ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

autis

অটিজম হচ্ছে এমন মানসিক অবস্থা যার কারণে একটি শিশুর স্বাভাবিক উন্নয়ন ও আচরণ বাধাগ্রস্ত হয়। এটি অন্যদের সাথে যোগাযোগ এবং নিজেকে অন্যদের সাথে সম্পর্কিত করার ক্ষেত্রে একটি উন্নয়নগত অসামর্থ্যের মাধ্যমে প্রকাশ লাভ করে। তাছাড়া অটিস্টিক শিশু বা ব্যক্তি তার চারপাশের জগতকে কিভাবে জ্ঞানে রূপান্তরিত করবে তাও এর দ্বারা প্রভাবিত হয়। এটি সারা জীবনের সমস্যা। অটিস্টিক মানুষেরা আলো, বর্ণ, শব্দ, স্পর্শ, ঘ্রাণ বা আস্বাদনের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিমাত্রায় অথবা অবমাত্রায় সংবেদনশীল হতে পারে।

অন্যদের সাথে স্বাভাবিক যোগাযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থতার কারণে এবং পরিবেশ ও জগত সম্বন্ধে স্বাভাবিক অবধারণা তৈরিতে অসামর্থ্যের কারণে শিশুটি অন্য দশটি শিশুর মত নিজেকে গড়ে তুলতে পারে না। অর্থাৎ তার শিক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তবে অটিজম যে একই রকম বা একই মাত্রার সমস্যা তৈরি করবে তা নয়। এর প্রভাবের মধ্যে একটি প্রশস্ত স্পেকট্রাম রয়েছে। সবচেয়ে নম্র অবস্থার অটিস্টিক ব্যক্তি মোটামোটি স্বাধীন জীবন যাপন করতে পারে; অন্যদিকে কোনোকোনো অটিজম এমন হতে পারে যে, শিশুটি বা ব্যক্তিটি সারাজীবন ব্যাপী শিক্ষণ-অসামর্থ্যে গুরুতরভাবে ভোগে ও উপযুক্ত সহায়তার উপর নির্ভরশীল থেকে যায়।

প্রায় একশত মানুষের মধ্যে একজন অটিজম আক্রান্ত। কারও দিকে তাকিয়েই বলা সম্ভব না যে, সে অটিস্টিক। কখনও কখনও অটিজমকে বলা হয় গুপ্ত অসামর্থ্য। নিজের প্রয়োজন বা নিজের অনুভবের কথা অন্যকে বলতে পারা, অন্যদের সাথে মেশতে বা নতুন বন্ধুত্ব গড়তে পারা, অন্যদের চিন্তাকে বুঝতে পারা ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের কম-বেশী অসুবিধা হয়। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না, কেন কিছু কিছু মানুষ অটিস্টিক হয়। মেয়েদের চেয়ে ছেলেরা বেশি সংখ্যায় অটিস্টিক হয়। তবে এটিও আমরা জানি না কেন এমন হচ্ছে। সারা জীবনেও প্রকাশ পায়নি এমন অটিজমও রয়েছে।

অটিজম একটি বাস্তবতা। ইতিবাচক ও কার্যকরভাবে আমাদেরকে এটি গ্রহণ করতে হবে। অটিজম যে কেবল মানুষটিকেই সমস্যার মধ্যে ফেলে তা নয়, তার পিতামাতা ও পরিবারকে প্রভাবিত করে। পিতামাতা ও সমাজের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৈরি হয় নানা অবিচার ও অত্যাচারমূলক পরিস্থিতির। অটিজম থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না বটে, কিন্তু যথাসময়ে ও যথাযথ সমর্থন ও সহায়তা অটিস্টিক মানুষের জন্য বিশাল পার্থক্য সূচিত করতে পারে।

আমাদের দেশে আমাদের মানসিক ও নৈতিক অবস্থা অটিজমকে আরও সংকটাপন্ন করতে পারে। এর পিছনে আছে আন্ত-পরিবার প্রতিযোগিতার মনোভাব, প্রতিপক্ষের বিপদে খুশি হওয়ার প্রবণতা, পরাজয়ে প্রতিশোধ স্পৃহা। আপনি অটিস্টিক শিশুর পিতামাতাকে আকারে ইঙ্গিতে যেমন কষ্ট দিতে পারেন, তেমনই গায়ে পড়ে সহানুভূতির একগাদা প্রকাশের মাধ্যমেও আঘাত করতে পারেন। আমাদের দেশে অটিস্টিক শিশুদের মা-বাবাদের জীবনে এটিই যে সবচে নির্মম ও কঠিন সমস্যা তা তাদের সাথে কথা বললেই জানতে পারবেন। এবং এটি থেকে আপনি আমাদের নৈতিক পরিস্থিতি পরিমাপ করলে খুব ভুল হিসাবে গিয়ে পৌঁছুবেন বলেও আমার মনে হয় না।

সমাজের নিপীড়নমূলক এই মনোভাবের আঘাত অটিস্টিক শিশু পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে। কারণ এতে পিতামাতার মনের উপর চাপ সৃষ্টি হয় যা কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের সন্তানের প্রতি অসন্তুষ্টি ও বিরক্তি হিসেবে প্রকাশ পেতে পারে।

অটিস্টিক মানুষের জন্য সবচেয়ে উপকারী মনোভাব হচ্ছে তাদের প্রতি যথার্থ অন্তর্গত কিন্তু স্থূলভাবে প্রকাশিত নয় এমন সহানুভূতি। তাদের সম্মানে, স্বাধীনতায় ও ইচ্ছায় আঘাত বা হস্তক্ষেপ না করে বরং তাকে একজন স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত ব্যক্তি হিসেবে সমীহ করা গেলে তাদের জীবন সুন্দর হবে। এরকম মানুষেরা নিজেদের মধ্যে অনেক প্রতিভা লুকিয়ে রাখে। যথাযথ ও সংবেদনশীল আচরণ ও শিক্ষার মাধ্যমে তাদের অবস্থারও অনেক উন্নতি করা সম্ভব। এদের কেউ কেউ হয়ে উঠতে পারে চমৎকার চিত্রশিল্পী, বেহালাবাদক, এমনকি আশ্চর্য হওয়ার মত গণিতজ্ঞ বা বিজ্ঞানী।

সত্য কথা হলো এই যে, একই পরিমান মর্যাদা ও সহানুভূতি সব মানুষেরই নির্বিশেষে প্রাপ্য। আমরা যদি সকল ব্যক্তিকে নিজসম মর্যাদা দিতে ও সকলকে গভীরভাবে ভালবাসতে শিখি তবে কোনো ক্ষেত্রেই আলাদাত্বের আবশ্যক হবে না।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী