ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

1_Title11
blank_m2m

১। সাধারণভাবে বললে, ছিটমহল হচ্ছে কোন দেশের মূল ভৌগলিক সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং অন্য একটি দেশের মূল ভৌগলিক সীমানার অভ্যন্তরে বিরাজমান ভূখণ্ড বা জনপদ। ছিটমহল দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ওখানে যেতে হলে অন্য দেশটির জমির উপর দিয়ে যেতে হয়।

২। ছিটমহল সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলাসমূহ

বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষে বৃহত্তর রংপুরের উত্তরে অবস্থিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কুচবিহার (Cooch Behar) ও জলপাইগুড়ি জেলা। বাংলাদেশের সর্ব-উত্তরের চারটি জেলা: পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম।

উপজেলাসমূহ:

পঞ্চগড় সদর, বোদা ও দেবীগঞ্জ
নীলফামারী ডিমলা
লালমনিরহাট হাতিবান্ধা ও পাটগ্রাম
কুড়িগ্রাম ফুলবাড়ী ও ভুরুঙ্গামারী

.
2_ChhitmahalDistricts_2
.
৩। ছিটমহলের সংখ্যা ও অবস্থান

১৯৯৬ সালে কলকাতায় তখনকার বিডিআর ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বৈঠক হয়। পরে ১৯৯৭ সালের ৯ এপ্রিল চূড়ান্ত হয় সরকারীভাবে নির্ধারিত ছিটমহলের মোট সংখ্যা যা ১৬২।

ভারতের ভেতর বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল রয়েছে। এগুলো প্রশাসনিক দিক থেকে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম এবং কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী ও ভুরুঙ্গামারী থানার অন্তর্গত। এদের মধ্যে লালমনিরহাটের আওতায় ৩৩টি ও কুড়িগ্রামের আওতায় রয়েছে ১৮টি ছিটমহল। ভৌগলিক দিক থেকে এদের ৪৭টি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের কুচবিহার জেলার অভ্যন্তরে এবং ৪টি জলপাইগুড়ি জেলার অভ্যন্তরে অবস্থিত।

বাংলাদেশের ভেতর ভারতের রয়েছে ১১১টি ছিটমহল। এগুলোর মধ্যে পঞ্চগড় জেলার সদর, বোদা ও দেবীগঞ্জ থানায় মোট ৩৬টি, নীলফামারী জেলার ডিমলা থানায় ৪টি, লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা ও পাটগ্রাম থানায় মোট ৫৯টি এবং কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী ও ভুরুঙ্গামারী থানায় মোট ১২টি ছিটমহল অবস্থিত। প্রশাসনিক দিক থেকে এগুলি সবই ভারতের কুচবিহার জেলার অন্তর্গত।
.
3_ChhitmahalsMap
.
উপরের ছবিতে ছিটমহলের যে ম্যাপ দেয়া হলো তা উইকিপেডিয় থেকে গৃহীত। ছিটমহলের সংখ্যাবিচারে তা আমাদের দেয়া হিসাবের সাথে না-ও মিলতে পারে। তবে ছিটমহলগুলির অবস্থান সম্বন্ধে একটি ভাল ধারণা এই ম্যাপ থেকে পাওয়া যায়।

৪। ক্ষেত্রফল ও জনসংখ্যা

তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভারতের মোট ছিটমহলের আয়তন ২৪ হাজার ২৬৮ একর। বাংলাদেশের চতুর্থ আদমশুমারি ২০০১ সালের প্রতিবেদনে ছিটমহলের জনসংখ্যার কোন হিসাব পাওয়া যায়নি। বর্তমান জনসংখ্যার সঠিক হিসাব কারও কাছে নেই। উভয় দেশের ছিটমহলগুলোতে সম্প্রতি শুমারি অনুষ্ঠিত হলেও তার ফল সরকারীভাবে অপ্রকাশিত রয়েছে।

বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের মোট ক্ষেত্র ৭ হাজার ১১০ একর এবং মোট জনসংখ্যা প্রায় ৭০ হাজারের মত। অন্যদিকে ভারতের ১১১টি ছিটমহলের মোট ক্ষেত্র ১৭ হাজার ১৫৮ একর এবং মোট জনসংখ্যা প্রায় ১ লক্ষের মত।

দেশ সংখ্যা ক্ষেত্র (একর) জনসংখ্যা
বাংলাদেশ ৫১ ৭,১১০ ৭০,০০০
ভারত ১১১ ১৭,১৫৮ ১,০০,০০০
১৬২ ২৪,২৬৮ ১,৭০,০০০

.
৫। ছিটমহলের ভেতর ছিটমহল

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের কয়েকটি বড় ছিটমহল রয়েছে যেগুলির ভেতর আবার বাংলাদেশের মালিকানাধীন ছিটমহল আছে। কুড়িগ্রামে ভারতের ছিটমহল দাশিয়ারছড়া। দাশিয়ারছড়ার ভেতরেই আছে চন্দ্রখানা নামের বাংলাদেশের ছিটমহল। তেমনই কুচবিহারেও সম্ভবত বাংলাদেশের এমন ছিটমহল আছে যার ভেতর আবার আছে ভারতের ছিটমহল। অর্থাৎ একদেশের ছিটমহলের ভেতর অন্যদেশের ছিটমহলের অস্তিত্বও রয়েছে।

৬। ছিটমহলের পূর্ব ইতিহাস

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় ইংরেজরা এই ছিটমহলগুলিসহ এভাবেই ভারত ও পাকিস্তান সীমানা এঁকে ও জমি বণ্টন করে দিয়ে যায়। কিন্তু তারা কেন এরকমটি করলো তার কারণটি ইতিহাসের দিক থেকে আরও পুরনো। এর অতীত মোগল আমল পর্যন্ত বিস্তৃত।

৬.১। কোচ বিহার (Koch Bihar)

পাল রাজবংশের পতনের পর তের শতকে কামরূপ রাজ্য ভেঙ্গে পশ্চিম অঞ্চলে কামতা ও পূর্বে অহম রাজ্যের উদ্ভব ঘটে। কামতা প্রথমে খেন’দের দ্বারা শাসিত হয়। পরে আলাউদ্দীন হুসেন শাহ (রাজত্বকাল ১৪৯৪-১৫১৯) তাদের তাড়িয়ে দিয়ে কামতা দখল করে নেয়। কিন্তু হুসেন কামতায় তার নিয়ন্ত্রণ পাকা করতে পারেনি। সেখানকার সামন্তদের কাছে তিনি হেরে যান। কোচ বংশের বিশ্ব সিংহ নেতৃত্বের এই শূন্যতা পূরণ করে ও কামতায় কোচ রাজবংশের গোড়া পত্তন করে। মোগল সম্রাট আকবরের আমলে এই কামতা রাজ্য ভেঙ্গে যায়। পশ্চিমে কোচ হাজো ও পূর্বে লক্ষ্মী নারায়ণের (রাজত্বকাল ১৫৮৭-১৬২১) শাসনে কোচ বিহার রাজ্যের পত্তন ঘটে। কোচ বিহার একটি প্রভাবশালী রাজ্যে পরিণত হয় এবং মোগলদের আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছিল। মোগলদের সাথে কোচ বিহার সন্ধি করে এবং বাংলার সালতানাত দখলে মোগলদেরকে সহায়তা করে। অবশ্য নিজ রাজ্যের অনেক অংশও মোগলদের কাছে হারাতে হয়েছিল কোচ বিহারকে। পরবর্তীতে ভুটানের সাথে দ্বন্দ্বের কারণে কোচ বিহার ইংরেজদের সাথেও সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় রাখে। মোট কথা, কোচ বিহার প্রিন্সলি স্টেট হিসেবে তথাকথিত স্বাধীনভাবে ইংরেজ আমলটিও পার করেতে পেরেছিল। ১৯৪৯ সালে রাজ্যটি ভারতে যোগ দেয় এবং পরের বছর তা পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলায় পরিণত হয়।

৬.২। রংপুর অঞ্চল

ছিটমহলের ইতিহাসের শুরু রংপুর অঞ্চলে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠার পর। আকবরের সেনাপতি রাজা মানসিংহ ষোল শতকে (১৫৭৫ সালে) রংপুর অঞ্চলের কিছু অংশ জয় করে। সতের শতকে (১৬৮৬ সালে) এই পুরো অঞ্চলটি মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ঘোড়াঘাট ‘সরকার’য়ের অধীনে ন্যস্ত হয়। অর্থাৎ তখন রংপুর অঞ্চল মোগলদের অধীন এবং তার উত্তরে স্বাধীন কোচ রাজার রাজ্য।

৬.৩। কোচ রাজাগণ এবং রংপুরের মহারাজাগণ

কোচ রাজাগণ এবং রংপুরের মহারাজাগণ মূলত ছিল সামন্ত। তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, ছিল ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্যে মহলের বিনিময়। বলা হয়ে থাকে, সেই মোগল আমলে প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই ক্ষুদ্র রাজ্যের রাজা ও মহারাজারা মিলিত হতো তিস্তার পাড়ে দাবা ও তাস খেলার উদ্দেশ্যে। খেলায় বাজি ধরা হতো বিভিন্ন মহলকে যা কাগজের টুকরা দিয়ে চিহ্নিত করা হতো। খেলায় হারজিতের মধ্য দিয়ে এই কাগজের টুকরা বা ছিট বিনিময় হতো। সাথে সাথে বদলাতো সংশ্লিষ্ট মহলের মালিকানা। এভাবেই নাকি সেই আমলে তৈরি হয়েছিল একের রাজ্যের ভেতরে অন্যের ছিট মহল।

৬.৪। ব্রিটিশ রাজ ও নেটিভ স্টেট

আজকের ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের সমস্ত ভূমি ব্রিটিশ রাজের অন্তর্গত ছিল না। প্রায় ৪০ শতাংশ ছিল বিভিন্ন তথাকথিত ‘স্বাধীন রাজ্য’ যেগুলিকে বলা হতো ‘নেটিভ স্টেট’ বা ‘প্রিন্সলি স্টেট’। এ রাজ্যগুলি কার্যত ছিল ব্রিটিশদের অধীন তবে অভ্যন্তরীণ বিষয়াদিতে রাজাদের কর্তৃত্ব বজায় ছিল। হায়দ্রাবাদের নিজামের মত কোচ রাজাও ব্রিটিশদের নেটিভ স্টেট-এর রাজা হিসেবে থেকে যান। ভারত ভাগের সময় এরূপ রাজ্যগুলিকে স্বাধীনতা দেয়া বা ভাগ করার এখতিয়ার ব্রিটিশ রাজের ছিল না।

৬.৫। ভারত ভাগ

১৯৪৭ সালে ১৫ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স এক্ট-১৯৪৭’ পাশ করে। এ আইন অনুসরণ করে সেই বছরেই ১৫ই আগস্ট ব্রিটিশ রাজ বিলুপ্ত হয় এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র গঠিত হয়। প্রণীত আইনে বলা হয়, উপমহাদেশের ‘স্বাধীন’ অঞ্চলগুলোর নিজ নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দেয়া সুযোগ থাকবে অথবা তারা স্বাধীন সত্তা নিয়েও ইচ্ছে করলে থাকতে পারবে। রাঙামাটির রামগড় ও বান্দরবান পূর্ব পাকিস্তানের সাথে এবং পূর্ব সীমান্তের পার্বত্য ত্রিপুরা ও উত্তরের কোচ বিহার ভারতের সাথে যুক্ত হয়।

অন্য কোন রাজ্যে জমি নিয়ে সমস্যা না ঘটলেও সমস্যা বাঁধে কুচবিহারে। তখনকার কোচ রাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণের কিছু জমিদারি স্বত্ব ছিল বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার মধ্যে। একইভাবে রংপুর ও দিনাজপুরের জমিদারের কিছু তালুক ছিল কুচবিহার সীমানার ভেতর। এ নিয়ে জমিদারদ্বয় কোন সমঝোতায় আসতে ব্যর্থ হন।

৬.৬। রেডক্লিফ কমিশন

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের উদ্দেশ্যে সীমানা নির্ধারণকল্পে সিরিল রেডক্লিফ’কে সভাপতি করে কমিশন গঠন করা হয়। তিনি ছিলেন একজন আইনবেত্তা মাত্র, দেশের সীমানা নির্ধারণের মত কাজে তার কোন জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা ছিল না। কমিশনের অন্য সদস্যদেরও একই হাল ছিল। কিন্তু যুদ্ধ বিধ্বস্ত ব্রিটিশ সরকারের না ছিল উদ্যম, না ছিল তার হাতে সময়।

১৯৪৭ সালের ৮ জুলাই ভারতে ভারতে আসেন এবং মাত্র ছয় সপ্তাহের কাজ করে ১৩ আগস্ট তিনি সীমানা নির্ধারণের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। কমিশন সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তা আর জমিদার, নবাব ও স্থানীয় রাজনীতিবিদদের দ্বারা দেশের সীমারেখা নির্ধারণ প্রভাবিত হয়েছে। কমিশন কোচ বিহার ও রংপুর এলাকার ছিটমহলগুলো নিয়ে কোন সমাধানে আসতে পারেনি এবং ছিটমহলগুলো বজায় রাখে। এভাবে রেডক্লিফের অংকিত ম্যাপ অনুসারেই শেষ পর্যন্ত ভারত ভাগ হয় ও ছিট মহলগুলো থেকে যায়।

৭। সমাধানের উদ্যোগ

১৯৪৭ সালের পরপরই ছিটমহল সমস্যা সমাধানে ভারত-পাকিস্তান উদ্যোগী হলেও তাদের অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে এগুনো সম্ভব হয়নি।

৭.১। নূন-নেহেরুর চেষ্টা

১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নূন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ছিটমহল সমস্যার সমাধানে অগ্রসর হন। তবে সমস্যার কোন বাস্তব সমাধান হয়নি। নূন ও নেহরু বেরুবাড়ী ছিটমহল হস্তান্তরের একটি যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষর করেন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আদেশের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

৭.২। ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি

বাংলাদেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধী একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যা ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি নামে অধিক পরিচিত। ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ও ভারত যথাশীঘ্রসম্ভব ছিটমহল বিনিময় করতে সম্মত হয়। এচুক্তি অনুযায়ী বেরুবাড়ীর বিনিময়ে বাংলাদেশ দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার সাথে মুল ভূখণ্ড সংযোগের নিমিত্তে ‘তিন বিঘা’ করিডোর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হিসেবে পাবে। বাংলাদেশ বেরুবাড়ী দিয়ে দিলেও ভারত তার বিনিময়ে তাৎক্ষণিকভাবে করিডোরটি দিতে পারেনি। কথা ছিল উভয় দেশই নিজ পার্লামেন্টে চুক্তি অনুমোদন করবে। বাংলাদেশ অনুমোদন করলেও ভারত তা করেনি। ১৯৯০ সালে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট তিন বিঘা করিডোরের অনুমতি দেয় ভারত সরকারকে।

৮। দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা

লালমনিরহাট জেলাধীন পাটগ্রাম উপজেলার সীমান্তবর্তী ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ছিটমহল দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা। ১৯৮৫ সালের পর থেকে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহল পাটগ্রাম উপজেলার একটি স্বতন্ত্র ইউনিয়ন ‘দহগ্রাম ইউনিয়ন’ হিসেবে পরিগণিত হয় এবং ১৯৮৯ সালের ১৯ আগস্ট এখানে ইউনিয়ন পরিষদের উদ্বোধন হয়। পাটগ্রাম উপজেলা সদর হতে এর দূরত্ব ১০ কিমি। করিডোরের দৈর্ঘ্য ১৭৮.৮৫ মিটার। বেসরকারি মতে এখানকার জনসংখ্যা ১৫ হাজার।
.
5_Angorpota
.

৯। তিন বিঘা করিডোর: পরবর্তী অগ্রগতি

৯.১। রাও-খালেদা চুক্তি

১৯৯২ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও আবার একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ১৯৯২ সালের ২৬ জুন তিন বিঘা করিডোর দৈনিক দিনের বেলা ১ঘন্টা পরপর মোট ৬ ঘণ্টার জন্য বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে খুলে দেয়া হয়। ২০০১ সালের ২৭ এপ্রিল থেকে তা দৈনিক সকাল ৭:৩০ থেকে সন্ধ্যা ৭:৩০ পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার জন্য উন্মুক্ত হয়।
.
4_Koridor
.
৯.২। মনমোহন-হাসিনা চুক্তি

গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০১১ এ স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে এটি ভারত ২৪ ঘণ্টার জন্য খুলে দেয়। মনমোহনের বাংলাদেশ সফর শেষে তিস্তা ও ট্রানজিট নিয়ে যত হতাশার সৃষ্টি হোক না কেন, ছিটমহল নিয়ে যে কাজে অনেক অগ্রগতি হয়েছে তা সরকারের বিভিন্ন মুখপাত্রের কথায় জানা যায়। এটি মনমোহন সিংয়ের সফরের সবচেয়ে সফল দিক।

১০। যৌথ সীমান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ (JBWG)

২০০০ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে সকল সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে যৌথ সীমান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হয়। ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি অনুযায়ী দু’দেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান বাস্তবায়ন কাজ করাও এই গ্রুপের অন্যতম দায়িত্ব। গত বছর নভেম্বরে এর চতুর্থ বৈঠক হয় নয়াদিল্লীতে এবং ১৯৭৪ সালের চুক্তির আলোকে ছিটমহলসহ সীমান্ত বিরোধ ও জটিলতা সংক্রান্ত বিষয়গুলো সুরাহার সিদ্ধান্ত নেয়।

ছিটমহল বিনিময়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা যায় যে, যে ছিটমহল যে দেশের ভেতরে অবস্থিত সেমহলের বাসিন্দারা সেদেশের নাগরিকত্ব পাবে, তবে বসবাসকারীরা কোন দেশের নাগরিক হতে চান সে ব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও দেওয়া হবে। ভিন্নরূপ সিদ্ধান্ত যারা নেবেন তাদেরকে স্থানান্তরিত করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেবে দু’দেশ।

১১। বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি

১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি এবং বর্তমান সরকারের আন্তরিকতার উপর ভিত্তি করে ছিটমহলবাসীরা সতুন করে আশায় বুক বাঁধে। এমনকি উভয় দেশের ছিটমহলবাসীরা ‘বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি’ নামে একটি কমিটিও গঠন করে। এই কমিটির ব্যানারে আন্দোলনও করছে তারা। মনমোহন সিংয়ের সাম্প্রতিক সফর নিয়ে তাদের ছিল বিরাট স্বপ্ন। এসফরে ছিটমহল সংক্রান্তে প্রটোকলও স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিন্তু অসহায় শিক্ষাবঞ্চিত মহলবাসীরা ‘বিনিময়’ ও ‘প্রটোকল’ এর পার্থক্য বুঝে না। একটি স্পষ্ট ঘোষণার প্রত্যাশায় ছিল বলে না পেয়ে ছিটমহলবাসীরা হতাশ হয়েছে। তাদেরকে আশ্বস্ত করা এখন সরকারের দায়িত্ব।

১২। ছিটমহল সমস্যা

ছিটমহল বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময়। যখন জাতীয়তাবাদী সার্বভৌম রাষ্ট্রের সীমান্ত অতিক্রম অনুমতি-সাপেক্ষ হয় ও পাসপোর্ট-ভিসা অবিচ্ছেদ্য উপাদান হয়ে দাঁড়ায় তখন ছিটমহলগুলি সম্পূর্ণরূপে নিজদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। যে সমস্যা ছিল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সমস্যা।

১২.১। অবরুদ্ধ জীবন

ছিটমহলবাসীরা বাস্তবে নিজদেশে পরবাসী। তাদের নাগরিকত্ব কার্যত নামমাত্র নাগরিকত্ব। নিজেদের মূল দেশের সাথে তাদের যোগাযোগ নেই। এ যেন ক্যাম্প-বন্দি জীবন। দেশের পরিচয়ে তারা বাংলাদেশের মানুষ, অথচ থাকতে হয় ভারতের ভেতর। আবার তারা ভারতের মানুষ, বসবাস বাংলাদেশের ভেতর। কিন্তু বাস্তবে এরা দেশহীন, নাগরিকত্বহীন।

বেশ ভিন্নরূপে হলেও এগুলো যেন হয়ে আছে বাংলার ফিলিস্তিন। কোন দেশেরই যেন এদের প্রতি কোন দায়দায়িত্ব নেই। বাস্তবে এরা যাপন করছে ‘ছিটের মানুষ’ পরিচয় নিয়ে। রাষ্ট্রের সকল নাগরিক সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থারগুলোরও কোন তৎপরতা সেখানে নেই। শিক্ষা, চিকিৎসা, পানীয়জল, রাস্তাঘাট, যানবাহনের তেমন কোন সুযোগ-সুবিধা সেখানে নেই; নেই ব্যাংক, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, পাকা সড়ক, সেতু, হাটবাজার ইত্যাদি। ছিটমহলগুলোতে আইনের শাসন বলতে কিছু নেই।

সেখানকার ৯০ শতাংশের বেশী মানুষ অক্ষর জ্ঞান শূন্য। অবহেলা, অবিশ্বাস আর হয়রানি তাদের নিত্যসঙ্গী। অবরুদ্ধ জীবন যাপনের কষ্ট, যাতায়াত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার কষ্ট, নিরাপত্তা ও বিচ্ছিন্নতার কষ্ট — সব মিলে দীর্ঘশ্বাসে ভরা অনিশ্চিত তাদের জীবন।

১২.২। অপরাধীদের অভয়ারণ্য

ছিটমহলগুলোয় অপরাধ বেড়ে চলছে, দাগি অপরাধীদের আশ্রয় হয়ে উঠেছে। আইনি জটিলতার কারণে কোনো দেশের পুলিশই ছিটমহলে প্রবেশ করে না। তাছাড়া ছিটমহলে প্রশাসনেরও নেই কোনো কর্তৃত্ব। নারী পাচার, মাদক পাচারের রুট হয়ে আছে ছিটমহলগুলো। ফসল নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকে এখানকার অধিবাসীরা; অনেকেই জিরো লাইনে ফসল চাষ করতে যায় না। অনেক সময় আবার সন্ত্রাসীরা গরু-বাছুর, ফসল নিয়ে যায়। ভয়ে কিছুই বলতে পারেন না অসহায় ছিটবাসীরা।

১৩। রাষ্ট্রের অধিকার বনাম মানবাধিকার

ছিটমহল বিনিময় নিয়ে প্রধান যে আইনগত জটিলতার কথা ওঠে সেটি হলো: একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র কী করে তার জমি অন্যদেশকে দিয়ে দিতে পারে? কিন্তু রাষ্ট্রের এই জমির অধিকারের চেয়ে ছিটমহলগুলোতে বসবাসকারী মানুষদের অধিকার কি বেশী গুরুত্বপূর্ণ নয়? রাষ্ট্রের অধিকারের কাছে কি মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হবে? তবে আশার কথা এই যে, ভারত এবং বাংলাদেশ বিনিময়ের জন্য সম্মত আছে। এখন বাস্তবায়নের পালা।

১৪। উভয় দেশের মূল ভূখণ্ডবাসীদের দায়িত্ব

যারা ভারত বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের এবং বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের বাসিন্দা তাদেরও নৈতিক কর্তব্য আছে। জাতিগতভাবে এই ছিটমহলগুলির অধিবাসীরা বাঙালী – আমাদেরই স্বজন। আমাদের কর্তব্য হলো আমাদের সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা যেন ছিমহল বিনিময়ে অযথা বিলম্ব না হয়। আমাদের কর্তব্য বিষয়টিকে রাজনৈতিক দিক থেকে না দেখে মানবিক দিক থেকে দেখা এবং নিজ নিজ সরকারকে ছিটমহল বিনিময়ে পূর্ণ সমর্থন দেয়া। প্রয়োজন হলে নতুন আইন করা হোক, সংসদে তা পাশ করা হোক, তবুও বিনিময় কাজটি ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি অনুসারে বাস্তবায়িত হোক। দু’দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এ ব্যাপারে সমন্বিতভাবে অবদান রাখতে পারে।

১৫। তথ্যসূত্র ও অধিকতর পঠন-পাঠনের জন্য:

কামরূপ – উইকিপিডিয়া
কামতা – উইকিপিডিয়া
কোচ বিহার – উইকিপিডিয়া
ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল – উইকিপিডিয়া
এ গ্রেট ডিভাইড, টাইম ম্যাগাজিন ওয়ার্ল্ড
দি ডেইলি স্টার ফোরাম
কালের কণ্ঠ
ছিটমহল ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব – তানিম আহমেদ
মানচিত্রের বাইরে বসবাস – রাহীদ এজাজ
বাংলাদেশ-ভারতের ১৬২ ছিটমহল বিনিময়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত

n

বাংলাদেশ ও ভারতের ছিটমহলের মানুষেরা

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী