ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

 

ব্লগ লিখতে এসেছিলাম সেই কবে। বছর পাঁচেকেরও আগে। কত মানুষের সাথে এখানে কথা হলো। আমি যতটা না আবেগ নিয়ে এখানে বিচরণ করেছি তারও চেয়ে বেশী মুখে বিষ নিয়ে লাফালাফি করেছি। যারা আমার প্রতি সহানুভূতিশীল তারা হয়তো ভাবছেন, ধোড়া সর্পের আবার বিষ হয় নাকি! আচ্ছা ঠিক আছে। মানলাম আমার মনে বিষ নেই, কিন্তু ভাষার দোষে কথায় বিষ মিশে যেতে পারে—এ সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। মানুষের মনে কষ্ট দেয়ার জন্য মনের বিষের দরকার হয় না। একের কথা তৈরিতে অসতর্কতার ফল হিসেবেও অন্যের মনে কষ্ট গড়িয়ে যেতে পারে। একারণে কথা যত কম বলা যায় তত মঙ্গল। কিন্তু এও আবার ব্লগীয় জীবনটাকে সংকুচিত করে ফেলে, করে ফেলে নিরানন্দ।

আমরা যারা ব্লগ লিখি তারা লিখতে আসি কেন? আর এখানকার মানুষগুলোর সাথে মায়ার বন্ধনে এবং মাঝে-মধ্যে টানাপড়েনে জড়িয়ে পড়ি কেন?

আমাদের নতুন কিন্তু স্থৈর্যগুণের অধিকারী ব্লগার সৈয়দ আশরাফ হয়তো বলবেন, একসাথে থাকলে অমন একটু আকটু হয়েই থাকে; দশটা পাতিল একসাথে থাকলে টুং টাং হবেই। টুং টাং শব্দ মানেই দশ পাতিলের সমাহার, প্রত্যেকের অস্তিত্বের স্বতন্ত্র বিঘোষণ। চুপচাপ ব্লগিং মানে যেন মৃত্যুপুরীতে জানালাবিহীন মনে একান্তে আনমনে স্বপ্ন দর্শন। যারা ব্লগে লেখালেখি করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তাদের কেও কেও হয়তো আসেন নিজের ভাবনাগুলোকে বেচবার জন্য। ভাবনাগুলো হতে পারে আদর্শিক, হতে পারে রাজনৈতিক, আবার হতে পারে নিছকই শিল্প। তারপরও দাবী করা যেতে পারে, যত বিরুদ্ধ, বিচিত্র কারণই থাকুক না কেন, একটা বিষয়ে আমরা সবাই এক—আর সেটা হচ্ছে, আমরা সবাই স্বপ্ন দেখি পরিবর্তনের আর উন্নতির। পথের বৈপরীত্য সত্ত্বেও এখানে যেন আছে লক্ষ্যের একটা ঐক্য। বিরোধ থেকে টুং টাং, আবার সব টুং টাং মিলে একটা ঐকতানের সমগ্র। ব্যাপারটাকে এমন করে তুলতে পারলেই আমাদের ব্লগ-জীবন কাজের হয়ে উঠতে পারে।

একটু-আধটুকু মনোবিশ্লেষক আব্দুর রাজ্জাক হয়তো বলবেন, সবাই জীবনে একটুখানি প্রতিষ্ঠা চায়, দশের কাছে নিজেকে আধেকখানি জানান দিতে চায়। সংসারের যাঁতাকলের ভেতরে কৌশলে যারা পেরে ওঠে না, কিন্তু মনের দোলনায় ঝুলতে পারে অনায়াসে, তারা ব্লগ লেখার দুনিয়ায় সহজেই আশ্রয় খুঁজে পায়, পায় মনের মতো বন্ধুদেরও। নিজেকে জানান দেয়ার অভিলাষের মতোই সমমনাদের সাহচর্যের বাসনাও হয়তো আমরা অবচেতনে বয়ে বেড়াই সংগোপনে। ‘আমি’র সুতো ছেড়া চিৎকার আর ‘তুমি-আমি’র সুতোয় নিজেকে বাঁধার প্রবণতার মধ্যে যে দ্বান্দ্বিকতা রয়ে গেছে তার ফেরে পড়েই কি তবে টুং টাং ধ্বনির সৃষ্টি? হুংকার ও সন্ধির এবং আড়ি ও ভাবের পর্যাবৃত্তির কি এটাই কারণ?

কিছুদিন আগে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ এ মর্মে একটা কথা বলেছিলেন যে, যারা বই পড়ে তারা দুর্নীতি করতে পারে না। কথাটায় কি কার্যকারণ অদলবদল বিভ্রাট রয়েছে? হয়তো। আমার তো মনে হয় আছে। যথার্থ কথা হতে পারে এটাও যে, যারা দুর্নীতি করে না বা করতে পারে না তারা বইয়ের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত করে। এটা ঠিক, যেকোনো সাধারণীকরণে ভুল থাকে। ঈশ্বর-ভক্তি ও দুর্নীতির যেমন একত্রবাসের নজীর থাকা সম্ভব, তেমনই বই ও দুর্নীতির সহবসতি অসম্ভব নয়। তবে সত্য যা-ই হোক, পড়ুয়ারাই একসময় লিখতে চায়; আর আমাদের মতো আম আদমিরা লেখার ইচ্ছার পাল্লায় পড়লে ব্লগে এসে হামলে পড়ে।

মনস্তত্ত্বেও নানা টার্ম রয়েছে: নার্সিসিস্ট, ইনট্রোভার্ট, অটিস্টিক ইত্যাদি। কাজী শহীদ শওকতের এক ব্লগে জানলাম বাইপোলার ডিসোর্ডারের কথা। ভাবি, আমরা ব্লগাররা কি কিছুটা হলেও আত্মপ্রেমী নার্সিসিস্ট? ইনট্রোভার্ট? খানিকটা অটিস্টিক? বা এমনকি বাইপোলার? মনস্তাত্ত্বিক এসব ক্যাটাগরির মানুষেরাই ভাল সংসারী হতে পারে না, হয় অনুভূতিপ্রবণ। সংসারে যেসব জিনিসের মূল্য বেশী বলে মনে করা হয় সেগুলো বাদ দিয়ে এরা বই, সঙ্গীত, শিল্পকলা—এসব নিয়ে থাকে। ব্লগাররাও ক্ষুদ্র মাপের (এখনও পর্যন্ত) হলেও এ ক্যাটাগরিতেই হয়তো পড়ে। কিন্তু জীবন বৈচিত্র্যময়, বিচিত্রতা আছে মানুষে মানুষে মনের গড়নেও। মনোবিজ্ঞানীরা ঠিক করে দেবেন, আর আমাদেরকে তা মেনে নিতে হবে এমন কথাও নেই। ব্লগে আমরা মনোমতো একটা কাজ যোগাড় করে নিতে পেরেছি, মাধুর্যমণ্ডিত সাহচর্য পেয়েছি তা-ই বড় কথা। অন্যগুলো তো কেবলই টেনেটুনে তৈরি করা অনুমান মাত্র।

ব্লগ লিখেন না, মন্তব্যও করেন না এমন পাঠকের সংখ্যাও কম নয়। তাদের মধ্যে যেমন রয়েছেন দেশের ভেতর বাস মানুষেরা, তেমনই রয়েছেন দেশের বাইরে অবস্থানকারী অনেকে। শেষোক্তজনদের সংখ্যাও কম নয় বলে আমার ধারণা। বিদেশে থেকেও তারা দেশের ব্লগে, ভিন্ন ভাষায় প্রতিদিন কথা বলা সত্ত্বেও তারা নিজের মাতৃভাষার ব্লগে নিয়মিত আসছেন, ব্লগ পড়ছেন—এও এক অনাবিল অনুভূতি এনে দেয়। এ হলো দূরত্বকে জয় করার, জীবনের তাগিদে পেশার কাছে পরাজয় না মানার মানুষগুলোর চোখের অদৃশ্য দৃষ্টিপাতের আনন্দ। লক্ষিত হতে কার না ভাল লাগে—তা সেটা অদৃষ্টই হোক না কেন।

ব্লগে বিচরণ করলেও আমাদের অনেকেরই বিচরণ নিরবচ্ছিন্ন বা নিয়মিত হয় না। কেউ ছাত্র, কেউ চাকুরে, কেউ বা ব্যবসায়ী। দিনকাল সবসময় একরকম যায় না—কখনো পরীক্ষা, কখনো অতিরিক্ত কাজের ঝামেলা। সময় দেয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না অনেক সময়ই। এরকমটা আমারও হয়, অতীতে হয়েছে, এবং ভবিষ্যতেও হবে। জাহেদ অনুযোগ করে, ডুব দেয়ার কথা ওঠে। প্রায়শই একটা ভাবনা আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। একটা দিন নিশ্চয়ই আসবে যখন অনেকদিন হয়ে যাবে আমার দেখা নেই। যারা আমাকে ভালবাসেন তারা অনুযোগ করবেন, মানুষটা গেলেন কই? এবার দেখি লম্বা ডুব দিলেন! সুকান্ত বা জুবায়ের বা বাংগাল একজন আরেকজনকে হয়তো আক্ষেপ করে বলবেন, কেন যে তিনি বারবার উধাও হয়ে যান! কিন্তু দুনিয়ার সব মানুষের একত্রিত ভালবাসাও যে কাউকে চিরকালের জন্য দুনিয়ায় বেঁধে রাখার জন্য যথেষ্ট শক্তির অধিকারী নয়—তা হয়তো তাদের খেয়ালেই আসবে না। দিন আসবে, দিন যাবে। কোলাহলে ব্লগ পূর্ণ হয়েই থাকবে। কিন্তু সবার অজানাই থেকে যাবে, লোকটা আসলে তখন কোথায়!

অফ টপিক:
রাজ্জাক ভাই বিদেশ-বিভুয়ে থেকেও আনাগোনা বাড়িয়েছেন। মোঃ গালিব মেহেদী খান গুরুত্বপূর্ণ সব ভাবনা নিয়ে একের পর এক পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন। পাখির মতো উড়ে বেড়াচ্ছেন নিতাই বাবু। কাজী শহীদ শওকত আর ফারদিন ফেরদৌস যেন দৌড় প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছেন। সৈয়দ আশরাফ মহি-উদ্-দ্বীন মুখে হাত দিয়ে বসে আছেন, দেখছেন চারপাশ, আর লিখছেন সেসবের বয়ান। দিব্যেন্দু দ্বীপ যেন একাকিত্মকে মেনে নিয়েই নিজের ভাবনাগুলোকে চলার পথে বিছিয়ে দিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। নতুন এসছেন মুফতি মুহাম্মাদ শোয়াইব; মুফতিরাও যে বাংলায় লিখতে পারেন জানা ছিল না। নুরুন নাহার লিলিয়ান আবার লিখতে শুরু করেছেন। প্রবীর বিধান, জাকির হোসেইন, সাজ্জাদ রাহমান, রিফাত কান্তি সেন, নুর ইসলাম রফিক, রেজওয়ান আব্দুল্লাহ, মোঃ উজ্জ্বল, সুরমী খান, সৈয়দ আলী আকবার, সুদীপ্ত শাহাদাত, দেলোয়ার জাহিদ, জহিরুল ইসলাম রাসেল, তৌকির—কত নাম। এ নামের বানে আর নম্বরের ঠেলাঠেলিতে কী অবস্থাটাই না হলো নিতাই বাবুর। বুড়ো বয়সে সে সমুদ্রে নাকানি-চুবানি খাওয়ার দুঃসাহস আর আমার না হবারই কথা। কিন্তু দেখছি না শিরীন আপাকে অনেকদিন। আইরিন আপা যদি সবাইকে জানাতেন তিনি কেমন আছেন। জাহেদ কোথায় ডুব দিল। আতা স্বপন আসছেন মাঝে মাঝে।

একটা গান, লিরিকসহ (গ্যারান্টি দিচ্ছি ভাল লাগবে):

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি