ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

সম্প্রতি নরওয়েতে যে দুঃখজনক ও বর্বরোচিত বোমা হামলা ও হত্যাকাণ্ডটি ঘটল তার নায়ক ব্রেইভিক নামের এক নরওয়েজিয়ান। তিনি পরিচিত হয়েছেন উগ্র ডানপন্থী হিসেবে। এই উগ্র ডানপন্থী সম্বন্ধে নরওয়ের সরকার অনবগত নয়। এরকম একটি সমস্যা তাদের আছে বলে সরকার বলছে। কিন্তু সমস্যাটি কী নিয়ে তা খতিয়ে দেখা যায়।

ব্রেইভিক ইউরোপে ইসলাম নিয়ে শংকিত। ইসলাম বিস্তার লাভ করছে অভিবাসনের মাধ্যমে এবং কিছু ধর্মান্তরের মাধ্যমে। ইউরোপ এবং বিশেষ করে আমেরিকায় ইসলাম ধর্মের ক্ষীণ প্রসারের ধারাটিকে ভয়ের চোখে দেখে অনেকেই। আজ যা ক্ষীণ তা ভবিষ্যতে হয়তো সমাজের চিত্রটিই বদলে দেবে – এটিই প্রধান আশংকা। এর বিরুদ্ধে প্রথম পদক্ষেপটি যা হতে পারে তা হলো অভিবাসন রোধ করা, বিদ্যমান মুসলিমদেরকে বিতারিত করা, তাদের জীবনকে কোনঠাসা করে তোলা।

কিন্তু ব্রেইভিক কোন মুসলিম সম্মেলনে গিয়ে নির্বিচার হত্যাকাণ্ডটি না ঘটিয়ে গেলেন সরকারী দপ্তরের সামনে বোমা নিয়ে এবং সরকারসমর্থক যুবা বয়েসি ছেলেমেয়েদের সম্মেলনে, যাদের সবাই খ্রিস্টান পরিবারভূক্ত। কেন? তার মতে এরাই দায়ী তার শংকার পেছনে। এদেরকে তিনি আখ্যায়িত করেছেন ‘সাংস্কৃতিক মার্কসবাদী’ হিসেবে। তার অভিযোগ, এরাই ইউরোপের, তার ভাষায়, ‘ইসলামীকরণ’য়ের কুশীলব।

আসল কথা হচ্ছে সরকারের বহুসংস্কৃতির সহাবস্থান নীতি। ব্রেইভিকদের মতে, এ নীতির কারণে ইসলাম প্রসার লাভ করছে। এবং এতে শংকিত হয়ে উঠছে ব্রেইভিকরা। ইসলামের প্রসার নিয়ে শংকাকে বলা হয় ইসলামোফোবিয়া। পাশ্চাত্যে ‘ইসলামী সন্ত্রাসবাদ’ যেমন গণমাধ্যমে এবং সমাজে বহুল আলোচিত বিষয়, তেমনই হয়ে উঠছে ‘ইসলামোফোবিয়া’ শব্দটি। বিবিসি’র মত সংবাদ সংস্থায়ও ব্রেইভিকের বেলায় ইসলামোফোবিক শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

মুসলিম বিশ্বে যেমন জঙ্গি মনোভাব তৈরি হচ্ছে, এই জঙ্গিরা পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে, পরস্পরের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ বিস্তৃত করতে চাচ্ছে, ঠিক তেমনভাবে পশ্চিমেও একশ্রেণীর অল্পকিছু মানুষ ইসলাম-ভীতিতে আক্রান্ত হয়ে ইন্টারনেটসহ সকল উপায়ে হিংসার বিস্তারে লিপ্ত হয়েছে। ব্রেইভিক এদেরই একজন। ইন্টারনেটে তার তৎপরতা উল্লেখযোগ্য এবং সে নিজেই দাবী করেছে যে, ২০৮৩ মেনিফেস্টোটি তার নিজের রচনা।

বোমা বিষ্ফোরণের সাথে সাথে গণমাধ্যমগুলো যথারীতি জল্পনা-কল্পনার উপর ভিত্তি করে ঘটনার বিচার-বিশ্লেষণ শুরু করে; আল-কায়দা, গাদ্দাফি ইত্যাদি নানা সম্ভাবনার কথা উঠে আসে। নরওয়েবাসী মুসলিম সমাজ আক্রান্ত হয় নানা দুশ্চিন্তায়। ব্রেইভিক ধরা দেয়ার পর সংবাদ মাধ্যমগুলোয় যেমন জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটে, তেমনই নরওয়ের মুসলিমদের মধ্য থেকে অস্বস্তি দূর হয়।

যদি এই হামলা মুসলিমরা করতো তবে বিষয়টিকে কিভাবে নেয়া হতো? ব্রেইভিক যদি সরকার ও খ্রিস্টানদের উপর না করে এই বর্বর হামলাটি সেখানকার মুসলিমদের উপর করতো তাহলেই বা অবস্থা কী হতো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর থেকে আমরা পেতে পারি বর্তমান বিশ্বের একটি প্রধান লক্ষণসূচক বৈশিষ্ট্য। আমরা বিভক্ত হয়ে পড়ছি – দুই বলয়ে বিভক্ত হয়ে একে অপরের সর্বনাশ কামনা করার দিকে এগুচ্ছি।

লাদেনের মত আলকায়েদা সদস্যরা অথবা ব্রেইভিকের মত নাইটস টেম্পলার’রা মানব জাতির ক্ষুদ্র অংশ। তারা যেন কিভাবে বদলে দিচ্ছে পৃথিবীটাকে, আমাদেরকে নিয়ে নিপতিত করছে পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থানে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই গুটি কয়েক মানুষ কেন ঠিক করে দেবে আমাদের পৃথিবী কেমন হবে? এই অল্প কয়েকজন কেন সমর্থ হবে আমাদের জীবন বদলে দিতে? আমাদের জীবনে তাদের ইচ্ছা পূর্ণ হতে দেব কেন আমরা? আমরা কেন তাদেরকে জয়ী হতে দেব এভাবে। লাদেনের মৃত্যু বা ব্রেইভিকের আজীবন কারাবাস তাদেরকে পরাজিত করবে না, যদি আমরা এভাবে বদলে যাই। এখানেই যে তাদের সফলতা, তাদের কাঙ্ক্ষিত জয়।

প্রত্যেক ধর্মের দুটি দিক আছে: একটি তার অন্তঃসার – যা মূলতঃ আধ্যাত্বিক ও নৈতিক মর্মবাণী এবং অন্যটি অবয়ব – যা তার সামাজিক বা সাংগঠনিক আকার, সাধারণতঃ তা গড়ে উঠে বিশ্বাসের বিষয়গুলো, আচার অনুষ্ঠান ও বিধিবিধানের মাধ্যমে। অন্তঃসারের দিক থেকে সব ধর্মের মধ্যে ঐক্য আছে, পার্থক্য হচ্ছে আকারে ও প্রতিষ্ঠানে। এই আকার ও প্রতিষ্ঠান ধর্মানুসারিকে একিভূত করতে চায় তার আধ্যাত্বিক ও নৈতিক নির্যাসের সাথে। এটি ঘটলে বিরোধ ও অশান্তি দূর হয়। যদি সেটি না ঘটে তবে বাইরের আকারটি যে ব্যর্থ হয়েছে তা খোদ ধর্মের ভিত্তিতেই বলাই যায়।

মুসলিমদের এখন সময় এসেছে, ইসলাম ধর্মের প্রকৃত বাণী ও নির্যাসের সাথে পরিচিত হওয়া, সেমত নিজেদের চিন্তাকে গড়ে তোলা এবং ধর্মের আকারগত দিককে প্রধান বিষয় করে তুলে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজনের পথ পরিহার করার। পশ্চিমেও অনেকে সক্রিয় হয়েছেন এই বিরোধ ও হানাহানির পথ পরিহারের সম্ভাবনা খুঁজে বের করার জন্য। উভয় পক্ষের শান্তিকামী মানুষের জয় হোক, প্রজ্ঞা ও মৈত্রীর জয় হোক, এবং গুটিকতক দুরাচারীর আশা দুরাশায় পর্যবসিত হোক।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী