ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

১। সুবর্ণ বিধি

১.১। আগেই বলেছি, সুবর্ণ বিধি প্রতিটি ধর্মেরই মূল সূত্র; এমনকি একথাও বলা যায় যে, এটিই মূলতঃ ধর্ম। এটিই নুহ থেকে ইব্রাহিম পর্যন্ত, মুসা থেকে মুহম্মদ পর্যন্ত সকল নবীর জীবন-সূত্র। ধর্ম এ সূত্রটি ধর্ম প্রয়োগ করেছে তার অন্যান্য বিধি-বিধানগুলো প্রণয়নের ক্ষেত্রে। একারণে অতীতে একথা অনেকেই বলে গেছেন যে, সুবর্ণ বিধিই ধর্মের মর্মবাণী এবং ধর্মের আর সব কথা এটিরই বিশ্লেষণ বা তফসির মাত্র। সুবর্ণ বিধি স্বচ্ছ, পরিষ্কার ও লক্ষ্যভেদী; মানুষকে উন্নত ও মহান জীবনের পথে চালিত করতে যে নির্দেশনা ও পথ-দিশার প্রয়োজন, তা এটি কার্যকর-ভাবে প্রদান করতে সক্ষম।

১.২। দার্শনিক থেকে শিক্ষাবঞ্চিতজন পর্যন্ত, শিল্পী থেকে কৃষক-শ্রমিক পর্যন্ত সকলেই তা অনুধাবন করতে পারেন ও নিজ বিচারবুদ্ধির মাধ্যমে নিজ জীবনে ক্রমাগত প্রয়োগ করে যেতে পারেন। আর এ প্রয়োগের ধারাবাহিকতায় ব্যক্তি নিজে ক্রমাগত পরিশুদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে ও উন্নত অবস্থার দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে—ধর্মতত্ত্ব ও শাস্ত্রের যা সাধ্যের অতীত।

১.৩। মানুষের কর্মের নৈতিক মূল্য নিহিত থাকে সে কর্মের উদ্দেশ্যের উপর। গ্রহীতার নিকট থেকে প্রতিদানের আশায়, সমাজের চাপে বা অনুমোদনের আশায় অথবা যম্বিদের মত সম্বিতহীন, অসচেতন ভাবনাবিহীন ‘এমনি এমনি’ দানের নৈতিক মূল্য তদনুরূপ হয়। সুবর্ণ বিধি ঈশ্বর-বিশ্বাসীর জন্য নৈতিক লক্ষ্য বা কাজের উদ্দেশ্য ঠিক করে দেয়, আবার কর্মের ক্ষেত্রটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে দেয়। সে মানুষকে ক্ষমা করার সুযোগ অন্বেষণ করতে থাকে, কারণ সে আল্লাহর ক্ষমার প্রত্যাশী; সে দেয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকে, প্রতিযোগিতামূলক ভাবে অধিকতর ভাল আচরণ করে চলে, কারণ সে আল্লাহর কাছ থেকে প্রত্যাশী, সে সকলকে ভালবাসে দোষগুণ বিচার না করেই কারণ সে নিজে দোষী হয়েও যে আল্লাহর ভালবাসা চায়। মানে হলো, সুবর্ণ বিধি একদিকে মনকে বেঁধে রাখে আল্লাহর সাথে, আর একদিকে তাকে তৎপর রাখে কর্মক্ষেত্রে। শাস্ত্রের ‘নাওয়াইতুয়ান, নাওয়াইতুয়ান’ বলে নিরুদ্দেশ ছুটাছুটি থেকে এটি পাওয়া যায় না।

২। ধর্মতত্ত্ব

২.১। সুবর্ণ বিধি ধর্মতত্ত্বের ধার ধারে না, কারণ জটিল ধর্মতত্ত্ব নিয়ে বিশদ আলোচনা দার্শনিকদের কাজ যা সাধারণেরা বুঝতে অক্ষম। তাছাড়া বাস্তব জীবনের সাথে তার কোনো প্রায়োগিক সম্পর্ক নেই। ধর্মতত্ত্বের আকাশ অনেক বিস্তৃত, কিন্তু সে আকাশে কোনো তারা নেই। এ এমন এক জলধি যার গভীরতার কোনো মাপ পাওয়া যায় না, কিন্তু ওতে কোনো প্রাণ নেই, মুক্তা নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো সেসব ধর্মতত্ত্বের রচয়িতারা কেবল অনুমানের উপরই নির্ভর করেন।

২.২। ধর্মতাত্ত্বিক বাদানুবাদ অনুমান-নির্ভর অনিশ্চিত কথাবার্তা মাত্র। একারণে আকায়েদ, কালাম, স্কলাস্টিসিজম, অধিবিদ্যা, তত্ত্ববিদ্যার সাথে সুবর্ণ বিধির আবশ্যিক কোনো সম্পর্ক নেই।

২.৩। উদাহরণ: মুহম্মদ আল্লাহর নবী—এটুকু জনতে পারলেই আমি তাঁর কাছ থেকে আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর বিচারের নিশ্চয়তা পাই। এতটুকুই এখানে যথেষ্ট; আল্লাহর সত্ত্বা ও তাঁর গুণাবলীর মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে ভাবনার প্রয়োজন পড়ে না। কোরান অনাদি নাকি কালে সৃষ্ট তারও মীমাংসার প্রয়োজন হয় না। আর এসব ধর্মতাত্ত্বিক বা আধিবিদ্যিক মতবাদের উপর ভিত্তি করে, আরও এক পা এগিয়ে, যারা মানব সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি করে তারা তো অনাচারী ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী। সুবর্ণ বিধির অনুসারীরা এসব অনাচারীদের বদ্ধমত ও মতান্ধতা নিয়ে ভাবিত হয় না। [দেখুন কোরান ২:১১৩, ২২:৬৭-৬৯, ২:২৭, ৪২:৮-১৪]

৩। শাস্ত্র

৩.১। সুবর্ণ বিধির জন্য কেবল প্রয়োজন ভাল মন্দের বিশ্লেষণমূলক স্পষ্ট অনুজ্ঞামালা ও সহজে বোধগম্য একটি সংক্ষিপ্ত ব্যবহারিক শাস্ত্র। এরূপ অনুজ্ঞামালা ও শাস্ত্র স্বভাবতই বিপুল কলেবরের হয় না এবং সেগুলো বয়ে নিতে শতাধিক গাধারও প্রয়োজন হয় না। সুবর্ণ বিধি তাই মানুষের জন্য বিশাল বিশাল সব শাস্ত্রের প্রয়োজন অনুভব করে না।

৩.২। শাস্ত্রের অনেক দালান-কোঠা, অলিগলি, কিন্তু তাতে আলো নেই; অনেক নদী-নালা, কিন্তু তাতে জল নেই; অনেক শিরা-ধমনী, কিন্তু তাতে রক্ত নেই। সুবর্ণ বিধি তাই সব বিষয়ে সব প্রশ্নের শাস্ত্রীয় সমাধান দেয়ার জন্য প্রশ্নের অপেক্ষায় চ্যানেল খুলে উত্তরের ঝুলি নিয়ে ঠাকুমার মত বসে থাকে না; বরং মানুষের মধ্যে শুভ চেতনা ও প্রজ্ঞার উন্মেষ ঘটাতে চায় এবং মানুষের বিচার বিবেচনার উপর আস্থাশীল থাকতে পছন্দ করে। [দেখুন কোরান ২:১০৮, ২:১২৯]

৩.৩। যিশুর আমলের ফরিশী ও সাদ্দুকীদের বিশালায়তন সব শাস্ত্র তাদেরকে যিশুর ক্রোধ থেকে রক্ষা করতে পারেনি। তারও আগে মুসা নবীকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে তারা জীবনের বিশালতার ও মহিমার সন্ধান পায়নি। আবার এই শাস্ত্রান্ধ মানসিকতাই মানুষ হত্যার মত অপরাধ করেও পরস্পরের সাথে তা নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ে দায় এড়াতে ব্যস্ত হয়। প্রজ্ঞাবর্জিত শাস্ত্র-অন্ধত্ব তাদেরকে তুচ্ছ বিষয়ে শাস্ত্রীয় সমাধানের জন্য চঞ্চল করে তোলে। অন্যদিকে মানুষের মৃত্যুকে নিয়ে পরিহাস করে তারা নিজেদের জীবনকে নিজেরাই পরিহাস করে। এ মানসিকতা কালক্রমে তাদের হৃদয়কে করে তোলে পাষাণের চেয়েও কঠিন। [দেখুন কোরান ২:৬৩-৭৪, ২:১০৮]

৩.৪। আগেই বলেছি অনুচ্ছেদ ৩.১-এ যে, সুবর্ণ বিধিরও শাস্ত্রের প্রয়োজন আছে; কিন্তু সে শাস্ত্র মানুষকে ন্যূনতম কাজের বা ত্যাগের কথা বলে। সুবর্ণ বিধি দেয় প্রশস্ত ও উন্মুক্ত আকাশ। সুবর্ণ বিধি শাস্ত্রের উপরে দাঁড়ায় ও উড়তে চায় আকাশের দিকে; তার চিন্তা থাকে পা যেন শাস্ত্রের নিচে নেমে না যায়। কিন্তু মিথ্যাচারীরা চলে শাস্ত্রকে মাথায় নিয়ে ও ঘুরে বেড়াতে চায় পৃথিবীর দিকে দৃষ্টিটা সীমাবদ্ধ রেখে; তাদের চিন্তা মাথা যেন শাস্ত্রের উপরে না ওঠে। শাস্ত্রের মীমাংসার চেয়ে একটুও বেশি কাজ করতে চায় না তারা এবং চায় না একটুও বেশী দান করতে। এই স্বার্থচিন্তা থেকেই তারা অন্বেষণ করে শাস্ত্রের আশ্রয়। [দেখুন মথি ৫:১৭-৪৮, মার্ক ৭:৬-১৩]

৩.৫। উদাহরণ: নবী বলেছেন ২.৫০% রাষ্ট্রকে দিতে, শাস্ত্রাচারী তাই দেয় গুণে গুণে। কিন্তু আল্লাহ বলেছেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত সব দিতে, কঠোর শাস্ত্রাচারীর মন সেদিকে যাওয়ার চেষ্টাটিও করে না।

৪। মেরুকরণ

৪.১। সুবর্ণ বিধি ধর্মতত্ত্ব বা শাস্ত্রের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে বিভাজন করে না। সুবর্ণ বিধি নিজে এগুলোর উপর ভিত্তি করে বিভাজনের রেখা টানে না। এখানে মেরুকরণ হয় অত্যাচারিত-অত্যাচারী ভিত্তিতে। কিন্তু বিধি নিজে অত্যাচারীদের সাথে গায়ে পড়ে বিরোধেও লিপ্ত হয় না। যারা অহংকারী, অত্যাচারী ও মিথ্যাচারী তারা নিজেরাই নিজেদেরকে বিধি থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং বিধির অনুসারীদেরকে প্রতিপক্ষ শত্রু ভেবে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আক্রমণ করে। সুবর্ণ বিধি কেবল তখন আত্মরক্ষা করতে চায় মাত্র।

৪.২। সুবর্ণ বিধি আস্তিক-নাস্তিক, মুসলিম-ইহুদি-খৃষ্টান, হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ নির্বিশেষে সকলের সাথে একই আচরণ করে; শান্তিকামী ও অহিংসার নীতির অনুসারী সকল মানুষই তার মিত্র; বিরোধটা কেবল অত্যাচারীদের সাথে—তা সে স্বধর্মী হোক বা হোক ভিন্নধর্মী।

৪.৩। উদাহরণ: ওমর বলতেন, ফোরাতের কূলে কোনো কুকুরও যদি না খেয়ে মারা যায় তবে আমাকেই দায়ী করা হবে। বলতেন: যে অত্যাচারিত সে-ই আমার কাছে সবচে শক্তিশালী, আর যে অত্যাচারী সে-ই সবচেয়ে দুর্বল। নবী ও রাশেদ খলিফাগণ ধর্মতত্ত্ব বা দার্শনিক মতাদর্শের ভিত্তিতে লড়াইয়ের প্রতিপক্ষ হয় বলে কখনওই ভাবতেন না।

৪.৩.১। মুসা কেবল চলে যেতে চেয়েছিলেন, সম্পদের ভাগ তো চাননি। যিশু অত্যাচার সহ্য করেও শত্রুর সাথে গলাগলি করে থাকতে চেয়েছিলেন। মুহম্মদ ‘লাকুম দীনুকুম ওয়া লিয়াদীন’ বলে সহাবস্থান করতে চেয়েছিলেন। নবীরা নিজেরা কাউকে শত্রু ভাবেননি, ভেবেছিল অত্যাচারীরা।

৫। শাস্ত্র বনাম ধর্মতত্ত্ব বনাম সুবর্ণ বিধি

৫.১। সুবর্ণ বিধি ধর্মতত্ত্ব বা আধিবিদ্যিক মতবাদের ভিত্তিতে অথবা শাস্ত্রের ভিত্তিতে মানব জাতিকে বিভক্ত করে না। তত্ত্বের নামে, শাস্ত্রের নামে বিচ্ছেদ আর বিভেদের দেয়াল তৈরি করে কেবল পার্থিব স্বার্থান্ধ ও ভেদবুদ্ধিজাত মতান্ধ অনাচারীরা। মানব জাতির ঐক্যকে সুবর্ণ বিধি দেখে জরায়ুর সাথে সম্পর্কের বিষয়গত ভিত্তি থেকে যে সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। [দেখুন কোরান ৪:১]

৫.২। আমাদের পূর্বসূরি একদল ভাই শাস্ত্রের বেড়াজালে আটকা পরে কোথায় হারিয়ে গেল! মরুভূমিতে ঘুরে বেড়াল নিরুদ্দেশ হয়ে। আরেক দল হারিয়ে গেল ধর্মতত্ত্বের মায়াজালে! তারপর পৃথিবীটাকে ভাসিয়ে দিল রক্তের বন্যায়। শাস্ত্রাধিকারিদের আশা শাস্ত্র তাদেরকে স্বর্গবাসী করবে, তাদের দাবী ধর্মতাত্ত্বিকদের কোনো ভিত্তি নেই। আবার ধর্মতত্ত্বাধিকারিদের আশা তত্ত্ব তাদেরকে স্বর্গ এনে দেবে, শাস্ত্রাচারীদের কোনো ভিত্তি নেই। এ ওদের দুদলেরই মিথ্যা আশা। যে কেউ সুবর্ণ বিধি মেনে চলবে সে-ই পাবে উদ্বেগ ও অনুশোচনা থেকে মুক্তি। [দেখুন কোরান: ২:১১১-১১৩, ২:৬২]