ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

কিছু লড়াই-বিতর্ক আছে যা আদতে প্রতীক নিয়ে বাঁধে। ওড়না এখন “রক্ষণশীলতা” ও “প্রগতিশীলতা”র প্রতীক—এভাবে নয়তো ওভাবে। ওড়না না পরা নিয়ে “মোল্লা”দের আপত্তিকে “প্রগতিশীল”রা ভাল চোখে দেখবেন না। “মোল্লা”রা ছাড়াও এদেশে অনেক “রক্ষণশীল” আছেন (আমি নিজেও রক্ষণশীল)। তারাও ওড়নাকে যেভাবে দেখেন, তাতে “মোল্লা”দের সাথে তাদের দেখার মিল রয়েছে। মেয়েরা হিজাব করা ছেড়ে দিলে অনেকেই খুশি হবেন, হিজাবের চল বাড়তে থাকলে নারীরা পেছনের দিকে যাচ্ছে বলে আক্ষেপ করবেন। আর নারী কী পরবেন, না পরবেন, তা নিয়ে নির্দেশনা দেয়ার মধ্যে ঝামেলা আছে বলে মনে করলে হিজাবটাকে ফ্যাশন প্রতিপন্ন করে জয়ের পাল্লা নিজেদের দিকে ভারী করতে চাইবেন। কারণ হিজাব ওড়নার চেয়েও আরও বেশী মাত্রায় একটা প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হাইপথেটিক্যাল চিন্তার একেবারে মূল্য নেই তা নয়। যদি পাঠ্যবইতে লেখা হতো, “ও-তে ওড়না, ওড়না গায়ে দেব না”, তবে লড়াইয়ের পক্ষ-বিপক্ষ যে একেবারে পাল্টে যেতো তা আমাকে ভগবানের নামে শপথ করে বলার প্রয়োজন হতো না। “প্রগতিশীল”রা যুক্তি দিতেন, এটা জেন্ডার-বৈষম্য বিনাশে সাহসী উচ্চারণ। আর যুক্তি উত্থাপনের সাহস দেখাতে না পারলে “মোল্লা”দের তর্জন-গর্জন দেখে মুচকি মুচকি হাসি মাত্র হেসে তৃপ্তি বোধ করতেন। কিন্তু হাইপোথেটিক্যাল চিন্তার সমস্যাও আছে। পাল্টা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়—“কে বলেছে আমরা তখন সমর্থন করতাম? তখনও আমরা এটার বিরোধিতাই করতাম।” ইত্যাদি। তবে প্রতীক নিয়ে এ-লড়াইয়ের পেছনে আদর্শের তাড়না, গোষ্ঠীগত বিবেচনা কাজ করে, যা আমার কাছে দুঃখজনক।

এ তো গেল একদিক। অন্য দিকটা হচ্ছে, বর্তমান ওড়না-সমস্যা গুরুতর রূপ নিয়েছে এ-কারণে যে, শৈশবেই জেন্ডার পার্থক্য সচেতন করে না তোলার পক্ষের যুক্তিটাকে সহজে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। সুবিধাটা এ-যাত্রা তাই স্পষ্টতই বিপক্ষওয়ালাদের। সে-কারণে যারা ওড়নার বিরোধিতা করছেন তাদের সবাইকে চোখ বুজে এক কাতারে ফেলে দিতেও পারা যাচ্ছে না। কিন্তু আতিশয্যটা আসে প্রতীকভাবনা ও আদর্শগত লড়াইয়ে মরিয়া মনোভাব থেকে। ফলে, এ নিয়ে হাঙ্গামা বহুদূর—মুক্তিযুদ্ধ, ইসলামধর্ম পর্যন্ত—গিয়ে ঠেকেছে। যারা জেন্ডার-বৈষম্য দূর করতে চান তারাও তাদের লেখাকে জেন্ডার বৈষম্যের দ্যোতনাযুক্ত কথা থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত রাখতে সবসময় পারেন কি? ভাষা, ঐতিহ্য, চিন্তার ঐতিহাসিক প্যাটার্ন—এদের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া খুবই কঠিন।

বানান ভুল নিজ থেকেই ভুল—এখানে দৃষ্টিভঙ্গির ফারাকের কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু ওড়নার বিষয়টি তা থেকে আলাদা। এখানে ভুল সংঘটিত হলেও বস্তুনিষ্ঠভাবেই ভুলটা তুলে ধরা দরকার, যুক্তি দেয়ার সময় তরল ভাষা এড়িয়ে ভাবগম্ভীর ভাষাই ব্যবহার করা প্রয়োজন এবং ঢালাওভাবে অনেক কিছুকে একসাথে গুলিয়ে ফেলা হলে বিষয়টা ভিন্ন খাতেই গিয়ে পড়বে।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি