ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

লোকেরা যখন প্রশ্ন করে, জীবনের অর্থ কী?—তখন অনেক সময়ই প্রত্যাশিত উত্তর হিসেবে প্রশ্নকারীদের মনে বিরাজ করে জীবনের বাইরের কোনো কিছুর নির্দেশ করাকে। এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এই ‘অর্থ’য়ের বিষয়ী সার্বিকভাবে মানবজাতি নয়, বরং আলাদা আলাদা ব্যক্তিমানুষ। আবার আমাদের অনেকেই এবং দার্শনিকদেরও অনেকেই মনে করে থাকেন যে, ব্যক্তির জীবন অর্থপূর্ণ হয় যদি সে নিজেকে, নিজের জীবনকে তার চেয়েও বড় কোনো কিছুর সাথে যুক্ত করতে পারেন বা এমন কিছুর সাথে সম্পর্কিত করতে পারেন যার মূল্য ব্যক্তিটির জীবনের মূল্যের চেয়ে বেশী। কাজেই আমরা কেউ ঈশ্বরের মধ্যে, কেউ সন্তানের মধ্যে, কেউ মানবতার সেবার মধ্যে, কেউ প্রেম-পরার্থপরতার মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে পাই। আবার কেউ কেউ মানবিক সভ্যতার প্রগতির জন্য সংগ্রামের মধ্যেই কেবল জীবনের অর্থ নিহিত বলে মনে করেন।

আমরা সাধারণ মানুষেরা—ঈশ্বরে বিশ্বাসী হই, কি নাস্তিকই হই—কার্যত যেভাবে জীবন যাপন করি তাতে প্রকাশিত হয় যে, একের জীবনের অর্থ তার সন্তানের মধ্যেই নিহিত। সন্তানের জন্য জীবন দিতেও আমরা পিছপা হই না। জীবনের সব গ্লানি, দুঃসহ সব কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিয়ে আমরা বেঁচে থাকতে চাই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে। “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”—এ কেবল মুখে মুখে উচ্চারিত কবিতার পঙক্তিই নয়; এ আমাদের বেঁচে থাকার দর্শন, জীবনের উদ্দেশ্য, জীবনের অর্থ। কিন্তু ভাবতে বসলে দেখা যাবে সন্তানের মধ্যে অর্থ খুঁজতে লেগে পড়লে তার কোনো শেষ পাওয়া যাবে না। রহিমের জীবনের অর্থ যদি হয় তার সন্তান করিম, তবে করিমের জীবনের অর্থ কোথায়? করিমের সন্তান জামালের মধ্যে? আর জামালেরটা তার সন্তান কামালের মধ্যে? তাহলে এ বংশের শেষ মানুষটির জীবনের অর্থ কী হবে? যারা নিঃসন্তান অথবা যারা এখনও সন্তানের মাতা বা পিতা নন—আমরা জানি না কতদিন বেঁচে থাকবো, বেঁচে থাকলেও সন্তানের পিতামাতা হতে পারবো কিনা—তাদের জীবনের অর্থই বা কোথায় নিহিত?

এভাবে আমরা অর্থের উৎসকে আসলে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখি মাত্র। অথবা বিমূর্তভাবে কেবলই ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেই। ঠেলে দেই এমন এক কালের দিকে যে কালে সন্তানেরা হয়তো সত্যিই থাকবে দুধে আর ভাতে। কিন্তু সেই ইউটোপিয়ায় মহানন্দে কালাতিপাতকারী বাসিন্দাদের জীবনের অর্থই বা কী হবে? তবে ব্যক্তিগতভাবে যার যার সন্তানের উন্নত জীবনের মধ্যে নিজ জীবনের অর্থ আরোপ বা অর্থ অন্বেষণের সামাজিক রূপ হচ্ছে জাতিগতভাবে প্রগতি, এবং আরও বিস্তৃত পরিসরে, মানব সভ্যতার প্রগতির মধ্যে ব্যক্তির জীবনের অর্থকে নিহিত করা।

দার্শনিক হেগেলের মতে, বিশ্বের ইতিহাস বৃত্তাবদ্ধ নয়; এটা উন্মুক্ত এবং ক্রমবিকাশমান। তার মতে, এই বিকাশের ধারা সম্মুখগামী, যদিও মাঝে মাঝে তা থেমে থাকে এবং কখনও কখনও পিছনের দিকে চলে। তবে সামগ্রিক বিচারে ইতিহাস সামনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে উন্নততর ও পূর্ণতর বিশ্বের দিকে। তিনি আরও মনে করেন, মানব সভ্যতার এই বিকাশ আদতে স্বাধীনতার সম্বিতের বিকাশ এবং বাস্তব স্বাধীনতার বিস্তারের বৃদ্ধি। ইতিহাস যতই বিবর্তিত হচ্ছে ততই লোকদের কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠছে যে, মানুষ সারগতভাবে স্বাধীন এবং অধিক থেকে অধিকতর লোক নিজেদেরকে স্বাধীন করেও তুলছে। একসময় মনে করা হতো রাজাই কেবল স্বাধীন, প্রজারা সব দাস। পরে মানুষের ধারণা হলো কেবল একজন নয়, অনেকেই স্বাধীন আর বাকীরা দাস। কিন্তু এখন গণতন্ত্রের যুগে মানুষের ধারণা হয়েছে, সকলেই স্বাধীন—মানুষ হবার কারণে প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বাধীন।

হেগেল দাবী করেন, যে ব্যক্তিরা অধিকতর স্বাধীনতার লক্ষ্যে ইতিহাসের এই প্রগতিশীল সঞ্চালনের অংশীদার হন তাদের জীবন অর্থপূর্ণ হয়। ইতিহাসের এই সম্মুখ যাত্রা বাদে অন্যত্র ব্যক্তির জীবনের জন্য কোনো অর্থ নেই। যে যুগে একজনের বসবাস সে যুগের উদ্দীপনার সাথে, সে যুগের স্বাধীনতার উদ্বর্তনের সাথে ইতিবাচকভাবে নিজেকে যুক্ত ও সংশ্লিষ্ট করার মাঝেই তার জীবনের অর্থ নিহিত। এই মতকে সঠিক ধরলে বলতে হয় যে, অধিকাংশ মানুষের জীবন আদতে অর্থশূন্য এবং প্রগতির লক্ষ্যে সংগ্রামে জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়া বীর-ব্যক্তিদের জন্যই কেবল সার্থক জীবনের সুযোগ রয়েছে।

হেগেলের ছাত্র মার্কসও এরকমই মনে করতেন, তবে তার কাছে প্রগতি ছিল অর্থনৈতিক। তার মতে, ভাবীকালের অধিকতর খুঁতহীন বিশ্ব হচ্ছে অর্থনৈতিক শ্রেণিহীন বিশ্ব। ইতিহাস ধাবিত হচ্ছে শ্রেণিহীন বিশ্বের দিকে। শ্রেণি ও শ্রেণিদ্বন্দ্ব সম্বলিত পুরাতন বুর্জোয়া সমাজের স্থলে পাওয়া যাবে এমন এক সমাজ যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তির মুক্ত বিকাশ সকলের মুক্ত বিকাশের পূর্বশর্ত। সে সমাজটি হবে ন্যায্য সমাজ এবং প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজন অনুসারে প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে এবং সামর্থ্য অনুসারে কর্তব্যভার আরোপিত হবে। ব্যক্তিজীবনে অর্থ খুঁজে পেতে হলে পুঁজিবাদী ও শ্রেণি-বিভক্ত এই সমাজ ভেঙে কমিউনিস্ট সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে পরিচালিত সংগ্রামে অংশীদার হতে হবে।

ইতিহাসের প্রগতিতে অবদান রাখার জন্য নম্র আরও নানা পন্থা-ক্ষেত্রের কথাও অনেকে বলেছেন। যেমন: বিজ্ঞান বা শিল্পকলা ইত্যাদি সাধনা, অধিকতর ভাল ও ন্যায্য সমাজ গঠনমূলক ক্রিয়াকাণ্ড, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষার বিস্তার, পরিবেশ সংরক্ষণ ইত্যাদি। মোট কথা, প্রগতির মধ্যে জীবনের অর্থ সন্ধানী তাত্ত্বিকদের সাধারণ দাবী হচ্ছে, কেবলমাত্র ইতিহাসের প্রগতিতে তথা উন্নততর সভ্যতা তৈরির কাজে কোনো না কোনোভাবে ভূমিকা রাখাই ব্যক্তির জীবনকে অর্থপূর্ণ করতে পারে; এর বাইরে জীবনের আর কোনো অর্থের সম্ভাবনা নেই। কিন্তু তাদের এরূপ দাবীর পেছনে কয়েকটি পূর্বতঃ গৃহীত সিদ্ধান্ত রয়েছে: ১. ইতিহাস সত্যিই প্রগতিশীল, ২. প্রগতির একটি বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্য রয়েছে এবং ৩. এ লক্ষ্যটি ভাল বলে সর্বজন কর্তৃক আদৃত।

কিন্তু গুরুতর প্রশ্ন থেকেই যায়। আসলেই কি আমারা প্রগতির পানে ছুটে চলেছি? সত্যিই কি আমরা আগের যেকোনো কালের চেয়ে অধিকতর ভাল, সুখকর, শোষণমুক্ত, স্বাধীন জীবনের অধিকারী হয়েছি? আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন কি মানুষ মারণাস্ত্র তৈরি ও ব্যবহারে অনেক বেশী মেধা, শ্রম ও সম্পদ নিয়োগ করছে না? অনাহার, রোগ, নিরাপত্তাহীনতার দীর্ঘস্থায়ী রূপ দেখে অবাক বিস্ময়ে আফ্রিকার অনেক মানুষ কি ক্লান্ত, শ্রান্ত হয়ে পড়েনি? যদি ধরেও নেয়া যায় যে, প্রগতির এসব লক্ষ্য ভাল ও কাঙ্ক্ষিত, তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, সে লক্ষ্য অর্জন করা বাস্তবিকই কী সম্ভব হবে? আর হলেই বা কী হবে? হেগেলের স্বাধীনতা নিজ থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ লক্ষ্য নয়। সে স্বাধীনতা ব্যক্তির জন্য অন্য কোনো কিছু অর্জনের প্রয়োজনীয় পূর্ব অবস্থা হতে পারে। তাহলে সেই ‘অন্য কিছু’টা কী? এর সাথে সেই ব্যক্তির জীবনের অর্থের কোনো সম্পর্ক আছে কি? অর্থনৈতিক শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা কি একান্ত আবশ্যক? বা এর প্রতিষ্ঠা কি আদৌ সম্ভব?

আরেকটি গুরুতর প্রশ্ন হলো, প্রগতির এই ধারা যখন তার লক্ষ্যে উপনীত হবে, তখন থেকে পরবর্তী ব্যক্তিদের পক্ষে প্রগতির জন্য সংগ্রাম বা তাতে ভূমিকা রাখার কোনো সুযোগ যেহেতু আর থাকবে না, সেহেতু সেসব ব্যক্তির জীবনের অর্থ কোথা থেকে আসবে? বলা হয়ে থাকে, সেই আদর্শ কালে সমাপ্তি ঘটবে ইতিহাসের। অন্যদিকে, মার্কিন চিন্তাবিদ ফুকিয়ামা’র মতে, ইতোমধ্যেই আমরা প্রগতির শেষ ধাপে পা রেখে ফেলেছি। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানুষে মানুষে প্রভু-দাস সম্পর্কের বিলুপ্তি, উদারনীতি, সাম্য ইত্যাদি ধারণাগুলো সার্বজনীনভাবে গৃহীত হবার পর চিন্তার জগতে আর নতুন ধারণার আবির্ভাবের কোনো অবকাশ নেই।

নাকি ইতিহাসের প্রগতি অনন্তকাল ধরেই চলবে? এক অর্জন-অসম্ভব লক্ষ্যের দিকেই মানবজাতি এগুতে থাকবে প্রগতির সুবিশাল ভার ব্যক্তির কাঁধে অর্পণ করে? তবে আমরা এখনও সাধারণত বিশ্বাস করে থাকি যে, ইতিহাস কোনো না কোনো অর্থে অগ্রসর হচ্ছে। ইতিহাসবিদ চার্লস ভ্যান ডোরেন যুক্তি দেন আমাদের জীবনে শান্তি, সাম্য বা মর্যাদা থাক আর না-ই থাক, মানুষের জ্ঞানের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে। বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা আগের যে কোনো কালের চেয়ে বেশী জেনেছি। এবং বিশেষ করে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বিকাশ এখনও অনেক সম্ভাবনাসহ অগ্রসর হচ্ছে, ইত্যাদি।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে, সার্বিকভাবে মানবজাতির প্রগতিতে ব্যক্তিবিশেষ কর্তৃক এই বিপুল ভার বহনের বিপরীতে ব্যক্তির অর্জন কী? ভবিষ্যতে রূপায়িত হবে এমন আদর্শ অবস্থা অতীতের ব্যক্তির কাছে মূল্যবান হবার যুক্তি কী? কেবলই ধরে নেয়া এই সার্থকতার ধারণা? মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ব্যক্তি ধ্বংস হয়ে যায় বলে ধারণা করা গেলে, ব্যক্তির পক্ষে বিকশিত ভবিষ্যৎ থেকে কী অর্জিত হওয়া সম্ভব? ভাবীকালের মানুষের স্বীকৃতি বা প্রশংসা তার তখন তার কোন কাজে আসবে? প্রগতির মধ্যে ব্যক্তিজীবনের অর্থ নিরূপণের তত্ত্বে সার্বিকভাবে মানবজাতিকে প্রধান সত্ত্বা হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছে এবং ব্যক্তি সেই সত্ত্বার অংশে পর্যবসিত হয়েছে। এভাবে ইতিহাসের প্রগতিতে অবদানের মধ্যে খুঁজলে মানবজাতির অধিকাংশ ব্যক্তির পক্ষেই তার জীবনের কোনো অর্থ পাওয়া সম্ভব নয়।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি