ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

‘গোলাপি এখন ট্রেনে’ ছায়াছবিটির কথা মনে পড়ে। দেখেছিলাম মা কিভাবে সন্তানের মুখে বিষ তুলে দেয়। ফরমালিন রূপে সেই বিষ এখন বাস্তব। সন্তান আমরা সবাই। মাছ ও ফল সংরক্ষণে ফরমালিন ব্যবহার চলে আসছে কত বছর হলো! রুই-কাতলা, আম-কলা, সবজি, দুধ কিছুই রেহায় পাচ্ছে না। ফরমালিন স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ক্রমাগত ফরমালিন দেয়া খাবার খেলে নানা রকমের গুরুতর অসুখ হয় বলে ডাক্তাররা বলছেন। তাদের মতে, এতে শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিকল হয়, মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে গর্ভবতী মায়েরা আর শিশুরা।

একটি সভ্য দেশে কালেভদ্রে মানুষ খুন হতে পারে। রাষ্ট্র, পুলিশ বা সমাজ শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। কিন্তু খুনের ঘটনা সংঘটিত হয়ে গেলে রাষ্ট্র, পুলিশ বা সমাজ নির্বিকার বসে থাকবে এটা কিভাবে সম্ভব? খাদ্যে ফরমালিন তো নতুন কিছু নয়, অনেক দিনের পুরনো সমস্যা। দেশে বিএসটিআই আছে, রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার, বেচাকেনা নিয়ে নীতিমালা আছে (নাকি নেই?), সংসদ আছে, সরকার আছে। তারপরও এতদিন ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে আসছে খাদ্যে ফরমালিনের ব্যবহার এবং প্রকাশ্য ব্যবহার; যেন ফরমালিন ওষুধ; বিষ নয়।

আমাদের পূর্ব-পুরুষদের আকাঙ্ক্ষা ছিল তাদের সন্তানেরা যেন থাকে দুধে ভাতে। দুধ-ভাতের চিন্তায় বিভোর কবির ভাবনায় কি কখনও এসেছিল যে, এন্তার দুধ-ভাত উৎপাদন করা গেলেও সন্তানের জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে? তিনি যে কালে কবিতা লিখেছিলেন সে কালের মানুষ ভুলেও ভাবতে পারেননি যে, তাদের সন্তানেরাই নিজেদের হাতে উৎপাদিত দুধে আর ভাতে নিজেরাই বিষ মিশিয়ে নাতি-নাতনিদের মুখে তুলে দেবে। এও কি সম্ভব? আমাদের পূর্ব-পুরুষদের যা ছিল ভাবনারও অতীত, তা-ই আমরা অবলীলায় করে যেতে পারছি নিজেদের দুহাত দিয়ে।

দুধ-ভাত থেকে মাছ-ভাত, মাছ-ভাত থেকে ডাল-ভাত—সে অনেক গড়াগড়ি। কিন্তু দরিদ্রজন থেকে সম্পদশালীজন সকলেই চায় তার সন্তানের মুখে মাছ উঠুক, ফল উঠুক, সবজি উঠুক। কিন্তু কতই না পরিতাপের বিষয় যে, সে মাছে বিষ, সে ফলে বিষ, সে সবজিতে বিষ। পয়সা দিয়ে কিনেও শান্তি নেই কারও। যারা বিষ মেশাচ্ছে তারাও চিন্তিত। তারাও খোঁজে বিষমুক্ত মাছ, ফল আর সবজি। কিন্তু পাচ্ছে কই? প্রত্যেকেই জানে তার দেয়া বিষ অন্যের সন্তানের মুখে উঠছে আর অন্যের দেয়া বিষ উঠছে নিজ সন্তানের মুখে।

এই বোধেও কাজ হচ্ছে না। সরকারের ছিটেফোঁটা হানাতেও কাজ হচ্ছে না। কোথায় যেন সবকিছু চক্রের মতো হয়ে উঠছে—যাকে বলে বিষচক্র, দুষ্টচক্র। যুক্তিগুলো, সমস্যাগুলো সরল রেখায় নেই যে, শুরু থেকে সমাধান করে করে শেষ পর্যন্ত পৌঁছুবেন। যেখান থেকেই শুরু করুন না কেন আবার সেখানেই এসে হাজির হবেন। ক বলে খ’র দোষ, খ বলে গ’র দোষ, গ বলে ক’র দোষ। ক, খ, গ সমস্বরে বলে, তুই ঘ আছিস শুধু খাওয়ার তালে। তাই এতো দোষ ধরার জিগির। ব্যবসায় নামতে হতো যদি তোকে তবে তোর সাধু কথার মুখে নিজেই কুলুপ দিতি।

কথাতো মিথ্যে নয়। তাহলে এখন উপায়?

‘গোলাপি এখন ট্রেনে’ ছবিতে দেখা গিয়েছিল অত্যাচার কিভাবে মাতৃরূপে পুত্রের মুখে বিষ তুলে দেয়। সে-ও এক ইতিহাস। প্রেম করলো চুরি, চুরি করলো খুন, খুন থেকে পাগলামি, পাগলামি থেকে বাহানা, বাহানা থেকে ওষুধ, ওষুধ হলো বিষ। বাবার অত্যাচার ফিরে আসলো মায়ের হাতে ওষুধরূপী বিষ হয়ে। আমরা অত্যাচার, আমরা টাকার অত্যাচার। টাকায় প্রেম, টাকায় চুরি, টাকায় খুন, টাকায় পাগলামি, টাকায় বাহানা, টাকায় ওষুধ, টাকায় বিষ।

আর কতদিন এই চক্করের মধ্যে পড়ে থাকব আমরা? কোথায়, কখন, কারা নিয়মিত ফরমালিন দিয়ে যাছে খাদ্যে তা কি আবিষ্কার করা খুবই দুরূহ কাজ? খাদ্যে ফরমালিন ব্যবহার রোধ করা কি এতই অসম্ভব?

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী