ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

বিরোধ ও দ্বন্দ্ব আমাদের জীবনের অংশ। এমতাবস্থায়, দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের অবতারণা করা যাক: ১. বিরোধ যদি জীবনের অংশই হয়ে থাকে, তবে আমরা তা নিয়ে স্বচ্ছন্দে থাকতে পারি না কেন? এবং ২. বিরোধের মধ্যে ভালোত্ব বলে কিছু আছে কি?

নিছক ব্লগ লেখার মাধ্যমে ব্লগারদের মধ্যে পারস্পরিকভাবে সক্রিয় বা ইন্টারয়েকটিভ কোনো যোগাযোগ সাধিত হয় না। সেটা হওয়া সম্ভব মন্তব্য লেখালেখির মাধ্যমে—যাকে আমরা বলতে পারি বাচনিক মিথস্ক্রিয়া। এই বাচনিক বা ভাষাগত মিথস্ক্রিয়ার দুটি অবস্থা রয়েছে: একটি বিরোধবিহীন ও অপরটি বিরোধপূর্ণ। প্রথমটির ক্ষেত্রে আমাদেরকে তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না। কিন্তু সমস্যা-সংকুল হচ্ছে পরেরটি—আমরা আহত হতে পারি, আঘাত করতে পারি ইত্যাদি।

আমারা কী চাই এবং আমরা কী পেতে পারি—তার মধ্যে প্রায়শই ফারাক থাকে, বা জিনিস দুটি এক হয় না। যেমন আমি চাইতে পারি একটি আম, কিন্তু অবস্থা হচ্ছে এমন যে, আমার পক্ষে একটি আপেল পাওয়াই সম্ভব। দুটিকে এক করতে হলে হয় প্রত্যাশিতকে নয়তো প্রাপ্তব্যকে পরিবর্তন করতে হবে। সমস্যা হচ্ছে, প্রত্যাশা আমার মধ্যে থাকলেও, প্রাপ্তব্য আমার বাইরে বাস করে। কাজেই প্রায় সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তনটা বাস্তবে ঘটে না, বা সম্ভব হয় না। কারণ আমার প্রয়োজন ও অন্যের সক্ষমতা ইচ্ছে করলেই বদলানো যায় না। ফলে ফারাকটা বা ভিন্নতাটা কখনোই ঘুচে না। এই পাওয়াটা অন্যজনের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে বলে তার সাথে আমার বিরোধ বাঁধে।

ব্লগের ক্ষেত্রে চাওয়া-পাওয়ার সমস্যাটি তৈরি হতে পারে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত সার্ভিস নিয়ে। আবার তৈরি হতে পারে ব্লগারদের নিজেদের মধ্যে। আমার বর্তমান উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্লগারদের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়া বাড়ানোর উপায় খোঁজা। কাজেই সার্ভিস আপাতত আলোচনার বাইরে রাখছি। আন্তঃব্লগার চাওয়া-পাওয়াটা কিন্তু শূন্য-মূলক নয়। মানে আমি আম চাইছি, আর তিনি আম দেবেন না, এরকম নয়। রকমটা হচ্ছে তিনি আমের বদলে আপেল দিতে চাইছেন, যা আমি আবার নিতে চাচ্ছি না।

ব্লগে আমরা কী লিখি? ব্লগ আমরা কেন লিখি? এদুটি প্রশ্নের উত্তর থেকে চাওয়া-পাওয়ার স্বরূপ বের হয়ে আসতে পারে হয়তো। উত্তরে বলা যায়: আমি একটি বিষয়কে একভাবে দেখছি, ব্লগের মাধ্যমে সে দেখাটাকে অন্যের সামনে উপস্থাপন করছি, অন্যের বিবেচনার জন্য। আমি নিশ্চয়ই আমার দেখাটাকে তথা ভাবনাটাকে নিজের তথা সকলের জন্য কল্যাণকর মনে করি বলেই তা উপস্থাপন করছি। ‘কল্যাণের’ বদলে অনেক ক্ষেত্রে ‘সত্য’ বা ‘আনন্দকেও’ ব্যবহার করা সম্ভব। ঘটনার বিবরণ, একটি নির্দিষ্ট পারসপেকটিভ থেকে ঘটনার বিবরণ ও মূল্যায়ন (যা সাধারণত খুবই সাবজেকটিভ এবং সাবজেকট টু আইডিওলজি), মতাদর্শের বিশ্লেষণ, নিছক আনন্দ দান—এসবই ব্লগের কন্টেন্ট হতে পারে।

তবে লেখার ধরণ-ধারণ পর্যবেক্ষণ থেকে এ বাস্তবতাকেই লক্ষ্য করা যায় যে, অধিকাংশ ব্লগ তাত্ত্বিক (যার মধ্যে ধর্মও অন্তর্ভুক্ত) এবং রাজনৈতিক মতাদর্শগত অবস্থান থেকে লিখিত। অর্থাৎ অধিকাংশ লেখা আদতে, বা প্রচ্ছন্নভাবে হলেও, প্রচারণামূলক। কিছু লেখাও পাওয়া যায় যেগুলো এই প্রবণতার বাইরে। জীবনের অভিজ্ঞতা সেখানে সাধারণত রম্য করে অথবা সংবাদ আকারে উপস্থাপিত হয়ে। ফলে বলা চলে, এই ব্লগসাইট প্রকৃত প্রস্তাবে বা প্রধানত বিভিন্ন মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক অবস্থানের লেখকদের একটি বিচরণস্থল।

কিন্তু ব্লগারদের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া নেই বললেই চলে। আমরা নিজেদেরকে বহুল পরিমাণে গুটিয়ে রেখেছি; যদিও আমাদের মধ্যে ব্লগারের সংখ্যা কম নয়, পাঠকের সংখ্যাও কম নয়। সকলেই যেন সাইলেন্ট ব্লগার এবং সাইলেন্ট রিডার। ব্লগগুলো আবার পাঠকরা বিপুল পরিমাণে শেয়ারও করছেন ফেসবুক ইত্যাদি সোশ্যাল মিডিয়াতে। অর্থাৎ তারা সাইলেন্ট হলেও নিষ্ক্রিয় নন। তাহলে ব্যাপারটা শেষতক কী দাঁড়াচ্ছে? সোজা কথায়, আমরা কেউ অন্যের সাথে প্রকাশ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়তে চাচ্ছি না, আমরা সেলফ সেন্টারড হয়ে পড়ছি, আমরা নীরবতাকে স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে নির্বাচন করেছি, যার যার কথা পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরছি এ প্রত্যাশায় যে, যার উপকারে লাগে সে উপকৃত হোক—এমন একটা ভাব নিয়ে।

বিরোধ কি আমাদের জন্য কোনো উপকারী জিনিস? বিরোধ মাত্রাছাড়া হলে একটি সংস্থা মুখ থুবরে পড়ে। আবার এও সত্য যে, কোনো সংস্থায় বিরোধ না থাকলে সে সংস্থাটি যথাযথভাবে চলতে পারে না। এই দুই বিপরীত অবস্থার মধ্যে বিরোধ-মাত্রার একটি প্রত্যাশিত স্তর রয়েছে যা সংস্থার জন্য দরকারি ও উপকারী। এগুলো কনফ্লিকট রেজলুশন বা কনফ্লিকট ম্যানেজমেন্ট নামক শাস্ত্রের মূল কথা। এ নিয়ে বেশী কিছু বলার দরকার পড়ে না। ব্লগারদের অনেকেই জানেন এবং আন-লাইনেও অনেক রিসোর্স রয়েছে। বুঝার সুবিধার জন্য আমি কেবল দুটো ছবি দিলাম।

বিরোধ বনাম প্রভাব গ্রাফ:
conflict1

বিরোধ ব্যবস্থাপনায় ব্যক্তির স্টাইল:
conflict2

ব্লগে আমাদের কারবারটা বিমূর্ত; ভাব ও ভাষা নিয়ে; বুদ্ধি দিয়ে বুঝাবুঝির ব্যাপার মাত্র। এখানে ধন-সম্পদের মতো মূর্ত বিষয়ে লাভ-ক্ষতির কোনো আশঙ্কা নেই। লেখাটিকে বুঝতে চাওয়াই এখানে প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হতে পারে। এতে জানা-বুঝাটা সমৃদ্ধ হয়। একটি বিশ্বাস ও আদর্শের কারণে আমি একটি নির্দিষ্ট পারসপেকটিভ এবং দেখার একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতার সাথে বিদ্যমান থাকি—এটিই স্বাভাবিক এবং এ থেকে মুক্তিও নেই; একই সাথে এটাও মেনে নিতে হয় যে, এটা দোষেরও কিছু নয়। কিন্তু এই সাপেক্ষ-অবস্থার কারণে আমার দেখাটা পূর্ণ হয় না। এখানে জ্ঞানটা বাড়ে অন্য পারসপেকটিভ ও ভিন্ন রকমের সক্ষমতাসম্পন্ন ব্লগারের দেখার বিবরণটিকে অনুধাবন করার মাধ্যমে। এটা আমার নিজের চিন্তাগত সমৃদ্ধির জন্য আবশ্যক। আমি যা মিস করছি তা অন্যের কাছ থেকে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছি। আরও সুফল হচ্ছে, আমরা একজন আরেকজনকে বুঝতে পারবো, কাছাকাছিও আসতে পারবো, বিরোধটা উপকারী বা প্রত্যাশিত মাত্রায় বিদ্যমান থাকবে এবং পার্থক্যটা বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে না।

এ অবস্থায় বরফ গলানোর উপায় কী? কী করে মিথস্ক্রিয়া বাড়ানো যায়? এটাই এখন খুঁজে বের করার বিষয়। আমি নবীন-প্রবীণ সকল সহব্লগারকে মতামত দেয়ার জন্য আহ্বান করছি। প্রত্যেক সহব্লগার অন্তত দু’চার লাইন হলেও লিখুন।

[এ দোষটি আমারও আছে, আমি নিজেও মন্তব্য করি না। দোষটিকে আমিও কাটিয়ে উঠতে চাই। সহব্লগারবৃন্দের মতামতে আলোর দিশা নিশ্চয়ই মিলবে।]

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি