ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

পুরুষ সাইকির ভেতরে শাসন নামক ধারণাটি, ইচ্ছাটি ও বাসনাটি ভূতকাল থেকেই ভূতের মতো উৎকটভাবে গেঁথে-জেঁকে বসে আছে। পথে বেড়ালটাকে একটা লাথি দিয়ে যাওয়া বা ক্ষ্যাপার মতো হর্ন বাজানো থেকে শুরু করে ঘরে বউ পেটানো, স্কুলে ছাত্র ঠেঙ্গানো, দপ্তরে কর্মচারী শাসানো—সবই এই শাসনতান্ত্রিক ইচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ। ভিলেন মানেই হিরোকে শাসানো-পেটানো এবং হিরো মানেই ভিলেনকে শাসানো-পেটানো। রাজনীতি মানেই যেন ধর-মার-বান ও লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান। মাইরের উপর ওষুধ নাই—এটা শুধু পোলাপাইনের ফালতু কথা মাত্র নয়, বুইড়ারাও জেনুইনলি বিশ্বাস করে। বহুকাল থেকেই পুরুষেরা নির্ধারণ করে চলেছে পারস্পরিক নানা মিথস্ক্রিয়ার নাম। ফলে আমরা প্রথমে পেয়েছিলাম কমপ্লেইন্ট সেন্টার বা অভিযোগ কেন্দ্র। এই অভিযোগ হচ্ছে শাসনের প্রথম পদক্ষেপ। অভিযোগ-সাইকি ও শাসন-সাইকি একে অপরের ভাই। সর্বোপরি, পুরুষেরা রাজনীতির তত্ত্ব নির্মাণ করে এবং রাজনীতি করে বলেই সংবিধানকে শাসনতন্ত্র ও রাষ্ট্রকে শাসনযন্ত্র বলা হয়।

শাসন করতে গায়ের জোর লাগে আর গায়ের জোরটা বেশী বলে জেতার এই পথটা পরুষের জন্য সহজতম। ফলে এর বাইরে গিয়ে খেলার অন্য নিয়ম স্থির করে হেরে যাওয়ার ঝুঁকি সে নেয় না। ‘পুরুষের’ সাইকি, নৈতিকতা ও তন্ত্রমন্ত্রকে তাই পরিণত করা হয়েছে ‘মানুষের’ সাইকি, নৈতিকতা ও তন্ত্রমন্ত্রে। কোনো পুরুষ কর্তৃক নারীর কণ্ঠস্বরের প্রতি মনোযোগী হওয়া, তার উচ্চারণকে বিবেচনা করাকে পুরুষসমাজ স্ত্রৈণদোষ বলে আখ্যায়িত করেছে। পতিভক্তিকে সদগুণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হলেও স্ত্রৈণদোষে দুষ্ট হতে কোনো কাপুরুষও রাজী হয় না। তবে অবস্থার যে পরিবর্তন হচ্ছে না তা নয়। আমরা এখন অভিযোগ কেন্দ্রের বদলে সার্ভিস সেন্টার বা সেবাকেন্দ্র বলতে শিখেছি। তবে সরকারী দপ্তরগুলো ব্যাপারটাকে উল্টে ফেলেছে। আগে ছেলেরা মেয়েদের কাছ থেকে সার্ভিস নিতেই পছন্দ করতো বলে এখন ভাল মানুষ সেজে নিজেরাই সার্ভিস দিতে শুরু করেছে।

কিন্তু সার্ভিস বা সেবা খুব যুতসই ধারণা নয়। এর মধ্যে অসাম্য ও দাসত্বের দ্যোতনা রয়েছে—একপক্ষ যেন শাহেনশাহ আর অপর পক্ষ জী-হুজুর। তবে আমাদের প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজগুলো এক্ষেত্রে মেয়েলি চিন্তার যথার্থ মূল্যটিকে অনুধাবন করতে পেরেছে—তারা বলছে কেয়ার সেন্টার, অর্থাৎ যত্নকেন্দ্র। যত্নের ডোমেইনটি শাসনের ডোমেইনের চেয়ে অনেক বড়। যত্নের মধ্যে শাসন একটি ক্ষুদ্র ও শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে বিদ্যমান আছে মাত্র, যা থেকে ক্রমে বের হয়ে আসাকে সম্ভব করে তোলাও আবার যত্নের লক্ষ্য হিসেবে বিদ্যমান থাকে। যত্নে একটি মা-সন্তান মা-সন্তান ভাব রয়েছে আর কর্মটা পারস্পরিক আদান-প্রদান ও অংশগ্রহণমূলক। এই মেয়েলী ভাবনাটাকে সকল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত তুলতে চেষ্টা করা আমাদের বর্তমান প্রচেষ্টা হওয়া দরকার। কবে শাসনতন্ত্রকে যত্নতন্ত্র ও শাসনযন্ত্রকে যত্নযন্ত্র বলা হবে এবং সেগুলো বাস্তবত সেভাবে ক্রিয়াশীল হবে আমরা এখন সে প্রত্যাশাকে উচ্চকিত করতে পারি। শাসনের আইনের চেয়ে বেশি গুরুত্বের সাথে যত্নের পন্থা অন্বেষাই হতে পারে আমাদের আগামীর চিন্তা ও পদক্ষেপ।

শাসনের কথা আসলে বিচারের কথা আসে। বিচারে ন্যায্যতা হচ্ছে শাসনের মূলমন্ত্র। শাসনের আইন প্রতিষ্ঠা পায় বিচারিক ন্যায্যতায়। পুরুষের সদভাবনা ন্যায়বিচারের মধ্যেই আটকে আছে। যত্ন আইনের কোনো মালা নয়, তা হচ্ছে অনুশীলন। তবে বিচার ও যত্ন—দুটোকেই পর বা প্রতিপক্ষ বলে বিবেচিত অংশের বেলায় আগ্রাসী হয়ে উঠতেও দেখা যায় হরহামেশা। ‘ব্রিং টু জাস্টিস’য়ের খাতিরে বিশ্বজুড়ে যত তোড়জোড়, হৈ-হল্লা, টাকা খরচ, ‘সেইভ দি চিলড্রেন’য়ের জন্য তত নয়। যত্ন আগ্রাসী হয় নিকটবর্তীদের স্বার্থের জন্য দূরবর্তীদের ক্ষতিকে আমলে না নেয়ার বা তাদের ক্ষতি সাধনের মাধ্যমে। সকল জাতির জাতীয় পরিসরে গৃহীত মূল্যমানগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিত্যক্ত হয়ে আছে এখনও। নিজেদের জন্য গৃহীত মূল্যমানগুলো অপরদের কোনো কাজে আসছে না। কিন্তু যত্নে ন্যায্যতা বলতে যদি বুঝায় ‘অন্যের সমরূপ অধিকার বা প্রাপ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে যত্ন’ তবে আমরা ‘ন্যায্য যত্ন’ বা ‘জাস্ট কেয়ার’ বা আরও এগিয়ে ‘ম্যাক্সিমাম কেয়ার উইথ জাস্টিস ফর অল’য়ের ধারণা তৈরি করতে পারি। এতে পুরুষালি ভাবনা ও মেয়েলি ভাবনার মধ্যে একটি সম্মিলন ঘটতে পারে।

শাসনের সাথে যুক্ত আরেকটি দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে যুদ্ধ। যুদ্ধ হতে পারে আন্তর্জাতিক, আবার হতে পারে অভ্যন্তরীণও। মানবজাতির দুঃখ-দুর্দশার এ-ও এক প্রধান কারণ। যুদ্ধ সিদ্ধ হয়ে আছে আত্মরক্ষার অধিকার দিয়ে এবং যুযুধান সকল পক্ষের মুখেই এই একই যুক্তি, দেহে এই একই বর্ম। সমঝোতার কোনো চেষ্টা তেমন দেখা যায় না। দু’একটি যা নজরে পরে তা-ও যুদ্ধ করতে করতে হয়রান হওয়ার পরই ঘটে—ভবিষ্যতের নতুন যুদ্ধের জন্য এটা যেন একটা শান্তিপূর্ণ প্রস্তুতিকালের আয়োজন। জ্ঞানীগুণীজনেরা বলে থাকেন, রক্তপাতহীন যুদ্ধই রাজনীতি, আর রক্তপাতের রাজনীতির নাম যুদ্ধ। যুদ্ধের জন্য পুরুষের আগ্রহের যেন শেষ নেই। প্রতিপক্ষের সৈন্যকে মরতে দেখলে ছেলেরা আকাশে হাত ছুড়ে খুশিতে শ্লোগান দেয়, আর মেয়েরা ভেজা চোখে ভাবে: আহা! না জানি কোন মায়ের ছেলে! কেন যে যুদ্ধ করতে আসে!

পুরুষের বুদ্ধির শেষ নেই—পুরুষালি শব্দটার ভেতরেও সে বাহাদুরি নামের ভাবটাকে ভরেছে, তার উপর ভিত্তি করে ভার্চু এথিকস তৈরি করেছে। অন্যদিকে মেয়েলিভাবে ভাবতে এখন আর মেয়েরাও চায় না—এটাকে তারা অবমাননাকর বলেই ভাবছে। শব্দ-ব্যঞ্জনার ঐতিহাসিক ভার তারা বহন করতেই-বা চাইবে কেন? কিন্তু পুরুষই আদর্শ, পুরুষ-সাইকিই আদর্শ সাইকি—এটাও এসেছে ও বহাল তবিয়তে টিকে আছে পুরুষের বানানো ঐতিহাসিক বয়ানের জোরেই। প্রকৃত স্বাধীনতা বলতে যা বুঝায় তার মধ্যে যদি আপতিত-নিপতিত বয়ান সম্বন্ধে সজাগতা অন্তর্ভুক্ত থাকে তবে সবার জন্যই এই সতর্ক হয়ে উঠাটা প্রথম প্রয়োজন। রাজনীতিতে মেয়েলি ভাবনা হানিকর—এ ধারণা থেকে পুরুষদের বের হয়ে আসা দরকার। এই বের হওয়াটা নারীর মতো হওয়ার ইচ্ছা নয়, বরং মানবিক কর্তব্যের যথার্থ ধারণা অর্জনে তা সহায়ক।

দেশকে আমরা মা-মা বলে কত গান করি, কত অহংকার করি। কিন্তু রাষ্ট্রের শাসন দেখলে বাপ-বাপ বলে চিৎকার করে হেনস্থা হয়ে পালাতে হয় অনেককেই। রাষ্ট্রগুলো যেন ভাত দেয়ার মুরদ নেই, কিল দেয়ার গোঁসাই হয়েই থেকে যাচ্ছে। এক বাপের ঘর থেকে পালাতে হচ্ছে আরেক মায়ের কোলের প্রত্যাশায়। দুনিয়া জুড়েই কমবেশি চলছে এই বাপ-বাপ কাণ্ড ও মা-মা দৌড়। নানা নামে ও প্রকারে চলছে এই হিজরত। রাজনীতিতে মেয়েলি ভাবনার মূল্যকে বুঝতে পারলে হিজরত কমানোর বুদ্ধি বের করা সম্ভব হতেও পারে। আর বিষাক্ত হয়ে ওঠা পুরুষালি চিন্তা যদি মেয়েলি চিন্তাকে ইনফেক্টেড করে তুলতে চূড়ান্তভাবে সফল হয় তবে সংকট কেবল বাড়তেই থাকবে। আগামী দুনিয়া সুন্দর হতে পারে নারীদের স্বাধীন চিন্তা ও তা থেকে জাত উচ্চকিত কণ্ঠস্বর থেকে এবং যদি পুরুষেরা সেটা মন দিয়ে বিবেচনা করতে প্রস্তুত হয়।
n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি