ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

আগের পর্ব: আনসেলম – মূলকথা

আনসেল্‌মের বিরুদ্ধে বলা যায়: আমার মনে একটি সবচেয়ে বড় দৈত্যের ধারণা আছে যার চেয়ে বড় দৈত্য নেই; অস্তিত্ববান দৈত্য অস্তিত্বহীন দৈত্যের চেয়ে বড়; কাজেই দৈত্যটি অস্তিত্ববান। এ ধরণের কথায় দৈত্য অস্তিত্ববান হয় না। কাজেই ঈশ্বর কিভাবে অস্তিত্ববান হন?

এখানে প্রশ্ন করা যায় যে, আপনার এই সবচেয়ে বড় দৈত্যটি কি সবচেয়ে বড় সত্তা? তার চেয়েও বড় হতে পারে কোনো সত্তা—এমন ধারণা কি আপনার মনে নেই? যদি বলেন, না নেই—তবে এই তো সেই ঈশ্বর। কথা হলো এতে দৈত্য আসলেই অস্তিত্ববান হয়ে ওঠে। এটি এমন এক দৈত্য যার চেয়ে বড় আর কোনো সত্তা নেই। তাহলে হলো কী? আসলে আপনি ‘ঈশ্বর’য়ের বদলে ‘দৈত্য’ শব্দটি ব্যবহার করলেন মাত্র। ঈশ্বরের জন্য ভিন্ন শব্দ বা তাঁর জন্য অবমাননাকর, বিশ্বাসীদের বিবেচনায়, শব্দ ব্যবহার করলেই ঈশ্বর উধাও হন না।

আর যদি বলেন, হ্যাঁ তার চেয়ে বড় সত্তার ধারণাও আমার আছে। তাহলে বলা যায়, আমরা বড়গুলোর মধ্য থেকে সবচেয়ে বড় সত্তার কথাটি বলছি, আপনার এই ছোট সত্তাটি নিয়ে নয়। আপনার এই সত্তাটি যেহেতু ছোট সেহেতু তা অস্তিত্ববান হতেও পারে, নাও হতে পারে। মনে করুন, ক নির্দেশ করে আপনার মনের সবচে বড় দৈত্য। খ নির্দেশ করে মন ও বাস্তব উভয় ক্ষেত্রের দৈত্য। কিন্তু খ তো সবচে বড় সত্তা নয়। কাজেই খ এর চেয়ে বড় দৈত্যের ধারণাও আপনার মনে আছে। এভাবে এগুতে থাকলে দৈত্যকে ঈশ্বর পর্যন্ত নিয়ে ঠেকাতে হবে।

কেউ বলতে পারেন আমার মনে—একটি সত্তা সবচে বড়—এই ধারণাটাই নেই। কাজেই ঈশ্বর নেই। প্রশ্ন করা যায়, তুমি কী অস্বীকার করছো? তোমার মনে যে ধারণাটি নেই তা তুমি অস্বীকার করছো কী করে? ধারণাটি যদি তোমার মনে না-ই থাকে তবে ধারণাটি নেই একথা বলছো কিভাবে? তাকে আমরা বৈধ ভাবেই উপদেশ দিতে পারি: তোমার মনে যে ধারণা নেই তা সম্বন্ধে তুমি কথা বলতে যেও না, চুপ করে থাক।
… … …

কার্টেসীয় যুক্তিটি ধরে কোথায় যাওয়া যায়? বিশ্বাসীরা ঈশ্বর বলতে বুঝান পরমভাবে পূর্ণ, ও সেকারণে আবশ্যিকভাবে অস্তিত্বশীল, সত্তাটিকে। দেখা যাক ঈশ্বর নেই কথাটির অর্থ কী দাঁড়ায়। ঈশ্বর নেই; অর্থাৎ পরিপূর্ণরূপে নিখুঁত সত্তাটি অস্তিত্ববান নন; অর্থাৎ যার অস্তিত্ব আছে তার অস্তিত্ব নেই।

‘কুমার অবিবাহিত’—এই বচনটি বিশ্লেষণধর্মী। ‘কুমার’ এর মধ্যেই তার অবিবাহিত থাকাটা নিহিত আছে। যদি ‘কুমার বিবাহিত’ বলা হয় তাহলে ‘কুমার’ পদের অর্থ বদলে যাচ্ছে, নয়তো বচনটি শুদ্ধ নয় বলতে হচ্ছে। কিন্তু এই বদলে যাওয়া অর্থের ‘কুমার’ নিয়ে আমরা আলোচনা করছিলাম না। যদি ধরে নেই ‘কুমার অবিবাহিত’ ও ‘কুমার অবিবাহিত নন’ দুটো বচনই ঠিক কথা বলে, তাহলে দুই বচনের ‘কুমার’ এক নয়, ভিন্ন।

‘ঈশ্বর অস্তিত্ববান’—এ কথাটিও তেমনই বিশ্লেষণমূলক। যে অস্তিত্বহীন তাকে বিশ্বাসীরা ঈশ্বর বলে না। ‘ঈশ্বর নেই’—এই কথার বিপরীতে বিশ্বাসী বলতে পারে যে, ‘ঈশ্বর’ পদটি দিয়ে এখানে যা বুঝানো হয়েছে আমি তো তাকে ঈশ্বর মনে করি না; এখানে যাকে ‘ঈশ্বর’ বলা হয়েছে সে যে অস্তিত্বহীন হতে পারে তা তো আমি অস্বীকার করছি না। বিশ্বাসীর ধারণায় যে ঈশ্বর আছে সেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে নেতিবাচক কিন্তু সঠিক বচন তৈরি করা সম্ভব নয়।

তাই আমাদের কাছে একটিই উপায় আছে অসঙ্গতি থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার। আর তা হলো বিশ্বাসীদের ঈশ্বরকে নিয়ে কোনো নেতিবাচক বচন তৈরি করা থেকে বিরত থাকা, ঈশ্বরে বিশ্বাসীদেরকে নির্বোধ বিবেচনা করে এবং স্বীয় পাণ্ডিত্য নিয়ে সন্তুষ্ট থেকে বিশ্বাসীদের ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ে চুপ করে থাকা ও তাদের উপেক্ষা করা। এছাড়া অন্য গতি কী বলুন?
… … …

আমি যদি বলি ‘বস্তু ছাড়া কিছু নেই’ এবং ‘আমরা দেহ নিয়ে বাঁচি—এই দেহ মরে গেলে জন্মের জন্য আমরা শেষ’ তবে তুমি মুসলিম আমার কাছে প্রমাণ চাইতে পার। কিন্তু আমি ইনসিস্ট করলে তোমরা মুসলিমরা আমাকে উপেক্ষা করা ছাড়া অন্যকিছুই করার অধিকার রাখ না; তোমরা মুসলিমরা আমার সম্মানের উপর, জীবনের উপর হামলা করতে পার না। তোমাদের আল্লাহই তোমাদেরকে এ অধিকার দেননি।
… … … … … …

কোরানের সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো নিচে দেয়া হলো।

(6:75) And thus We gave Abraham his first insight into mighty dominion over the heavens and the earth—and this to the end that he might become one of those who are inwardly sure.

(6:76) Then, when the night overshadowed him with its darkness, he beheld a star; he exclaimed, “This is my Sustainer!”—but when it went down, he said, “I love not the things that go down.”

(6:77) Then, when he beheld the moon rising, he said, “This is my Sustainer!”—but when it went down, he said, “Indeed, if my Sustainer guide me not. I will most certainly become one of the people who go astray!”

(6:78) Then, when he beheld the sun rising, he said, “This is my Sustainer! This one is greater!”—but when it went down, he exclaimed: “O my people! Behold, far be it from me to ascribe divinity, as you do, to aught beside God! … … …

(6:83) And this was Our argument which We vouchsafed unto Abraham against his people: We do raise by degrees whom We will. Verily, thy Sustainer is wise, all-knowing.

তারা, চাঁদ ও সূর্যের মধ্যে প্রতীয়মান আকৃতির ক্রম এবং শেষে ‘বড়’ শব্দটির উল্লেখের মধ্যে আনসেল্‌মের ধারা পাওয়া যায়। অন্যদিকে তারা, চাঁদ ও সূর্যের ডুবে যাওয়ার মধ্যে আছে কার্টেসীয় অপূর্ণতা বা সীমাবদ্ধতার বিষয়টি।

এখানে একটি কথা বলা দরকার। নবীদের অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞা দার্শনিকদের থেকে ভিন্ন, এ অনেক গভীর ও রহস্যময়। নবীদের আসল কথাগুলো দার্শনিকদের চিন্তাপ্রসূত কথার মত নয়। তাঁরা তাঁদের অভিজ্ঞতার যথার্থতা ও বাস্তবতা সম্বন্ধে নিশ্চিত হন। বিশ্বাসীরা নবীর চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য ও সত্যবাদীতার উপর ভিত্তি করে তাঁর বাণীর সত্যতার উপর আস্থাশীল হন।

এখানে যুক্তির ধারাটি হুবহু মিলছে না—একথাটি ঠিক। তবে সাদৃশ্য যে আছে তাও বলা চলে। অবস্থা যা-ই হোক, আনসেলম ও ডেকার্টের যুক্তির সাথে মুসলিমদের আসল যোগটি তো তাদের ‘আল্লাহু আকবার’ ও ‘সুবহান আল্লাহ’র মাধ্যমে টিকেই থাকছে।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী