ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

মুসলিমরা তাদের নামাজের শেষ বসায় দরুদ ইব্রাহিমি পাঠ করেন। ওতে তারা আল্লাহর কাছে ইব্রাহিমকে তিনি যেভাবে অনুগ্রহ করেছেন সেভাবে মুহম্মদকে অনুগ্রহ করার প্রার্থনা করে থাকেন। মুসলিমদের ধর্ম ইব্রাহিমের ঐতিহ্যের সাথে প্রগাঢ়ভাবে যুক্ত। ইব্রাহিম ইসলাম ধর্মের ইমাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ইব্রাহিমের সাথে মুসলিমদের এই গভীর সম্পর্কটি তারা নামাজে পর্যন্ত এভাবে প্রকাশ করে থাকেন।

এই ইব্রাহিম আকাশে তারা দেখে বলেছিলেন: এটিই আমার প্রভু। আবার চাঁদ দেখে বলেছিলেন: এ-ই আমার প্রভু। তারপর সূর্য দেখে বলেছিলেন: এ তো দেখি আরও বড়। তারপর বলেছিলেন: আমার আসল প্রভু এরা কেউই না।

তাহলে এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, আসল প্রভু কে? উত্তরটা তো এই হতে পারে যে, তিনিই—যার চেয়ে বড় আর কেউ নন।

ইব্রাহিমের যুক্তির ধারাটি মনে রেখে চলুন আরও একটু এগোই।

এগার শতকের কথা। দর্শনের যুবরাজ নামে খ্যাত ইবনে সিনা যখন জীবনের শেষ অংশটি কাটাচ্ছিলেন পারস্যে, তখন এক ছেলে বাল্যকাল উপভোগ করে যাচ্ছিল ইটালিতে। ছেলেটির নাম আনসেল্‌ম। এই ছেলে বড় হয়ে দর্শনের জগতে ঈশ্বরের অস্তিত্বের যে এক প্রমাণ হাজির করেন তা এখন পয়লা প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দর্শনের সব ছাত্রই এ প্রমাণটি পড়েন। এ প্রমাণের নাম ঈশ্বরের তত্ত্ববিদ্যিক প্রমাণ।

অবশ্য মাঝখানে খ্রিষ্টীয় স্কলাস্টিক ধর্মতত্ত্বের প্রবাদ পুরুষ সেন্ট টমাস একুইনাসের আক্রমণে টিকতে পারেনি আনসেল্‌মের যুক্তিটি। মানুষ একরকম সেটিকে ভুলে গিয়েই থেকেছিল, প্রায় তিনশ বছর ধরে। এর পুনরাবির্ভাব হয় ডেকার্টের আমলে, পনের শতকে।

এর আগে এরিস্টটল থেকে ইবনে সিনা পর্যন্ত সময়কালে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রধান প্রমাণটি ছিল বিশ্বতাত্ত্বিক প্রমাণ। এখন বিশ্বতাত্ত্বিক প্রমাণকে দুই নম্বরে নামিয়ে এক নম্বরে নিজের স্থান করে নিয়েছে আনসেল্‌মের প্রমাণটি। প্রমাণটি এই রকম –

আমার মনে এমন একটি ধারণা আছে যে, একটি সত্তা সবচেয়ে বড় যার থেকে বড় আর কেউ নেই।
এখন এ সত্তাটি ধারণা হিসেবে কেবল আমার মনেই থাকতে পারে, বাস্তবে নয়।
আবার থাকতে পারে আমার মনেও এবং বাস্তবেও।
ধরি কেবল মনের ধারণা মতে সবচেয়ে বড় সত্তা।
এবং মন এবং বাস্তব উভয় ক্ষেত্রে বিদ্যমান সবচেয়ে বড় সত্তা।
তাহলে কে বড়, নাকি ?
এখানে নিশ্চয়ই এর চেয়ে বড়, যেহেতু তা বাস্তবও বটে।
তাহলে আমার মনের সবচেয়ে বড় সত্তার ধারণা যাকে নির্দেশ করছে তা হলো
কাজেই অস্তিত্ববান।
সবচেয়ে বড় এবং তিনিই ঈশ্বর।

ইব্রাহিমের চিন্তার সাথে এই প্রমাণের মিল আছে। দর্শনে এই যুক্তির অনেক সমালোচনাও আছে। অনেকেই এটিকে কোনো যুক্তি বলে মনে করেন না। ইকবালও আনেস্‌লমের বা পরে বলা ডেকার্টের তত্ত্ববিদ্যিক প্রমাণ দুটোকে টিকিয়ে রাখা যায় বলে মনে করতেন না। আমি কেবল দেখাতে চাইলাম যে, ইব্রাহিমের যুক্তির বিন্যাসটির অনুরূপ যুক্তিটি দর্শনে ঈশ্বরের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ বলে অন্ততঃ পক্ষে পরিগণিত ও পঠিত—তা সেগুলো ঠিক হোক বা বেঠিক হোক।

ডেকার্টেকে বলা হয় আধুনিক দর্শনের জনক। ফরাসি এই দার্শনিক তত্ত্ববিদ্যিক প্রমাণের আরেকটি রূপ মানুষের সামনে হাজির করেন। মূলত তখনই আধুনিক মানুষের সামনে আনসেল্‌ম হয়ে ওঠেন আলোচনার বিষয়। ডেকার্টে সম্ভবত নিজের যুক্তিটি দেয়ার আগে আনসেল্‌মের যুক্তিটির সাথে পরিচিত ছিলেন না। ডেকার্টের যুক্তিটি এরকম –

আমার মনে এই ধারণাটি বিদ্যমান যে, একটি সত্তা পরিপূর্ণরূপে নিখুঁত, পারফেক্ট।
আবশ্যিক অস্তিত্ব একটি নিখুঁততা।
কাজেই আমার ধারণায় বিদ্যমান সত্তাটি অবশ্যই অস্তিত্ববান হবেন।
এই পারফেক্ট সত্তাই ঈশ্বর।

ডেকার্টের যুক্তিটিকে অনেকেই আনসেল্‌মের যুক্তির চেয়ে ভাল বলেছেন; যদিও ডেকার্টের মূল দর্শনের বিশাল আয়তন ও ঘটার মধ্যে এই যুক্তিটি প্রাধান্য পায় নি অথবা তাঁর যুক্তির অতি-সরলতা এটিকে গুরুত্ব দিতে পারেনি।

বিস্তারিত দেখুন: http://plato.stanford.edu/entries/descartes-ontological/

এখন দেখা যাক ইসলাম ধর্মের সাথে এদের যোগটা কোথায়।

মুসলিমরা আযানের শুরুতে চারবার এবং শেষের দিকে দুইবার বলেন আল্লাহু আকবার অর্থাৎ আল্লাহ সবচেয়ে বড় যার উপরে আর বড় কেউ নেই। তারপর আযান শেষ করেন আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য—নেই এই সিদ্ধান্তে এসে। তারা নামাজ শুরুও করেন আল্লাহু আকবার বলে, আল্লাহর কাছে নিজেকে অবনত করেন আল্লাহু আকবার বলে। আবার সিজদাতেও যান আল্লাহু আকবার বলে।

আল্লাহু আকবার-এর পর মুসলিমদের সবচেয়ে বেশি বলা কথা কোনটি? তা হলো সুবহান আল্লাহ। সুবহান আল্লাহ অর্থ হলো আল্লাহ সব অপূর্ণতা ও খুঁত থেকে মুক্ত বা পবিত্র, তিনি পরিপূর্ণরূপে পারফেক্ট। মুসলিমরা নামাজের শুরুতেই বলেন সুবহানাকা আল্লাহুম্মা, রুকু অবস্থায় বলেন সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম, সিজদা অবস্থায় বলেন সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা।

কাজেই একথা বলা যায় যে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ক সবচেয়ে বড় প্রমাণ দুটোর প্রথম কথা দুটো মুসলিমদের ঈশ্বর-চিন্তার মূলকথা হয়ে আছে এবং কথা দুটোকে সার্বজনীন করা হয়েছে।
… … …

পরের ও শেষ অংশ: আনসেল্‌ম – পরিশিষ্ট

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী