ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

ইতিহাসের সকল কালে চিন্তার জগতে অগ্রসর ব্যক্তিগণ এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন যে, আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহের কাছে প্রতিভাত জগত, যা নিয়ে বা যার মধ্যে আমরা দৈনন্দিন কাজকর্মে লিপ্ত থাকি, সেটি আরও গভীর ও লুক্কায়িত বাস্তবতার উপরিতলগত প্রকাশ মাত্র। আর এখানেই অস্তিত্বের সাথে সম্পৃক্ত বড় বড় প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজবার পথের শুরুটা নিহিত। এর আবেদনটি এতো জোরাল যে, সব সমাজের পুরো কাঠামোটিই গড়ে উঠার ক্ষেত্রে এর প্রভাব লক্ষণীয়।

এটিও সত্য যে, সেই লুক্কায়িত বাস্তবতার অভ্যন্তরে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো কোনোভাবেই প্রবেশ করতে পারে না, ইন্দ্রিয়গুলোর আসলে সেই ছেদন ক্ষমতাই নেই; এরা শুধু বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায়—তাও আবার আত্মগত ছাপগুলোর উপরিতলে। বস্তু যতই কেটে কেটে ছোট করেন না কেন, ততই নতুন নতুন উপরিতল তৈরি হয়, অভ্যন্তরটা সব সময়ই থেকে যায় নাগালের বাইরে। অভাবটা পূরণ করার চেষ্টা করা হয় চিন্তার মাধ্যমে, তাতে কেবল এটুকুই পাওয়া যায় যে, বস্তু হয়ে উঠে যৌক্তিক সংগঠনের মত একটা কিছু—অভ্যন্তরটা সবসময়ই থেকে যাচ্ছে ইন্দ্রিয় ও চিন্তার বাইরে।

কিন্তু নাট্য মঞ্চটা যা দিয়েই গড়ে উঠুক, তা জানা যাক আর অজানাই থাকুক, নাটকটি কিন্তু কম বিস্ময়কর নয়! এখানে নাটকের মূল অভিনেতা চৈতন্য, বুদ্ধি। এই অজানা জগত একটি রূপ নিয়ে বুদ্ধির কাছে ধরা দেয়। এ ধরা দেয়া জগতের নিয়ম আছে, নিয়মের ভিতরে আরও নিয়ম আছে। নিয়মগুলো একীভূত হতে থাকে যত অগ্রসর হওয়া যায়। এই বুদ্ধি সেগুলো আবিষ্কার করতে পারে। আর এ নিয়মগুলো অপরিবর্তনীয় গাণিতিক নিয়ম।

বহুকাল আগে পিথাগোরাস বলেছিলেন, জগত আসলে সংখ্যা। আজকের পদার্থ বিজ্ঞানীরা জগতকে প্রতিকায়িত করতে সক্ষম হয়েছে গণিতের মাধ্যমে। এতে তৈরি হয়েছে এক গাণিতিক স্ক্রিপ্ট বা পাণ্ডুলিপি—এটিকে আবার জগতের সাব-টেক্সট’ও বলা হয়। এটি হচ্ছে মহাজাগতিক কোড। এটি কাজ করে চলেছে জাগতিক প্রপঞ্চের অন্তরালে।

আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, প্রকৃতির এমন একটি সূক্ষ্ম ও জটিল কোড থাকতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা যুক্তির বিচারে নেই; একই সাথে এরও কোনো আবশ্যিকতা ছিল না যে, মানুষ তা জানতে পারবে।

এই অন্তর্নিহিত পাণ্ডুলিপি এতই অবাক কারার মত যে, খোদ বিজ্ঞানীরাও হতচকিত। নাস্তিক পদার্থ বিজ্ঞানীগণও নিজেদেরকে সামলাতে পারেন না, গেয়ে উঠেন বিস্ময় বিহ্বল চিত্তে প্রশংসার সব গীতি কবিতা—জগতের রাজকীয় আড়ম্বর, সামঞ্জস্য আর নিপুণতার স্বাক্ষর এতই বেশী। প্রশ্ন উঠে: এ পাণ্ডুলিপি কে রচনা করল? নাকি অলৌকিক ভাবে এটি নিজেই নিজেকে কোনোভাবে তৈরি করেছে?

এখানে এসে ঈশ্বরের অস্তিত্ব পর্যন্ত আলোচনার বিষয় হয়ে উঠে। কিন্তু অনেক বিজ্ঞানীই ঈশ্বর পর্যন্ত যেতে রাজী নন। তারা বরং বলার চেষ্টা করেন উল্টো কথাটি: জগতকে আমরা যত বুঝতে পারছি, জগত ততই অর্থবর্জিত, উদ্দেশ্যবর্জিত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

অর্থ ও উদ্দেশ্য মনস্তাত্ত্বিক ধারণা। মানুষের ধারণাগুলোকে পদার্থ বিজ্ঞানের পরিসরে না আনার জোরালো সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু এ কথাও তো ঠিক যে, জগতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সকল প্রয়াসই মানুষের অভিজ্ঞতা ও ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত হতে বাধ্য। উদ্দেশ্য বর্জিত জগতে বিজ্ঞান চর্চার প্রয়োজনইবা কী, জগতকে বুঝবার দরকারইবা কী? আমাদের পক্ষে তো উল্টো এও বলা সম্ভব: জগত যত অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন বলে প্রতীয়মান হবে, জগত ততই দুর্বোধ্য হয়ে উঠবে।

উপরে যা লিখেছি তা Paul Davies এর The Goldilocks Enigma বইয়ের প্রথম অধ্যায় The Big Questions এর The Cosmic Code ও Is the Universe Pointless? নামক অনুচ্ছেদ দুটো অনুসরণ করে।

পল ডেভিসের নিজের ভাষায় তাঁর কিছু কথা:

Somehow the universe has engineered, not just its own awareness, but also its comprehension. Mindless, blundering atoms have conspired to make not just life, not just mind, but understanding. The evolving cosmos has spawned beings who are able not merely to watch the show, but to unravel the plot. …

Could it just be a fluke? Might the fact that the deepest level of reality has connected to a quirky natural phenomenon we call ‘the human mind’ represent nothing but a bizarre and temporary aberration in the absurd and pointless universe? Or is there an even deeper subplot at work?

এ প্রসঙ্গে কোরানের নীচের আয়াতগুলো পাঠ করে দেখুন।

3:190-191

Verily, in the creation of the heavens and the earth, and in the succession of night and day, there are indeed messages for all who are endowed with insight, and who remember God when they stand, and when they sit, and when they lie down to sleep, and thus reflect on the creation of the heavens and the earth: “O our Sustainer! Thou hast not created aught of this without meaning and purpose. Flawless and limitless art Thou in Thy glory! Keep us safe, then, from suffering through fire!

(নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃজন ক্রিয়ায়, এবং দিন রাতের অনুবর্তনে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন জনদের জন্য বার্তা রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহ সম্বন্ধে ভাবে এবং আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃজন সম্বন্ধে চিন্তা করে। তাদের কথা হলো: হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এর কোনোকিছুই অর্থবর্জিতভাবে সৃষ্টি করনি। তুমি তো সকল ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত! তুমি আমাদেরকে আগুনের যন্ত্রণা থেকে রক্ষা কর।)

21:16-17

And We have not created the heavens and the earth and all that is between them in mere idle play: for, had We willed to indulge in a pastime, We would indeed have produced it from within Ourselves—if such had been Our will at all!

(আমরা আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবীকে এবং এদের মাঝে যা আছে তা লীলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। বিনোদনের ইচ্ছা যদি আমাদের থাকতো তবে আমরা জগত আমাদের মধ্যেই সৃষ্টি করতাম—তা করার ইচ্ছা যদি আমাদের আদৌ থাকত!)

38:27-28

We have not created heaven and earth and all that is between them without meaning and purpose, as is the assumption of those who are bent on denying the truth: but then, woe from the fire unto all who are bent on denying the truth! For, would We treat those who have attained to faith and do righteous deeds in the same manner as We shall treat those who spread corruption on earth? Would We treat the God-conscious in the same manner as the wicked?

(আমরা আকাশ ও পৃথিবী এবং এদেরে মাঝে যা আছে তা অর্থবর্জিতভাবে সৃষ্টি করিনি—যেমনটি সত্যকে অস্বীকার করতে প্রবণ জনেরা অনুমান করে থাকে। পরিতাপ সত্যকে অস্বীকার করতে প্রবণ জনদের জন্য, যারা আগুনের উপযুক্ত। আমরা কি যারা আস্থাশীল ও ভাল কাজে নিয়োজিত এবং যারা পৃথিবীতে বিপর্যয়, অনাচার, অশান্তির বিস্তারে লিপ্ত, তাদের উভয়কে একই পরিণতির দিকে ঠেলে দিব? আমরা কি সংযমী, সচেতন, সাবধান জনদেরকে এবং দুরাচারীদেরকে একই পরিণতির দিকে ঠেলে দিব?)

67:3-4

He has created seven heavens in full harmony with one another: no fault will thou see in the creation of the Most Gracious. And turn thy vision upon it once more: canst thou see any flaw? Yea, turn thy vision upon it again and yet again: and every time thy vision will fall back upon thee, dazzled and truly defeated.

(তিনিই সপ্ত আকাশকে সুসমঞ্জস ভাবে বিন্যস্ত করে সৃষ্টি করেছেন! মমতাবানের সৃজন ক্রিয়ায় তুমি লেশমাত্র ত্রুটি খুঁজে পাবে না। আবার তাকিয়ে দেখ! কোনো ত্রুটির সন্ধান পাচ্ছ কি? বারবার তাকিয়ে দেখ! প্রতিবার তোমার দৃষ্টি তোমার উপরই নিপতিত হবে—হতবিহ্বল হয়ে, পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত হয়ে।)

… … …

বিজ্ঞান সংক্রান্ত অন্য লেখাগুলো:
প্রাণ বান্ধব জগত
তারা-বাতি কাহিনী
বিজ্ঞানপাঠ

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী