ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

noiseতেলাপোকা দেখলে বউ-কন্যার মতো ভয়ে ছোটাছুটি করতে শুরু করি না—আমি এমন বাহাদুর। তবে আমার শব্দভীতি আছে। আঙুল দিয়ে কেউ দেয়াল খামচাচ্ছে ভাবতেই নখের খনখনে শব্দ কানে ভাসে, গা আমার কেমন যেন রি রি করে উঠে। বেলুন আমার দু’চক্ষের বিষ। মশা মারার র‍্যাকেট দিয়ে মশা মারতে গেলেও আমার বুক দুরু দুরু করে, ওতে চিট চিট শব্দ হয় তাই। বউ-কন্যার হাসাহাসি দেখে জিদ করে বুক ভরে বাতাস টেনে মেডিটেশন করে মশক-বধের চেষ্টার ত্রুটি করিনি। কিন্তু সুফল কিছু পাইনি শেষ তক। যতবারই র‍্যাকেটটা হাঁকিয়েছি ততবারই প্রার্থনা করেছি, মশা যেন একটাও না লাগে। আর লাগলেই কেঁপে কেঁপে উঠেছি। বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গে আমার ভয় হয় না, ভয়ে মরি স্পার্কের শব্দে। ফুটফাট শব্দের আশঙ্কায় সামান্য মোবাইল ফোনের চার্জারটাকেও লাইভ সকেটে প্লাগ-ইন করতে আমার ঝামেলা হয়। ই.এইচ.টি (এক্সট্রা হাই টেনশন) ইউনিটটাকে কোনোদিনই নিজ হাতে টিউন করতে পারিনি। সেটা বাদে মস্ত যন্ত্রটার সমস্ত গা দেদারসে হাতিয়ে ঠিকঠাক করে আপদটাকে সহকর্মীদের ঘাড়ে চাপিয়ে আমি শেল্টার থেকে বেরিয়ে যেতাম। তাই দেখে তারাও কত যে মিটমিটিয়ে হেসেছে!

lightningবজ্রের বিকট শব্দ বয়ে আনে বজ্রাঘাতে না মরার সুসংবাদ—এ যাত্রা বেঁচে গেলে বাপু; যার গায়ে পড়ে, শোনার সুযোগ তার ঘটে জোটে না। বজ্রের শব্দে অহেতুক ভয়ে মরার জোগার হলেও, ভূমিকম্পের বেলায় আমার হাবভাব যুক্তিছাড়াভাবে দুঃসাহসীর মতো। কাঁপন যখন ধরেই গেছে আর দৌড়ে লাভ কী! ক’কদমই বা যাব? এর মধ্যে তো থেমেই যাবে; হয় কিছুই হবে না, নয়তো পথেই সাবাড়। ভূমিকম্পে মানুষের ছুটতে শুরু করার ব্যাপারটা আমার কাছে আজও বিস্ময় হয়ে আছে। তেলাপোকার মতো ভূমিকম্পও আমার মনে ভয় ধরাতে পারে না বলে আমার দেমাগেরও শেষ নেই। এ থেকে আপনি সঙ্গত কারণেই ধারণা করতে পারেন যে, আমি একাধারে ভীতুর ডিম এবং প্রকাণ্ড একটা অবিবেচক। ভীতুরাই সামান্য শব্দের সম্ভাবনায় ভয়ে মরে। আর অবিবেচেক না হলে কেউ কি ভূমিকম্পকে বুড়ো আঙুল দেখায়? ছোটাছুটি না কর, বউ-বাচ্চা নিয়ে অন্তত ঘর থেকে বের হয়ে কিছুক্ষণ রাস্তায় কাটাও; আফটারঅল, আফটার-শক বলে তো একটা ব্যাপার আছে।

gunবিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এক বিকেলে হোস্টেলে ঘুমে বেঘোর ছিলাম। শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। উঠে দেখি রুমে কেউ নেই, শুনি বাইরে বেজায় হৈ চৈ। এক জোড়া চপ্পলের একটা পড়ে আছে ঘরের মধ্যখানে আরেকটা দরজার ওপারে। লম্বা বারান্দাটায় গিয়ে দেখি ভাইয়েরা সব রাস্তায়, পুকুরপাড়ে। আশির দশকের বিরাশির পরের ঘটনা। তখন সময়টা ছিল গোলাগুলির। বন্দুক-পিস্তল নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার সাহসীরা হামলে পড়েছে নাকি গড়ে তোলা বর্তমানকে বিধ্বস্ত করতে ভূমিকম্প এসেছিল নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। একদৌড়ে দৃষ্টির ত্রিসীমা না পেরিয়ে সবাই পুকুরপাড় তক মোটে গিয়ে জড়ো হয়ে খলবল করছে। দেখে হামলার হিসাবও মেলাতে পারছিলাম না। আমার নাম ধরে আমার প্রিয় বড়ভাইয়ের ডাকাডাকিও আমার কানে আসছিল। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করে জানা গেল ভূমিকম্পের কথা। কোমর-সমান উঁচু দেয়ালে নিশ্চিন্তভাবে দু’কনুই রেখে প্রশ্ন করেছিলাম, তা বড়ভাই, ফেলে রেখে দৌড় দিলেন যে? তিনি আমাকে খুবই আদর করতেন। পাল্টা ধমকে উঠলেন, আরে ইবলিস, তাড়াতাড়ি নাম্, নাইম্যা কতা ক।

earthআমাদের দেশে নিজের ভারেই ভবন ধসে যাওয়ার ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। ভূমিকম্প ছাড়াই মিনিয়েচার বা স্মল-স্কেল ভূমিকম্প-দশা আমাদেরকে দেশান্তরেও দেখতে হয়। ভয়াবহ ভূমিকম্পের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা-কল্পনায় বিভোর মানবজাতির মধ্যে যারা অতিশয় ভাল তাদের দ্বারা আকাশ থেকে ফেলা বোমার ঘাতে, এবং যারা জঘন্যভাবে মন্দ তাদের দ্বারা গাড়ি-বাহিত বোমার তোড়ে এখনও ভবন ধসে পড়ছে বেশুমার। দেশের খাতিরে প্রেমে মাতোয়ারা বড় বড় সব বিজ্ঞানীরা আশ্চর্য উদাসীনতায় নতুন নতুন বোমা তৈরি থেকে ক্ষান্ত না হলেও তাদের বিজ্ঞান-মাত্রেয় অন্য ভাইয়েরা ভূমিকম্পের পূর্বাভাসের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছেন নিরন্তর। পড়শির গাছের আমগুলো অংকে-বকলম যে দামাল ছেলেরা দখলে নেবার পর গুণেও দেখতে পারে না, তারাও বোধ করি অংক না কষেই বলে দেবে মানুষের ধাক্কায় যত মানুষ মরেছে আর প্রকৃতির ধাক্কায় মরেছে যত মানুষ—দুটোর মধ্যে কোনটা সংখ্যায় বড়।

hairব্লগার কাজী শহীদ শওকতের ভাষা পেলে ভূমিকম্পও যেন প্রাণ খুঁজে পায়। তার “যদি আরও জোরে কাঁপে মাটি, যদি জেগে না উঠি” লেখাটা পড়তে গিয়ে নানা কথা মনে আসছিল। আসলেই তো! ভূমিকম্পের মর্মভেদী চিত্রের কতটুকু পাওয়া যায় কবিদের কবিতায়? কবিরা নারীর সার-কা-বাল, বাল-কা-ধাক্কায় দিল-কা-হাল নিয়ে কত যে ছবি এঁকেছেন! বাস্তব কষ্টের চেয়ে রোমান্সের গুরুত্বই বুঝি কবিদের কাছে বেশী। গল্পগুচ্ছের শুরুটাও আছে ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ দিয়ে। কিন্তু ধসে পড়া ভবনে পাষাণের পিপাসার চোট যে কত—তা কি কেউ পরিমাপ করেছে? পাষাণের ক্ষুধার শিকার হওয়া মানুষের রক্ত-মাংসের দেহের চিত্র আলোকচিত্রকরদের কাছ থেকে আমরা পাই। দেখে নিজ নিজ ভাবনা অনুসারে আমরা নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করি। কিন্তু মনের চিত্রটা তীব্রভাবে, তীক্ষ্নভাবে এঁকে দিতে পারতো কেবল কবিরা, গল্পকারেরা। ক্ষুধিত পাষাণের শিকার রক্ত-মাংসের মানুষের মনের সে চিত্র কোথাও কি আছে?

trinity2“যদি আরও জোরে কাঁপে মাটি, যদি জেগে না উঠি”—এমন কাব্যিক সম্ভাবনায় মন যেন ততটা কেঁপে ওঠে না। সেই বিকেলের ঘটনাটা মনে ভেসে ওঠে। যদি জেগে উঠি, যদি জেগে দেখি, একটা পা ফেঁসে গেছে কনক্রিটে, রড একটা পেট দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। গদ্যময় এমন সময়ে কি ম্যাট্রিক্সের ট্রিনিটির মতো প্রশান্ত থাকতে পারবো? ধরুন, ফোনটা নাগালেই আছে, মা’র সাথে কথা বলছি। পাশে নিষ্পাপ চোখে চেয়ে থাকা, পড়ে থাকা… কল্পনায় যে-পথে আর যেতে পারি না, অন্তরের ভেতর নিজেরই আর্তনাদ শুনি। তিলে তিলে নিজের মরে যাওয়াও সহ্য হয়, কিন্তু সব কিছুই কি সেভাবে সহনীয়? মনে করুন, ছাদটা ফেটে কাত হয়ে আছে। ফাঁক দিয়ে বিকেলের নীল আকাশটাও স্পষ্ট দৃশ্যমান। একসময় রাত হবে। চারপাশ অন্ধকার। জেগে আছি। ভোরের প্রতীক্ষায় সময়ের গতি তখন কত হতে পারে?

earth2ভূমিকম্পের সাথে মিশেছে রড ঠেসে কনক্রিটের ভবন নির্মাণে আমাদের সামর্থ্য। এই মিশেলটা আমাদের অস্তিত্বভাবনার আরও বড় উৎস ও উপাদান হয়ে উঠেছে। আমরা সাধারণত পরিসংখ্যানগত সম্ভাবনার হিসেবের জোরে বেখেয়াল থাকি। প্রত্যেকের বেলায়ই সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। কিন্তু যার বেলায় ঘটে তার কাছে এই ক্ষীণতার কোনো গুরুত্ব আর থাকে না; ০০১ বা তারও চেয়ে অনেক অনেক কম আর ১০০ তখন সমান সমান। প্রজাতির ভাবনা আমাদের নিজকে ভুলিয়ে রাখে। লাখে একজন মরলে বিশ্বমানবের কী বা আসে যায়! মোটে একজনের কথা ভেবে, সেখানে নিজেকে বা নিরানব্বই জনকে বসিয়ে দিয়ে সবাইকে মুখ গোমরা কেন করতে হবে? তবুও ইচ্ছে হয়, সাধ হয়। যদি বড় কবি হতে পারতাম! হতে পারতাম যদি বড় গল্পকার! শব্দের পর শব্দ দিয়ে এমন ছবি এঁকে দিয়ে যেতাম, পড়লে তোমাদের গা শিওরে উঠতো।

likeভূমিকম্প প্রসঙ্গে আমাদের কালের আরেকটি ফেনোমেনন মাথায় ঘুরপাক খায়। বিনোদনের এই যমানায় আমরা সবকিছুকেই লাইক/ডিসলাইক-এ ফেলে দিয়ে বসে থাকি। ভূমিকম্পের মর্মবিদারী ছবি দেখে তাতে লাইক দিতে গেলে কেমন দেখায়? ডিসলাইকেরই বা কী মানে দাঁড়ায়? সেকালে লোকে বলতো, আই থিংক, দেয়ারফর আই এ্যাম।* এখন কি বলতে হবে, আই লাইক, দেয়ারফর আই এ্যাম? কিন্তু প্রথম কথাটিই কি খুব সত্য? পছন্দের কথা বাদই দিলাম, শুধু চিন্তার মাঝেই কি জীবনের সার্থকতা? নাকি, যে ক্রমাগত বদলায়, সেই আছে—কথাটা আরও বড় সত্য? আমি চরকিতে চড়ে মনের আনন্দে একই বৃত্তে ঘুরছি তো ঘুরছিই, কাজেই আমি নেই। যদি হতে পারতাম পাহাড় বেয়ে উপরে ওঠার অভিযাত্রী, তবেই আমি থাকতে পারতাম।


* দেকার্তের “আই থিংক, দেয়ারফর আই এম” কথাটা “সার্থকতার” সাথে সম্পর্কিত নয়। সেটা ছিল অস্তিত্বের নিশ্চয়তা সম্পর্কিত—সব সন্দেহ সত্ত্বেও সন্দেহ-ক্রিয়াটার কারণে সন্দেহকারী তথা চিন্তাকারীর অস্তিত্বের সন্দেহাতীত প্রতীতি পাওয়া যায়। আমার লেখাটায় অর্থ-ভিন্নতা ঘটেছে।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি