ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

‘মুক্তমন’ ও ‘বিজ্ঞানমনস্কতা’ কি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাসের মানুষদের একচেটিয়া সম্পত্তি? নাকি ‘নাস্তিকতা’ নামক বিশ্বাসটির সরাসরি ব্যবহারে সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে কৌশলগত কারণে ধার্য করা দুটি বিকল্প শব্দ? পত্র-পত্রিকায় যাদের জন্য এ শব্দ দুটি রীতিমতো টাইটেলের রূপ নিয়েছে, যারা নিজদেরকে ‘বিজ্ঞানমনস্ক মুক্তমনা’ বলে ঘোষণা করছেন, তাদের লেখা পড়লে দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিই গ্রহণ করতে হয়।

ঈশ্বরের ধারণা মানবজাতির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ এবং দার্শনিক চিন্তায়ও তার একটি স্থান রয়েছে। কিন্তু নাস্তিক বা এথেয়িস্টদেরকে এখনও আত্মপরিচয় দিতে হয় নেতিবাচকভাবে—মানে, তারা যা মানেন তার ভিত্তিতে নয়, যা মানেন না তার ভিত্তিতে। এই যে অন্যের বিশ্বাসের নেগেশনে নিজের পরিচয় তা ইতিবাচক নয়, পরনির্ভর। দুনিয়ায় যদি সবাই নাস্তিক হয়ে যান—যা তারা কাম্য মনে করেন, যার জন্য তারা লড়ছেন, যে লড়াইয়ে তাদের জয় অবশ্যম্ভাবী বলে প্রফেসি করছেন—তবে নাস্তিক শব্দটির যা একটু অর্থ এখনও বিদ্যমান, তাও থাকবে না। এ বিচারে তারা ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ শব্দটিকে নিজেদের জন্য একচ্ছত্র করতে চাইছেন—এটাও অসম্ভব নয়।

তবে মুক্তমন্যতা ও বিজ্ঞানমনস্কতাকে অবধারিতভাবে একত্র করা সম্ভব নয়। মুক্তমন বলতে কী বুঝায় এবং বিজ্ঞানমনস্কতা বলতেই বা কী বুঝায় তা এগুলোর একচ্ছত্রবাদী সমর্থকদের কাছ থেকে ভালভাবে পাওয়া যায় না। আমাদেরকে জানানো হয়েছে যে, নিউটনের আপেল মাথায় না পড়ে উড়ে গেলো না কেন, এমন চিন্তাটাই মুক্তমনা হওয়ার প্রধান লক্ষণ। কিন্তু বিজ্ঞানমনস্কতায় তারা এতোখানি নিবিষ্টভাবে অনন্যমনস্ক যে, অন্যমনস্ক হওয়ার, দর্শনমনস্ক হওয়ার অবসর পান না। পেলে ‘আমি কি মরা, অন্ধ, মূর্খ বস্তু থেকে অনিচ্ছায় উত্থিত কিন্তু স্বনিয়োজিত অভ্রান্ত জ্ঞানাবতার?’—এ প্রশ্নটিকেও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে বিনয়ের পথ ধরতেন।

বিজ্ঞান অভিজ্ঞতার জগতের বাইরের কিছু নিয়ে কথা বলে না; আবিষ্কার করতে চায় শুধু অভিজ্ঞতার জগতের নিয়মগুলোকে। এখানে অভিজ্ঞতা হচ্ছে আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা এবং তা আমাদের বুদ্ধির যুক্তিগত পারঙ্গমতা নির্ভর বিষয়। অর্থাৎ, ‘মানুষের’ বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি হচ্ছে ‘মানুষের’ ইন্দ্রিয়সমূহের ও ‘মানুষের’ বুদ্ধির গড়ন, ধর্ম, ছাঁচ ইত্যাদির নিকট প্রতিভাসিত জগতকে বিজ্ঞানের জগত হিসেবে নেয়া—এটাই বিজ্ঞানে গৃহীত প্রথম এসাম্পশন; এটা যে একটা এসাম্পশন মাত্র তা সম্বন্ধে ‘বিজ্ঞানমনস্ক’রা সচেতন থাকুক আর না-ই থাকুক। এধরণের এসাম্পশন-বন্দী শাস্ত্রের উপর এতো অন্ধ অগাধ বিশ্বাসের চিন্তকরা কিভাবে মুক্তচিন্তার অধিকারী হন তা তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা আর ধর্মান্ধ গোঁয়ার-গোবিন্দদের কাছ থেকে চিন্তার সমস্যা সম্বন্ধীয় সচেতনতা প্রত্যাশা করা একই কথা। আমি যা দেখি না, আমি যাকে জানতে পারি না, তার কোনো অস্তিত্ব নেই—এটাই হচ্ছে বিজ্ঞানমনস্কদের চূড়ান্ত সূত্র আর আমাদের কর্তব্য বুঝি-বা তাদের এই ঘোষিত অন্ধত্ব ও অজ্ঞানতায় একিন রাখা।

তারা বিজ্ঞানকে সবকিছুর পরীক্ষক হিসেবে নিয়েছেন। আমরা জানি বিজ্ঞানেরও পরীক্ষক আছে, আর তা হচ্ছে দর্শন। দর্শনই হচ্ছে মানুষের কাছে এভেইলেবল সর্বোচ্চ পরীক্ষক। দর্শন ধর্মকে পরীক্ষা করে দেখার অধিকার যেমন রাখে, তেমনই দর্শনের পরীক্ষার আওতা থেকে বিজ্ঞানেরও রেহায় নেই। যেসব বিজ্ঞানমনস্ক এ কথা মানতে চান না, তারা তাদের বড় বড় নাস্তিক বিজ্ঞানী ও নাস্তিক দার্শনিককে জিজ্ঞেস করে দেখুক।

স্বঘোষিত বিজ্ঞানমনস্ক বন্ধুরা মনে করেন ধর্মের জন্যই দুনিয়ায় যত অনাচার, বিভেদ ও যুদ্ধ। ধর্ম অপসৃত হলে ও কেবল বিজ্ঞান বিদ্যমান থাকলে দুনিয়ায় আর অনাচার থাকবে না, বিভেদ থাকবে না, যুদ্ধও থাকবে না। তাদের আশা, সব মানুষ ধর্ম ছেড়ে ‘মুক্ত বিজ্ঞানমনস্ক’ হয়ে গেলেই দুনিয়া আলোয় একেবারে ফকফকা, প্রগতি আর প্রগতি, শান্তি আর শান্তি। এভাবে অর্জিতব্য শান্তির লক্ষ্যে তারা ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন, দুনিয়াটাকে অনাচারমুক্ত করার জন্য এ যুদ্ধকে আচারে পরিণত করেছেন।

কিন্তু তারা চোখ বুজে বসে থাকেন এ ঘটনাগুলো থেকে যে, দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ যারা বাঁধিয়েছিলেন—যে যুদ্ধে ২ ও ৬ মোট ৮ কোটি মানুষই নিহত হলো, আহতের সংখ্যা, ঘরবাড়ির দশা বাদই দিলাম—তারা ধর্ম থেকে রাষ্ট্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আলাদাই রেখেছিলেন এবং হারে হারে বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন। কয়েক শতক ধরে ইউরোপ যে দুনিয়ার একটা বিরাট জায়গা জুড়ে যুদ্ধ, খুনাখুনি ও লুটপাট করলো, উন্মত্তের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো এশিয়ায়, আফ্রিকায়, আমেরিকায়, নির্মমতার একশেষ দেখিয়ে মেরে সাফা করলো সেখানকার অধিবাসীদেরকে, তারপর নিজেরা নিজেরা হানাহানি করলো, সেসবের নেতারাও ছিলেন গালিলিও, নিউটন, ডারউইনের সমর্থক, কাট্টা বিজ্ঞানমনস্ক মুক্তমনা। স্ট্যালিন নাস্তিক ছিলেন, নাস্তিক ছিলেন কম্বোডিয়ার খুনিরাও।

বিজ্ঞানকে ইনারা ধর্মের বিকল্প হিসেবে সকলকে গ্রহণ করতে বলেন। যেন বিজ্ঞান মানুষের আচরণের ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দ দেখার জন্য কপালের মধ্যখানে ইয়া বড় সাইজের একখানা চোখের অধিকারী। আজকের বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে আমরা জেনেছি যে, গতি নয়, ত্বরণের জন্যই কেবল বলের দরকার হয়; সূর্য নয়, পৃথিবীটাই সূর্যের চারদিকে ঘুরে; হিমোগ্লোবিন জীবদেহে অক্সিজেন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, বস্তু ইলেকট্রন, প্রোটন, কোয়ার্ক দিয়ে গড়া, ইত্যাদি ইত্যাদি। আর এসব মানলেই মানুষ সব যেন অটোমেটিক জ্ঞানী ও সাধু হয়ে যাবে; না মানলে মূর্খ ও অসাধু। অর্থাৎ, এরিস্টটল জানতেন গতি বজায় রাখার জন্য বল দরকার, টলেমী জানতেন পৃথিবীটা জগতের কেন্দ্র, থ্যালিস জানতেন দুনিয়ার সব বস্তুই আদতে পানি—আর এ কারণে তারা সব হলেন মূর্খদের সরদার এবং দুষ্টদের শিরোমণি।

ধর্ম সম্বন্ধে এঁদের জ্ঞান এরকম যে, ধর্ম মানে ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-তুমার দিয়ে রোগ-বালাই দূর করা। কথা শুনে মনে হয় দার্শনিক, বিজ্ঞানী, ডাক্তার, গণিতবিদদের কেউই শেষতক ঈশ্বরে বিশ্বাস করেননি, ধর্মচর্চা করেননি। মরার আগে তাদের প্রত্যেকেই বুঝি মানবজাতিকে অসিয়ত করে গিয়েছেন যে, তারা যেন জীবন থেকে ধর্মকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে। তাদের আরও বিশ্বাস, বিবর্তনবাদ কোনো মতবাদ নয়, নিউটনের সূত্রের মতো নিষ্পাদিত বিষয়। অন্যায়ভাবে বিজ্ঞানীরা ‘বিবর্তন সূত্রে’র বদলে ‘বিবর্তন’য়ের সাথে এখনও ‘বাদ’কে সন্ধি করে রেখেছেন। কিন্তু যেহেতু বিজ্ঞানীদের সকলেই এরকম বলছেন না, সেহেতু বিবর্তনবাদকে আধা-খিচড়া তত্ত্ব না বলে উপায় কী? এই আধা-খিচড়ায় বিশ্বাসকে নিশ্চিত জ্ঞানে পরিণত করে সব ছাত্রকে গেলানো বিদ্যালয়ের কাজ নয়। ধর্মের বেলায় তো তারা এরূপই মনে করে থাকেন। তাহলে বিবর্তনবাদের বেলায় আর দোষ কী? তাদের ক্যারিক্যাচারের শেষ কথা হচ্ছে, মাটি থেকে এলে পরের সৃষ্টি হয়, বান্দর থেকে আসলে হয় অটোমেটিক; অথবা, বই যদি থাকে টেবিলের উপর আর টেবিলটা থাকে মাটির উপর, তাহলে বইটার আর মাটির উপর থাকার জো থাকে না, সেঁধিয়ে যায় মাটির তলায়। তবে এ তত্ত্ব তাদের দাবী আর তাদের তৈরি সবকিছুকেই বিনা প্রশ্নে গেলা হচ্ছে বিজ্ঞানমনস্কতার অভ্রান্ত লক্ষণ।

এসব অতি-উৎসাহী বিজ্ঞানমনস্কদের একাংশের নৈতিকতায় গালাগালি পুণ্যকর্ম—তা এটি তারা মুখে স্বীকার করুন আর না-ই করুন, লেখা পড়লে এটাই প্রতীয়মান হয়। পিতামাতাদের ভ্রান্তির জন্য তাদেরকে গালাগাল করাকে তারা পুণ্যের কাজ মনে করেন। এই গালাগালই তাদের জেহাদের অস্ত্র। শক্তি পেলে, ক্ষমতা পেলে তারা আর কী কী করবে তা তাদের অসহিষ্ণুতা থেকেও অনুমান করা যায়। তারা মাঝে মাঝে এখানে ওখানে উঁকি দেন, কয়েক কলম লিখেন। কিন্তু তাদের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি না, ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দ আদতে কী, কিভাবে তাদের বিশ্বাস বা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান থেকে ন্যায়-ভাল উৎসারিত হয়। তাদের কথা শুনে মনে হয়, কাউকে মূর্খ বলে গাল দিলেই গাল খাওয়া লোকটা জ্ঞানী হয়ে যাবে, মন্দকে মন্দ মন্দ সব গাল দিলেই মন্দ ভাল হয়ে যাবে। তাহলে তো মূর্খ-মন্দগুলোর পিঠে ছড়ি ভাঙলে কাজ দ্রুততর হওয়ার কথা। শক্তি পেয়ে এরূপ বিজ্ঞানমনস্করা সে পথ অতীতে ধরেছিলেন, পেলে ভবিষ্যতেও ধরবেন বলে আশা করা যায়।

ধর্ম নিয়ে নিজ গোত্রভুক্তদের কারও কারও বাতচিত প্রসঙ্গে তাদের (অপর অংশের) বিরাগ রয়েছে। কথাগুলোকে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্যারিক্যাচার বলা হলেও একই সাথে এর জন্য ধর্মকেই দায়ী করা হচ্ছে। কিন্তু সমরূপে তারা মানতে নারাজ যে, যারা ধর্মের নামে হানাহানিটা করছে তারাও প্রকৃত ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন না, হানাহানিটার জন্য মুক্তচিন্তাধিকারীদের অনৈতিক উস্কানিও দায়ী। তারা যদিও তাবিজ-তুমারের ফকিরি চিকিৎসায় বিশ্বাস করেন না, তবুও ধর্মানুভূতির পিঠ কিলিয়ে রোগ সারানোর কবিরাজি পন্থায় বিশ্বাস করেন; আর এই কিলের জন্য মুক্তমনের হাত নয়, ধর্মপ্রাণের পিঠই দায়ী বলে ঘোষণা করেন। আমাদের যদি পিঠে ব্যথা থাকে আর সরকার যদি হাতের কারবারিদেরকে আমাদের পিঠ সামলে চলার পরামর্শ দেয় তবে তারা সরকারের উপর পিঠের ব্যথা জিইয়ে রাখার দায় আরোপ করেন। অথচ তাদের কোবরেজি চিকিচ্ছে যে মূর্খতাপ্রসূত, অনৈতিক ও অত্যাচারমূলক, এটা তারা আকল দিয়ে বুঝতেও পারেন না, আর অন্তর দিয়ে অন্যের ব্যথা অনুভব করার সামর্থ্য তো তারা বহুকাল আগেই হারিয়েছেন।

শিশুরা ব্যথা অনুভব করে, যুক্তি দিতে পারে না। ব্যথার অনুভব থেকেই তারা একটি নৈতিকতাবোধের অধিকারী হয়, পিতামাতার কাছ থেকে শিক্ষা পাওয়ার আগেই। পিতামাতা কেবল সেটিকে স্মরণ করিয় দেন, তার পক্ষে যুক্তি দেন, সেটিকে সম্প্রসারিত করেন। অন্যদিকে, সাইকোপ্যাথরা যুক্তি দিতে পারেন, কিন্তু মন দিয়ে অনুভব করতে পারেন না। আর আমাদের আলোচ্য বিজ্ঞানমনস্ক বন্ধুদের কেউ কেউ গোঁ ধরেছেন, তারা অনুভূতি ও যুক্তি—কোনোটারই ধার ধারবেন না, কেবল ক্যারিক্যাচারই করে যাবেন; এ তাদের অধিকার।

এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, তাদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। কিন্তু দুঃখজনক এ অবস্থার বিপরীতে তারা দায়িত্বশীল লেখালেখির বদলে সংকটকে চলমান রাখার কাজটিই করে যাচ্ছেন। জ্ঞান মানুষের উপর মাতব্বরির অধিকার দেয় না, বরং তা থেকে দায়িত্ব উৎসারিত হয়। কাজেই বিজ্ঞানমনস্ক বন্ধুরা যদি মনে করে থাকেন তারা অভ্রান্ত জ্ঞানের সর্বোচ্চ অধিকারী, তবে তারা সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিক। ধর্মে আলো নাই, তুমি ভুল আর আমি ঠিক—এরকম কথার কুপি থেকে আলো বেরোয় না। আপনারা ইতিবাচক লেখাও লিখুন, আমাদেরকে শেখান, জ্ঞান কী, যুক্তি কী, মূল্যবোধ কী, কেন তা আমাদের জন্য অবধারিত, জীবনের অর্থ কী, আমাদের কিভাবে চলা উচিত ইত্যাদি। কারণ প্রাইমারি স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় তক বিজ্ঞানের মেলা বই পিঠে বয়ে বেড়িয়েও এখনও আমরা গাধাই যে রয়ে গিয়েছি, সেখানে বাইরের দুনিয়াটা নিয়ে কিছু কিছু জানতে পারলেও ভেতরের জীবনটা নিয়ে আলোর কোনো হদিস পাইনি।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি