ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

রাজ্যের প্রশ্ন: আমি কে? ঈশ্বর বলে কেউ আছে কি? বাস্তব কী? কী আমি জানতে পারি? আমি আদতে জানি কিভাবে? সত্য কী? নৈতিকতা কী? ন্যায় কী? এসব প্রশ্নের সাথে জড়িয়ে থাকা শেষ প্রশ্ন: জীবনের অর্থ কী? এই শেষের প্রশ্নটি অনেকের কাছেই অত্যাবশ্যক, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আবার অনেকেই এ প্রশ্নটিকে একটি অনর্থক, এমনকি অবাঞ্ছিত, প্রশ্ন বলেও গণ্য করেছেন। দুনিয়াটা মস্ত বড়, খাও-দাও ফুর্তি করো; জীবন মানেই যন্ত্রণা, নয় ফুলের বিছানা; অল উই আর ইস ডাস্ট ইন দি উইন্ড—এগুলো শুধু বিনোদনমূলক গানের কথা মাত্র নয়, জীবনের অর্থ নির্ধারণের প্রচেষ্টা। জীবন একটি আশীর্বাদ; জীবন একটি যাতনা; একটি এডভেঞ্চার; শিল্পকলার অনুকরণ; একটি খেলা—যেখানে কতিপয় মাত্র জেতে, আর বাকি বিপুল সংখ্যকেরা হারে; একটি ধাঁধা—যার কোনো উত্তর নেই, এমন কি স্বয়ং ধাঁধাটিও অনর্থক; জীবন একটি গোলক-ধাঁধা—ফারাকটা হচ্ছে অন্যগুলোর বেলায় আমরা বের হবার পথ খুঁজি আর এটির বেলায় বেরোবার পথটি এড়িয়ে চলি; জীবন হচ্ছে আঙুরের থোক; বিছুটি পাতার জ্বালা; গোলাপে ছড়ানো বিছানা; চোখের জলের উপত্যকা; কানা মাছি ভোঁ ভোঁ, যারে পাবি তারে ছোঁ; জীবন হচ্ছে কৌতুক, রোগ, ভাইরাস, আলো, অন্ধকার, ট্র্যাজেডি, কমেডি, গোল্লা-ছুট, গল্প, মিশন, ইচ্ছা, ক্ষমতার ইচ্ছা, বাসনা, জ্ঞান, শিক্ষণ, সুখ, সোনার পাথর-বাটি, শশবিষাণ, এবসারডিটি—জীবনের অর্থ প্রসঙ্গে এমন শত কথা বলা হয় বা বলা যায়।

একালে এ প্রশ্নটির সাথে আলবেয়ার কাম্যুর নাম যেন অবধারিতভাবে জড়িয়ে গেছে। তিনি মিথ অব সিসিফাস-এ লিখেছেন: There is but one truly serious philosophical problem, and that is suicide. Judging whether life is or is not worth living amounts to answering the fundamental question of philosophy. All the rest—whether or not the world has three dimensions, whether the mind has nine or twelve categories—comes afterwards. সিসিফাস দেবতাদের দ্বারা অভিশপ্ত হয়েছিল এবং আদিষ্ট হয়েছিল একটা প্রকাণ্ড পাথরকে পাহাড় বেয়ে উপরে উঠাতে। তারা জানতো, পাথরটি উপরে উঠবে কেবল নিচে পড়ে যাওয়ার জন্য। সিফিফাস আবার উঠাবে, সেটা আবার পড়বে—এভাবেই চলতে থাকবে অনন্তকাল, আর এই নিষ্ফল চেষ্টাই ছিল তার কর্তব্য, করণীয়। সিফিফাস সচেতন ছিল এই নিষ্ফলতার নিয়তি বিষয়ে—তা না হলে এটি ট্র্যাজেডি হয়ে উঠতো না। কিন্তু অন্তরে আশা পোষণ না করতে পারলে এবং কর্মে আনন্দ পাওয়া না গেলে নিজেকে কর্ম-নিয়োজিত রাখাও কোনো বীরের কাজ হয় না। এই নিষ্ফলতা-সচেতনতা এবং একই সাথে আশা-আনন্দ কি সিসিফাসের জীবনকে এবসার্ড করে তোলে না? মানুষের জীবন-পরিস্থিতিও সিসিফাসের পরিস্থিতির সাথে তুল্য—জেনে-বুঝে, তবুও আশা বুকে নিয়ে, একই কাজের পুনরাবৃত্তি দিয়ে সানন্দে বালির উপর বৃত্তের পর বৃত্ত তৈরি করা।

জীবনের অর্থ কী? বিরাট প্রশ্ন, উত্তর দেওয়াও মানুষের পক্ষে কঠিনতম কাজ। জরুরী এই প্রশ্নটি, মানে স্বয়ং প্রশ্নটিই আবার খুবই অস্পষ্ট। যুক্তি দিয়ে অনেক উত্তর তৈরি করেছে বুদ্ধিমান মানুষ, একই সাথে প্রতিটি উত্তরকেও আবার যুক্তি দিয়েই অসার প্রতিপন্নও করেছে। যে বুদ্ধি উত্তর তৈরি সম্ভব করেছে, নাকচ করাও সম্ভব করেছে, সে বুদ্ধিই প্রশ্নটিকে অবধারিতও করে তুলেছে। প্রশ্নটি নিয়ে আমরা সাধারণ মানুষেরা জীবনের কোনো না কোনো একটি মুহূর্তে ভেবেই থাকি। সবকিছু ‘ঠিকঠাক’ মতো চললে, হেসে-খেলে বৃত্তাবদ্ধ জীবনে আবর্তিত হতে থাকলে, বিপদের মুখোমুখি হয়ে অভ্যস্ত সহজ জীবনে ছেদ না ঘটলে, আমরা জীবনের অর্থ নিয়ে সাধারণত ভাবতে বসি না বটে, তবে জীবন সংকটাপন্ন হয়ে উঠলে, মৃত্যুর মুখোমুখি হলে এ প্রশ্ন অনেকের মনেই জেগে উঠে। সম্পন্ন অবস্থায় আমরা দুনিয়াটিকে আকারে মস্ত বড় দেখলেও, খেয়ে-দেয়ে ফুর্তি করলেও, বিপন্ন অবস্থায় দুনিয়াটাকে সংকীর্ণ হয়ে উঠতে দেখি এবং হতাশায় ভাবি, জীবন হচ্ছে আত্মাভিমান তাড়িত সাড়ম্বর অসারতা—যেমনটা আমরা ম্যাকবেথে দেখতে পাই:

Life’s but a walking shadow, a poor player
That struts and frets his hour upon the stage
And then is heard no more. It is a tale
Told by an idiot, full of sound and fury,
Signifying nothing. —Shakespeare’s Macbeth

তবে অনেকের জীবনে সম্পন্ন অবস্থাতেও প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেয়। মানুষ পছন্দমতো কোনো এক বা একাধিক অর্থ নিজের জীবনের জন্য ঠিক করে নেয়। কেউ সন্তানের মধ্যে, কেউ দেশ-জাতির মধ্যে, কেউ মানবতার মধ্যে, কেউ মানবিক প্রগতির জন্য সংগ্রাম-যুদ্ধের মধ্যে, কেউ বিজ্ঞান বা শিল্পকলার মধ্যে, কেউ জীবিকা নির্বাহের পেশার মধ্যে, কেউ ধন-সম্পদের সঞ্চয়ের মধ্যে, কেউ সেলিব্রিটি হওয়ার মধ্যে, কেউ যৌন-প্রেমের মধ্যে, কেউ পরার্থপরতায়, কেউ-বা প্রতিশোধ গ্রহণে সফলতায় জীবনের অর্থকে দেখতে পায়। কেউ ঈশ্বরের মধ্যে জীবনের অর্থকে খুঁজে পেয়ে পরিতৃপ্ত হতে চায়। কেউ জীবনকে, জীবনের সব শ্রম-সাধনা-সংগ্রামকে, সব অর্জনকে অন্তঃসারশূন্য, নিষ্ফল ও নিরর্থক ভেবে জীবনের কোনো অর্থ নেই দেখে হতাশায় মুহ্যমান হয়ে পড়ে। অনেকেই আবার নিজেই নিজের জন্য জীবনের নতুন অর্থ আবিষ্কার করে ব্যাড ফেইথের বদলে গুড ফেইথের বাসনায় বদ্ধপরিকর হয়।

সভ্যতার সংকটকালে আমরা দার্শনিকদেরকেও জীবনের অর্থ সংক্রান্ত প্রশ্নটিকে নিয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে উঠতে দেখি। মানুষের গৃহীত ও চলতি ভূমিকা, বিশ্বাস, মতাদর্শ, নৈতিক দর্শন, প্রথা, ঐতিহ্য যখন বিস্তৃত মাত্রায় গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়, তখন জীবনের অর্থ অনুসন্ধানে নতুন করে বিপুল চিন্তার উদ্ভব ঘটে। দুটো বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিধ্বস্ত সভ্যতার সাথে অস্তিত্ববাদী চিন্তার উন্মেষ ও বিস্তারের সম্পর্ক রয়েছে। একথাও হয়তো ঠিক যে, হাইডেগারের ‘বিয়িং এন্ড টাইম’-এর সাথে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং সার্ত্রের ‘বিয়িং এন্ড নাথিংনেস’-এর সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংযোগ রয়েছে। সাধারণ ব্যক্তিমানুষেরাও অবসর সময়ে নিজ জীবন নিয়ে নিছক যৌক্তিক চিন্তার ইচ্ছার বশে জীবনের অর্থ নিয়ে ভাবলেও এর তীব্রতা বাড়ে জীবনের সংকটকালেই।

এ প্রশ্ন নিয়ে কেবল যে দার্শনিকেরাই এবং সাধারণ মানুষেরেই ভাবিত হয়েছে তা নয়। শিল্পী, সাহিত্যিক, সঙ্গীতকারেরা, সফোক্লিস-শেক্সপিয়ারের মতো ট্র্যাজেডি রচয়িতেরা, হার্ডি-দস্তয়েভস্কির মতো উপন্যাসিকেরাও জীবনের অর্থ-সংকটকে তুলে ধরেছে, অর্থ অন্বেষণ করেছে। তবে এটাও ঠিক, মানুষের কাছ থেকে এই প্রশ্নবিজড়িত মানবিক জীবনাবস্থার নানা উপস্থাপনা এবং প্রশ্নটির নানা উত্তর পাওয়া গেলেও আদতে জীবনের নিশ্চিত-সুনিষ্পাদিত অর্থ আমাদের অজানাই থেকে যাচ্ছে। অনেকে এ অবস্থা নিয়েও সন্তুষ্ট নয়। সংগীত-গোষ্ঠী এনিগমা’র উচ্চকিত কণ্ঠ একারণেই যেন ভেঙ্গে পড়তে চায় মর্মস্পর্শী বেদনায়।

I’m asking why
Nobody gives an answer
I’m just asking why
Just tell me why
Why it has to be like this —Enigma’s song ‘Why’

অথবা

All of our life we’ll wait for the answer
And the question is why … … …
No one knows if there’ll be an answer —Enigma’s song ‘Morphing Thru Time’

***
অসমাপ্ত।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি