ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

১। মমতাময় ও করুণাময় আল্লাহর নামে।

১.১। আমাদের প্রতিটি কাজের পেছনে প্রণোদনা ও উদ্দেশ্য থাকে। কাজের মাধ্যমে আমরা কিছু অর্জন করতে চাই। জীবনকে সফল ও অর্থপূর্ণ করাই আমাদের কাজের নৈতিক লক্ষ্য। এ নৈতিক লক্ষ্যে সঠিক পথে এগুতে পারাই আমাদের প্রার্থনার বিষয়। এজন্য দরকার জ্ঞান ও জাগতিক অবলম্বনগুলো। আমরা অর্জনে সফল হতে পারি আল্লাহর নিকট থেকে ইতোমধ্যে পাওয়া বিষয়গুলোকে নিয়োগ করার মাধ্যমে।

১.২। যা পেয়েছি ও যা পাওয়া যাবে তা সবই মমতাময় ও করুণাময় আল্লাহর কাছ থেকে। কাজেই যা পাচ্ছি ও যা পাবো তা থেকে নিজের জন্য ও অপরের জন্য ব্যবহার করবো অন্যকে ভালবেসে, মমতায় ও সহানুভূতির সাথে। যা পেয়েছি তা নিয়ে অহংকারের কোনো যুক্তি নেই; অহংকার অকৃতজ্ঞতার অন্য নাম; এবং আরও এগিয়ে হিংসাতাড়িত বা অত্যাচারমূলক কাজে নিয়োজিত হওয়া তো রীতিমতো প্রকাশ্য সীমা লঙ্ঘন।

১.৩। জগত পরিচালনায় আল্লাহর প্রথম নীতি হলো এই মমতা ও করুণার নীতি। তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের জীবনেরও এটিই প্রধান অনুসৃতব্য নীতি। এটিই হলো সব কাজ বিসমি আল্লাহু আল-রহমান আল-রহিম বলে শুরু করার প্রধান তাৎপর্য। এটি একটি বোধ বা অনুভূতি মাত্র নয়, একটি অঙ্গিকারও বটে।

২.১। সকল প্রশংসা কেবল আল্লাহরই জন্য।

২.১.১। ভক্তিমূলক প্রশংসা মাত্রই আল্লাহর প্রাপ্য। আমরা আল্লাহর কাছ থেকে যা পেয়েছি তার বিপরীতে এছাড়া আর কিছুই আমাদের করার নেই—কারণ তিনি যে সকল প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে। আর সকলেই যে তাঁর উপর নির্ভরশীল—একারণে এই ভক্তিতে তাঁর সাথে কাউকে অংশীদার করারও কোনো যুক্তি নেই। এই প্রশংসা আল্লাহ তাঁর নিজ গুণের কারণেই যেমন প্রাপ্য তেমনই তা আমদের কৃতজ্ঞতা বোধেরও প্রকাশ।

২.১.২। এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বা মানসিক স্বাধীনতার মূল মন্ত্র। মানুষ সাধারণত অন্য মানুষের, প্রকৃতির বা মানুষের সৃষ্টির সামনে নিজেকে সভক্তি সমর্পণ করে থাকে। এটি হলো নিজেকে হেয় জ্ঞান করা ও নিজেকে স্বেচ্ছায় অবনমিত করা।

২.১.৩। তাহলে কি আমরা আর কারও প্রশংসাই করতে পারব না? এ জগতের বুননে বা তার অন্তরালে নিহিত গাণিতিক পাণ্ডুলিপির প্রশংসা তো খোদ নাস্তিকেরাও না করে থাকতে পারে না। আমরা বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ব্যক্তিদের বা তাঁদের অবদানের প্রশংসা কি করতে পারব না? এর উত্তর কিন্তু খুবই সহজ। যদিও সহজ উত্তরটা সবসময় অনেককে সন্তুষ্ট করে না। ভক্তিবাদীরা ভক্তির ইচ্ছাকে টিকিয়ে রাখতে চাইবেন এখানে নানা কথার আশ্রয় নিয়ে।

২.১.৪। আল্লাহ ছাড়া অন্যদের বেলায় প্রশংসাসূচক কথাবার্তা শিক্ষার বিস্তার ও তথ্যের বিনিময়ের বিষয়। আমরা গায়ে পরে শেখাতে যাই না, বিনা প্রয়োজনে তথ্য দিতেও যাই না। এটি যোগাযোগের বিষয়, এখানে প্রটোকল রয়েছে: অপর পক্ষের আবেদন বা প্রয়োজনে এবং তার গ্রহণে সম্মতির পরই আমরা শিক্ষা বা তথ্যের বিনিময় করি।

২.১.৫। ভক্তিমূলক বচনাদি, এদের প্রকাশের ঢং, এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ক্রিয়াকলাপ ও পরিবেশ থেকে শিক্ষা বা তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অনুরূপ বিষয়গুলি একরকম নয়। আমরা নিজেরাই নিজেদের মনের প্রবণতাগুলো পরীক্ষা করে দেখে তা বিচার করতে সক্ষম।

২.১.৬। ভক্তিতে বা বন্দনায় আল্লাহর কোনো অংশীদার নেই; তা তিনি আল্লাহর নবী-রসুলই হোন বা ভক্তদের দ্বারা ঘোষিত অলি-আল্লাহই হোন; বা অন্য যেই হোন না কেন।

২.২। আল্লাহ জগতসমূহের প্রতিপালক।

২.২.১। এ হচ্ছে ২.১.২ অনুচ্ছেদে বলা মনোগত স্বাধীনতার যুক্তি। আল্লাহ সহ বা ছাড়া অন্য কারও ভক্তি করার দিকে মানুষকে যারা ডাকেন তাদের এটিই প্রধান যুক্তি যে, এতো পেলে তার কাছ থেকে তবে ভক্তি কেন করবে না? উত্তরটি এখানে নিহিত: আল্লাহই জগতসমূহের অংশীবিহীন প্রতিপালক, আর সকলেই তাঁর উপর নির্ভরশীল ও তাঁর দ্বারা প্রতিপালিত।

২.২.২। আমরা দেখি যে, এ জগতে একে অপরের সাথে নেয়া-দেয়ার সম্পর্কে বাঁধা আছে। এখানে বিনিময়হীন উপকার পর্যন্ত আছে। কর্মদক্ষতায়, গুণে ও মানে সকলে সমান বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নন। ফলে আমাদেরকে একে অপরের কাছ থেকে নিতেই হয়। যিনি দেন তিনি কষ্ট স্বীকার করেন, পরিশ্রম করেন। পিতা-মাতা, শিক্ষকমণ্ডলী, সমাজ, রাষ্ট্র, অন্য রাষ্ট্রগুলো সকলের সাথেই আমাদের দেয়া-নেয়ার সম্পর্ক।

২.২.৩। আমি একজনকে হাজার টাকা দিলাম তার কন্যার পরীক্ষার খরচের জন্য। এতে কি আমি তাকে অনুগ্রহ করলাম? নাকি আমার দায়িত্ব পালন করলাম? আমার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি না দিতাম তবে ওতে কি আমার দোষ হতো না? এক জনের কাছে পড়ার টাকা নেই, আমার কাছে অতিরিক্ত রয়ে গেছে, এবং তা দেয়ার সামর্থ্যও আমার আছে; তাহলে কার টাকা আমি কাকে দিলাম? তারই টাকা তার হতে গেল মাত্র। এখন আমি কি বলতে পারি যে, মনে রেখ আমার দানের কথা, অকৃতজ্ঞ হয়ো না, আমাকে মান্যগণ্য করে চলো? এটা যদি আমি নিজে বলতে না পারি তবে অন্যে আমার হয়ে আমাকে ভক্তি করার সুপারিশ বা আবেদন কন্যাটির পিতার কাছে কিভাবে করতে পারে?

২.২.৪। এখন এই দেয়ার পরিমাণ যত বেশীই হোক অবস্থার হেরফের হয় না। তাহলে আমি যার কাছ থেকে নিয়ে উপকৃত হচ্ছি তার প্রতি আমার রেসপন্স কিরকম হতে পারে? আমি তার প্রতি-কল্যাণ, প্রতি-উপকার করতে পারি। আমরা যত বড়ই হই না কেন, সকলকেই সকলের প্রয়োজন হয়। যদি কিছু নাও দিতে পারি, আমি তার সাথে তো উত্তম আচরণ করতে পারি, তার ক্ষতির ইচ্ছা পরিহার করে চলতে পারি। আর যে জন্য তিনি আমাকে টাকাটা দিলেন সে কাজে অর্থাৎ আমার কন্যাটি যেন ঠিকমত পরীক্ষা দিতে পারে তার জন্য সচেষ্ট থাকতে পারি, কোনো ত্রুটি বা অবহেলা না করি।

৩। আল্লাহ মমতাময় ও করুণাময়।

৩.১। আল্লাহ জগতসমূহের প্রতিপালক। আর এই প্রতিপালন নীতির প্রথম ও মুখ্য নীতি হলো মমতা ও করুণা। মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। মুসলিম চিন্তকদের অনেকে বলেছেন, মানুষ আল্লাহর রবুবিয়তের তথা প্রতিপালন নীতির প্রতিনিধি। এতে মানুষের উপর বর্তায় মানুষের প্রতিপালনের জন্য, স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য, বিকাশের জন্য কাজ করার দায়িত্ব। মানুষের জন্য এই পালনমূলক দায়িত্বের প্রথম নীতিটিও হয়ে পড়ছে মমতা ও ভালবাসা—কারণ এটিই জগত প্রতিপালনের ক্ষেত্রে আল্লাহর মূলনীতি।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী