ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

ট্র্যাজেডি
জীবনের স্বরূপ উদঘাটনে সাহিত্যের সবচে সাড়ম্বর সাহসী অভিযানের নাম ট্র্যাজেডি। এ এমন এক দর্পণ যাতে প্রতিফলিত হয় মানবিক অস্তিত্বের মৌল প্রকৃতি। সাহিত্যে ট্র্যাজেডির আবির্ভাব প্রাচীন গ্রীক সংস্কৃতিতে। নাটক আকারে। জীবন দুর্বল। ভঙ্গুর। বিপদসংকুল। ধ্বংসদ্বারপ্রান্তের সার্বক্ষণিক বাসিন্দা। যুক্তির ক্ষীণ আলোয় জগত সামান্যই প্রবেশ্য। অতীত কর্মফল বর্তমানের অভিলাষকে বিপন্ন করে তোলে। মানুষ দেখতে পায় ভবিষ্যৎ বল্গাহারা ঘোড়ার মতো নিয়ন্ত্রণের বাইরে ধাবমান।

নেমেসিস
প্রাচীন এক গ্রীক দেবীর নাম নেমেসিস। নামের সাথে মিশে থাকা অভিধা ‘প্রাপ্য প্রদান’। গ্রীকদের কাছে সে ছিল ঐশী প্রতিশোধের আত্মা। তার আরেক নাম ছিল—এডরেসটিয়া; অর্থ ‘যার কাছ থেকে পালানো অসম্ভব।’ নেমেসিস মানে এখন অমোঘ নিয়তি। হেলেনীয় জীবনবীক্ষার, গ্রীক ট্র্যাজেডির মূল থিম এই নেমেসিস। সফোক্লিসের নাটকগুলোতে অলঙ্ঘ্য নিয়তিই ঐক্যবিধায়ক সূত্র। এ সুতোয় বাঁধা নাটকের অংকগুলো, চরিত্রগুলো।

ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখে না! সুনীলের কবিতার তেত্রিশ বছর কবে পার হয়েছিল কবিই জানে। আমি শুধু জানি যমানা পার হয়ে গেছে। কথা না রাখার যমানা। কে রাখে, কেই বা রাখে না, তার খবর একালে আর কেউ নেয় না। আমাদের বসবাস কালান্তরে। কথা না শোনার কালে। একালে কেউ কারও কথা শোনে না। সভ্যতা ও সংস্কৃতির জানালাহীন ছোটছোট খোপে বন্দী মানবজাতি। কেউ কথা শোনে না, তেত্রিশ বছর কাটবে, কেউ কথা শুনবে না! আইদার ইউ এগরি উইথ মি অর বি রং। সভ্যতা ও সংস্কৃতির জন্য আপোষহীন মানবজাতি। বিভাজন ও বিবাদের পথে লড়াকু অভিযাত্রী।

অবহেলিত প্রশ্ন
Where do the terrorists get their money and weapons from?[*1]

অসম্ভব সমাধান
It is surely clear that the only ultimate solution to terrorism is political justice.[*2]

মার্টিন লুথার
জার্মানির ধর্মবেত্তা। জন্ম ১৪৮৩। মৃত্যু ১৫৪৬। খ্রিস্টীয় জগতে প্রটেস্টান্ট ধর্মমতের প্রতিষ্ঠাতা। ক্যাথলিক ও ইসলাম ধর্মের প্রতি তার ছিল বিরাট বিরাগ। পোপতন্ত্র তার চোখে দাজ্জাল। ভিয়েনার ফটকে হানা দেয়া তুর্কিরা মিথ্যার উপর মিথ্যার তাবেদার ডাকাতের দল। তবুও তুর্কিদের কাছে পরাজিত হোক পোপতন্ত্র—এ ছিল তার প্রত্যাশা। এতো বড় পণ্ডিত! অথচ কত বিচিত্র তার ধারণা। কত বিচিত্র প্রত্যাশা।

লজিক এন্ড ইগো
আমি যুক্তি মেনে চলি না। যুক্তিই নীতি। নীতি ভেঙ্গেই চলি। সময় যখন যে পথকে সুবিধেজনক করে দেয়, সে পথকেই তখন বেছে নেই। যুক্তির পথে, নীতির পথে চলে হেরে গেলেও বুকের বল পালায় না, মুখের জ্যোতি হারায় না। যুক্তিছাড়া সুবিধার পথে চলতে গিয়ে হেরে গেলে অহংয়ের জালে বন্দী হয়ে পড়ে থাকতে হয়। আমার হার শুধু পথেই হয় না। ঘরেও হয়। পুষ্পাসনে আয়েশে বসে খেতে খেতেও হয়। তারপর জেলের হাতে ধরা পড়া মাছের মতো এপাশ ওপাশ করি। কিন্তু মুক্তি জোটে না।

অহংয়ের আগুন নেভে না কোনো জলে
অহংয়েরা যুগল হয়ে চলে। সমান্তরালে। বছরের পর বছর কাটে। পার হয় যুগের পর যুগ। অহংয়ের হাতে বন্দী হয় পথিকের আত্মা। যেভাবে মথ নিজেকে গুটিয়ে রাখে তন্তুর বেড়াজালে। বিপদের উপর বিপদ। তবুও পথিক গুটি ভেদ করে বেরিয়ে আসতে পারে না। লাগে। বাজে। মনে কেবলই আশার উপর আশার স্তূপ। মরীচিকার মতো। যুগলের মধ্যে কেবলই দূরত্ব বাড়ে। মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলোর মতো।

সময়ে এক ফোঁড়, অসময়ে লিথাল মোমেনটাম
সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়। নীতি কথার রচয়িতা হাল ছাড়েনি। সময় পার হয়ে গেলেও সমাধানের পথ রেখে দিয়েছে সে। দশ ফোঁড় লাগিয়ে দাও। সমাধান। কিন্তু দশ ফোঁড়ের অসময় কি অনন্তকাল তক লম্বা? না, এমন অসময়ও আসে যখন হাজার ফোঁড়ও নিষ্ফলা। যেকোনো ফোঁড়ই যখন অনর্থক। টেরি ইগলটন এরকমটাই মনে করেন: Destructive forces which spring from remediable causes can take on a lethal momentum of their own which there is finally no stopping.[*3]

ট্র্যাজেডি
শ্রুতি-বন্ধ্যাত্ব থেকে জন্ম নিতে পারে ট্র্যাজেডি। ইগোর বেড়াজালে বেড়ে ওঠে ট্র্যাজেডি। সময়ের ফোঁড় সময়ে না দিলে সর্বনাশা ত্বরণের কবলে পড়ে ট্র্যাজেডি। জগদধ্বংসের মহাযজ্ঞ। আত্মবিনাশের মহালীলা। অনুষ্ঠিত হয় অক্ষি সমক্ষে। আকাশ জুড়ে। দিগন্ত ব্যাপী। দুঃসাহসী মানুষ। দুর্বিনীত মানুষ। বুদ্ধিমান মানুষ। অবিবেচক মানুষ। অবশেষে অসহায় মানুষ। ফেরেশতারা চেয়ে থাকে। বিশাল আড়ম্বরে নাট্যমঞ্চের মেঝেতে পড়ে থাকে ঈশ্বরের আদলে গড়া মহানায়ক।

নেমেসিস
হায়! নেমেসিস! ইগোর জাল ছিঁড়ে মুক্ত মনে মুক্ত মাঠে ছুটে আসতে পারে না কোনো আত্মা। তুমি যতই বল, যতই চিৎকার কর, যতই শোনাতে চাও। শুনবে না। এক তেত্রিশ, শত তেত্রিশ বছর পেরিয়ে যাবে। শুনবে না। নিজেকে দেখবে না। সরে আসবে না। আমার দু’চোখে শুধুই অপরের ছবি। মুখ অনর্গল। কান অর্গলাবদ্ধ। ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়েই কেবল রিক্ত-শূন্য অহং নিজেকে দেখতে পায়। মুখ স্তব্ধ হয়। কান শুনতে পায়। নেমেসিস! অমোঘ নিয়তি! আমার, তোমার, তার। সকলের।

ইরাক ও সিরিয়া
সব সমস্যারই কি সমাধান আছে? এমন কোনো সময় কি সব তাতেই থাকে যখন এক ফোঁড়েই সমাধান? নিয়তি কি ফেরানো সম্ভব ছিল? কোন সময়ে কী করলে তার ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো? মানুষ অভিজ্ঞ হলো। কেউ কেউ দুঃখভারে আক্রান্ত। কিন্তু টাইম মেশিনে করে জগতটাতে কুড়ি বছর পিছিয়ে দিলে কি নতুন ইতিহাস হবে? হ্যাঁ, বিশ্বের মহান অভিজ্ঞ নেতারা নিশ্চয়ই মানবজাতিকে সুখের ইতিহাস উপহার দেবে। বিশ্বাস হয় না? আবারও দুঃখেরই ইতিহাস হবে? ভিন্ন পথে? শুড আই এগরি উইথ ইউ অর শুড আই বি রং?

স্টেফেন হকিং
নিউক্লিয়ার ওয়ার। গ্লোবাল ওয়ার্মিং। জেনেটিক্যালি মডিফাইড ভাইরাস। মিলিটারী এআই অস্ত্র প্রতিযোগিতা। পুঁজির লিপ্সাপাশে আবদ্ধ ওয়ার্কফোর্স অটোমেশন। আরও কত কী! স্টেফেন হকিংয়ের তাই আশঙ্কা, রুলিং ক্লাস এ গ্রহের মানবজাতিকে একদিন ধ্বংসের গহ্বরে নিক্ষেপ করবে। তার পরামর্শ, প্রজাতিকে বাঁচাতে হলে মানুষকে অন্য নানা গ্রহে বসতি বানাতে হবে। ভাগ মানুষ, ভাগ। গ্রহান্তরে ভাগ। কিন্তু সবখানেই আবার আসবে স্টেফেন। নীটশের ওভারম্যানের মতো। পুনঃ পুনঃ। ভাগ মানুষ, ভাগ, গ্রহান্তরে ভাগ। ভাগতেই থাক।

দালাই লামা
প্রাচীন আশাবাদী প্রবচন: When there is a problem, there is a solution. নৈরাশ্যবাদীরা বলবে, কথা তো নয়, ঘোড়ার ডিম। তা সেকথা খাঁটি হোক, কি ভেজাল, দালাই লামার একথা নির্ভেজাল: If there is no solution to the problem then don’t waste time worrying about it. If there is a solution to the problem then don’t waste time worrying about it.

মধুসূদন
কুহকিনী আশা। তবুও আশাবাদ নিয়ে মানুষের পথ চলা। জয়ের আশা। বিজয়ের প্রত্যাশা। কিন্তু অটল অনড়দের পরম উৎসাহী আশাবাদের ফল কী? পরিণতি কী? বিপ্লবী আশাবাদের যৌক্তিক পরিণতিও নৈরাশ্যবাদ। আশার ছলনে ভুলি কী লাভ লভিনু হায়! … দিন দিন আয়ুহীন হীনবল দিন দিন, তবুও এ আশার নেশা ছুটিল না, এ কি দায়?—মধুসূদন?

ইয়া নফসি
সমঝোতার আশাই কি প্রকৃত আশা? সমঝোতার জন্য চাই মধ্যস্থতা। কেউ কি আছে যার উপর আস্থা রাখা যায়? জাতিসংঘ? পৃথিবীর তাবৎ সুশীল বুদ্ধিজীবীরা? নাকি আমরা এমন যে স্বয়ং ফেরেশতারা নেমে আসলেও সমস্বরে বলে উঠবো, তোমাদেরকে আমরা বিশ্বাস করি না, তোমাদের উপর আমাদের কোনো আস্থা নেই? সামাজিক পুঞ্জিবাট্টায় দেউলিয়া আম আমাদের তাই দিল কা জপ, ইয়া নফসি, ইয়া নফসি।

আশাবাদ
তারপরও মাঝে মাঝে আশার কথা শুনি। তাতেই আশা। তাতেই প্রশান্তি। এবার কিন্তু তোমরা আমায় বলো না বন্ধুরা, বন্ধু! তুমি আসলেই একটা বোকা! আকাশে তাসের ঘর বানিয়ে পাতালে করছো বসবাস!

***

[*1] Click to read.

[*2] Terry Eagleton, The Meaning of Life: A Very Short Introduction, Page 10, Oxford University Press, 2008.

[*3] Terry Eagleton, The Meaning of Life: A Very Short Introduction, Page 11, Oxford University Press, 2008.

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি