ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

বছর খানেক আগে ইউটিউবে একটি বিতর্কের ভিডিও দেখেছিলাম। বিতর্কের একপক্ষে তিন জন খ্রিষ্টান পণ্ডিত ও অন্যপক্ষে তিন মুসলিম। মুসলিম পক্ষের তিনজন ছিলেন জামাল বাদাবি, গ্যারি মিলার ও জেফফ্রি ল্যাং। খ্রিষ্টান পক্ষের একজন ইসলাম ধর্মকে অত্যন্ত কঠোর ও তার বার্তাকে অত্যন্ত কঠিন বলে সাব্যস্ত করেন ও তার বিপরীতে খ্রিষ্টের ধর্ম ও বাণীকে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও সহজ বলে আখ্যায়িত করেন।

আমরা যদি যিশুর কথা শুনি তবে দেখি, তিনি ভারাক্রান্ত ও যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষকে ডাকছেন মমতার সাথে এবং শোনাচ্ছেন শুভসংবাদ। অন্যদিকে মুহম্মদের কণ্ঠে প্রকাশ্য প্রচারের সেই প্রথম দিন থেকেই মানুষ শুনে এসেছে কঠোর সতর্কবাণী। মক্কায় তিনি পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে সমবেত মক্কাবাসীকে সম্বোধন করে বলেছিলেন এই মর্মে, “আমি যদি বলি এই পাহাড়ের ওপারে শত্রুসেনারা তোমাদেরকে আক্রমণ করতে সমবেত হয়েছে, তবে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে না? এই আমি তোমাদেরকে বলছি তোমাদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন, তোমরা সতর্ক হও, ভয়ানক এক বিচারের দিন আসন্ন।”

পূর্বেকার ধর্মগুলো থেকে ইসলাম ধর্মের রূপগত পার্থক্যটি এ প্রসঙ্গে বিরাট। এর কারণ কী? একটি উদাহরণ দিলে বুঝতে সহজ হবে। আমরা যখন শৈশবে থাকি বা কৈশোরে থাকি তখন আমাদের পিতামাতা বা শিক্ষকেরা আমাদেরকে সবসময় আশার বাণী শোনান, পুরস্কৃত করেন। এই আমি যখন বড় হই ও কোন দপ্তরে চাকুরী নেই তখন কিন্তু বেতন-বোনাস-ইনসেন্টিভের কথা প্রথমে শুনি না। যা প্রথমেই আমার নিয়োগকারী আমার মনে সঞ্চালন করতে চান তা হলো আমার কর্তব্যভারের বিশালতা সম্বন্ধে বোধ এবং আমার সামনের চ্যালেঞ্জগুলোর পরিচয়। এখানে সতর্কতা ও সচেতনতাই প্রথম বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠে।

আমরা জানি মুহম্মদ আল্লাহর শেষ বাণীবাহক ও কোরান আল্লাহর শেষ গ্রন্থ। কাজেই মানব জাতি সাবালক হয়ে উঠার পরই যে শেষ নবী আসবেন তা-ই তো স্বাভাবিক এবং তিনি যে এভাবেই শুরু করবেন তা-ও স্বাভাবিক। এখন প্রশ্ন হলো এ ভার কতটা গুরু? কোরানের একটি আয়াত উল্লেখ করাই এজন্য যথেষ্ট হতে পারে।

“Verily, We did offer the trust to the heavens, and the earth, and the mountains: but they refused to bear it because they were afraid of it. Yet man took it up. Verily, he has proved to be unjust and most foolish.” (Koran 33:72)

“নিশ্চয়ই আমরা আকাশের কাছে, পৃথিবীর কাছে এবং পর্বতমালার কাছে ভার গ্রহণের প্রস্তাব করেছিলাম: কিন্তু তারা তা বহন করতে নারাজ হয়েছিল, কারণ তারা ভীত হয়েছিল। মানুষ তা গ্রহণ করল। কিন্তু সে নিজেকে অত্যাচারী ও নির্বোধ প্রতিপন্ন করেছে।” (কোরান ৩৩:৭২)

এই আমানত বা দায়ভার হলো যুক্তি, ইচ্ছা, ব্যক্তিত্ব, ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য, অহং, দায়িত্ব, মর্যাদা ইত্যাদির দায়ভার। যে দায়ভার আকাশ, পৃথিবী বা পর্বতমালার বহন-অসাধ্য, যা গ্রহণ করতে তারা সভয়ে পিছিয়ে গেল সে ভার কত বিরাট! কোরানে উল্লেখিত আল্লাহর দেয়া এই উপমা জগতে মানুষের বিরাটত্বকে যেমন কুলে ধরে তেমনই প্রকাশ করে মানুষের দায়ভারগত নাজুক অবস্থা।

অন্যদিকে, এই অত্যাচার ও নির্বুদ্ধিতা যে কী পরিমাণ বিশাল তা সম্বন্ধে মানুষ নিজেই যথেষ্ট সাক্ষী। মানব জাতির বিকাশের ইতিহাস বঞ্চনা, শোষণ, প্রতারণা ও অত্যাচারের ইতিহাস। মানুষের নির্বুদ্ধিতার এটাই চরম প্রমাণ। সর্বকালেই মানুষেরা অসন্তুষ্ট ছিল নিজেদের কর্মকাণ্ডে; আজও আমরা সন্তুষ্ট নই নিজেদের উপর – কি সভ্যতা-গর্বিত পশ্চিমের দেশগুলো, কী আমাদের মত দিশেহারা দেশগুলো। দার্শনিক, কবি ও শিল্পীরা বিরামহীনভাবে চিত্রিত করে চলেছেন মানুষের অত্যাচার আর নির্বুদ্ধিতার করুণ ইতিহাস।

ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, পরিবারে পরিবারে, শ্রেণীতে শ্রেণীতে আর জাতিতে জাতিতে সম্পদের জন্য মানুষের চলছে উন্মত্ত প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ, লুণ্ঠন আর শোষণ। অথচ ইতিহাসের সকল স্তরেই মানুষ ছিল এবং আছে আল্লাহ ও তাঁর বিচারে বিশ্বাসী। এই অত্যাচার আর নির্বুদ্ধিতা আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতারই নামান্তর এবং কার্যতঃ, বাস্তবতঃ চূড়ান্ত ন্যায় বিচারকে প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া অন্য কিছু নয়। ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা আমাদের জীবন নিয়ে এই মঞ্চে আবির্ভূত।

মানুষে মানুষে ও জাতিতে জাতিতে সম্পর্ক এখন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, জীবন এখন জটিল হয়েছে, বিশ্ব হয়ে পড়ছে একটি গ্রামের মত। কাজেই প্রতিটি ব্যক্তি-মানুষের উপর কর্তব্য ও দায়িত্বের যে ভার তা পাহাড়সম ভার। এ ভার সম্বন্ধে সচেতনতা আধুনিক মানুষের নৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সোপান, মুসলিম জীবনের সূচনা বিন্দু। এই সচেতনতাকেই কোরানে বলা হয়েছে তাকওয়া। সুরা ফাতিহার পর কোরানে প্রথমেই লিখিত আছে যে, এই কোরান থেকে দিকনির্দেশনা পেতে পারে কেবল তাকওয়ার অধিকারীগণ। রমজান মাসের সিয়াম সাধনার লক্ষ্যও তাকওয়া অর্জন। আল্লাহ তাকওয়ার অধিকারীদের ভালবাসেন ও তাদের সাথে থাকেন।

মানুষ নিজের সত্ত্বার কাঠামোগত দিক থেকে এক অত্যুন্নত ও বিস্ময়কর সৃষ্টি। কিন্তু একই সাথে সে নিজেকে দেখতে পায় এক নাজুক অবস্থায়। তার চিন্তা ও কাজ নিজের জন্য যেমন, অন্যের জন্যও তেমন ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাছাড়া নিজের ও অন্যের ভাল করার কাজেও সে নিজের সবটুকু সামর্থ্য প্রয়োগে বিস্তর অবহেলাও করে থাকে। আমরা সাধারণভাবে দেখতে পাই যে, মানুষ সদাই নিজের সুখের বিষয়আশয় নিয়ে মশগুল এবং অন্যের প্রতি তার সক্রিয় দায়িত্বকে সে এড়িয়েই যায় যাবত সামাজিক নিন্দা বা রাষ্ট্রীয় শাসনের মুখোমুখি না হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অথবা বলা যায়, প্রমোশন, বেতনবৃদ্ধি বা বেশী পার্থিব লাভের প্রত্যাশা দ্বারা তার ‘দায়িত্বশীল’ আচরণ অনেকখানি প্রভাবিত হয়। এধরণের দায়িত্বশীলতার মধ্যে প্রচুর ফাঁকি থেকে যায় এবং নৈতিক উৎকর্ষতা সাধন বাধাগ্রস্ত হয়।

আল্লাহ আমাদের মনে দায়িত্বের গুরুভার সম্বন্ধে সচেতনতা তৈরি করতে চান। এ ভার বয়ে নেয়াকে যদি পথচলার সাথে তুলনা করা যায় তবে সে পথটি হবে চুলের মতো সূক্ষ্ম ও ক্ষুরের মতো ধারাল। একই সাথে আল্লাহ আমাদেরকে পার্থিব কোন কিছুর নিকট থেকে প্রতিদান পাওয়ার প্রত্যাশা পরিহার করতে বলেন এবং নিজের ক্রিয়াকলাপের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে বলেন যেন শৈথিল্যকে পরিহার করা যায়, প্রয়াসকে ক্রমাগতভাবে প্রসারিত ও বেগবান করা যায় – এছাড়া সম্ভাবনার সর্বাধিক স্ফুরণ তো সম্ভব নয়।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী