ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

সাধারণ মানুষেরা জীবনের অর্থ অন্বেষণে যত সহজে পা বাড়িয়ে থাকে, দার্শনিকেরা ঠিক সেভাবে পরে না। শেষোক্তদের একটি উন্মত্ততাযুক্ত বৈশিষ্ট্য বা অভ্যাস হচ্ছে উত্তর না দিয়ে খোদ প্রশ্নটিকে নিয়ে প্রথমে মেতে ওঠা, সেটির বিশ্লেষণে নেমে পড়া। তাদেরকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, জীবনের অর্থ কী?—তাহলে তারা পাল্টা প্রশ্ন করে বসেন: প্রশ্নটি দিয়ে ঠিক কী জানতে চাওয়া হচ্ছে? ‘অর্থ’ বলতে এখানে ঠিক কী বুঝানো হচ্ছে? ‘জীবন’ বলতেই-বা কী বুঝায়? ‘জীবনের অর্থ’ সংক্রান্ত প্রশ্নটি কি আদৌ কোনো যথার্থ বা অর্থপূর্ণ প্রশ্ন? নাকি এটি কোনো ছদ্ম প্রশ্ন?

যৌক্তিক দৃষ্টবাদী দার্শনিকদের পরিষ্কার দাবী, খোদ প্রশ্নটিরই কোনো অর্থ নেই, এটা আক্ষরিক অর্থেই নিরর্থক প্রশ্ন। তাদের মতে, অর্থপূর্ণ প্রশ্ন কেবলমাত্র তথ্যসংক্রান্ত প্রশ্ন যার উত্তর ইন্দ্রিয়-পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। জীবনের অর্থ সম্বন্ধীয় প্রশ্নের এভাবে কোনো মীমাংসা সম্ভব নয়, তাই প্রশ্নটিরও কোনো অর্থ নেই। অন্যদিকে, ভাষা-বিশ্লেষণী দার্শনিকেরা ভাষা ও ব্যাকরণের নানা প্রসঙ্গ এনে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, এই অনর্থক প্রশ্নটি আদতে ভাষার অপব্যবহার থেকে উৎপন্ন হয়েছে। আমরা প্রশ্ন করতে পারি: আকাশের রঙ কী? একইভাবে প্রশ্ন করা যায়: জ্যামিতির বিষয় কী? কিন্তু যদি প্রশ্নটি হয়: জ্যামিতির রঙ কী?—তবে ভাষার অপব্যবহার থেকে একটি অনর্থক প্রশ্নের অবতারণা হয়। অস্তিত্ব বা বাস্তবতাকে যদি মানুষের বর্তমান ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতায় সীমিত করা হয় এবং ‘জীবনের অর্থ’কে যদি এরূপভাবে সীমিত করা জগতের জন্য ব্যবহৃত ভাষার সীমার মধ্যে রেখে বিশ্লেষণ করা হয়, তবেই কেবল প্রশ্নটি অনর্থক বলে সাব্যস্ত করা যায়।

আমাদের জানা জগতে মানুষই সম্ভবত একমাত্র ‘সত্ত্বা’ বা ‘প্রাণী’ বা ‘বস্তুপিণ্ড’ যে কি না নিজের অস্তিত্বকেই নিজের চিন্তার বিষয়ে পরিণত করতে পারে; সে তার নিজের অস্তিত্বকে, অস্তিত্বের অর্থকে, মূল্যকে বিশালাকার সব প্রশ্ন-বিবরে নিক্ষেপ করতে পারে, নিজেকে নিজের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে। মানুষ এক আশ্চর্য প্রজাতি যে তার নিজের অবস্থার সাথে নিজেকে সংকট-বিরোধে জড়াতে পারে: উদ্বেগ, আশা, বোঝা, উপহার, নিশ্চিন্ততা, আতঙ্ক, উত্তরহীন প্রশ্ন, উভয়-সংকট, এবসারডিটি রূপে। মানুষ ভবিষ্যৎ-সচেতন, মৃত্যু-সচেতন, ধ্বংস-সচেতন; এবং রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলা সংঘটনে সচেতন-বিপুল-অংশীদার বলেই সে সবসময় মৃত্যু ও ধ্বংসের ছায়ায় বসবাস করে। এবং বিপন্ন-কালে অবধারিতভাবে জীবনের অর্থ-সংকটে পড়ে। ভাষা ও ব্যাকরণের দোষে আমরা ঈশ্বর-ভাবনা ও ‘জীবনের অর্থ’-ভাবনা থেকে মুক্তি পাচ্ছি না, না কি ভাষার কাঠামো নয়, আমাদের অস্তিত্বের কাঠামো থেকেই ভাবনাগুলো উৎসারিত হয়ে ভাষার দুর্বলতা সত্ত্বেও ভাষার মাধ্যমেই প্রকাশ পেতে চায়—কোনটা সঠিক, তা একটি বিবেচনার বিষয়।

এই যে নিজেই চিন্তার ‘বিষয়ী’ হয়ে নিজেকেই চিন্তার ‘বিষয়ে’ পরিণত করার সামর্থ্য, তা নিছক ভাষার অপব্যবহার থেকে জাত মাত্র—বলে বা দেখিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। আমাদের অনেক গুরুভার সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক ইস্যু রয়েছে, যা ইন্দ্রিয়গুলোর মাধ্যমে পাওয়া জ্ঞানের মাধ্যমে নিষ্পন্ন করার চেষ্টাটাই বরং নিরর্থক। এবং যদিও এক্ষেত্রগুলোতে সর্বজনসম্মতভাবে ভাষার ব্যবহার এখনও সম্ভব হয়ে উঠেনি, তবুও ‘প্রশ্নগুলো অবান্তর’—কেবল এই ঘোষণায় জীবন থেকে ইস্যুগুলো বিতাড়িত হয়েও যাবে না। আরও উল্লেখ করা যায় যে, নিজেকে নিজের চিন্তার ও পরীক্ষার বিষয়ে পরিণত করার সামর্থ্যকেই আমরা আত্মসচেতনতা বলে থাকি এবং আত্মসচেতনতাকে একটি প্রয়োজনীয় নৈতিক গুণ বলেই সাব্যস্ত করে থাকি। ফলে একে ভাষার অপব্যবহার বলা হলে ও এ নিয়ে চিন্তা করাকে অবান্তর সাব্যস্ত করা হলে আমরা আত্ম-অসচেতন প্রাণীতেই পর্যবসিত হই এবং অন্যদের দ্বারা নির্ধারিত জীবন-পথে গড়িয়ে চলা ভোক্তা-জীবনের অধিকারী মাত্রে পরিণত হই।

আমরা প্রধান দুটি মহল থেকে জীবনের অর্থ সংক্রান্ত প্রশ্নটিকে আক্রান্ত হতে দেখছি—১.বিজ্ঞানবাদীরা ও ২. ভাষা-বিশ্লেষকরা; তবে উভয়েই পরস্পরের উপর নির্ভরশীল বলেই মনে হয়। প্রথমটিতে ধরে নেয়া হয়েছে যে, বিশ্বে নিছক টিকে থাকা ও বহির্বিশ্ব সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করা ছাড়া মানুষের অন্য কোনো কাজ নেই। দ্বিতীয়টিতে প্রাকসিদ্ধভাবে ধরে নেয়া হয়েছে যে, মানুষের বৈজ্ঞানিক ভাষার নিয়ম-কানুনের মধ্যেই মানুষের চিন্তাকে সীমিত রাখতে হবে;—এটা ফুটবল খেলার নিয়ম-কানুনকে বাস্কেটবল খেলার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সাথে তুল্য। কিন্তু কোনো না কোনোভাবে ‘জীবনের অর্থ কী’ প্রশ্নটি অবশ্যই বোধগম্য, তা না হলে দার্শনিক, কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক ও সাধারণ মানুষেরা প্রশ্নটিকে এতো গুরুত্ব দিতো না, এবং উত্তরের জন্য এতো মরিয়া হয়ে উঠতো না; জীবনের অর্থ অনুসন্ধান এভাবে জীবনের অংশ হয়ে উঠতো না।

প্রশ্নটি যদি অবান্তরই হয় তবে ‘জীবন’ ও ‘অর্থ’কে কোনো বচনেই একত্রিত করা চলে না। ‘জীবনের অর্থ আছে’ কথাটি যেমন অবান্তর, এমতাবস্থায়, তেমনই অবান্তর হয়ে উঠে ‘জীবনের অর্থ নেই’ কথাটিও। ফলে ‘জীবনের অর্থ নেই’—একথাটি প্রমাণ করার সব প্রচেষ্টাও অনর্থক। কিন্তু ফলিত দিক থেকে বিবেচনা করে বলা যায়, সাধারণ মানুষেরা জীবনের অর্থ অন্বেষণ করে প্রধানত দুটি কারণে। একটি হচ্ছে শেক্সপিয়ারের হ্যামলেটের To be or not to be প্রশ্নের উত্তরের জন্য এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে যাপিতব্য জীবনের বাঞ্ছিত রূপ নির্ধারণের জন্য। তাই জীবনের অর্থ সম্পর্কিত প্রশ্নটি জীবনের মূল্য ও উদ্দেশ্য সংক্রান্ত প্রশ্নের সাথেও জড়িত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ এ প্রশ্নটির সম্পর্ক রয়েছে আমাদের নৈতিকতার সাথে।

তাছাড়া জীবনের অর্থ কী?—প্রশ্নটিকে আমরা অন্যভাবেও উত্থাপন করতে পারি। অর্থপূর্ণ জীবন দেখতে কেমন? সার্থক বা অর্থপূর্ণ জীবনের জন্য আমাদের করণীয় কী? কেন বেঁচে থাকবো? কাজেই, একদিকে যেমন প্রশ্নটির অর্থে বিদ্যমান অস্পষ্টতা সত্ত্বেও তার বিচিত্র রূপ রয়েছে, তেমনই অন্যদিকে তা একটি মাত্র প্রশ্ন নয়, বরং বিচিত্র অনেক প্রশ্নের আধারও বটে: দুনিয়ায় আমরা কেন আসলাম? বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য কী, সুখী হতে পারাই কী যথেষ্ট? আমার জীবন কি বৃহত্তর কোনো উদ্দেশ্য সাধনে আমার অজান্তেই নিয়োজিত? আমরা কি এখানে অন্যদের সহায়তা করতে এসেছি, না কি কেবল নিজের? ইত্যাদি ইত্যাদি।

ব্যক্তির স্বাধীনতার সাথেও জীবনের অর্থের যোগসূত্র রয়েছে। অর্থ বিষয়ক প্রশ্নটিকে পূঁজি কর্তৃক শঙ্কার দৃষ্টিতে দেখা অসম্ভব নয়। কারণ পুঁজির বিকাশ, মুনাফা ও স্বার্থের সাথে হাইপার-কনসিউমারিজম বা হাইপার-কনসাম্পশনের সম্পর্ক রয়েছে। আত্ম-অসচেতনতা থেকেই ব্যক্তি এ দুটি দ্বারা আক্রান্ত হয়। বিজ্ঞাপন-সৃষ্ট অভাববোধের অধিকারী ব্যক্তি মনে করতে পারেন যে, তিনি স্বাধীন; কিন্তু এরূপ স্বাধীনতা এক ধরনের ছদ্ম স্বাধীনতার রূপও নিতে পারে। অন্যদিকে, আত্মসচেতন ব্যক্তিকে প্রলোভনে নিপতিত করা সহজ হয় না। জীবনের অর্থ বিষয়ক চিন্তা বা অর্থ অন্বেষণ যেহেতু মানবিক আত্মসচেতনতার নির্দেশক, সেহেতু পুঁজি প্রশ্নটিকে গুরুত্বহীন বা অবান্তর বলেই সাব্যস্ত করতে চাইবে।

অসমাপ্ত।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি