ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

প্রচলিত সভ্যতার সাথে সকল মহান ধর্মাদর্শের যেন চিরকালের বিরোধ। সভ্যতা দৌড়ায় বাসনা ও অহংকারের পায়ে ভর দিয়ে সুখের লক্ষ্যে। অন্যদিকে, ধর্ম উড়তে চায় অহিংসা ও প্রেমের ডানায়, অস্তিত্বের গভীরতর রহস্যের দিকে। আর তাই সভ্যতার সকল স্তরেই আমরা দেখি ফ্যারওদেরকে একদিকে ও বিপরীত দিকে দেখি নবীদেরকে। সভ্যতা আমাদের আদিম সুস্থ কাঠামোকে বিকৃত করে – যেভাবে ইটচাঁপা ঘাস বিবর্ণ হয়, আমাদের মধ্যে মিথ্যা আশা সঞ্চার করে ও আমাদেরকে বিভক্ত করে: আমরা ভাগ হয়ে যাই প্রভু ও দাসে, শোষক আর শোষিতে। ধর্মের মহান শিক্ষা আমাদেরকে দেখায় বিপরীত পথ – প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার পথ।

সিয়াম সাধনা সেই প্রকৃতির দিকে যাত্রার সাধনা। রমজানের এই সিয়াম সাধনা শেষে আসে ঈদুল ফিতর। এ হলো এই সাধনায় জয়ের আনন্দ। এই আনন্দ সুগভীর এক বোধ, সামনের নতুন ও শুভ জীবনের জন্য এক প্রত্যাশা। ‘ঈদ’ অর্থ আনন্দ এবং ‘ফিতর’ অর্থ প্রকৃতি; দুইয়ে মিলে হয়, ব্যক্তিগতভাবে মূল মানব প্রকৃতির পুনরুদ্ধার ও উদ্বোধনের সাধনায় বিজয়ের আনন্দ এবং সামাজিকভাবে সকলের মধ্যে মহামিলনের আনন্দ। তাই দীর্ঘ একমাসের রোজার পর আমরা উদযাপন করি প্রাকৃতিক উৎসব বা ঈদুল ফিতর।

এই আনন্দ কার্নিভালের উল্লাস-উচ্ছাস থেকে প্রকৃতিগত ভাবেই স্বতন্ত্র। মদিনাবাসীরা আগে থেকেই বছরে দুটি উৎসবে অভ্যস্ত ছিল; যা ছিল তাদের কার্নিভাল। এদিন দুটিতে তারা ঘর থেকে বেড়িয়ে আসত, সকলে মিলে নানা উপকরণে আনন্দ-উল্লাস করত এবং উৎসব শেষে যার যার ঘরে ফিরে যেত। এ যেন একের প্রকৃত দেশ নিয়ে অন্যের দেশে যাওয়া নয়, মাঝখানের নো-ম্যান্‌স ল্যান্ডে সাময়িক স্ফূর্তি। এতে যে একসাথে জড়ো হয়েও মহামিলনের ঘাটতি। নবী মদিনায় গিয়ে নগরবাসীদের বললেন, “আল্লাহ তোমাদেরকে এদুটির চেয়েও উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন।” সেই থেকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার প্রচলন।

মদিনাবাসীরা আগের রীতি পরিহার করে এখন একে অপরের বাড়ী যেতে শুরু করলো। বাড়ীই আসল দেশ, সেখানে আমরা দেয়াল তুলি, অন্যদের থেকে পৃথক হই এবং সেখানে অন্যের প্রবেশকে উৎপাত মনে করি। নিজের যা কিছু তা সব এখানে জড়ো করি, ও তা নিরাপদে কেবল নিজের করেই রাখতে চাই। নবীর অনুসারীরা নিজের বাড়ীর সম্পদ নিয়ে হাজির হতেন অন্যের বাড়ী। আর এতেই ছিল তাদের আনন্দ, এ আনন্দ যার-যার মত করে মাঠে নাচ, গান, সার্কাস, নাগরদোলা উপভোগের আনন্দ থেকে বৈপ্লবিকভাবে বিপরীতধর্মী। সেকাল থেকে একাল প্রায় চৌদ্দশ বছর – এতো অধঃপতনের পরও তার রেশটি আমাদের মাঝে আজও টিকে আছে অনেকখানি।

ঈদে আমরা সকলের সাথে মিলিত হই, ক্ষুণ্ণ সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হই। রমজানে আমরা আত্মগতভাবে নিজেদেরকে শুদ্ধ করি এবং এই শুদ্ধচিত্ত নিয়ে আমরা বাইরের সাথে নিজেকে মিলিত করেতে চাই ঈদের তিনদিন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘উৎসব’ প্রবন্ধে একটি সফল উৎসবের চিত্র এঁকেছেন এভাবে, “মিলনের মধ্যেই সত্যের প্রকাশ—সেই মিলনের মধ্যেই সত্যকে অনুভব করা উৎসবের সম্পূর্ণতা। একলার মধ্যে যাহা ধ্যানযোগে বুঝিবার চেষ্টা করি, নিখিলের মধ্যে তাহাই প্রত্যক্ষ করিলে তবেই আমাদের উপলব্ধি সম্পূর্ণ হয়।”

কিন্তু আমাদের সিয়াম ও আমাদের ঈদ কি কাঙ্খিতভাবে সফল হচ্ছে? যে সমাজ নানাভাবে বিভক্ত, যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত নিয়োজিত অবিচার আর অত্যাচারে, যে সমাজে একমাসের সিয়াম নিতান্তই হয়ে উঠেছে আনুষ্ঠানিকতা ও ঈদ হয়ে উঠেছে স্বার্থপরের সুখের উচ্ছ্বাস, সে সমাজে সিয়াম বা ঈদ শেষ বিচারে সম্পূর্ণ হচ্ছে না। অনুষ্ঠান বা উৎসবের আয়োজন যত সহজ এর অন্তর্গত মর্ম উপলব্ধি ও তার রূপায়ন তত কঠিন।

রবীন্দ্রনাথ আরও লিখেছেন, “স্বার্থপরতাকে আমরা জগতের একটা সুকঠিন সত্য বলিয়া জানিয়াছি, সেই স্বার্থপরতার সুদৃঢ় জালকে অনায়াসে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করিয়া দেয় প্রেম। যে হতভাগ্য দেশবাসীরা পরস্পরের সুখে দুঃখে সম্পদে বিপদে এক হইয়া মিলিতে পারে না, তাহারা জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ সত্য হইতে ভ্রষ্ট হইয়াছে বলিয়া শ্রী হইতে ভ্রষ্ট হয়—তাহারা ত্যাগ করিতে পারে না, সুতরাং লাভ করিতে জানে না—তাহারা প্রাণ দিতে পারে না, সুতরাং তাহাদের জীবনধারণ করা বিড়ম্বনা। তাহারা পৃথিবীতে নিয়তই ভয়ে ভীত হইয়া, অপমানে লাঞ্ছিত হইয়া দীনপ্রাণে নতশিরে ভ্রমণ করে। ইহার কারণ কী? ইহার কারণ এই যে, তাহারা সত্যকে পাইতেছে না, প্রেমকে পাইতেছে না, এইজন্যই কোনোমতেই বল পাইতেছে না। আমরা সত্যকে যে-পরিমাণে উপলব্ধি করি, তাহার জন্য সেই পরিমাণে মূল্য দিতে পারি – আমরা ভাইকে যতখানি সত্য বলিয়া জানি, ভাইয়ের জন্য ততখানি ত্যাগ করিতে পারি।”

আল্লাহর সাথে যুক্ত থাকা ও মানুষের জন্য ত্যাগ স্বীকার করাই আমাদের ধর্মের মূল অনুজ্ঞা এবং এর মধ্যেই নিহিত জীবনের প্রাচুর্য ও সৌন্দর্য। এই নীতি থেকে দূর সরে যাওয়াই হচ্ছে জীবনের মূল্য ও তাৎপর্য থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা। এটিই কোরানের সুরা ‘আল কাউসার’-এ বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে:

“নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে দিয়েছি প্রাচুর্যের ঝর্ণাধারা। কাজেই উপাসনায় নিরত (হয়ে তাঁর সাথে সদা যুক্ত) থাক এবং তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগে নিয়োজিত থাক। নিশ্চয়ই তোমার (জন্য প্রদত্ত এই নীতির) প্রতি শত্রুভাবাপন্নরা (মঙ্গলময় ভবিষ্যৎ থেকে) বিচ্ছিন্ন।”

সত্যের উপলব্ধি আমাদের মাঝে জগরুক হোক, আমাদের মাঝে অহিংসা ও প্রেম বিস্তার লাভ করুক, ত্যাগের লক্ষ্যে আমাদের ক্রিয়াপরতা বৃদ্ধি পাক এবং ভবিষ্যতের সিয়াম ও ঈদ সার্থক হয়ে উঠুক এই প্রত্যাশা আমার নিজের জন্য ও সকলের জন্য।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী