ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

১। গাছ-প্রাণী

১.১। গাছেরা গাছত্ব ও বিড়ালেরা বিড়ালত্ব নিয়েই জন্মায়। অর্থাৎ তারা জন্মায় পূর্ণত্বের আবশ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে। যদি প্রতিবেশ প্রতিকূল হয়, তবেই কেবল তারা অপূর্ণ থেকে যায়। আপনি গাছের যত্ন নিন, জল দিন, সার দিন—গাছ গাছ হয়ে উঠবে। প্রাণীদের বেলাতেও একই নিয়ম। দার্শনিক প্লেটোর সার্বিকেরা যদি সত্যিই কোনো বাস্তব জগতে অবস্থান করে থাকে, তবে বিশেষ গোলাপ গাছগুলো বা বিশেষ বিড়ালগুলো সেই সার্বিকের প্যাটার্ন অনুযায়ী সহজেই পূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ গাছেরা ও প্রাণীরা শূন্য অবস্থায় জন্মায় না।

২। মানুষ

২.১। মানুষের বেলায় ব্যাপারটি ভিন্ন। মানুষের সাথে মনুষ্যত্বের সম্পর্ক গাছেদের ও প্রাণীদের অবস্থা থেকে স্বতন্ত্র। মানুষকে খেতে পরতে দিলেই মানুষ আবশ্যিকভাবেই মনুষ্যত্ব অর্জন করে না। মানুষ নিষ্পাপ হয়ে জন্মালেও শুভ-সুন্দর জীবন সহজে অর্জিতব্য নয়। মানুষ প্রকৃতিগত সম্ভাবনা ও কাঠামোর দিক থেকে বিস্ময়কর ভাবে বিশাল ও সুন্দর একটি ছাঁচ নিয়ে জন্মায় বটে, কিন্তু আচরণের প্যাটার্নের দিক থেকে জন্মায় শূন্য অবস্থায়। (এ প্রসঙ্গে দেখুন কোরান ৯৫:৪-৫)

৩। আদর্শ

৩.১। তাহলে বড় হওয়ার সাথে সাথে মানুষ নিজেকে গড়ে তোলে কিভাবে? তার আচরণ নিয়ন্ত্রিত বা পরিচালিত হয় কিসের দ্বারা? এটি হয় আদর্শের আশ্রয়ে। মানুষের আদর্শের প্রয়োজন—কেবল তা-ই নয়, আদর্শ ছাড়া সে চলতেই পারে না—এমনকি আদর্শহীনতা নিজেই একটি আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ প্রকৃতির উপর জন্মায় এবং আদর্শ তাকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। কোরানে ‘ফিতরাত’ শব্দটি দ্বারা প্রকৃতিকে এবং ‘দীন’ শব্দটি দ্বারা আদর্শকে বোঝানো হয়েছে। আবার আদর্শানুসরণজাত অর্জন বা কর্মফল বা পরিণতি বুঝাতেও একই শব্দ ‘দীন’ ব্যবহৃত হয়েছে।

৪। আদর্শের উৎস

৪.১। আদর্শ আসে বাইরে থেকে। মানুষ আদর্শ তৈরি করে, বাছাই করে ও নিজের উপর আরোপ করে। মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আদর্শ-সংশ্লিষ্ট একটি শর্ত রয়েছে; আর তা হলো, আদর্শের ব্যাপারে সত্যনিষ্ঠ হতে হলে মানুষকে সর্বদা সচেতনভাবে ও বিচারশীলভাবে নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে হয় আদর্শের ভিত্তিতে।

৫। আদর্শের পরিসর ও পূর্ণাঙ্গতা

৫.১। আদর্শ পূর্ণাঙ্গ হওয়া বাঞ্ছনীয়। জীবন যতটা বিস্তৃত, আদর্শকে হতে হবে ততখানি প্রসারিত। চিন্তা ও কর্মের পুরো পরিসরকে আদর্শ যদি আলোচনার আওতায় না আনতে পারে তবে দর্শনসম্মত ও যুক্তিসম্মত একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ রচনা সম্ভব হয় না। আদর্শ যদি অপূর্ণাঙ্গ হয় তবে আদর্শানুসারীকে সে অভাব পূরণ করতে হয় বাসনা, ঐতিহ্য ও পরস্পর বিরুদ্ধ শিক্ষা থেকে প্রসূত নির্দেশনার দ্বারা। এতে জীবন সঙ্গতি বর্জিত হয়ে উঠার সম্ভাবনাই বেশী।

৫.২। অপূর্ণাঙ্গ আদর্শ অপূর্ণ মানুষ তৈরি করে। আদর্শের অপূর্ণতা যেহেতু প্রকৃতিকে সীমিত করে না তাই বাস্তব জীবনে সে তার অনুসারীকে ঠেলে দেয় অন্ধকারের দিকে এবং অনুসারী পথের দিশা না পেয়ে বিচিত্র সব আচরণে লিপ্ত হয়। এতে তার জীবনের তাল নষ্ট হয় ও সে চরিত্রগত তারল্যের মধ্যে নিমজ্জিত হয়।

৬। যৌক্তিক ও নৈতিক সঙ্গতি

৬.১। আদর্শের হওয়া দরকার ইউক্লিডীয় জ্যামিতির মত যৌক্তিকভাবে সুসঙ্গত একটি ভবন। এর প্রাথমিক বিশ্বাসগুলো হতে হবে বুদ্ধিসম্মত; বুদ্ধির সাথে এর বিরোধ থাকলে আদর্শ দাঁড়াতেই পারবে না।

৬.২। আবার তা হতে হবে এমন যে, তা মানুষের নৈতিক আকাঙ্ক্ষা পরিপূরণে সফল হতে পারে। নৈতিকতার অপরিহার্যতাই মানুষকে আদর্শ অন্বেষণের দিকে নিয়ে যায়। আদর্শের অভাব বা অসুস্থ আদর্শ থেকে তৈরি হয় নৈতিকতার সংকট।

৭। আদর্শ ও প্রকৃতি

৭.১। আমরা ২.১ ও ৩.১ অনুচ্ছেদে দেখেছি মানুষের সাথে তার প্রকৃতি ও বেছে নেয়া আদর্শের সম্পর্ক। যদি প্রকৃতির সাথে আদর্শের অসঙ্গতি থাকে বা বিরোধ থাকে তবে সে আদর্শ অনুসরণ পীড়নমূলক হয়ে উঠবে—এ পীড়ন যেমন নিজের উপর হতে পারে তেমনই অন্যের উপর প্রযুক্ত হতে পারে আদর্শানুসারীর সামাজিক ক্রিয়াকলাপের ফল হিসেবে।

৮। আদর্শের উৎসের ঐক্য

৮.১। আদর্শ যেহেতু প্রকৃতির বাইরে থেকে আসে এবং আদর্শের উৎসের যেহেতু আধিক্য আছে সেহেতু আদর্শের উৎস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয় হয়ে উঠে। আদর্শের উৎস এক হওয়া দরকার, তা না হলে অসঙ্গতি আসে। আদর্শের উৎস যদি হয় স্বয়ং প্রকৃতির উৎস, তবেই কেবল, অন্ততঃ তাত্ত্বিকভাবে তো অবশ্যই, উপযোগী, উপকারী ও সুসমঞ্জস আদর্শ সম্ভব। (এ প্রসঙ্গে দেখুন কোরান ৩:৮৩, ৩০:৩০ ও ৩০:৪০)

৯। পূর্ণাঙ্গ আদর্শের বৈশিষ্ট্যগুলো

৯.১। একটি পূর্ণাঙ্গ ও সর্বাঙ্গ-সুন্দর আদর্শ সংক্রান্তে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
ক) উৎসের একত্ব,
খ) জ্যামিতিক-যৌক্তিক সঙ্গতি,
গ) জীবনের ব্যাপ্তি জুড়ে বিস্তৃতি,
ঘ) নীতি ও অনুজ্ঞাগুলো বোধের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও পথ নির্দেশনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত,
ঙ) আদর্শের লিখিত রূপ,
চ) আদর্শ রূপায়নের সুন্দর নজীরমূলক একক পুরুষ ও একটি নমুনামূলক সমাজ।

১০। আদর্শ অনুসারীর সাফল্যের শর্ত

১০.১। আদর্শের অনুসারীর মৃত্যু ঘটে যখন সে নিষ্ঠার সাথে আদর্শ অনুসরণ না করে বরং আদর্শের উপাসনায় লিপ্ত হয়। এরূপ উপাসনা বিকৃত উপাসনা। এই বিকৃত রূপের উপাসনা হলো পার্ট-টাইম বন্দনামূলক বা ভক্তিমূলক ক্রিয়াকলাপ, যেখানে নিজের আদর্শ নিয়ে একটি আত্মপ্রসাদ বা আত্মতুষ্টি প্রাধান্য পায় কিন্তু সেই আদর্শের সাথে আদর্শ অনুসারীর জীবন-ব্যাপী ঘনিষ্ঠ ও সক্রিয় সম্পর্ক থাকে না। (এ প্রসঙ্গে দেখুন কোরান ৩০:৩২)

১০.২। অন্যদিকে একটি জ্যামিতিকভাবে সংহত আদর্শের যথার্থ অনুসারী এমন হয় যে, এমনকি সেই আদর্শের বিরোধী কিন্তু বুদ্ধিমান ও চিন্তাশীল এবং সে আদর্শ সম্বন্ধে সম্যক অবহিত ব্যক্তিও আদর্শানুসারী ব্যক্তির আচরণ প্রেডিক্ট করতে পারে। অর্থাৎ কোন অবস্থায় একজন অনুসারী কী আচরণ করবে তা আগাম বলা যাবে। বর্তমান বাস্তব অবস্থার সব ফ্যাক্টর ও প্যারামিটার থেকে শত্রুও প্রেডিক্ট করতে পারবে একজনের পরবর্তী আচরণটি কী হবে।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী