ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

সকালে উঠো, অফিসে যাও। বিকেলে—কপাল মন্দ হলে রাতে—ঘরে ফেরো। তারপর ঘুমোতে যাও। এবং ফের সকালে উঠো…। কর্মমালার সুতোটা গোলাকারে ঘুরপাক খাচ্ছে তো খাচ্ছেই। কুণ্ডলীর মতো। যেন সার্কল ইন দি স্যান্ড। রাউন্ড এন্ড রাউন্ড। পাক খাওয়ার সাথে সাথে ইদানীং মাঝে মাঝে খাবিও খাচ্ছি। সুতোয় বাঁধা জলে ভাসা ফাতনার মতো। ডুবতে ডুবতে আবার ভাসা। সুতো হয়তো সহসাই একদিন ছিঁড়বে। পাক খাওয়া, খাবি খাওয়া—সব খাওয়াই লাটে উঠবে। অনুভবে না থাকলেও সেটা জ্ঞানে আছে তো বটেই। আর না, অনন্তকাল ধরে এবার অহর্নিশি অন্ধ, জন্মান্ধ, রোগী, কুষ্ঠরোগী, মুমূর্ষু, মরাদের সব সেবা করে বেড়াবো—ভগবানের নামে দিব্যির পর দিব্যি দিয়ে শপথের পর শপথ করলেও সেকান্দর বা রুস্তমকেও আজরাইল বিশ্বাস করবে না। সে রেহায় দিতে জানে না। ডেথ ইজ মার্সিফুল টু নো-বডি। অতএব, সেকান্দর-রুস্তমের না থাকুক, সকলের জন্যই আশার বাণী ত্যাগ করারও তাগাদা দেখছি না। আমার গোষ্ঠির রক্তের ধারার সাথে ছাপ মারা হয়ে আছে বি পজেটিভ। আশা করা যায়, আমার মতো যে নো-বডি, সে মার্সির অ-কাবেল নয়।

তবে এই নিদ্রা ও জাগরণ তথা আবর্তমান রাত্রি ও দিবসের মধ্যে কোনটি এইম ও কোনটা-ই-বা মিনস তা নিয়ে—বলি শোনেন—আমার একটি সুভাবনা রয়েছে। লোকে কী ধারণা করে তা আমার জানা নেই। অনুমান করি, কর্মবীর যারা, তারা রাতে ঘুমোতে যায় সকালে উঠবে বলে। কিন্তু আমার মতো আলসেরা সকালে উঠে রাতে ঘুমোতে যাবার জন্যে। দিনের বিপ্লবী সংগ্রামের তাগিদে লোকে রাতে গুড নাইট সম্ভাষণে সুইট ড্রিমস শুভেচ্ছা করে। সংগ্রামে জয় হলে ডে হয় গুড। আর আমি দিনে কিছু মাত্র কাজ করি রাতের ঘুমকে হারাম হয়ে উঠা থেকে বাঁচানোর একান্ত প্রয়োজনে। বাহ! ভারী দেমাগ হচ্ছে দেখি!—অভিযোগ অসঙ্গত নয়। বিচিত্র সব জীবনের মা এই বিচিত্র ধরণী। আলসেমি নিয়ে অলসেরও থাকে বুক-চেতানো ফুটানি। তবে ঘুম যে কেবল আমারই সম্পত্তি, আমারই দখলে, তা তো নয়। ধরণীর মতো নিদ্রাও বীরভোগ্য বটে। মেপে দেখলে দেখা যাবে, আমার কপালে ডিম্ব আর তাদের ভাগে সিংহ। বিশ্বাস না হলে উদাহরণ দিতে পারি: দেশে-বিশ্বে একটা বড়সড় অঘটন অথবা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। আর অমনি উজির আলেম আমলা কামলা সবার ঘুম হারাম। অবশেষে আবার লম্বা ঘুম। নতুন ঘটনা ঘটলেই কেবল নবরূপে নিদ্রাভঙ্গ।

যথানিয়মে সেদিনও আমি ঘুমোতে গেলাম। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নের মধ্যে ঘুম ভাঙলো। ঘুম ভাঙলেও স্বপ্ন চললো। আয়নার ভেতরে আয়নার ছবির মতো। ড্রিম, বেবি, ড্রিম অন। অফিসে গেলাম। দেখলাম আমার আগেই তিনি এসে বসে আছেন। মনে মনে সগর্বে অনুভব করলাম, চুক্তিভুক্ত বেতনভুক কর্মচারী আমিই হলাম আসলে রাজা। আর লাভের গুড়ে পালিত স্বাধীনেরা আমার প্রজা। নতজানু সভাসদদের সারির ভেতর দিয়ে রাজা যেভাবে রাজা-রাজা ভাব নিয়ে সিংহাসনের প্রতি করুণা প্রকাশ করেন, আমিও তেমনটি নকলনবিশি করে তার ও তার লটবহরের মধ্য দিয়ে গিয়ে ঠাণ্ডা চেয়ারটাকে গরম হওয়ার সুযোগ করে দিলাম। তিনি আবদারের সুরে বললেন, আমি আপনার বড়কর্তার সাথে আলাপ করে কমিটি বানাবো। তাতে আপনাকে থাকতে হবে কিন্তু। না বললে চলবে না। এ আমি আগাম বলে রাখলাম।

শোকে-দুঃখে ভয়ে-আতঙ্কে লোকে কত যে অকাতরে সকাতরে ডেকে বলে, হে ধরণী! দ্বিধা হও, লুকাই! তবুও ধরণী শোনে কার কথা! আর আমি না ডাকতেই দেখলাম, দ্বিধাবিভক্ত ধরণী, আর ধরণীর ভেতর বা-ইজ্জত গায়েবায়ন দূরস্থ-সুদূর বচন। আরও দেখলাম, লোক-লস্করের চোখের সামনে আমার গতরে সুতা মাত্রও অবশিষ্ট নেই। কে আসল আর কে নকল তার খবর গাতকে না রাখলেও আমার আর অজানা থাকলো না। অল দ্যাট গ্লিটার্স ইজ নট গোল্ড। তবুও দিন গেলেও যে কথা থেকে যায়। আপনিই বলুন, কে রাজ্য এত সহজেই-বা হেলায় হারাতে চায়? জিজ্ঞেস করলাম, বড়কর্তার কাজ আজকাল আপনারাই করছেন বুঝি? ঠেস দিয়ে বেশ করে লাল করে তুলে বস্ত্র ফেরত পাওয়ার আশা করেছিলাম। ফল হয়নি। লঙ্কায় গেলে রামের শিষ্যও রাবণ হয়। দশ মাথা ধরে টানলেও চুল ছাড়ে না। চুলেরই যখন মুক্তি নেই, তখন বস্ত্র উদ্ধারের আশা কই? আবু মেঘনাদ রাবণের তো আর ইয়ে ছিল না, কিন্তু দুঃশাসন ইবনে ধৃতরাষ্ট্রের সেই দারাজত নেই।

হৃত-বস্ত্রের শেষ অস্ত্র মিনতি। চোখ থেকে আলোর সিগনাল না পেলে মস্তিষ্ক মুখকে আদেশ করে, এবার মিনতি কর্। আদেশের অনুবর্তী হয়ে বললাম, ভাই, আমি থাকতে চাই না—এ কথা কর্তাবাবুকে বলে আর লাভ কী? সুদে বড়ে মিঞা যখন আসলে ছোটে মিঞা, তখন আপনাকেই অনুরোধ করছি, দয়া করে আমাকে রাখবেন না। ইউরেকা, ইউরেকা বলে পদার্থ-বিজ্ঞানী সেই কবে বিনা কাপড়ে প্রকাশ্যে রাজপথ ধরে দৌড়লেন। সে কি যে-সে দৌড়? এক দৌড়ে একেবারে রাজার দরবারে হাজির। কাজে কাজেই অপদার্থ-অজ্ঞানী যদি অন্তত কর্তার দরবার থেকে পালাতে পারে তবে তাতেও রক্ষে—গায়ে কাপড় নাই-বা থাকলো। রাজায় দেখলে যদি মান না যায়, প্রজায় দেখলে যাবে কেন? আর্কিমিডিসের দৌড়ের কথা লোকে ঢেকেও রাখেনি। আমারটার ঢোল আমি নিজেই বাজালে ক্ষতি কী? নিজের ঢোল নিজেই পেটায়—দুনিয়ায় এমন লোকের তো আকাল পড়েনি। সকলের যদি হয় এক পরিণতি, দেখিলেই তাহাতে-বা হয় কার ক্ষতি?

ভাবছেন, সোজা কথা সোজাভাবে দু’লাইনে বললেই হয়। অতশত ফ্যান্টাসির পর্দা কেন? কিন্তু কী করবো, বলুন? কলিকালোত্তর উত্তরকলিকালে নিদ্রাকালেও মেফিস্টো থেকে রেহায় মেলে না। আর আমি যে স্বপ্ন দেখি না—তার-ই-বা প্রমাণ কই? তারও উপর আরও ভারী কথা—বৈষম্য করলে তো চলবে না, বাপু। মা হয়ে সন্তানের নাক চেপে ধরে দেদারসে শিশির পর শিশি কত-যে ওষুধ গিলিয়েছেন তিনি! আর আমি বাপ হয়েও ওইটুকু বাচ্চার ঘাড় চেপে ধরে ঈশপের একখানা গল্পও গেলাতে পারলাম না। পড়তে বললেই সে বইটার পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টায়। আর একে একে গল্পের শেষে লেখা এক লাইনের নীতিকথাগুলো নিমেষে পড়ে শেষ করে বইটা ফেরত দেয়। সাথে বলে, কেসসাগুলো তুমিই পড়ে নাও, বাবা। কাজে আসবে। ইনানো-বিনানো ছাড়া তোমার আর কাজ কী বলো? তা ঈশপে-আমাতে বৈষম্যের যুক্তি কি এই কঠিন সত্যই যে, তিনি জ্ঞানী ধনী সবল, আর আমি দুর্বল গরিব মূর্খ? সে যাই হোক, আমি যা-ই হই, আপনারা নিশ্চয়ই আজকালকার শিশুর মতো করে ঈশপ-পড়ুয়া নন।

পরে বুঝেছি, আমি এমনটাই বকছিলাম, আর নাকে-মুখে গজরাচ্ছিলাম। কিন্তু তিনি তা সহ্য করবেন কেন? অফিস-ঘর ডবল শিফটে দপ্তর করে যিনি হয়রান, আমার মতো সিঙ্গেল-শিফট অলসের আভিজাত্য তার অসহ্য হওয়ারই কথা। কাজেই ঠেলা খেয়েই ঘুম ভাঙলো। বললাম—বাপরে! কী যে একটা বিচ্ছিরি স্বপ্ন!… গায়ে সুতা নেই,… একেবারে দ্রৌপদী দশা…। শুনলাম—ওমা, এ আর নতুন কী কথা! তা লোক হাসানোর শখ থাকলে তোমার দিগম্বর-অবস্থা-সংবাদ সকালে ব্লগে ছাপিয়ে দিও, আমাকে জ্বালাচ্ছো কেন? আমিও স্বস্তি পেলাম—যাক বাবা! এ স্বপ্ন মাত্র।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি