ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

পৃথিবীর অন্য জাতিগুলো কম্পিউটার কিবোর্ড লেআউট নিয়ে কী করেছে, কতদূর করেছে তা আমি জানি না। কিন্তু আমরা বাংলাদেশিরা সম্ভবত অন্য সকল ভাষাকে ছাড়িয়ে গিয়েছি কিবোর্ড লেআউটের সংখ্যার দিক থেকে। আমাদের যতগুলো আছে, ততগুলো লেআউট অন্য কোন ভাষার কপালে সম্ভবত জুটেনি। এই নানা ধরণের কিবোর্ড নিয়েই কম্পিউটারে বাংলা তার আসন প্রতিষ্ঠিত করেছে। অফিস-আদালতে, পথে-ঘাটে, বাসা-বাড়ীতে এখন বাংলায় হরদম টাইপ হচ্ছে কম্পিউটার ব্যবহার করে। ডকুমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, ওয়েব পেইজ বাংলায় তৈরি হচ্ছে। কিন্তু নানা কোড, সফটওয়্যার ও ফন্টের অত্যাচারে নানা বিচ্ছিন্ন বলয় তৈরি হয়েছে। একজনের কাজ অন্যে শান্তি মতো ব্যবহার করতে পারছে না।

আমার তৈরি ডকুমেন্ট যদি কেবল আমার ব্যবহারের মধ্যেই সীমিত থাকতো তবে কোন সমস্যা ছিল না। কিন্তু কম্পিউটার তো আর মেকানিক্যাল টাইপ রাইটার নয়। একবার টাইপ করে ফেললাম, কাগজে লিখা হয়ে গেল – তো ল্যাঠা চুকে গেল, এমন তো না। এখানে ডকুমেন্ট শেয়ার করার দরকার আছে। এটি করা না গেলে কম্পিউটার ব্যবহার হাস্যকর পর্যায়ে থেকে যায়। কিন্তু এখানে বাধ সেজেছে ফন্ট। ফন্টের মধ্যে কোন সার্বজনীনতা নেই। অপারেটিং সিস্টেমের ভার্সন, অ্যাপ্লিকেশনের ভার্সন এবং কিবোর্ড সফটওয়্যারের প্রস্তুতকারীর ভিন্নতা এমনকি একই প্রস্তুতকারীর সফটওয়্যারে ভার্সনের ভিন্নতা – সবই এখানে একের তৈরি ডকুমেন্ট অন্যের দ্বারা ব্যবহার ও পরিমার্জন ক্ষেত্রবিশেষে আপদজনক ও ক্ষেত্রবিশেষে অসম্ভব হয়ে আছে। শুধু কি তাই? অপারেটিং সিস্টেম আপগ্রেড করলাম, তো বাধ্য হয়ে ‘বিজয়’ বদলাতে হল, বিজয় বদলালাম তো ফন্ট কালেকশন বদলে গেল, ফন্ট বদলালো তো আমি আমার আগের তৈরি ডকুমেন্ট নিয়ে নিজেই পড়লাম বিপদে – একগাদা যুক্তাক্ষর উল্টোপাল্টা হয়ে গেল।

যে কাজ সরকারের করার কথা ছিল, সে কাজে নেমেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পাল্লা দিয়ে, একের পর এক বেড়িয়েছে কিবোর্ড লেআউট। কোন্ কীবোর্ড লেআউট এফিসিয়েন্সি বিচারে উত্তীর্ণ – বলা দুষ্কর। এজন্য যত গবেষণা দরকার ছিল তা এ প্রতিষ্ঠানগুলো যে ভাল মতো করেছে – তা বিশ্বাস করা সহজ নয়। তার উপর আছে লেআউটের উপর ব্যক্তির সত্ত্ব। আর কতদিন লেআউটের উপর ব্যক্তির সত্ত্ব মেনে চলবে সরকার? সফটওয়্যারের উপর সত্ত্ব থাকবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু লেআউটের উপর স্বত্বাধিকারের অবসানের সময় কি এখনও আসেনি?

স্ট্যান্ডার্ড ছাড়া সার্বজনীন ইন্টার অপারেবিলিটি হয় না। বাটখারা সরকারকেই নির্ধারণ করতে হয়। এদেশে কম্পিউটারের প্রসার বেসরকারি খাতেই হয়েছে। সরকারের বা প্রশাসনের কাছ থেকে এক শুল্ক মুক্তি ছাড়া আর কোন সহায়তা আগের সরকারগুলোর কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। বর্তমান সরকারের আমলে কম্পিউটারায়ন ও আইটি’তে সরকারী দপ্তরসমূহে অনেক কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে। সরকারী অফিসগুলো অনেক সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাংলায় লেখার বিষয়ে প্রথম কাজটি যে কী সরকার এখনও তা বুঝে উঠতে পেরেছে বলে মনে হয় না। এর কারণ কী? বেসরকারি পর্যায়ের যাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে সরকার কাজ করে তারা এ বিষয়ে জট খোলার বুদ্ধিটা সরকারকে স্পষ্টভাবে দিচ্ছেন না বলেই প্রতীয়মান হয়।

ডাটাবেজ ছাড়া আইটি হয় না। অক্ষরের কোডে যে বাইনারি মান নির্ধারণ করা হয় তার উপর নির্ভর করে তৈরি হয় সর্টিং, ফিল্টার ইত্যাদি। এখানে ইউনিকোডের বিকল্প নেই। তাছাড়া ফন্টের জন্য ব্যবহৃত ইউনিকোড ব্যতীত অন্য সব কোড অফিসিয়াল বা স্ট্যান্ডার্ড কোনটিই নয়। আমাদের বাংলাদেশের বাংলা ভাষার চিহ্নগুলোর ইউনিকোড এখনও সন্তোষজনক অর্ডার দেয় বলে দেখছি না। সমস্যাগুলো দ্রুত সরকারকেই সমাধান করতে হবে। ইউনিকোডের বাংলা ফন্ট ফ্যামিলি এখনও দরিদ্র। সরকার নিজেই ফন্ট তৈরির কাজ সম্পন্ন করে ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করতে পারে।

সকল অফিস আদালতে ইউনিকোড ব্যবহার করাকে ঘোষণা দিয়ে বাধ্যতামূলক করার সময় আর কতদূর? এবং এজন্য যা যা করণীয় তা দ্রুত সম্পন্ন করা কি সম্ভব নয়? যাদের সন্তানেরা এখন ছোট, তাদের জন্য একটি এফিসিয়েন্ট কিবোর্ড লেআউট এখনই প্রয়োজন। কেবল প্রশাসনের পক্ষেই এটি দেয়া বা নির্ধারণ করা সম্ভব। এই প্রথম প্রয়োজনীয় কাজটি না করেই আমরা অনেক দূর যাওয়ার জন্য দৌড়চ্ছি। প্রশাসন একটি পরিকল্পনা হাতে নিক, টাইম লাইন ঠিক করুক, ট্রানজিশনের ফ্রেম ঠিক করে দিক। এবং সেটি প্রচার করুক।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী