ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

রমজান মাসে আল্লাহ কোরান অবতীর্ণ করা শুরু করেন। যে রাতে প্রথম কোরান নাজিল হয় সে রাতকে আল্লাহ মহিমান্বিত রাত ও মর্যাদার রাত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এ রাতের মহিমা ও মর্যাদা কোরানের জন্যই, কোরানের মহিমা ও মর্যাদার জন্য। আল্লাহ কোরানের মাধ্যমে ঘোষণা করেছেন নিজের এবং জগতে মানুষের মহিমা ও মর্যাদা। কাজেই এ রাত হয়ে উঠেছে প্রকৃত প্রস্তাবে আল্লাহ ও মানুষের মহিমা আর মর্যাদার রাত। কোরান এসেছে মানুষের পথ-নির্দেশনার জন্য। এ রাতেই শুরু হয়েছিল মানুষের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞা পূর্ণ বিষয়াদির নিষ্পত্তি এবং মানুষের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় শান্তির সম্প্রসারিত বার্তা। এ রাত তাই আমাদের কাছে সহস্র মাসের চেয়েও উত্তম রাত।

এ রাত রমজান মাসের রাত এবং রমজান মাসের শেষ দশ দিনের কোনো এক বেজোড় রাত। কাজেই রমজান মাস এবং এ মাসের শেষ দশ দিন আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আল্লাহ এ মাসকেই বেছে নিয়েছেন মানুষের জন্য বিশেষ সাধনার মাস হিসেবে। এই সাধনাই সিয়াম সাধনা। তদুপরি, এ মাসের শেষের দশ দিনে আমরা পালন করি আরও কঠোর সাধনা যাকে বলা হয় এতেকাফ। উদ্দেশ্য একটিই আর তা হলো তাকওয়া অর্জন। তাকওয়া বলতে বোঝায় সচেতনতা, সংযম, বিচারশীলতা, সতর্কতা। এ সচেতনতা যেমন আল্লাহ সম্বন্ধে, তেমনই নিজের সম্বন্ধে, তেমনই জীবনে দায়িত্বের গুরুভার সম্বন্ধে।

কোরান মানুষের প্রকৃত পরিচয় ও তার জন্য পথের দিশা প্রদানকারী গ্রন্থ। এ গ্রন্থের এপ্রোচ যেমন দার্শনিকতামণ্ডিত তেমনই তার শিক্ষাও অত্যুন্নত। এ শিক্ষা সম্বন্ধে জার্মান কবি গ্যাটে বলেছেন, “দেখুন, এ শিক্ষা কথনও ব্যর্থ হয় না। আমাদের সকল ব্যবস্থা-বিধান দিয়েও আমরা এটিকে অতিক্রম করে যেতে পারি না। সাধারণভাবে বলতে গেলে, কোনো মানুষই তা পারে না।”[১] গ্যাটের এই বোধ এতোই প্রগাঢ় ছিল যে, তিনি তাঁর ‘ডিভান’ কাব্যে কোরানকে সাব্যস্ত করেছেন ‘দি বুক অব বুকস’ হিসেবে।[২] রমজান মাস এবং কদরের রাত মানব জাতির ইতিহাসে মানুষের সাথে তার প্রতিপালকের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ যোগাযোগের মাস ও রাত।

আমাদের কাছে কোনো বার্ষিকী উদযাপন যদি গুরুত্বপূর্ণ হতো এবং আনন্দ করাই যদি আমাদের উদ্দেশ্য হতো তবে এই রমজান মাস ও কদরের রাতই হতো আমাদের কার্নিভালের জন্য সবচেয়ে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত মাস ও রাত। কিন্তু আল্লাহ আমাদের জন্য তা না করে এটিকে নির্ধারণ করলেন সাধনার মাস হিসেবে। কোরানের শিক্ষা হলো শান্তির শিক্ষা; শান্তি আসে অহিংসা, মমতা ও ন্যায় বিচার থেকে। এই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন আমাদের রিপু ও বাসনাগুলোকে বৈধ পর্যায় থেকে আরও সংকুচিত করা যেন আমরা সংযম অর্জন করতে পারি। এই সংযমসাধনার জন্য ক্রমাগতভাবে একমাস নির্ধারণ করা হয়েছে। এই একমাস সাড়া বিশ্বের মুসলিমরা দিনের বেলা পানাহার ও যৌনাচার পরিহার করে, সাড়া মাস ধরে কঠোরতা ও বিরোধ পরিহার করে এবং দানশীলতা চর্চা করে; তদুপরি, আল্লাহর সাথে নিজের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির জন্য তারাবিহসহ অধিক পরিমাণে উপাসনামূলক কাজে নিরত থাকে।

রমজান মাসের সাধনা একজনকে কালগত দুটি দিকের সাথেই সম্পৃক্ত করে। একদিকে আমরা অতীতের সাথে সম্পৃক্ত হই কৃত মন্দ কাজগুলোর এবং অমনোযোগিতা, ব্যর্থতা ও অবহেলার খতিয়ানের জন্য। সেজন্য আমরা ক্ষমা প্রার্থী হই আল্লাহর নিকট। অন্যদিকে, নিজেদেরকে প্রস্তুত করি ভবিষ্যতের জন্য। রমজান মাস আমাদের জন্য একই সাথে আত্মবিশ্লেষণের মাস, কোরান অনুযায়ী নিজেকে গড়ার বিশেষ প্রশিক্ষণ কাল এবং আমাদেরকে কোরান দানের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা বিশেষভাবে প্রকাশের কাল। সিয়াম সাধনা ও এতেকাফ থেকে আমরা এভাবে উপকৃত হতে পারি।

মানুষের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উন্নয়নে রোজা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই আমাদের পূর্ববর্তীদের বেলায়ও রোজার বিধান ছিল। আমরা সনাতন, বৌদ্ধ, ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মসহ সকল প্রধান ধর্মেই রোজার বিধান দেখতে পাই। আল্লাহ কোরানে এই মর্মে বলেন, “তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেয়া হল, যেমন বিধান ছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য, যেন তোমরা নিজেদেরকে রক্ষা করতে শিখ অশুভের হাত থেকে।”[৩] তাই রোজা কেবল খাবার ও সম্ভোগ থেকে বিরত থাকাকে বুঝায় না, সব রকমের অন্যায়-অশুভ চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা ও কাজ থেকে দূরে থাকাও বুঝায়।

জীবনকে ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই তবে জীবন হয় ভারসাম্যপূর্ণ, সুন্দর ও সার্থক। এই ন্যায়ের দুটি ক্ষেত্র আছে: একটি বৌদ্ধিক ও অপরটি ব্যবহারিক। বৌদ্ধিক ন্যায়পরায়ণতা উৎসারিত হয় চিন্তায় যৌক্তিক সঙ্গতির প্রতি আকর্ষণ ও সিদ্ধান্ত নেয়ার বেলায় তা বজায় রাখার চেষ্টা থেকে। যেখানে দ্বৈত নীতি, যৌক্তিক অসঙ্গতি সেখানে যুক্তি ভেঙ্গে পড়ে ও ন্যায় ক্ষুণ্ণ হয়। অন্যদিকে, ন্যায়ের অপর ক্ষেত্রটি সমাজ। এখানে দেয়া-নেয়ার ভারসাম্যের উপর নির্ভর করে ন্যায়পরায়ণতা। বেশী নেবার ও কম দেবার ইচ্ছা ও সে উদ্দেশ্যে প্রযুক্ত কৌশল আমাদেরকে সামাজিক ন্যায় থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

উভয় ক্ষেত্রেই, ন্যায় থেকে আমাদেরকে সরিয়ে আনে যে দুটো মানসিক ভাব তা হলো বাসনা ও অহংকার। বাসনা একজনের মানসিক ও ব্যবহারিক প্রয়াসকে চালিত করে ভোগের উপকরণ আহরণ ও সঞ্চয়ের দিকে। অহংকার আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে অন্যদের থেকে এবং আহরিত সবকিছু এককভাবে ভোগের দিকে ঠেলে দেয়। বাসনার সাথে সম্পর্ক আমাদের জীব-সত্ত্বার আর অহংকারের সাথে সম্পর্কিত আমাদের মনের রাজসিক ইচ্ছা। দুনিয়ায় যত শোষণ, বঞ্চনা ও অত্যাচার তা সবেরই সূতিকাগার এই বাসনা ও অহংকার। বাসনার দাসত্ব আমাদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় হিংসার পথে; আমাদেরকে বিযুক্ত করে মিলন ও প্রেম থেকে।

বাসনা ও অহংকারের বিপরীতে আছে অহিংসা ও প্রেম। এই অহিংসা ও প্রেম হলো ন্যায়পরায়ণতার দুই ভিত্তি। এই দুপায়ে ভর না দিয়ে ন্যায় যেন দাঁড়াতেই পারে না। কাজেই বাসনার রাশে লাগাম দাও, নিজেকে অবনত কর আল্লাহর কাছে। নিজেকে মুক্ত কর লোভের ও গর্বের আগুন থেকে; যুক্ত হও মানুষের সাথে, জগতের সাথে যেন জীবন হয়ে উঠে কানন। আমাদের সিয়াম সাধনা এই লক্ষ্যের সাধনা।

বছর ঘুরে আমাদের কাছে আবার এসেছে রমজান মাস। এ মাসে কাননের দ্বার উন্মুক্ত হয়, আগুনের দ্বার বন্ধ হয় এবং সকল অশুভের দল শৃঙ্খলিত থাকে। নিজেকে পরিশুদ্ধ করার, শোভামণ্ডিত করার, আল্লাহর সাথে ও অন্যদের সাথে নিজেকে আরও ঘনিষ্ঠ করার সাধনার এ মাসে আমরা আমাদেরকে চিন্তা, মনন, বাচন, আচরণ ও কর্মে আরও উন্নত করতে পারবো এবং সামনের দিনগুলো আমরা আরও সুন্দরভাবে যাপন করতে শিখব এই আশা নিজের জন্য এবং সকল সিয়াম সাধক পাঠক-পাঠিকার জন্য থাকল।M

[১]
ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন—ইকবাল, প্রথম বক্তৃতা।
The main purpose of the Qur’an is to awaken in man the higher consciousness of his manifold relations with God and the universe. It is in view of this essential aspect of the Quranic teaching that Goethe, while making a general review of Islam as an educational force, said to Eckermann: ‘You see, this teaching never fails; with all our systems, we cannot go, and generally speaking no man can go, farther than that.’

[২]
Whether the Koran is of eternity?
I don’t question that!
That it is the book of books
I believe out of the muslim’s duty.

[৩]
বিভিন্ন ধর্মের রোজা সম্বন্ধে জানতে হলে দেখুন:
http://en.wikipedia.org/wiki/Fasting
http://fasting.ygoy.com/

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী