ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

সময় সবার জন্য প্রতীক্ষায় থাকলেও কারও জন্যই অপেক্ষা করে না। শৈশব যায়, কৈশোর যায়, যায় যৌবন; একসময় কেটে যায় বার্ধক্যও। প্রতীক্ষায় থাকে বলে একটার পর একটা আসে, ক্রম বদলায় না। আর অপেক্ষা করে না বলে সবই একের পর এক, একসময় পার হয়ে যায়। সময় সদাই আশায় আশায় থাকে—হয়তো এবার আমি বদলাবো। কিন্তু বদলাই আর না-ই বদলাই, এক মুহূর্তের জন্যও চলা সে বন্ধ করে না। মায়ের কোল থেকে মাটির কবর। একটা নগণ্য ইতিহাস।

শৈশবের একটা ছোট্ট অংশ কেটেছে কুষ্টিয়ায়। চৌরহাসের মোড় থেকে হাউজিংয়ে যাওয়ার পথের মাঝামাঝি একটা জায়গায় হাতের বাঁ’দিকে দুটো একতলা বিল্ডিং ছিল। তাদেরই একটায় থাকতাম আমরা। সড়কটা ছিল অনেক উঁচু এবং কাঁচা—ধুলো ওড়ানো। ওপথে নাকি আগে রেললাইন ছিল। এ সড়কটা আমার স্মৃতির দুনিয়ায় নিত্যদিনের যাওয়া-আসার প্রথম সড়ক। পাড়ার সব ছেলেমেয়েরা সকালে একসাথে হেসে-খেলে হেঁটে-নেচে নিত্য হাউজিং স্কুলে যেতাম মাইল খানেক পথ পাড়ি দিয়ে। উঁচু সেই পথের ধারের ঝোপঝাড়ের ফুল বা ফড়িং—কোনোটারই রেহায় ছিল না, প্রাণের আনন্দে মাতোয়ারা শিশুদের হাত থেকে।

বাসার সাথে একদম লাগোয়া একটা বিল ছিল, যেটায় ছিপ দিয়ে মাছ ধরা ছিল নেশার মতো। বাসা থেকে একটু দূরে ছিল সেচের জন্য কাটা একটা প্রশস্ত খাল। লোকেরা খাল না বলে বলতো ক্যানাল। বড়দের কাছে খাল হোক কি ক্যানাল, আমাদের শিশুমনে সেটা ছিল নদী। নদীর ওপার ছিল আমাদের কাছে বন্য কল্পলোক—কী আছে ওখানে? প্রায়ই বাবার সাথে, বন্ধুদের সাথে দল বেঁধে গোসল করতে যাওয়া হতো। সেকালের বাবাদের সাহস ছিল। সাঁতার না জানা শিশু সন্তানগুলোকে তারা কোন সাহসে যে পানিতে ছেড়ে দিতেন! আজ আমি পানি দেখলেই কন্যাকে সাত হাত দূরে সরিয়ে রাখি আর পঁই পঁই করে বলি, খবরদার!

ভবনটা ছিল দেয়ালঘেরা সরকারি একটা বিশাল জমির এক কোনায়। বিলটা বাদ দিলে জমির বাকীটায় ছিল ইটের স্ট্যাক আর নাম না জানা নানা জাতের ছোট-বড় সব জংলী গাছ। জঙ্গলের ভেতরটা আমাদের কল্পনায় ছিল ভৌতিক এক রহস্যময় জগত। গাছগুলোর ভেতর লুকিয়ে বাস করতো সরব ঘুঘুরা। আর গাছদের মাথায় দল বেঁধে উড়ে এসে জুড়ে বসতো নীরব বকের দল। ঘুঘুর ডাক ছিল কানের পরিতৃপ্তি আর বকদের দৃশ্য ছিল চোখের বিস্ময়। শিশুদের চোখে ঘুঘুরা কী সুন্দর, বকেরা কী অভিজাত! বড় হলেই বুঝি মানুষ অমন সুন্দরের মাঝে চালাকি আর অমন আভিজাত্যের ভেতর কপট তপস্যার সন্ধান পায়! নাকি বড়দের কাছে সবকিছুই দর্পণ, সবতাতে কেবল নিজেকেই দেখতে পায়?

তারপর যে-ক’টা বছর গ্রামে কাটিয়েছি, সেকালটাই বোধ হয় জীবনের সেরা সময়। লগি বা বৈঠা—কোনটাতেই হাত কাঁচা ছিল না। আমাদের দেশে লগিকে বলে ছইড় (‘ছ’টা ‘যাইতাসে’র ‘স’র মতো করে উচ্চারিত)। ছোট কোষা নৌকা ছইড় দিয়েই চালাতো লোকেরা। রাতের আঁধারে নিজ হাতে লগি ঠেলে নৌকা ভ্রমণেরও একটা বিশেষত্ব ছিল। হালকা গা ছমছম ভাবের সাথে চারপাশের আবছা ছায়ার মতো গাছ-ঝোপগুলোর কায়া ও জলের শব্দ মিলেমিশে অদ্ভুত এক ভাল লাগার অনুভূতি। লতাপাতার ফাঁক গলে হঠাৎ হঠাৎ হারিকেনের আলোর ক্ষীণ রশ্মি চোখে এসে পড়তো। আর গৃহস্থদের হাঁকডাকে মনে হতো নিরবচ্ছিন্ন এক কুটুম্বীর ভেতর দিয়ে চলছি যে চলছিই।

আজ জীবনের এই শেষার্ধে পা দিয়েও ঠিক বুঝতে পারি, সময় শেষ হয়ে যায়নি। সে প্রতীক্ষায় আছে, হয়তো বদলাবো। কিন্তু বদলের আশা, বদলের ইচ্ছা মানুষকে বদলায় না। এই কঠিন আধেকটাতেও সামনের দিকে নজর পড়ে না। স্মৃতিগুলোই কেবল চোখের সামনে উড়ে বেড়ায়, ফানুসের মতো, ভেসে বেড়ায় মেঘের মতো। সময়-ঘড়ি চলতেই থাকে একরোখাভাবে একদিকে। জানি সে অপেক্ষা করবে না। তবুও মনের আকুতি কেবলই উল্টো দিকে ফিরে যাওয়ার জন্য। আহা! ঘড়ির কাঁটা যদি উল্টানো যেতো! সব যদি আবার নতুন করে করা যেত!

 

 

ব্লগটা একসময় চনমনে হয়ে ওঠে। তারপর আবার ঝিমিয়ে পড়ে। ঢেউয়ের মতো। পর্যাবৃত্তি। একটা কিছু ঘটলে হৈচৈ। তারপর থিতিয়ে যাওয়া। যেন ঢোলে বাড়ি, তো নাচো; সব শান্ত, তো ঘুমাও। ক্ষোভ? হতাশা? অনিশ্চয়তা? শঙ্কা? যা ইচ্ছে তা-ই হোক—আমার কী? এসবই কি আমাদেরকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে?

সকালের সোনালী আভা। বিকেলের সোনালী রোদ্দুর। মনের সোনালী ভাব।—কোনোটাই বেশীক্ষণ থাকে না। সব প্রাণান্ত পরিশ্রম হতাশায় গিয়ে ঠেকুক না। না হয় কোনো পথই স্বপ্নের দেশে না-ই বা গিয়ে মিশলো। তবুও ইচ্ছেটা হোক সুবর্ণ হৃদয়ে ব্লগে মেতে থাকাটা। না থেকে যাবেন কোথায়? এখানে যারা আসেন একরাশ স্বপ্ন নিয়ে, ফেসবুক বা ভিডিও গেইম তাদের জন্য যথেষ্ট নয়।

 

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি