ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

ব্যক্তি বলতে বোঝায় রক্ত-মাংসের ব্যক্তি-মানুষকে, যাকে চিমটি দিলে ব্যথা পায়, যে কিনা সন্তানের নিরাপত্তা, শিক্ষা ইত্যাদি নিয়ে চিন্তা করে, উদ্বিগ্ন হয় ইত্যাদি। যদিও আমরা বলে থাকি “চিমটি দিলে মানুষ ব্যথা পায়” তবুও এ বাক্যের ‘মানুষ’ একটি সার্বিক ধারণা বা একটি নাম মাত্র। এই ‘মানুষ’কে আমরা চোখেও দেখি না, ধরতেও পারি না, তাকে চিমটি দেয়াও সম্ভব হয় না, আর যদি দেয়া যেতোও তবু সে ব্যথা পেতো না।

পশু-পাখিরা কি আমাদের মতো করে এভাবে সার্বিক ধারণা তৈরি করতে পারে? পাখিরা কিচির-মিচির করে, এভাবে সংকেতও পাঠায়। পশুদের বেলায়ও একই কথা খাটে। তবে সবাই হয়তো বলবে, এদের কেউই সার্বিক ধারণা করতে পারে না, কোনো কিছুর নাম দিতে পারে না। তারা যখন দেখে বিশেষকেই দেখে, সার্বিক ধারণা তাদের মাথায় আসে না, কাউকে তারা নাম ধরে ডাকে না।

আদমের বিশেষত্ব ‘নাম’ বলতে পারা। আর একে ভিত্তি করেই, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও রক্তপাতে সক্ষম এজেন্ট হওয়া সত্ত্বেও ফেরেশতারা তাকে সেজদা করেছিল।* আবার মানুষের নকল উপাস্যগুলো সম্বন্ধে সেই একই কোরানে বলা হয়েছে যে, সেগুলো মানুষের উদ্ভাবিত ‘নাম’য়ের বেশী কিছু নয়।**

কিছু ব্যতিক্রম আছে বলে শুনেছি; তারপরও সাধারণভাবে বলা যায়, পশু-পাখিরা নিজ প্রজাতির অন্তর্ভুক্তদেরকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে না। কিন্তু নামকরণে সক্ষম মানুষ যে কেবল সজ্ঞানে নকল ঈশ্বরের উপাসনা করতে পারে তা-ই নয়, সে নিজ প্রজাতি মানুষকে জীবিকা করে, তাকে শোষণ করে, তার উপর অত্যাচার করে।

পরিবার, সমাজ, গোত্র, সম্প্রদায়, জাতি বা এমন কি মানবজাতি—সবই তৈরি হয় ব্যক্তিমানুষের সমবায়ে। কিন্তু ব্যক্তিরাই কষ্ট পায়, আনন্দিত হয়। পরিবার থেকে শুরু করে মানবজাতি—সবই ধারণা মাত্র, তাদের অস্তিত্ব ব্যক্তির মনে, ব্যক্তিদের ভাষায়। তারা চিন্তাও করে না, কষ্টও পায় না, আনন্দিতও হয় না। কিন্তু এই সমবায়গুলোকে যখনই ব্যক্তির চেয়ে বড় মনে করা হয়, তখনই ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে, সে তখন একটি মানসিক সত্তার গাঠনিক উপাদানে পরিণত হয়।

আমাদের দেহের সাথে একটা তুলনা করে দেখলে বিষয়টা বুঝতে সহজ হয়। একটি প্রাণীর দেহে কত কোষ। কোষগুলোর সমন্বয়ে নানা ধরণের তন্ত্রও তৈরি হয়েছে। কোষগুলো জানে না তারা একটা বৃহত্তর সত্তার সেবক ছাড়া কিছু নয়। একই ভাবে ব্যক্তিরা কোষগুলোর মতো হলে আর সমাজ ইত্যাদি একটা বৃহত্তর বা উচ্চতর সত্তা হলে ব্যক্তিদেরকে সেই উচ্চতর সত্তার সেবক ছাড়া আর কিছুই ভাবা যায় না। দেহের ভেতর প্রতিনিয়ত কত কোষ মরছে। কিন্তু দেহটির অস্তিত্বকে আমরা বড় করে দেখি বলে সে মৃত্যুগুলো গৌণ হয়ে আছে।

সার্বিক ধারণার ভাষাগত প্রকাশ হচ্ছে নাম। এই নাম হচ্ছে প্রতীক। এই নাম হয়ে ওঠে প্রতীক। বস্তু দিয়ে আমরা এই প্রতীকের অভিব্যক্তি তৈরি করতে পারি। হিন্দুর টিকি, মুসলিমের টুপি, খ্রিস্টানের ক্রুশ। ধর্মভিত্তিক প্রতীক যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ ইহজাগতিক হাজারও প্রতীক। আছে ছবির জগতেও। সুপারম্যানের প্যান্টের উপরকার আন্ডারপ্যান্ট, কৃষ-এর মুখোশ ইত্যাদি।

প্রতীক হয়ে ওঠে সমষ্টির ও আদর্শের প্রতিবিম্ব। ব্যক্তিকে প্রস্তুত করা হয় এসব প্রতিবিম্বের সেবক হিসেবে। প্রতীক হয়ে ওঠে ব্যক্তির ঈশ্বর। বহু প্রতীক, বহু ঈশ্বর। এসব নাম, এসব প্রতীক দিয়েই ব্যক্তির পরিচয় নির্ধারণ করা হয়। প্রথম দৃষ্টিতেই দৃশ্যমান প্রতীক, বা মুখ-নিঃসৃত বয়ানের প্রথম শ্রুতিতেই আমরা রাম ও রহিমকে আলাদা করে ফেলি। তাদেরকে বিভিন্ন সমাহারের সদস্যে পরিণত করি। হিজাব পরা আর না পরার ভিত্তিতেই প্রথম নজরেই আমরা দুজন সম্বন্ধে ভিন্ন ধারণা সৃষ্টি করে থাকি।

তনু তখন আর তনু থাকেন না, তার হিজাব বা তার নাট্যকর্মীত্ব তার বড় পরিচয় হয়ে ওঠে।

প্রতীক আর নামের ভিন্নতায় বিভক্ত হয়ে পড়ে মানবজাতি। জাতি, সম্প্রদায়, বর্ণ, গোত্র, সমাজ তখন প্রধান হয়ে যায়। ব্যক্তি হয়ে যায় গৌণ। ঘৃণা, তাচ্ছিল্য, হিংসা, আঘাত—সবই তখন নকল ঈশ্বরের উপাসনায় পর্যবসিত হয়। কিন্তু ব্যক্তিকে গৌণ করে সমাহার হিসেবে মানবজাতির ঐক্যও ভাল কিছু বয়ে আনবে না। সবার উপরে ব্যক্তি সত্য না ধরে ধরা হয়ে থাকে সবার উপরে মানুষ সত্য। কিন্তু এই কথিত মানবতা সোনা-রুপা-লোহার জন্য নির্দয়ভাবে ভিন গ্রহের এলিয়েন খুনাখুনিতে দ্বিধা করবে না।

খুবই জনপ্রিয় একটি স্লোগান রয়েছে আমাদের দেশে। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। ব্যক্তিকে আমরা আদতে যে সমষ্টির দাস ছাড়া কিছু ভাবি না তার স্বাক্ষর রয়েছে এ স্লোগানটিতে। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই পরিষ্কার হবে এখানে গুরুতর ক্যাটাগরি মিসটেক রয়ে গিয়েছে। দল ও দেশ বিমূর্ত ধারণা, দুটোই ব্যক্তির সমাহার। এদুটোর মধ্যে তুলনা চলে। দলের চেয়ে দেশ নিশ্চয়ই বড়। কিন্তু ব্যক্তি মূর্ত অস্তিত্বশীল কিছু, বিমূর্ত নয়। ব্যক্তির সাথে অন্য দুটোর তুলনা চলে না।

এ দাবী কি করা যায় যে, সব নকল ঈশ্বর ও হিংসা-বিভেদ ভাষার অপব্যবহার থেকে জাত উত্তরাধিকার?


* কোরান ২ : ৩০-৩৪।
** কোরান ৫৩ : ২৩। (They are not but [mere] names you have named them – you and your forefathers…)

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি