ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

১। সুবর্ণ বিধির নানারূপকে সংক্ষেপে নিচে লেখা গেল:

১.১.১। অন্যকে হিংসা করো না, যেহেতু তুমি অন্যের নিকট থেকে হিংসা প্রত্যাশা কর না।
১.১.২। অত্যাচার করো না, যেন অন্যে তোমার উপর অত্যাচার করতে না পারে।
১.২.১। অন্যের সাথে এমন আচরণ কর, যেমন আচরণ তুমি অন্যের নিকট থেকে প্রত্যাশা কর।
১.২.২। অন্যের সাথে অধিকতর ভাল আচরণ কর, যেহেতু অন্যের কম ভাল আচরণ তোমাকে আহত করে।

[১.১.১ ও ১.২.১ এর জন্য দেখুন: ধর্ম ও সুবর্ণ বিধি]
[১.১.২ এর জন্য দেখুন: সুবর্ণ বিধির তৃতীয় রূপ – শেষ অংশ]
[১.২.২ এর জন্য দেখুন: সুবর্ণ বিধির তৃতীয় রূপ – অংশ ৪ এর অনুচ্ছেদ ঙ]

২। অনুচ্ছেদ ১ থেকে আমরা যা পাই তা হলো: আমার পক্ষ থেকে হিংসা ও অত্যাচারের অবসান এবং অন্যদের সাথে সমরূপ সদাচার, প্রতিযোগিতামূলক অধিকতর সদাচার এবং প্রতিরক্ষা।

৩। প্রশ্ন হলো, উপরের এ বিধিগুলো বৈধ বা গ্রহণ-আবশ্যক হয় কিসের ভিত্তিতে? এ প্রশ্নের যুক্তিসঙ্গত উত্তর না পেলে আমরা বিধিগুলো বৈধ ও বাধ্যতামূলক এ কথা বলতেই পারবো না। মানুষের সত্ত্বাগত অবস্থা, মানুষে মানুষে সম্পর্ক, কাজের সাথে মানুষের সম্পর্ক—এসব বিষয় এখানে বিবেচনার জন্য চলে আসে অবধারিত ভাবে। কাজেই এখন প্রয়োজন বা আবশ্যক হচ্ছে সুবর্ণ বিধির পূর্ব-শর্তাবলী চিহ্নিত করা। পূর্ব-শর্তাবলী বলতে বুঝচ্ছি একই সাথে ‘রিকোয়ারমেন্ট’ এবং জ্যামিতিক ভাবে আবশ্যক পূর্ব-সূত্র বা প্রাথমিক সংজ্ঞা—যা থেকে সুবর্ণ বিধি জ্যামিতিক ভাবে নিঃসৃত হতে পারে। একটু চিন্তা করলে এটা স্পষ্ট হবে যে, নিচের ৩.১, ৩.২ ও ৩.৩ এ লিখিত মূল বচনগুলো যা প্রকাশ করে সেগুলো সত্য না হলে বিধিগুলোর বৈধতা আসছে না।

৩.১। অনন্য মর্যাদা: মানুষ জগতে একটি অনন্য মর্যাদার অধিকারী সত্ত্বা।

৩.১.১। প্রমাণ: যদি না হয়, তবে স্বার্থের জন্য বিবাদে নৈতিক নিয়ম পরিহার করলে অসুবিধা কোথায়? এ প্রশ্নের মধ্যেই নিহিত আছে প্রমাণটা। জগতে মানুষ ছাড়াও প্রাণ-বিযুক্ত বস্তু, প্রাণ-যুক্ত উদ্ভিদ ও প্রাণীরা রয়েছে। এখানে সুবর্ণ বিধি সবার জন্য প্রযোজ্য হলে মানুষের অস্তিত্ব সম্ভব হয় না। তাছাড়া প্রাণীদের কাছে পারস্পরিক সমরূপতার আচরণ আশা করা যায় না।

৩.১.২। মন্তব্য: বস্তু থেকে আকস্মিকভাবে উৎপন্ন চেতনা কী করে বিষয়গতভাবে অনন্য মর্যাদা পায় তা আমার বোধগম্য নয়। আমাদের জীবসত্ত্বাকে চেতনার ভিত্তি ধরলে একইভাবে সুবর্ণ বিধির ভিত প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হবো। সারভাইভাল এর জন্য ব্যক্তি, পরিবার, শ্রেণী ও জাতিরা পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে ও নৈতিকতার কোনো তোয়াক্কা না করলে দোষের কী হয়? জগত ও আমাদের ব্যক্তিগত চেতনার উপরে আর একটি স্বয়ংনির্ভর ও সর্ববেষ্টনকারী চেতনা থেকেই বিষয়গত মর্যাদা আসতে পারে। নয়তো এ মর্যাদা কেবল স্বঘোষিতদের চুক্তি মূলে নির্ধারিত মর্যাদা মাত্র। আর প্রথম ঘোষণাই প্রমাণ করে স্বঘোষিতরা স্বেচ্ছাচারী হয়; স্বেচ্ছাচারী স্বেচ্ছায় চুক্তি মেনে চলে না।

৩.২। মর্যাদায় সমতা: এই মর্যাদার ক্ষেত্রে সকল মানুষ সমান। কোনো ব্যক্তি অন্য ব্যক্তি থেকে বেশী বা কম মর্যাদার অধিকারী নন।

৩.২.১। প্রমাণ: এটা সত্য না হলে অহংকার, হিংসা, অত্যাচার, শোষণ, ভক্তি, দাসত্ব সবই বৈধ হয়ে ওঠে। এইরূপ ক্ষেত্রে সমরূপ আচরণ অর্থহীন, ভিত্তিহীন। কারণ তখন আমার পক্ষে এরূপ বলা বৈধ হয়: ও আমার থেকে ছোট, তাই ও আমাকে ভক্তি করবে, আমার জন্য কাজ করবে, আমার পায়ের নিচে থাকবে; অথবা: ও আমার থেকে বড়, তাই আমি ওকে ভক্তি করবো, ওর জন্য কাজ করবো, ওকে মাথায় নিয়ে চলবো। এখানে সমরূপ প্রত্যাশাও থাকে না, আদান-প্রদানটাও সমরূপ হয় না।

৩.৩। সমমর্যাদার অবিচ্ছেদ্যতা: এই সমমর্যাদা ব্যক্তি থেকে অবিচ্ছেদ্য। কোনো কাজই কোনো ব্যক্তিকে এই সমতল থেকে উপরে উঠায় না বা নিচে নামায় না।

৩.৩.১। ব্যাখ্যা: প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের এ মর্যাদা ও মর্যাদার সমতা অস্তিত্ব সূত্রে প্রাপ্ত ও প্রাপ্য। মানুষের কোনো কাজই, এ মর্যাদায় পার্থক্য ঘটাবে না। এমন কোনো পুণ্য কাজ, ভাল কাজ, অবদান, সাংগঠনিক উচ্চপদ নেই যার কারণে একজন বেশী মর্যাদার অধিকারী হয়ে উঠতে পারে—যার উপর ভিত্তি করে সে অন্যের ভক্তি বা দাসত্ব দাবী করতে পারে। আবার এমন কোনো পাপ কাজ, মন্দ কাজ, ধ্বংস সাধন, সাংগঠনিক নিম্নপদ নেই যার কারণে একজন কম মর্যাদার অধিকারী বলে নিজেকে সাব্যস্ত করতে পারে—যার উপর ভিত্তি করে সে অন্যকে ভক্তি বা অন্যের দাসত্ব করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের বেলাতেও একই কথা। অপরাধ করায় তারা মানুষের মর্যাদা ও সমমর্যাদা হারায় না।

৩.৩.২। প্রমাণ: মানুষের নৈতিক কর্মের মূল্যায়ন করার সামর্থ্য মানুষের নেই। তাছাড়া বর্তমান মুহূর্তের মন্দ কর্মীটি পরের মুহূর্তেই ভাল কর্মী হয়ে উঠার বা ভাল কর্মীটির পরের মুহূর্তে মন্দ কর্মী হয়ে ওঠার সম্ভাবনাযুক্ত। কোনো মানুষই নিজেকে নিষ্পাপ মনে করতে পারে না, নিজের পাপী হয়ে উঠার সম্ভাবনাকে অস্বীকার করতে পারে না, অন্যজনকে পরিপূর্ণরূপে পাপী বলতে পারে না, অন্যজনের পুণ্যবান হয়ে উঠার সম্ভাবনাকে অস্বীকার করতে পারে না। যদি ব্যক্তি মানুষের নৈতিক বাস্তব কর্মের বিচারের ভার অন্য মানুষ নিজেই নেয় এবং তার ভিত্তিতে মর্যাদার হ্রাস-বৃদ্ধির হিসাব করতে বসে তবে না পারা যাবে সঠিক হিসাব করা আর না পাওয়া যাবে সুবর্ণ বিধি প্রয়োগের অবসর।

৪। উপরের অনুচ্ছেদ ৩-এ গৃহীত মানুষের অনন্য মর্যাদা, মর্যাদার সমতা ও সমমর্যাদার অবিচ্ছেদ্যতা বিষয়ক সূত্র তিনটি মেনে নিতে হলে আরও কতগুলো পূর্বসূত্র মানতে হয়—যা ছাড়া এই সূত্র তিনটি ভিত্তিযুক্ত হয় না। এ অনুচ্ছেদে সেগুলো অন্বেষণ করা হলো।

৪.১। জগত ও তার নিয়মগুলো বাস্তব।

৪.১.১। প্রমাণ: যদি জগত মিথ্যা মায়া হয়, ঈশ্বরের লীলা খেলা হয় তবে সুবর্ণ বিধির ভিত থাকে না, কারণ সকল বিধি মিথ্যা জগতের অংশ হিসেবে মিথ্যাই হয়। জগত যদি কুশলী ও দীর্ঘস্থায়ী একটি স্বপ্নের মত কিছু হয় তবে সুবর্ণ বিধি অনাবশ্যক। যদি জগত ‘মেট্রিক্স’ সিনেমার প্রতারণামূলক ভার্চুয়াল জগত হয় তাহলেও একই কথা হয়। জগতের নিয়মগুলো, যা আমরা অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধির মাধ্যমে জানতে পারি সেগুলো প্রতারণামূলক হলে সুবর্ণ বিধির প্রায়োগিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা যায় না।

৪.২। এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তি থেকে স্বতন্ত্র এবং কর্তব্য-দায়িত্বের দিক থেকে প্রত্যেক ব্যক্তি একক স্বাধীন সংস্থা। এই স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য ব্যক্তি থেকে অবিচ্ছেদ্য, ও অন্যের দ্বারা অজেয়।

৪.২.১। ব্যাখ্যা: এখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের কথা বলা হচ্ছে। যদি এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তি থেকে স্বতন্ত্র না হয় এবং যদি ব্যক্তি পরিবারের, সমাজের, বা জাতির সাংগঠনিক উপাদান মাত্র হয় তবে ব্যক্তির স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য বিনষ্ট হয়। এক ব্যক্তির চৈতন্যের দেশ অন্য ব্যক্তির অনধিগম্য। এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে অত্যাচার করতে পারে, আত্মীয়-স্বজনদের উপর অত্যাচার করে মানসিকভাবে আক্রান্ত করে তুলতে পারে, আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য করতে পারে, সকলকে অচেতন ও হত্যা করতে পারে; কিন্তু চেতনার দিক থেকে দাসে পরিণত করতে পারে না।

৪.২.২। প্রমাণ: ব্যক্তির পরাধীনতা সুবর্ণ বিধির বাধ্যবাধকতা অপসারণ করে, কারণ তা না হলে বিধি নিজেই যে অবাস্তব ও অত্যাচারমূলক হয়ে উঠে। স্বাতন্ত্র্য না থাকলে ব্যক্তিকে তার কাজের জন্য এককভাবে পুরস্কৃত বা সাজাপ্রাপ্ত করা চলে না। সমবেতর পুরস্কার বা শাস্তি অংশ গ্রহণ না করা ব্যক্তির উপরও তখন বর্তায়। এটিও অত্যাচারমূলক।

৪.৩। সুবর্ণ বিধি অপরিত্যাজ্য। এর অনুসরণ ব্যক্তিকে কোনোভাবেই ঠকায় না, এর পরিত্যাগের পরিণাম থেকে ব্যক্তির কোনোভাবেই নিস্তার নেই।

৪.৩.১। প্রমাণ: যদি আমি ঠকি তবে মানবো কেন? যদি অন্যকে ঠকানো সম্ভব হয় তবে ভাঙবো না কেন? এর উত্তর আমি দিতে পারবো না; বস্তুবাদী, ইহলোকবাদী, সুখবাদীরা ভাল বলতে পারবেন এবিষয়ে—তাদেরকে জিজ্ঞাসা করুন। আমি শুধু বলতে পারি, সুবর্ণ বিধি পরিত্যাজ্য হলে বিধির ভিত টেকে না, বিধির বাধ্যবাধকতা থাকে না। এ অবস্থায় নৈতিক বিধি একটি অর্থহীন শব্দে পরিণত হয়।

৫। প্রাথমিক প্রস্তুতি: যদি ৪.১, ৪.২ ও ৪.৩ কে সত্য বলে গ্রহণ করতে হয়, তবে নিচের মানসিক অবস্থাগুলো বাধ্যতামূলক হয়ে উঠে। কারণ তা না হলে জীবন ব্যর্থ হয়ে উঠবে, যা অনুশোচনার কারণ হবে।

৫.১। ব্যর্থতার বিরুদ্ধে সতর্ক হওয়া (নিজেকে সতর্কীকরণ)।

৫.১.১। ব্যাখ্যা: সুবর্ণ বিধি অপরিত্যাজ্য হলে জীবন হেসে খেলে কাটানোর বিষয় হয়ে আর থাকছে না। কাজেই সুবর্ণ বিধির আন্তরিক ও সর্বাত্মক অনুশীলন থেকে গাফিল থাকার অবকাশ শেষ হয়ে যায়।

৫.২। সফলতার জন্য আশাবাদী হওয়া (নিজেকে শুভসংবাদ দান)।

৫.২.১। ব্যাখ্যা: সুবর্ণ বিধি অনুসারে জীবনের সম্পূর্ণ পরিসর গড়ে তুলতে গেলে আপাত দৃষ্টিতে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। নিজের পার্থিব স্বার্থ, সুখ, কামনা-বাসনার ধন অনেক ক্ষেত্রেই পরিহার করতে হয়। পরিবার, শ্রেণী, সমাজ, রাষ্ট্র এদের কোনোটিই বিধি অনুসারীকে পুরস্কৃত করতে সক্ষম নয়। কারণ এরা সর্বজ্ঞানী, সর্বদর্শী ও সর্বশ্রোতা নয়। তদুপরি এরা প্রয়োজনীয় সামর্থ্যেরও অধিকারী নয়। একারণে নৈরাশ্যবাদী হয়ে উঠার কারণ নেই। অনুচ্ছেদ ৪.৩ সে কথাই বলে।

৫.৩। সকলের সাথে আচরণে সার্বক্ষণিক সাবধানতা ও বিচারশীলতা অবলম্বন (তাকওয়া অবলম্বন)।

৫.৩.১। ব্যাখ্যা: সুবর্ণ বিধির ক্ষেত্র অভিনব। সুবর্ণ বিধি প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার জগতের কেন্দ্রে স্থাপন করে এবং তাকে নায়কের ভূমিকায় নিয়োজিত করে। একের ক্ষেত্র অন্যের ক্ষেত্র থেকে অবস্থার দিক থেকে স্বতন্ত্র। একারণে বিধির প্রয়োগ সৃজনধর্মী। কেবল নকল-নবিশি করে এর প্রয়োগ সম্ভব নয়। প্রত্যেককেই আপন আপন অবস্থান থেকে তাই সর্বদা সাবধানতা, বিচারশীলতা, মাত্রা সম্বন্ধে সম্বিত বজায় রাখতে হয়, কোরানে যাকে তাকওয়া বলা হয়েছে।