ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

চাকুরীজীবনে একটা বিরক্তিকর জিনিস হচ্ছে পাবলিকের টাকায় ফুল কিনে বস’কে তেল দেয়ার ব্যাপারটা। বস মানে বড় বড় রুই-কাতলা বস। এক বস যাবেন, তো আরেক বস আসবেন। ফেয়ারওয়েল আর ওয়েলকাম জানাতে ফুলের তোড়া আর নানা কিসিমের তোহফা নিয়ে পুরো অফিস যেন হামলে পড়তে চায়। তা পরুক, কিন্তু জনগণের টাকায় বা ঠিকে-ব্যবসায়ীর টাকায় বিশাল বিশাল ফুলের তোড়া দিয়ে ফেয়ারওয়েল’কে ফেয়ার-অয়েল বা ওয়েলকাম’কে অয়েলকাম’য়ে পরিণত করার যুক্তি কী?

আমাদের কিতাবি বিধি-বিধানগুলো কিন্তু প্রজ্ঞাজাত ও প্রজ্ঞাপ্রসূ বিধি-বিধান। সেখানে পাবলিকের টাকায় আদিখ্যেতার আতিশয্যের সুযোগ নেই। বিধিগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখাতে না চাইলে এসব অয়েল-বাজির কোনো সুযোগ বের করা যাবে না। কিন্তু রুই-কাতলা বড় কর্তারা যদি দেনেওয়ালা আয়োজকদেরকে এসব হতচ্ছাড়া তোড়ার পয়সা, উপহারের টাকা কোথা থেকে এসেছে প্রশ্নটি নেংটোভাবে করে বসতে পারতেন তবে এমন তেলবাজির সাহস উধাও হতে বিলম্ব হতো না। এক কর্তা যাবেন, আরেক কর্তা আসবেন। কিন্তু পাবলিকের একপয়সাও তো ফুলের তোড়া দিয়ে বিদায়-বরণ করার এখতিয়ার পাবলিক কাওকে দেয়নি?

এরকম আপত্তির আবার জ্বালাও রয়েছে। জ্বালার উৎস দুটি হতে পারে। একটি হচ্ছে কালচার-সংস্কৃতি। কাণ্ডটা যেহেতু ফুলেল সেহেতু তা সুবিধাজনকভাবে সভ্যতা-সংস্কৃতির সাথে নিজেকে লটকিয়েছে। আর সংস্কৃতি এমন এক চিজ, যার বেদীতে পাবলিকের টাকা কোরবান করার লাইসেন্স যেন সহজেই মেলে। কিছু বলতে গেলেই সংস্কৃতি-বিরোধী অসংস্কৃত, গেঁয়ো আখ্যা পাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

এইসব তেলবাজ কিন্তু কখনোই নিজ দাপ্তরিক কাজে পাবলিকের জন্য নিজ বেতনের দুটো টাকাও খরচ করেন না। এই না করাটা খুবই যুক্তিযুক্ত। এটা যতটা যুক্তিযুক্ত, ততটাই যুক্তিযুক্ত হচ্ছে ফুলের পেছনে পাবলিকের টাকা খরচ না করা। পাবলিকের টাকা খরচ হবে পাবলিকের পেছনে। কর্তার জন্য ফুল কিনতে নয়। কিন্তু হিসেব করলে দেখা যাবে পরেরটা বেশী ভয়ানক। কেউ তার বেতনের টাকা পাবলিকের জন্য খরচ করতে চাইলে করতেই পারেন। আমার টাকা আমি দেব, যারে খুশি তারে দেব। কিন্তু পাবলিক পাবলিকের টাকা সেভাবে যারে খুশি তারে দেবে কেমনে? পাবলিকের টাকার তহশিলদার যেন হয়ে গেছে পাবলিকের টাকার মালিক।

দ্বিতীয় সমস্যাটি হচ্ছে অল্প-টাকা-যুক্তির সমস্যা। অল্প কয়টা টাকার বিনিময়ে যদি বিরাট একখানা কালচার করা যায় তবে তাতে বাধ সাধার দরকার কী? লুটেপুটে লোকে কত টাকা সাবাড় করে দিচ্ছে! আর তুমি কিনা দু’টাকার ফুলের তোড়া নিয়ে দেশ-উদ্ধারে নেমেছো। কিন্তু এখানে সমস্যাটা অন্যখানে। লোকে টাকা সাবাড় করে গোপনে, লোকচক্ষুর আড়ালে। জিজ্ঞেস করলে বলে, তৌবা, তৌবা, এ আপনি কী বলছেন; আমি বুঝি তেমন যেমন। কিন্তু, হোক না দু’পয়সার তোড়া বা দু’টাকার উপহার, অফিসশুদ্ধ সবার সামনে এরকম তোড়া-উপহার কিন্তু পাবলিকের মাল হেফাজতে গাফিলতিকে প্রকাশ্যে ‘এনডোর্সড’ সিল মেরে দেয়।

***

এবারের চৈত্রের শেষের দিন কয়েক আরেক তোড়জোড় দেখে দেখে কাটাতে হয়েছে। বলতে পারেন, দেখার চোটে চোখ ধাঁধিয়ে গেছে। রুই-কাতলা বস’দের পিএস/পিএ’র রুম মিষ্টির ভাণ্ডে একাকার। আহা! কী আনন্দ আকাশে বাতাসে। আহা! কী শৈল্পিক সৌন্দর্য ভাণ্ডে ভাণ্ডে। গ্রামীণ কারুকাজ, চিরায়ত শিল্পকলা। ভাণ্ডে ভাণ্ডে কতই না বৈচিত্র্য। কিন্তু তেলা-মাথা মানুষগুলো মানুক, আর না-ই মানুক, তেলের অভাবে যাদের চুল এ্যাবড়া-থ্যাবড়া সেই কর্মচারীরা জানে, দিব্যদৃষ্টিতে সাক্ষাত দেখে—মিষ্টির ভাণ্ড তো নয়, এগুলো যেন একেকটা তেলের পিপা—আলিবাবা আর মর্জিনার গপ্পের চল্লিশ চোরের তেলের পিপা। আহা! কী মওকা, কী মৌসুম, কী ধুম, কী ধামাকা!

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি