ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

১.
পরের জাত তো পরের জাত। তো জাত তুলে গাল দিলে কী হয়? নাহ! আপাতত কিছুই হয় না। কাজেই দিন না, ভাল করেই দিন, যত পারেন দিন। কিন্তু ফ্যাকরা বাঁধবে আখেরে। আর ফকিরের কথা ততদিনে বাঁশি হয়ে পঁচবে। নিজের জাত নিয়ে তামাশা করা, নিজের জাতের জাত তুলে গাল দেয়া একদিন আপনার জন্য ডালভাত হয়ে যাবে। বাশি কথায় কান দেয়ার মতো কান আপনি পা ধরে দোহাই দিয়েও, দেয়ালে মাথা ঠুকেও, জিগরি দোস্তের কাছে মিনতি করেও ধারে-কর্জেও জুটাতে পারবেন না। সবার কানই তখন গাল শোনার মহামজার ভাণ্ডে মরা মাছির মতো বুঁদ হয়ে পড়ে থাকবে। মস্তকান্তরে স্থানান্তরিত হবার ঝামেলায় গিয়ে মজা আহরণে ছেদ সে চাইবে না। কথায় কথায় মোড়লের মুখ থেকে তখন কথা বেরুবে, অই যে বলে না! হুজুগে…!— আর গাঁ শুদ্ধ রায়তের দল ‘ইয়ে বাত সহি হ্যায়’ বলে তালিয়া বাজাবে, হাসির দমকে কাঁপতে কাঁপতে লোক সব মরতে বসবে।

২.
খোঁড়াকে খোঁড়া বলতে নেই—এ নীতিকথা শিশুকালেও অনেকের কপালে জুটেছে। কিন্তু সওয়াল হচ্ছে, এ নীতিকথা শিক্ষা করে সবাই কি ‘আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে’ গীত ধরে মনের সুখে বগল বাজিয়ে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেছে? মনে হয় না। হাঁটার সক্ষমতা যাদের কিছু কম, তারা মনের কষ্টে ভুগেছেন। ভেবেছেন, নীতিকথার নাম করে জাতশুদ্ধ সবাই আমাদেরকে নিয়ে এ কী উপহাস করছে! আমাদের সাইকির ভেতরে বসে আছে এসব নানা প্রকারের ভূত আর তা আমাদেরকে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে ইংরেজি থেকে বাংলা, ইতিহাস থেকে ভূগোল পর্যন্ত। যাদের পা নিয়ে জ্বালা নেই, তারাই পা-বিষয়ক নীতিকথা লিখেন। নিজের সম্বন্ধে যে কথা শুনলে আমরা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠি, সে কথাই পরের বেলায় আমরা অবলীলায় বলতে পারি। এই লীলাখেলা শেষতক নিজের বেলায়ও সে-কথা নিজের মুখে বলিয়ে ছাড়ে। অবচেতন তখন ভেংচি কাটার চেতন হয়, চেতন হয় মরা তেলাপোকার মতো অচেতন।

৩.
খাওয়ারিজমির কিতাবে সমীকরণ তত সোজা না হলেও আমাদের সমীকরণ বেজায় সরল। এপাশ থেকে ওপাশে নিতে নিয়ম সম্বন্ধীয় কোনো জ্ঞান লাগে না। অজ্ঞতাই এখানে সম্বল। আমার বুঝে আসলো না, তো ঝুলিয়ে না রেখে ফেলে দাও সমান চিহ্নের ওপারে। এভাবে সমানে ফেলতে থাকলে কোন সংখ্যাটা কমে, আর অহেতুক কোনটা বাড়ে তার হুঁশটাও তখন লোপ পায়। গোয়েবলসের সাগরেদরা জানেন, মিছে কথা বারবার বললে তা সত্য হয়ে যায়, যেভাবে একটা নষ্ট আম আরেকটা ভাল আমকে নষ্ট করে দেয়। আপনি আপনার পাহারাদারকে বারবার চোর বলুন। সব চোর জেলের ভাত খেয়ে ঘানি টানতে ব্যস্ত থাকলেও দেখবেন আপনার সিন্দুক উজাড়। হারে হারে জ্ঞান পাবেন, মিছে কথা বারবার বললে কিভাবে তা সত্য হয়। সত্য দরিদ্র নয়। অতএব, তা শুধু এতটুকু মাত্র নয়। উল্টোটাও সত্য। যেভাবে চুম্বক দিয়ে ঘষলে লোহাও চুম্বক হয়।

৪.
মানুষ ভাঙা হাত দেখিয়ে ভিক্ষে করে। যে ভিক্ষে করে লোকে তাকে ভিক্ষুক বলে। ভিক্ষুক ভাল হাত লুকিয়ে রাখে। ঘুম ভাঙার পর ভাঙা হাতের কথাই তার প্রথম মনে পড়ে। মানুষ ভাল হাত দিয়ে ফুলের বাগান করে। যে ফুলের বাগান করে লোকে তাকে মালি বলে। মালি ভাঙা হাত চাদরের নিচে রাখে। কাজ সহজ নয়। তাই লোকে নিড়ানির বদলে ঝোলা নিয়ে বের হয়। মানুষ দেখলেই, যত্রতত্র, গ্রামে-গঞ্জে, হাটে-বাজারে, পথে-ঘাটে, ভাঙা হাত দেখায়। সকরুণ সুরে কীর্তন শুরু হয়। হিজ মাস্টারর্স ভয়েসের ভেঙে যাওয়া রেকর্ডের মতো একই কলের গান। এতে মানুষের মন সহজেই গলে, যেভাবে জলে গলে চিনি। মালির চেয়ে তাই ভিক্ষুকের রোজগার বেশী হয়।

৫.
পারসপেকটিভ বদলালে একই বস্তুর রূপ বদলায়। প্যারাডিম শিফট করলে একই ঘটনার মূল্যায়ন দু’রকম হয়। একই পরিস্থিতিতে সাড়া ভিন্ন ভিন্ন কায়া পায়। আপনি পাখিটার কন্ডিশন দেখে বিনোদিত হতে পারেন। জাঁকিয়ে তোলার জন্য বিনোদনে অংশীদার হয়ে পাখিটার মুখে কয়েন ধরিয়ে দিতে পারেন। আপনি ধেই ধেই করে নাচতে পারেন। মনের আনন্দে গীত ধরতে পারেন। আবার পাখিওয়ালা ভিখারীকে দেখে এ জ্ঞানও কুড়োতে পারেন যে, মানুষের প্রয়োজনে মানুষ তেমন সাড়া দেয় না, কিন্তু মাঝখানে বাঁদর বা পাখিকে কন্ডিশন্ড করে নিতে পারলে, মানে এক্সপ্লয়েট করতে পারলে, বেহতর কাজ হয়।

৬.
সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, ভাবাদর্শিক এবং নৈতিক মূল্যমানগত চিন্তার রাজ্যে প্যারাডিমের মতো নচ্ছার চিজ আর নেই। যখন দেখি তখন মাঝখানের সুতোগুলোকে আমি দেখতে পাই না, দেখতে পাই না দেখার প্রক্রিয়াটাকে। একই রকমে, চিন্তা করার সময় আমি প্যারাডিমটাকেও দেখতে বা ঠাহর করতে পারি না। প্যারাডিম হচ্ছে একটা বাক্স, ভূতের বাক্স, যার ভেতরে বসে আমি মনের সুখে চিন্তা করে বেড়াই। এ ভূত হচ্ছে একাধারে ভূত-ভবিষ্যতের ভূত, ভূত-প্রেতের ভূত। খুব সম্ভব আমি বাক্সটার দেয়ালগুলোতে যা আছে তার ভাবের সুতাই শুধু টেনে লম্বা করি—যদিও আমার মনে হতেই থাকে যে, আমি এক আযাদ চিন্তামুনি। যখন চিন্তা করি তখন কি নিজের অজান্তেই আমি খালি বাক্সে বায়োস্কোপ দেখতে দেখতে বিড়বিড় করতে থাকি?

৭.
লোকে বলে, রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশী বাজাচ্ছিলেন। না হয় একবার বাজালেনই। যুগ যুগ ধরেই তো ভাতের জন্য আগুন জ্বালানো হচ্ছে আর তা থেকে রান্না হচ্ছে শিল্প। এক ঢিলে দুই পাখি। খেয়েদেয়ে হেলদি থাকা হয়, আবার বাঁশী শুনে কালচার্ড হওয়াও হয়। ভাঙা ঘরে না খেয়ে রায়তেরা খাজনা দেয়। জমিদার গড়ে প্রাসাদ আর সমাধি—আহা! কী শিল্পকলা। জমিদার খায় দায় তাইরে নাইরে না; মরে গেলেও ভূত হয়ে আর মরে না। বিলেতি পাস্ট আর ঘোস্ট তাই আমাদের ভূত আর ভূত। তাদের দুই হলেও আমাদের এক। ভূত কিভাবে ভূত হয়, জানেন কর্তা রবীন্দ্রনাথ। আপনিও চাইলে দেখা করে আসতে পারেন ‘কর্তার ভূত’-এর সাথে।

৮.
রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে কেটেছেটে নেয়া: ওরে নবীন, … ওরে সবুজ, … আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি