ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

জ্ঞানতাত্বিক দিক থেকে কোরানে বিধৃত আদর্শখানি যৌক্তিকভাবে সুবিন্যস্ত এবং প্রায়োগিক মূল্য বিচারে এটি নিজেকে সফল হিসেবে দেখাতে পারে। এ শিক্ষা আমাদের জীবনকে সন্তুষ্ট করে এবং জীবনের সর্বাঙ্গীণ ও সুসমঞ্জস বিকাশে সহায়ক হয়। অন্যদিকে, রাসুলের ও তাঁর নিকট আসা প্রত্যাদেশের ঐতিহাসিকতা অন্য আরেকটি অনবদ্য জ্ঞানতাত্বিক বিষয়। মানুষের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে এবং রয়েছে একটি প্রকৃতি। কোরানের আদর্শটি এই প্রকৃতির সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই দিকটি লিওপোল্ড উইস (পরবর্তীতে মুহম্মদ আসাদ নামে পরিচিত হন) দেখেছিলেন কোরান পড়তে গিয়ে। তিনি বলেন, “Islam appears to me like a perfect work of architecture. All its parts are harmoniously conceived to complement and support each other; nothing is superfluous and nothing lacking; and the result is a structure of absolute balance and solid composure.” ফলে একজন বিশ্বাসী মানসিকভাবে এমন একটি দৃঢ় অবস্থান পান যা থেকে তাঁকে টলানো সম্ভব হয় না।

বিশ্বাসীদের চতুর্থ অধিনায়ক আলী বিশ্বাসীর জীবনের দৃঢ়তাকে তুলনা করেছেন পর্বতের দৃঢ়তার সাথে। এই দৃঢ়তাকে কোরানে দুটো শব্দ দ্বারা নির্দেশ করা হয়েছে: যুহদ ও সবর। যুহদ হলো মানসিক দৃঢ়তা এবং সবর হলো ব্যবহারিক জীবনে দৃঢ়তা। যুহদ শব্দটি দ্বারা বুঝায় বৈরাগ্য, অনুকূল ও প্রতিকূল, সম্পদ ও বিপদ উভয় পরিস্থিতিতে মনের অচঞ্চল অবস্থা, অর্থাৎ মনের নিষ্কাম দশা। সবর অর্থ ধৈর্য; কঠিন প্রতিকূল অবস্থাতেও পা দৃঢ় রেখে ঋজু অবস্থায় বিরাজ করা। অনন্তকালের প্রেক্ষাপটে নিজের কর্মকে দেখতে পারা ও আল্লাহর উপর নির্ভরতা থেকে আসে যুহদ ও সবর।

যারা একটি আদর্শ বেছে নিয়ে সে অনুযায়ী চলতে চায় কিন্তু মনে বল পায় না, মনে দ্বিধা থেকে যায় তাদের চিত্রটি কোরানে এভাবে আঁকা হয়েছে, “And among mankind is he who worships Allah on an edge. If good befalls him, he is content with it; and if a trial befalls him, he turns on his face. He has lost this world and the life to come. That is the clear loss.” (“মানুষের মধ্যে এমন জনও বিদ্যমান যে আল্লাহর উপাসনা করে প্রান্তবর্তী হয়ে। যদি তার মঙ্গল হয় তবে সে তুষ্ট থাকে, যদি বিপদগ্রস্ত হয় তবে পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে পার্থিব জীবনে এবং অনাগত জীবনে নিজের ক্ষতি করল। এ ক্ষতিই স্পষ্ট প্রতিভাত ক্ষতি।” কোরান ২২:১১)

এখানে আমরা আল্লাহর এমন এক উপাসকের চিত্র পাই যে আল্লাহর কাছে নিজের ইচ্ছাকে আত্মসমর্পণ না করে বরং আল্লাহকে পেতে চায় তার কামনা-বাসনার ধন সরবরাহকারী হিসেবে। এখানে জীবনকে আধ্যাত্মিকভাবে ও নৈতিকভাবে উন্নত করার সংগ্রাম হিসেবে না দেখে দেখা হয় পার্থিব সুখপ্রদায়ী সামগ্রীর অর্জনের মধ্যে। এই ভ্রান্ত লক্ষ্য শেষ পর্যন্ত জীবনকে একটি বিয়োগান্ত নাটকে পর্যবসিত করে।

যুহদ একটি মানসিক অবস্থা যা প্রজ্ঞা থেকে উৎসারিত হয়, নিছক আকারী উপাসনামূলক কর্মকাণ্ড থেকে অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হয় না। ভক্তিমূলক উপাসনা এটি অর্জনে সহায়ক বটে, কিন্তু চিন্তাবর্জিত মন নিয়ে উপাসনায় কাঙ্ক্ষিত ফল না-ও অর্জিত হতে পারে।

কোরানের একটি আয়াতাংশ থেকে মনের বৈরাগ্যদশা বা নিষ্কামচিত্ততার পরিচয় পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, “So that you may not grieve over what has escaped you, nor exult at what has come to you. And Allah does not love any self-deluded boaster.” (“এটি এজন্য যে তোমরা যা হারিয়েছ তার জন্য যেন তোমরা বিমর্ষ না হও, এবং যা পেয়েছ তার জন্য হর্ষোৎফুল্ল না হও। আল্লাহ স্বপ্রতারিত দাম্ভিকদের ভালবাসেন না।” কোরান ৫৭:২৩)

একারণে একজন বিশ্বাসী রাজপুত্র এবং একজন বিশ্বাসী ভিখারীপুত্রের মধ্যে মনোগত কাঠামোর দিক থেকে বা সাংস্কৃতিক দিক থেকে ফারাক খুঁজে পাওয়া কঠিন। ওমর এবং তাঁর গৃহসেবক একসাথে থাকা অবস্থায় অপরিচিত আগন্তুকের পক্ষে কোন জন মুসলিম সাম্রাজ্যের অধিকর্তা তা বোঝা অসম্ভব ছিল। আগন্তুককে জিজ্ঞেস করতে হতো যে, তাদের মধ্যে কে ওমর। ওমর যখন জেরুসালেম গিয়েছিলেন তখন সেখানকার যাজকগণ তো রীতিমতো ভুল করে সহযাত্রী সেবককেই খলিফা বলে সম্ভাষণ জানাতে এগিয়ে এসেছিলেন।

ব্যবহারিক জীবনে ধর্মের এক অর্ধাংশ হচ্ছে ধৈর্য ও অন্য অর্ধেক হলো অন্যদের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে চলা। যেখানে ধৈর্য নেই সেখানে ধর্ম নেই। সকল প্রতিকূলতায় বিপন্নবোধ না করে সাহসের সাথে তার মুখোমুখি হওয়া হচ্ছে ধৈর্য বা সবর। ধৈর্যের আর একটি রূপ হচ্ছে আলস্য ও বাসনার আক্রমনের বিপরীতে অবিচল থাকা। বিশ্বাসীদের নিছক বিশ্বাসের কারণে কিছু মানুষ তাদেরকে শত্রু ভাবতে শুরু করে। কোরানে ধৈর্যের উপদেশ এসেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব মানুষের বাচনিক ও ব্যবহারিক আগ্রাসন ও অত্যাচারের বিপরীতে। কোরান থেকে ধৈর্য সংক্রান্ত কয়েকটি আয়াত নীচে দেয়া হলো।

“O you who believe! Be steadfast, patient and constant. Remain conscious so that you may be successful.” (“হে বিশ্বাসীরা! সুদৃঢ় থাক, ধৈর্যশীল হও এবং অবিচলিত থাক। সচেতনতা বজায় রাখ যেন তোমরা সফল হতে পার।” কোরান ৩:২০০)

“So be patient. Indeed, the Promise of Allah is true. And let not those who have no certainty regarding life-world take you in light estimation.” (ধৈর্যশীল হও। নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। জীবন-জগতের কোন বিষয়েই যাদের কোন নিশ্চয়তাবোধ নেই তারা যেন তোমাকে হালকাভাবে পরিগণনা করতে না পারে।” কোরান ৩০:৬০)

“But be patient with a patience fair to see.” (ধৈর্যশীল হও, দৃষ্টিনন্দন ধৈর্য সহকারে।” কোরান ৭০:৫)

সাধারণত মানুষ যাকে বলে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা, একজন বিশ্বাসী সেরকম নিরাপদ পরিবেশেও নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারেন না। তিনি সেখানেও নিজের চিন্তা ও কর্মের শুদ্ধাশুদ্ধ নিয়ে বিচলিত থাকেন এবং নিজেকে খুব নিরাপদ বলে গণ্য করতে পারেন না। এটিও একটি মানসিক দৃঢ়তার লক্ষণ। অন্যদিকে, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্রের ঢেউয়ের উপর একা নিপতিত হলেও এবং চারদিকে ঘন অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখা না গেলেও বিশ্বাসী বিপন্ন বোধ করে না।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী