ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

কিসান বাবুরাও হাযারে (Kisan Baburao Hazare), যিনি আন্না হাযারে নামে সমধিক পরিচিত, ১৯৩৭ সালের ১৫ই জুন ব্রিটিশ ভারতের বোম্বে প্রদেশে (এখনকার মহারাষ্ট্র) জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৯০ সালে পদ্মশ্রী ও ১৯৯২ সালে পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত আন্না হাযারের বয়স এখন ৭৪। সেনাবাহিনীতে চাকুরী করা সহ তাঁর জীবন হয়ে আছে নানা কর্মে ভাস্বর।

নিজের ছোট্ট গ্রামটিকে তিনি দুর্বিষহ দশা থেকে তুলে এনেছেন এবং সমস্ত ভারতের জন্য এটিকে করে তুলেছেন আদর্শ গ্রাম হিসেবে। গান্ধীর অনুসারী আন্না হাজারে মহারাষ্ট্রের একটি গ্রামের পর্যায় থেকে আজ ভারতের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাতির কণ্ঠস্বর এবং চালকের ভূমিকায় অধিষ্ঠিত হয়ে উঠেছেন। তিনি একজন ব্যক্তি। ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামের মূর্ত প্রকাশ। তিনি এই সংগ্রামকে দিয়েছেন ভাষা এবং চলৎশক্তি, এবং একে নিয়ে গিয়েছেন সরকারের মূল দুর্গের দুয়ার পর্যন্ত। সরকার আজ তাঁর ছুড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি – ভাবতে বাধ্য হচ্ছে সক্রিয়ভাবে।

রালেগাঁও সিদ্ধির (Ralegaon Siddhi) রূপান্তর

১৯৭৮ সালে সামরিক বাহিনীর চাকুরী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে হাযারে নিজ গ্রাম রালেগাঁও সিদ্ধিতে ফিরে যান। গ্রামটি মধ্য মহারাষ্ট্রের আহমেদনগর জেলায় অবস্থিত। এটি ছিল খরাপ্রবন ও বৃষ্টি-না-হওয়া অঞ্চলে অবহেলা, হতাশা, বঞ্চনা ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতায় আক্রান্ত এক হতদরিদ্র্য গ্রাম। হাযারে এটিকে করে তুলেন সমগ্র ভারতের জন্য একটি আদর্শ গ্রাম।

তিনি মদ্যপানকে এমন একটি ক্ষতিকর অভ্যাস হিসেবে দেখলেন যা সবার আগে বন্ধ করা আবশ্যক বলে ঠিক করলেন। তিনি মদ্যপান থেকে গ্রামবাসীকে সরিয়ে আনলেন এবং মদের সব সরাইখানা ও প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাম থেকে নিশ্চিহ্ন করলেন। একাজের উদ্দেশ্যে তিনি যুবকদেরকে নিয়ে তরুণ মণ্ডল গঠন করেছিলেন এবং গ্রামবাসীকে মন্দিরে নিয়ে মদ্যপান পরিহার করতে উদ্বুদ্ধ ও সম্মত করেছিলেন। তিনি মহারাষ্ট্র সরকারের কাছে দাবী করেন যে, কোন গ্রামের ২৫% নারী যদি মদপান নিষিদ্ধ করার আবেদন করে তবে যেন সে গ্রামে তা নিষিদ্ধ করা হয়। ২০০৯ সালে সরকার কিছু পরিবর্তনসহ তাঁর দাবী মেনে নেয়। তিনি নিজে মাতালদের মন্দিরের পিলারের সাথে বেঁধে তাঁর আর্মি বেল্ট দিয়ে পিটিয়েছেন অবধি।[১]

১৯৮০ সালে আন্না হাযারে মন্দিরকে কেন্দ্র করে একটি শস্য ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। ধনী কৃষকরা উদ্বৃত্ত শস্য থেকে ব্যাংকে দান করতো। এভাবে গড়ে তোলা ব্যাংক থেকে খরার সময় ও শস্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে দরিদ্র কৃষকদেরকে সহায়তা করা হতো। তাছাড়া তিনি গ্রামে জলাধার তৈরি করেন, শিক্ষার বিস্তার করেন, দুধের উৎপাদন বৃদ্ধি করেন, কাস্ট সিস্টেম অনেকাংশে বিলুপ্ত করে দলিতদের অবস্থার উন্নতি করেন। এখন হাযারের গ্রাম ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপ দ্বারা স্বীকৃত একটি আদর্শ গ্রাম।

গ্রামের মানুষেরা তাঁকে শ্রদ্ধা করে। রালেগাঁও সিদ্ধির স্কুল শিক্ষক থাকারাম রাউত বলেন, “আন্নাকে ধন্যবাদ, আমাদের এখন স্কুল হয়েছে, বিদ্যুৎ হয়েছে, কৃষকদের উন্নয়নে অনেক স্কীম হয়েছে।”

বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন

১৯৯১ সালে আন্না হাযারে গড়ে তোলেন ‘ভ্রষ্টাচার বিরোধী জন আন্দোলন’। এবছরেই তিনি ৪০জন বন কর্মকর্তা ও কাঠ ব্যবসায়ীর যোগসাজশের বিরুদ্ধে কথা বলেন। তার আন্দোলনের ফলে এই কর্মকর্তাদের বদলি ও বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তিনি গ্রামের উন্নয়নে বাঁধা সৃষ্টিকারী দুর্নীতিগুলোর বিরুদ্ধে সর্বদাই সোচ্চার ছিলেন।

১৯৯৫ সালে তিনি মহারাষ্ট্রের সেনা-বিজেপি সরকারকে বাধ্য করেছিলেন দুই কেবিনেট মন্ত্রীকে মন্ত্রীসভা থেকে বাদ দিতে। ২০০৩ সালে তিনি প্রাদেশিক কংগ্রেস-এনসিপি সরকারকে বাধ্য করেছিলেন চার মন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে। প্রাদেশিক বা কেন্দ্রীয় উভয় সরকারের সাথেই তাঁর সম্পর্ক বেশ নাজুক থেকেছে সর্বদাই।

সেনাবাহিনীর চাকুরী তিনি ছেড়েছেন ঠিকই কিন্তু যুদ্ধ ছাড়েননি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি একের পর এক যুদ্ধ করে চলেছেন। তিনি তথ্য অধিকারের জন্য লড়েছেন এবং সরকারকে দিয়ে তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করিয়ে ছেড়েছেন। এখন লড়ছেন দুর্নীতি দমনের উদ্দেশ্যে আরও শক্তিশালী লোকপাল বিলের জন্য।

তাঁর আন্দোলন কর্মসূচি বলতে তাঁর একার অনশন। এক ব্যক্তি কিভাবে একটি সংগঠন হয় তার অনন্য উদাহরণ আন্না হাযারে।

***
[১] দেখুন: http://www.readersdigest.co.in/anna-hazare?page=2
[২] দেখুন: http://www.ndtv.com/article/india/who-is-anna-hazare-96883

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী