ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

মানুষের দুঃখকে বড় করে দেখতে না পারলে, বড় জীবনের দিকে অগ্রসর হওয়া যায় না।[১] যদি আমরা দুঃখকে আমাদের জীবনে একটি প্রধান বিবেচনার বিষয় করতে না পারি, তবে চিন্তা, আচরণ ও কর্মকে নৈতিকভাবে শুদ্ধ পথে চালনা করতে আমরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবো। নিজেকে পরিচ্ছন্ন, শুদ্ধ ও শোভামণ্ডিত করার পথে যাত্রার জন্য মানুষের দুঃখকে অনুভব করা প্রথম প্রয়োজন। ধর্মের পথের শুরু এখান থেকেই।

দুঃখ বলতে আমি বুঝচ্ছি যাতনা, কষ্ট, যা আঘাত বা অত্যাচারের বা বঞ্চনার শিকার হয়ে মানুষ ভোগ করে। মানুষ আঘাত ও অত্যাচার পেয়ে থাকে প্রধানত মানুষের কাছ থেকেই। আঘাত আবার প্রকৃতি থেকেও আসতে পারে। আঘাতে মানুষ কষ্ট পায়। আঘাতের সম্ভাবনা, হুমকি মানুষকে নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দেয় ও তাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। এতে মানুষ মানসিকভাবে যাতনা ক্লিষ্ট হয়।

মানুষের কষ্ট চোখে পড়লে আমরা বিচলিত হই, তার জন্য আমরা কিছু করিও। কিন্তু এটি আমাদের মনের অনুভূতি থেকে সাড়া দেয়া। আমি সবসময় ভাবছি কিভাবে আমার সুখের সম্পদ বাড়িয়ে চলব এবং এই চিন্তাকে আমার জীবনের মূল চিন্তার মর্যাদা দিয়েছি। এ নীতি তাড়িত জীবন চলার পথে অকস্মাৎ দেখা হয়ে যাওয়া দুঃখের প্রতি ক্ষণিকের করুণা হলো পার্ট-টাইম ধার্মিকতার মতোই।

দুঃখের বিবেচনাটিকে ওভাবে নয় বরং চিন্তার বিষয়ে পরিণত করতে পারলেই শুভ পথে যাত্রা সহজ হয়। নয়তো জীবন হয় নিজের বাসনার সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধের একটি করুণ ক্ষেত্র। মানুষ তা-ই, যা সে চিন্তা করে; মানুষ যা হয়, তা তার চিন্তা থেকেই হয়; দুনিয়াটিও মানুষ গড়ে তার চিন্তা দিয়েই।[২] দুঃখীদের দুঃখও আসে সুখের জন্য মরিয়া মানুষের চিন্তা থেকে।

দুঃখের বোধ থেকে আসে অহিংসার নীতি। কষ্টে থাকা মানুষ কখনই মানুষের কষ্ট বাড়াতে পারে না।

দুঃখের অনুভব থেকে জন্মায় করুণা ও মমতা। যে করুণা ও মমতা বাস্তবে প্রকাশিত হয় তা-ই মানুষের জন্য মানুষের প্রেমের প্রকাশ। এই প্রেম মানুষকে সচল করে। অন্যের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ করে তোলে। ভালবাসতে জানে যে মানুষ সে অন্যের কষ্টের অংশীদার হতে চায়, অন্যের কষ্ট লাঘবে সচেষ্ট হয়। প্রেমিক অন্যের যাতনাকে, কষ্টকে পান করে নীলকণ্ঠের ন্যায়। আর এভাবে সে প্রতিষ্ঠিত করে তার নিজের সত্তাকে।

কিন্তু যে প্রেম নিছক অনুভূতি তা বুদ্বুদের মত অপূর্ণ, ক্ষণস্থায়ী; নয়তো হয় স্থায়ী বাসনার তাড়না মাত্র। প্রেমের ক্ষেত্রেও চিন্তার স্থান আছে। চিন্তা থেকে পাওয়া যায় ঈশ্বরকে। ঈশ্বর থেকে আসে স্থায়ী প্রেম। মানুষের জীবনে যতখানি ঈশ্বর, তার মনে ততখানি প্রেম। ঈশ্বর-প্রেম প্রেমিকের মনে সৃষ্টি করে প্রেমের বন্যা, যা উপচে পড়ে নিজের ঘরে, প্রতিবেশীদের ঘরে এবং ছুটতে থাকে জগতের প্রান্তের দিকে।

দুঃখের কারণ লোভীদের মন আর অত্যাচারীদের হাত। দুঃখের বোধ ও প্রেমের অনুভব থেকে উদ্‌গত হয় ন্যায়বিচার ও প্রতিরক্ষার চিন্তা।

সুখের সন্ধানে পাগল মানুষেরা মানুষের দুঃখ কেবলই বাড়িয়ে চলে। যেদিন দেশের সব মানুষের দুঃখ দূর হবে, পৃথিবীর সব মানুষের দুঃখ দূর হবে সেদিন সবাই মিলে তোমরা হাততালি দিয়ে নেচে বেড়িও, আমি চুপ করে থাকব—না থাকলে আমাকে লক্ষ্য করে বোলো: এবার তুই খামোশ হ!

জেরেমি বেন্থাম ও জন স্টুয়ার্ট মিলের সুখের দর্শন আমাদেরকে মুক্ত করতে পারবে না। জীবন কোনো অলাভজনক বিয়োগান্ত নাটকও নয়, কোনো প্রতারণা নয়, নয় নিরাশ হওয়ার মত কোনোকিছু। চলো বুদ্ধের কাছে যাই, চলো যিশুর কাছে, যেন শেষে মুহম্মদের কাছে যাওয়ার উপযুক্ত হতে পারি।[৩]
… … …

এখানে প্রাসঙ্গিক দুটো কথা বলা যায়।

দুঃখ নিয়ে একজনের মধ্যে দুটো বিপরীত মনোভাব থাকে:
১। আমি আমার দুঃখ নিয়েই ব্যস্ত, আমার দুঃখই আমার জীবনে প্রাধান্য পায়।
২। আমি অন্যের দুঃখকে আমার চিন্তায় প্রাধান্য দেই এবং সেমত সাড়া দেয়ার চেষ্টা করি।

দোষ বা নীচতা নিয়েও একজনের মধ্যে দুটো বিপরীত মনোভাব থাকে:
৩। আমি অন্যের দোষগুলোকে নিয়ে বেশী ব্যস্ত, নিজেকে মনে করি সাধু।
৪। আমি নিজের দোষগুলোকে বড় করে দেখি, অন্যের দোষ চর্চায় ব্যস্ত হই না।

এই দুই জোড়া মনোভাবের মধ্যে কোন দুটো প্রাধান্য পেয়েছে তা পরীক্ষা করে মানুষ নিজের নৈতিক জীবনের মূল্য বিচার করে দেখতে পারে। মনোভাব হিসেবে ২ ও ৪ প্রাধান্য পেলেই একজনের পক্ষে নিরহংকার ও মমতাময় হওয়া সহজ হয়—অন্যের প্রতি ঈর্ষা ও ঘৃণার মনোভাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। মনের এই দশা মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে ও আচরণকে সুন্দর করতে পারে। মনের এ অবস্থা চিন্তা দ্বারা লভ্য ও সবসময় বাস্তবে প্রয়োগ সম্ভব হতে পারে বিচারশীলভাবে সতর্ক থাকার মাধ্যমে।[৪]

[১] বাক্যটি শোপেনহাওয়ারের লেখা থেকে নেয়া।
[২] বাক্যটি বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ধম্মপদ থেকে নেয়া।
[৩] এজন্য দেখুন সুবর্ণ বিধির তৃতীয় রূপ—শেষ অংশ
[৪] এই শেষ অংশটির প্রায় সবটুকুই শোপেনহাওয়ারের লেখা থেকে নেয়া।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী