ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

আমরা ইতোমধ্যে আলোচনা করেছি সুবর্ণ বিধির নানা রূপ নিয়ে—ধর্মতত্ত্ব ও শাস্ত্রের সাথে তার সম্পর্ক ও মেরুকরণ নিয়ে। নবী মুহম্মদ তাঁর সাক্ষাৎ ও ঘনিষ্ঠ সহচরদের মধ্যে এ নীতি অনুসরণের সক্ষমতা তৈরির উদ্দেশ্যে তাদের মধ্যে সচেতনতা ও প্রজ্ঞার উন্মেষ ঘটাতে চেয়েছিলেন। এর সফলতার পরিধির মাপ আমরা পাই তাঁর মৃত্যুর পরের ত্রিশ বছরের ইতিহাসে।

ওমর

ওমর যদি আল্লাহকে ভয় না করতেন ও সুবর্ণ বিধির ধার না ধারতেন তবে পৃথিবীর ইতিহাস অন্য রকম হতো। সেকালের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ওমরের অবস্থান ছিল আজকের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মত। ওমর বিচক্ষণ ও নিজের শক্তি সম্বন্ধে সচেতন এক পুরুষ ছিলেন। তাঁর একটি নির্দেশে আরবরা বাতাসের বেগে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে ছুটতে পারতো।

তার চেয়ে কত কম শক্তি নিয়ে চেঙ্গিস বা হালাকু কী না করেছে! তাহলে তাঁর নীতির মধ্যে কিসের ইংগিত পাওয়া যায়? নবীর সুবর্ণ বিধির সচেতনতা নয় কি? তাই যদি না হবে তবে তিনি রাতের অন্ধকারে নিজের পিঠে করে খাদ্যের বোঝা বইতেন কেন? বারবার মানুষকে কেনই বা জিজ্ঞেস করতেন: আচ্ছা বলতো, আমি তোমাদের রাজা, নাকি তোমাদের প্রতিনিধি? মানুষ তো অনেক আগের কথা, ফোরাতের কূলে কোন প্রাণী না খেয়ে মরতে বসেছে কি না তা নিয়ে ভাবনায় মরতেন কেন তিনি? কেনই বা শাসাতেন: তোমাদের মধ্যে সে-ই আমার কাছে সবচেয়ে দুর্বল, যে অত্যাচার করে।

আলী

আলী ও তাঁর সময়ের সিরিয়াবাসিদের বিরোধ যখন তুঙ্গে, তখন কূটনীতি ও রাজনীতির বিচারে আলী সাদাসিধা অপটু নেতা হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করেছিলেন। পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকগণের মধ্যেও এই মত আমরা দেখতে পাই। কারও কারও মতে আলীর রাজনৈতিক অকুশলতা সিরিয়াবাসীদের চালাকির কাছে তাঁকে পরাজিত করেছিল।

আলী নবীর সাহাবীদের মধ্যে বেশ খানিকটা অন্য রকমের ব্যক্তি। তিনি একাধারে ঋষি, দার্শনিক ও বীর। কিন্তু পরে আমরা দেখি, তাঁর একে একে পরাজয়—সিরিয়রা তাঁর রাজ্যকে সংক্ষিপ্ত করে তুলছে। সিরিয়রা জিতেছিল শক্তি ও অর্থের জোরে। আলী সেটি জানতেনও। তাহলে তিনি কি বুঝতে পারেননি যে, ভয় দেখিয়ে, লোভ দেখিয়ে, টাকা-তলোয়ার দিয়ে তাঁর পক্ষেও দল ভারী করা সম্ভব? এতটুকু বুঝতে কি আর এমন পাণ্ডিত্য প্রয়োজন? তাহলে তাঁর নীতির অর্থ কী? এটা নয় কি?: আমার জীবন যায় যাক, রাজ্য যায় যাক, তবুও সুবর্ণ বিধি ভাঙব না। যে সুবর্ণ বিধিকে অবলম্বন করে নবীর উত্থান হয়েছিল, সে বিধি অবলম্বন করেই আলী স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে পতনকে গ্রহণ করেছিলেন।

খারেজি

এটা সেই কালের ঘটনা। একদল মুসলিম সুবর্ণ বিধি কী তা জানতেই পারলো না। তাদের নেতারাও নবীর সান্নিধ্য তেমন পায়নি। তাছাড়া ততদিনে নবীর মৃত্যুর পর বছর পঁচিশেক অতিবাহিত হয়ে গেছে, অর্থাৎ নবীর জীবনের শেষের দিকে এই দূরবর্তী বেদুইন গোত্রগুলোর মধ্যে যারা বাল্যকাল অতিক্রম করছিল তাদের বয়স এতদিনে ত্রিশেরও বেশী। এদের অনেকেই ধর্মের ব্যাপারে হয়ে ওঠে অতি উৎসাহী, কিন্তু ধর্মের মূল বাণীটি বুঝতে ব্যর্থ থেকে গেল। অজ্ঞতার কারণে, প্রজ্ঞার অভাবের কারণে ও কোরানকে অসংলগ্ন বচনাদির সমাবেশ হিসেবে দেখার কারণে, তারা শেখার ও অনুশীলনের বদলে নিজেদেরকে আলী থেকে বিচ্ছিন্ন করলো। এই স্বঘোষিত বিচ্ছিন্নরা সিফফিনের প্রান্তরে নিজেদেরকে আলাদা করলো অভিনব ধর্মতাত্ত্বিক মতের ভিত্তিতে। তারা যা বুঝল তার ভিত্তিতে নিজেদের নাম নিজরাই দিল খারেজি শব্দটি দিয়ে: যার অর্থ আলাদা হওয়া। উমাইয়ারাও এরকম কিছু করতে সাহস করেনি কখনও বা তারা এটি ভাল কাজ বলেও মনে করেনি কখনও। সেই থেকে সূত্রপাত।

ধর্মের বাইরের আকারের দিক থেকে বিচার করলে তারা খুবই ধার্মিক ছিল। মিথ্যে কথা তো একদমই বলতো না, আর নামাজ পড়তো এতো যে তাদেরকে কপালে দাগ দেখেই চেনা যেতো। নাহরাওয়ানের যুদ্ধে তারা আলীর নিকট ভীষণভাবে পরাজিত হয়েছিল ও তাদের সকল সৈন্যই নিহত হয়েছিল, মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত থেম না, তাদের এ নীতির কারণে।

এই খারেজিদের অনেক শাখা আছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানকরা ছিল সন্ত্রাসীরা; এরা তাদের ধর্মতাত্ত্বিক মতের সাথে কেউ একমত না হলেই তাকে হত্যা করা ও তার বাড়িঘর লুণ্ঠন করা বৈধ বলে মীমাংসা করেছিল। তারা হাটে বাজারে গিয়ে নিজে নিহত না হওয়া পর্যন্ত মানুষ হত্যা করতো। তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে প্রতিপক্ষকে বাড়ী বাড়ী গিয়ে হত্যা করতো। এরা খুবই সংকীর্ণ অর্থে কোরান ও নবীর কথার ব্যাখ্যা দিত। তাদের ধর্মতত্ত্বে কোরানে ব্যবহৃত কুফর, শিরক, জিহাদ, ইসলাম এ-শব্দগুলো আভিধানিক অর্থের বদলে উগ্র পারিভাষিক রূপ লাভ করল। তোমরা কাফির, আমরা তোমাদের হত্যা করবো—এই রকম কথা পৃথিবীর মানুষ তাদের মুখেই প্রথম শুনল।

তারা ঠিক কোন জায়গাটায় ভুল করেছিল? তাদের ভুলটা ছিল এইখানে: ঠিক যে তরিকায় তত্ত্বের ভিত্তিতে অবিদ্যাপতিরা ও অগ্নিপতিরা মানব সমাজে বিভাজন রেখা টানে, তারাও ধর্মের নামে ঠিক সে কাজটাই করে বসেছিল। যে তরিকায় নবীদের শত্রুরা স্বীয় স্বার্থের খুঁটি ও সুখের উৎসসমূহ রক্ষা করতে চেয়েছিল, ঠিক সেই তরিকায় তারা তাদের আল্লাহকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু মুহম্মদের তরিকা যে আল্লাহর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত না, বরং ঐক্য, শান্তি, নিজেকে ও অন্যের জন্য মমতা নিয়ে বেশী চিন্তিত এটা খারেজিরা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল।

আলী ও খারেজিরা

তারা অস্থিরমতি ও অবিবেচক। তারা যুদ্ধের সময় আলীকে সিরিয়াবাসীদের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য করেছিল। আবার সন্ধির পরপরই সন্ধি ভেঙ্গে অতর্কিতে সিরিয়া আক্রমণ করতে পীড়াপীড়ি করেছিল। মূর্খতার চাপে যুদ্ধ বন্ধ করা যায়, সন্ধি করা যায়; কিন্তু সন্ধি তো ছিঁড়ে ফেলা যায় না। পরবর্তীতে তারা আল্লাহর বদলে মানুষকে কেন শালিস মানা হলো এ অভিযোগ করে আলীপন্থীদের হত্যার হুমকি দিয়ে দুমাতুল জান্দাল ছেড়ে চলে গেল। সেই থেকে তারা নিজেদেরকে খারেজি বলে সাব্যস্ত করলো এবং এখান থেকেই খারেজিদের জন্ম হলো।

খারেজিরা আলীকে হত্যা করেছিল দুই গুপ্ত ঘাতক পাঠিয়ে।

খারেজি মতের পরবর্তী প্রভাব

এই খারেজি তত্ত্বের বীজ আজও বংশ পরম্পরায় টিকে আছে, তাদের ধর্মতত্ত্বেরও বিস্তার ঘটেছে। তাদের চিন্তা উগ্র থেকে অনুগ্র নানারূপেই বিস্তৃত হয়েছে নানা মহলে।

খারেজি মতের সবচে নম্র প্রভাবটি আমরা দেখতে পাই পরবর্তী কালের আকায়েদ ও কালাম শাস্ত্রবিদদের অনুসারীদের মধ্যে। তারা কী করলে কী বললে একজন কাফির হয়, মুশরিক হয়, মুনাফিক হয় তার তালিকা পাঠ করতো এবং এর ভিত্তিতে পড়শিদের কে কী তা বিচার বিশ্লেষণে পর্যাপ্ত সময় কাজে লাগাতো।

খারেজি মতাবলম্বীদের লক্ষণ হলো তারা জোরেশোরে বলে লা হুকমা ইল্লা বিল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া মীমাংসা দেয়ার আর কোনো অধিকর্তা নেই। কিন্তু আল্লাহ যেহেতু পৃথিবীতে এসে মীমাংসা দেন না, তাই মীমাংসার দায়িত্বটি তারা নিজেদের কাঁধে তুলে নেয় এবং নিজেদের নির্বুদ্ধিতা প্রসূত সব মীমাংসা তারা আল্লাহর জন্য ফেলে না রেখে নিজেরাই কার্যকর করার উদ্দেশ্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। তারা মনে করে, কোনো মানুষ তাদের মতানুসারে অত্যাচারী সাব্যস্ত হলেই তাদের জন্য তার পরিবারের সদস্যদের বা সমর্থকদের হত্যা করা সম্পূর্ণ বৈধ হয়ে যায়। তাদের মূল মত হলো, তাদের ধর্মতত্ত্বের সাথে অমতই একজনকে অত্যাচারী সাব্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট। আর এমন কথিত অত্যাচারীকে হত্যা করার জন্য আর কোনো চিন্তার প্রয়োজন আছে বলে তারা মনে করে না। তারা অন্যের কোনো কথাই শুনতে চায় না, কেউ কথা বলতে চাইলে হৈ চৈ করে, আর কথায় কথায় মানুষকে কাফির বলে ঘোষণা করে ও হত্যার হুমকি দেয়।

লাদেনপুত্র ওসামা

আমাদের কালের ওসামা ও তার অনুসারীদের ধর্মতত্ত্ব ও অনুশীলনের মধ্যে সেই পুরাকালের খারেজি ধর্মতত্ত্ব ও অনুশীলনের কমবেশি মিল আছে। মানুষের নসবের—মানে, বংশধারার খোঁজ নেয়ার সামর্থ্য আমার নেই। যার সামর্থ্য আছে সে খুঁজে দেখুক, ওসামার পিতা লাদেনের বংশের সেইকালের পুরুষটি খারেজি ছিল কি না।