ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

পথ চলিতে গিয়া বাঁদরের নাচ দেখে নাই এমন বঙ্গদেশীয় সন্তান খুঁজিয়া পাওয়া ভার। তবে মনুষ্যই যে কেবল বাঁদর নাচায় তাহা নহে, বাঁদরও মানুষ নাচাইতে পারে। হালে বিজ্ঞাপনে দেখিয়াছি বলিউডের কোন নায়িকার গলায় দড়ি আর ডুগডুগি বাজাইতেছে বিশাল এক বানর। নাচ শেষে পিচ্চি নায়িকা সাইকেলের হাতলে বসিয়া আছে আর বানরটি সিটে বসিয়া প্যাডেল চালাইতেছে – নতুন স্থান ও নতুন মানুষের খোঁজে। ডুগডুগিতে মানুষ আঘাত করুক কি বাঁদরেই আঘাত করুক, মানুষদেরকে নাচিয়া উঠিতে দেখিতে পাওয়া যায় হরহামেশাই।

আমাদের বিবাহ অনুষ্ঠানে সানাই বাজে আকসার। কাহারও গান বাজনার প্রতি বিরাগ থাকিলেও অথবা কেহ কেহ শুনিবামাত্র ‘তৌবা তৌবা’ বলিয়া কানে আঙ্গুল দিলেও সানাই শুনেন নাই এমন মানুষ আমাদের দেশে আছে বলিয়া বিশ্বাস করা কঠিন। সানাইয়ের মাহাত্ম্য মিলনে। মানুষে মানুষে মিলন মেলার সুরের উৎস হইয়া আছে আমাদের সানাই।

ডুগডুগিতে ঘুরানি দিয়া গোটা কতক বাড়ি দিলেই এবং মুখে গোটা কতক খাঁকারি দিলেই যথেষ্ট হইলেও, সানাইতে কেবল ফুঁ দিলেই কাজ হয় না। সানাই বাজানো কঠিন, এইখানে তাল লয় কত কিছুর দিকে যে নজর রাখিতে হয়! ইহা একটি সমগ্র, একটি শিল্প, একটি জ্যামিতি। কত সুরেই যে আপনি সানাই বাজাইতে পারিবেন! শ্রোতার ক্লান্তি আসিবে না। বাজানোও শেষ হইবে না। কিন্তু ডুগডুগি! কতক্ষণইবা বাজাইতে পারা যাইবে! কতক্ষণইবা মানুষ আগ্রহ ভরিয়া শুনিবে?

তবুও বোকার দল ডুগডুগির বাড়িতেই মাতিয়া উঠে। কোথায় কোন ভিন দেশের কে ডুগডুগিতে বাড়ি দিল আর অমনি আমরা আমাদের দেশের নিজেদের সম্পদে আগুন লাগাইয়া দিলাম। নকল-নবিশি করিয়া কে একটু ডুগডুগি বাজাইল আর অমনি আমরা তাহার মোকাবেলায় যুদ্ধ বাঁধাইয়া দিলাম। ডুগডুগি বাজানো যে হারাম তাহা সপ্রমাণ করিতে আমাদের সমস্ত তফসির আর শাস্ত্র লইয়া হাজির হইলাম।

আরে বোকার দল! না নাচিলেই যে সুবিধা পাওয়া যায় তাহা বুঝিবি কবে? ডুগডুগি তো সানাই নয়। ডুগডুগির ভাণ্ডার তো সানাইয়ের ভাণ্ডারের মতো অসীম নয়। বাজিয়া বাজিয়া ডুগডুগি নিজেই ক্লান্ত হইয়া একসময় থামিয়া যাইবে, থামিয়া পথের উপর পড়িয়া থাকিবে। আর যদি বাজিতেই জিদ ধরে তবে একই কলের বাড়ি শুধু ঘুরিয়া ঘুরিয়া পড়িবে।

এই সানাই যেমন পুরাতন, তেমনই পুরাতন এই ডুগডুগি। তোমরা যাহাকে গুরু মানিয়াছ সেই গুরু যাবত সানাই বাজাইতেছেন তাবৎ ডুগডুগিও বাজিয়া চলিয়াছে। সানাই ওয়ালারা ডুগডুগিতে কান পাতিয়াছিল তাহা তো কখনও সেই কালে দেখা যায় নাই। গুরুর আগেও গুরু ছিল। সেই প্রথম গুরু হইতেই একই ইতিহাস চলিয়া আসিয়াছে। কেহই নতুন কিছু বাজাইতেছে না—না সানাই ওয়ালা, না ডুগডুগি ওয়ালা।

নতুন নতুন সুর তুলিয়া সানাই ওয়ালারা বাজাইতে ব্যস্ত হইলে এবং সানাইয়ের সুরে নিজেদের মন বদলাইতে পারিলে তাহার রোশনাই সানাই ওয়ালার কদর বাড়াইবে। ডুগডুগির পিছনে পড়িলে তুমি সব হারাইবে। ডুগডুগিরও যাদু আছে, কিন্তু সেই যাদু সানাই ফেলিয়া নাচিতে ধরিলেই কাজ করে, সানাইয়ে মন দিলে করে না।

ডুগডুগির ইতিহাস না হয় অজানাই থাকিল—কিন্তু নিজের গুরুর ইতিহাস তো, তুই নচ্ছার, বুঝার চেষ্টা করবি!

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী