ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

১। পৃথিবীতে সভ্যতার উন্মেষ অনেক কালের প্রাচীন। বেবিলন, মিশরের সভ্যতা থেকে আজকের জাতিগুলো পর্যন্ত নানা সময়ে নানা রকম দিগ্‌বিজয় অভিযানে নেমেছিল। কেউ কেবল সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে, কেউ ধর্মের জন্য, কেউ কাঁচামালের জন্য, আবার কেউ কেউ শুধু সভ্যতা ধ্বংস ও লুণ্ঠনের জন্য। পৃথিবীবাসী দেখেছে বিজেতারা বিজিতদের সাথে কিরূপ আচরণ করেছে, বিজিতদের জন্য কী বয়ে এনেছে। আরবরাও ইতিহাসের এক বিরাট দিগ্‌বিজয়ী জাতি। দেখা যাক কিছু ঐতিহাসিক এর কিরকম মূল্যায়ন করেছে।

২। মিথ্যার আদিক্ষেত্র

২.১। কোরান, ইসলাম ও মুহম্মদকে নিয়ে গালগল্প রচনা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করার ইতিহাসের ইউরোপীয় অংশের সূচনা করেছিল সেখানকার এক শ্রেণীর যাজক। তাদের কথিত ‘ইতিহাস’ সেখানে প্রাধান্য পেয়ে চলেছিল অনেকদিন ধরেই। মিথ্যার বেসাতি টেকে না। মিথ্যার কাঠামোটিই এরকম। মিথ্যার সবচেয়ে বড় স্বভাব হলো আতিশয্য, আর আতিশয্য মিথ্যার কাঠামোটিকে গড়ে তোলে অন্তর্গতভাবে দুর্বল করে। মিথ্যা নিজের ভিতর তার প্রমাণ ও চিহ্ন রেখে চলে। যে জানে না, ভাবে না এবং অন্য পিঠটি জানার চেষ্টাও করে না, মিথ্যা তাদেরকে কিছু সময়ের জন্য মতিচ্ছন্ন করে রাখে মাত্র। কিন্তু ক্রমে ক্রমে নিরপেক্ষ, চিন্তাশীল মানুষেরা মিথ্যুকের বিবরণ থেকেই মিথ্যা সম্বন্ধে একদিন সচেতন হয়ে উঠে এবং মিথ্যাকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়।

২.২। এই মিথ্যাচারটি প্রধানতঃ শুরু হয়েছিল মধ্যযুগের ক্রুসেডের সময়, এবং স্বাভাবিকভাবেই তাতে (নির)বুদ্ধিগত নেতৃত্বটা দিচ্ছিল কিছু যাজক। এই ক্রুসেডের একটি চিত্র দেখা যায় হলিউডের Kingdome of Heaven ছবিতে। এনিয়ে একটি ধারণা পাঠক পেতে পারেন ছবিটি দেখলে।

৩। মিথ্যা প্রত্যাখ্যান

৩.১। এই মিথ্যাচারের পর সেখানে আসলেন এমন কিছু ঐতিহাসিক যারা ‘মেন অব লেটারস এন্ড উইজডম’ এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছেন ও যাদের বই আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পড়ে থাকে রেফারেন্স হিসেবে। এই লেখকগণ ইসলাম ও আরবদের ইতিহাস সম্বন্ধে অন্য কথা বলতে শুরু করলেন – তারা স্বীকার করলেন যে, এতদিন যা শোনা যাচ্ছিল তা অদ্ভুত সব গালগল্প; মূর্খতার ভেতর বিদ্যমান বিদ্বেষ থেকে প্রসূত। এ জন্য পাঠক আকরাম খাঁ’র লেখা “মোস্তফা-চরিত” দেখতে পারেন।

৩.২। ভিক্টোরীয় যুগের স্কটিশ লেখক এবং ঐতিহাসিক টমাস কার্লাইল এই মিথ্যাচারকে তুলে ধরেছেন এভাবে, “Our current hypothesis about Mahomet, that he was a scheming Impostor, a Falsehood incarnate, that his religion is a mere mass of quackery and fatuity, begins really to be now untenable to anyone. The lies, which well-meaning zeal has heaped round this man, are disgraceful to ourselves only.” (মুহম্মদ সম্বন্ধে আমাদের প্রচলিত প্রকল্প – যে, তিনি ছিলেন একজন কুশলী প্রতারক, মিথ্যার অবতার, তার ধর্ম হচ্ছে নিছক চালবাজ উন্মত্ততাগ্রস্ত মানুষের দলের ধর্ম – যে কারও কাছে বাস্তবিকই হয়ে উঠছে ভিত্তিহীন। এই সকল মিথ্যাচার – যা সদুদ্দেশ্যজাত আগ্রহের আতিশয্য এই মানুষটিকে ঘিরে স্তূপীকৃত করেছে – তা কেবল আমাদের নিজেদের জন্যই অপমানকর হয়েছে।) – On Heroes, Hero-Worship, And The Heroic In History By Thomas Carlyle, Lecture II. The Hero As Prophet, Mahomet: Islam [May 8, 1840.]

৩.৩। মুহম্মদের উপর মিথ্যার অভিযোগের মিথ্যার বেসাতি পশ্চিমে যেভাবে করা হয়েছে তার জন্য কার্লাইল কেঁদেছেন, “Alas, such theories are very lamentable.” (হায়! এই তত্ত্বগুলো কতই না অনুশোচনার।)

৩.৪। আমাদের কালে তুলনামূলক ধর্ম বিষয়ে একজন প্রখ্যাত লেখিকার নাম হচ্ছে কারেন আর্মস্ট্রং। তিনি প্রথম জীবনে ছিলেন খ্রিস্টান নান; কিন্তু পরে তাঁর ধর্ম ও ঈশ্বর সম্বন্ধে সংশয়ী হয়ে ওঠেন। তবে বর্তমানে তিনি নিজেকে একজন ফ্রিল্যান্স মনোথেয়িস্ট বলে পরিচিত করতেই পছন্দ করেন। তিনি মহম্মদ এবং ইসলাম সম্বন্ধে তিনটি বই লিখেছেন। বই তিনটির নাম Islam: A Short History (2000), Muhammad: A Biography of the Prophet (1991), Muhammad: A Prophet For Our Time (2006)। পাঠকগণ এ বই তিনটিও পরে দেখতে পারেন। কারেন এর কয়েকটি ভিডিও দেখা যেতে পারে তাঁর লেখা সম্বন্ধে ধারণা লাভের জন্য।
Karen Armstrong on Islam
Islam a short history by Karen Armstrong part 1
Islam a short history by Karen Armstrong part 2
Islam a short history by Karen Armstrong part 3
Karen ARMSTRONG on Interviews with Ernie Manouse

৪। আরবদের উত্থান ও প্রসার

৪.১। মানবেন্দ্রনাথ রায়, যিনি এমএন রায় হিসেবে বহুল পরিচিত, ইসলামের উত্থান সম্বন্ধে বলেন, “The apparently sudden rise and the dramatic expansion of Mohammedanism constitutes a most fascinating chapter in the history of mankind.” (মোহামেডানিজমের প্রতীয়মান আকস্মিক উত্থান এবং নাটকীয় প্রসার মানবজাতির ইতিহাসে একটি আকর্ষণীয় অধ্যায়।)। ব্রিটিশ রাজনীতিক ও ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড গিবন এই উত্থান ও প্রসারকে আখ্যায়িত করেছেন “one of the most memorable revolutions which has impressed a new and lasting character on the nations of the globe.” (সর্বাধিক স্মরণীয় বিপ্লবগুলোর একটি, যা সমগ্র বিশ্বের জাতিগুলোকে একটি নতুন ও স্থায়ী চারিত্র্য বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত করেছে।)

৪.২। কার্লাইল তার পূর্বে উল্লেখিত বক্তৃতার শুরুতেই মুহম্মদকে কেন্দ্র করে আরবদের এই উত্থানকে বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, “A great change; what a change and progress is indicated here, in the universal condition and thoughts of men!” (এক মহান পরিবর্তন; সর্বকালের সার্বজনীন অবস্থা এবং মানুষের চিন্তার রাজ্যে তা কী অবাক পরিবর্তন ও প্রগতির এক দিশার নির্দেশনা।)

৪.৩। আরবরা বিস্ময়কর দ্রুততার সাথে চতুর্দিকে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে থাকে। এর একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র আমরা পাই বার্ট্রান্ড রাসেলের The History of Western Philosophy বইতে। তিনি লিখেছেন, “The Hegira, with which the Mohammedan era begins, took place in A.D. 622; Mahomet died ten years later. Immediately after his death the Arab conquests began, and they proceeded with extraordinary rapidity. In the East, Syria was invaded in 634, and completely subdued within two years. In 637 Persia was invaded; in 650 its conquest was completed. India was invaded in 664; Constantinople was besieged in 669 (and again in 716-17). The westward movement was not quite so sudden. Egypt was conquered by 642, Carthage not till 697. Spain, except for a small corner in the north-west, was acquired in 711-12. Westward expansion (except in Sicily and Southern Italy) was brought to a standstill by the defeat of the Mohammedans at the battle of Tours in 732, just one hundred years after the death of the Prophet.”

৪.৪। ইসলামের উত্থান ও প্রসার নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে একটি বিস্ময়ভাব লক্ষ্য করা যায়। নবী ও নবীর সাহাবীদের মনোকাঠামোটি সবাই ভালভাবে আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন এমন দাবী হাস্যকরই হবে। কালের দিক থেকে হাজার বছর পরের এবং স্থানের দিক থেকে দূরবর্তী জাতির মনীষীদের পক্ষে প্রথম দফায় সবটুকু বুঝে ফেলা স্বাভাবিকও নয়। আমরা আজকের মুসলিমরা তো বটেই, এমনকি মধ্যযুগের নতুন মুসলিমরাও যদি তা না পেরে থাকে তবে দোষ দেয়া যায় না। চিন্তা সবসময়ই কাল, পরিবেশ, সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা দ্বারা প্রভাবিত হয়। আবার এর মধ্য দিয়ে চিন্তার উৎকর্ষতাও বজায় থাকে। এটিই মানুষের বেলায় প্রযোজ্য নিয়ম। কাজেই ইসলাম, নবী ও কোরান বোঝার ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় হয়নি।

৪.৫। ইসলামের উত্থান ও প্রসারের এই বিস্ময়কর ঐতিহাসিক প্রপঞ্চটি বোঝার চেষ্টা পশ্চিমা মানস এখনও করে যাচ্ছে। তারা সে চেষ্টার ফল প্রকাশও করে চলেছেন নিজেদের লেখায়। আমরা জানি আরবরা নবীর কাছে মিরাকল দাবী করলে তিনি কোরানকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। এমএন রায় ইসলাম বিস্তারের প্রপঞ্চটিকে তাঁর পক্ষের মিরাকল বা অলৌকিক ঘটনা বলে সাব্যস্ত করেছেন। তিনি বলেন, “Every prophet establishes his pretension by the performance of miracles. On that token, Mohammad must be recognized as by far the greatest of all prophets, before or after him. The expansion of Islam is the most miraculous of all miracles.” (প্রত্যেক নবী তার নবী-অবয়ব প্রতিষ্ঠা করেছেন অলৌকিক ঘটনা সংঘটনের মাধ্যমে। এই প্রতীক বিবেচনা করলে একথা মেনে নিতেই হয় যে, তাঁর আগের ও পরের সব নবীদের মধ্যে বিপুলভাবে এগিয়ে থাকা মুহম্মদই সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। ইসলামের প্রসারই হচ্ছে সব অলৌকিক ঘটনার সেরা অলৌকিক ঘটনা।)

৪.৬। কিন্তু কিভাবে ঘটল সেই বিস্ময়কর অলৌকিক? ঐতিহাসিকদের কাছে এ প্রশ্নটি হয়ে আছে হতবুদ্ধিকর; এমএন রায়ের ভাষায়, “How did that stupendous miracle happen? That has been one of the baffling questions for historians.”

৫। তলোয়ার ও হিংস্রতার মিথ

৫.১। নবীদেরকে যারা শত্রুজ্ঞান করেছিল তাদের কাছে সব অলৌকিকেরই একটি ব্যাখ্যা ছিল – “এ তো স্পষ্ট যাদু!” কিন্তু এ যে সাগর দ্বিখণ্ডিত করা নয়, এ যে ইতিহাস! মুহম্মদের ইতিহাসের বেলায় কী বলতে পারে তারা? এখানেও তাদের ব্যাখ্যা আছে – “এটি হয়েছে হিংস্রতা দিয়ে, তলোয়ার দিয়ে; প্রমাণ কোরানে বিদ্যমান যুদ্ধের জন্য উন্মত্ততা এবং মুহম্মদের ও তার অনুসারীদের যুদ্ধ। মুসলিমরা এক হাতে কোরান, অন্য হাতে তলোয়ার ও কোমরে টাকার থলি নিয়ে ছুটেছে এবং চিৎকার করেছে, ‘হয় কোরান নে, নয় টাকা দে, আর নয়তো মর’ বলতে বলতে। মানবতা ধর্মান্ধতার কাছে পরাজিত হয়েছে মাত্র।”

৫.২। আর্থার স্টেনলি ট্রাইটন হলেন ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি শিক্ষক। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ” The picture of the Muslim soldier advancing with a sword in one hand and the Qur’an in the other is quite false.” (মুসলিম সৈন্য এক হাতে কোরান ও অন্য হাতে তরবারি নিয়ে এগুচ্ছে – এই চিত্রণ একেবারে নির্জলা মিথ্যা।) – Islam: Belief and Practices (1951)

৫.৩। এমএন রায় দাবী করেন যে, আজ শিক্ষিত দুনিয়া এই অসভ্যের তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করেছে। তাঁর ভাষায়, “To-day the educated world has rejected the vulgar theory that the rise of Islam was a triumph of fanaticism over sober and tolerant peoples.”

৫.৪। একই আকাশে শকুন ও ঈগল উড়লেও এ দুই এক হয় না, আর শকুন কর্তৃক ঈগলের বিচার, মূল্যায়ন ও ব্যাখ্যা তার নিজের মানসের আদলেই হয়। সেদিনের বর্বর ও অন্ধকারে আচ্ছন্ন ইউরোপীয়রা (‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ কথাটির উৎপত্তি ওখান থেকেই, আরব থেকে নয়) যখন লোভ, লুটপাটের তাড়না ছাড়া অন্য কিছু নিজেদের বেলায় ভাবতে পারতো না, তখন প্রতিপক্ষের মূল্যায়নের বেলায় এর ঊর্ধ্বে তারা উঠতে পারেনি।

৬। প্রসারের এই দ্রুতগতির কারণ

৬.১। ইসলামের তথা আরবদের এই বিস্ময়কর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি নিহিত ছিল খোদ ইসলাম ধর্মের কাঠামো এবং সে অনুসারে আরবদের রূপান্তরের মধ্যে। সেই সাথে যুক্ত হয়েছিল তখনকার দুনিয়ার মানুষের সার্বিকভাবে পশ্চাৎপদ ও দুর্দশাগ্রস্ত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা। এমএন রায় বলেন, “The phenomenal success of Islam was primarily due to its revolutionary significance and its ability to lead the masses out of the hopeless situation created by the decay of antique civilizations not only of Greece and Rome but of Persia and China—and of India.”

৬.২। এ প্রসঙ্গে রাসেল তাঁর পূর্বোক্ত বইতে লিখেন, “Various circumstances facilitated this expansion. Persia and the Eastern Empire were exhausted by their long wars. The Syrians, who were largely Nestorian, suffered persecution at the hands of the Catholics, whereas Mohammedans tolerated all sects of Christians in return for the payment of tribute. Similarly in Egypt the Monophysites, who were the bulk of the population, welcomed the invaders. In Africa, the Arabs allied themselves with the Berbers, whom the Romans had never thoroughly subdued. Arabs and Berbers together invaded Spain, where they were helped by the Jews, whom the Visigoths had severely persecuted.”

৬.৩। মুসলিমদের অনেকের মধ্যে আরবদের সামরিক শক্তি ও যুদ্ধে তাদের বীরোচিত ভূমিকার জন্য একটি ভক্তিমূলক মনোভাব বিদ্যমান। তারা ইহুদিদের মত ইসলামকে যেহেতু একটি নিরস আইন-সর্বস্ব ধর্ম হিসেবে দেখে থাকেন, তাই বিজয়ের কারণ হিসেবে সমরাভিযান ও বীরোচিত মনোভাবকেই প্রধান করে দেখা ছাড়া তাদের উপায় নেই; কারণ সে দৃষ্টিশক্তিই তো তাদের নেই। এটি ইসলামের প্রতি সহানুভূতিহীনরাও বড় করে দেখে থাকেন ও তা প্রতিষ্ঠিত করতে চান নিজেদের মতলবে। কিন্তু এটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, মুসলিম বাহিনীগুলো সবসময়ই তুলনামূলকভাবে অনেক ক্ষুদ্র ছিল। এরূপ ক্ষুদ্র বাহিনী বিজিত অঞ্চলের উপর দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয় না এবং তা সভ্যতা ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও নবরূপে গঠন ও বিকশিত করতে পারে না।

৬.৪। তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র সেনাদল নিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে মুসলিম বাহিনীর একের পর এক যুদ্ধ জয় নিজেই একটি চমক সৃষ্টিকারী ঘটনা। এরূপ জয়ের বিপরীতে যে নিষ্ঠা, তিতীক্ষা ও গতি প্রতিভাত হয় তা পাঠকের বা দর্শকের নজরে পরে আগে। এমএন রায়ের ভাষায়, “The miraculous performance of the ‘Army of God’ usually dazzles the vision and the more magnificent achievements of the Islamic evolution are seldom known to the average student of history, even if he be a follower of Mohammad.” কিন্তু এর ভিত্তিতে সবটা বিচার করতে গেলে মুসলিম অভিযানের স্বরূপ, উদ্দেশ্য ও অবদান মূল্যায়নে ভুল হবে। এ পয়েন্টটি এমএন রায় তুলে ধরে বলেছেন, “Yet, the martial victories of the followers of the Arabian Prophet were but the prelude to a more magnificent and lasting performance in the social and cultural fields.”

৬.৫। এমএন রায় বলেন, Vulgar interpreters of the Islamic history lay stress upon its military achievements either to praise or to deprecate its far-reaching revolutionary significance. If the undoubtedly brilliant military conquests of the Saracens were the only measure of the historic role of Islam, then it would not be a unique historical phenomenon.”

৬.৬। প্রপাগান্ডিস্টরা আরবদের অভিযানগুলোকে তাতার, মোঙ্গল, ভেন্ডাল, হূন ইত্যাদি জাতির অভিযানগুলোর সাথে একই সারিতে ফেলার চেষ্টা করে। তারা মুসলিমদেরকে চিত্রিত করতে চায় রক্তপিপাসু, ধনলিপ্সু ও ধর্মান্ধ অভিযাত্রী হিসেবে। আরবরা পারস্যের মত বড় জাতিকেও নিজেদের অধীনে এনেছিল কিন্তু যুদ্ধের সূচনা নিছক আক্রমণের মাধ্যমে শুরু করেনি। তাদের এমিসারি রাজার দরবারে গেছেন তলোয়ার দিয়ে কার্পেটটি বিদ্ধ করতে করতে এবং রাজাকে এই মর্মে বলেছিলেন যে, “আমরা ধন-সম্পদের জন্য আসিনি যে তা বিপুল পরিমাণে দিয়ে দিলেই আমরা চলে যাব; তুমি মানুষকে নীচে রেখে এতো উপরে উঠে বসে আছ কেন? তোমাকে কুর্নিশ করতে হয় কেন? তুমি নেমে আসো, নয়তো তোমাকে জোর করেই নামানো হবে – কারণ তুমি জোর করেই নিজেকে এরূপ আসনে উঠিয়ে বসিয়েছ, তোমার প্রজারা তোমাকে বসায়নি।”

৬.৭। যুদ্ধের ধ্বংসের দিকটিকে এমএন রায় চিত্রিত করতে গিয়ে বলেন, “Destruction was only a subsidiary part of its mission. It pulled down the played-out old, to construct a necessary new. It demolished the holy edifices of the Cesars and the Chosroes, only to rescue from their impending ruin the accumulated treasures of human knowledge, to preserve and multiply them for the benefit of the posterity.”

৬.৮। ইসলাম ও আরব রাজ্যের এই প্রসারে সাফল্যের কারণগুলো নীচে উল্লেখ করা গেল।
ক) ইসলাম ধর্মের সাধারণ বুদ্ধির জন্য সহজ চিন্তা, এর বাস্তববাদী ও প্রয়োগবাদী দৃষ্টিভঙ্গি;
খ) মানুষ সম্বন্ধে এবং প্রকৃতিতে মানুষের অবস্থান সম্বন্ধে এর উচ্চ, বলিষ্ঠ ও বীরোচিত দৃষ্টিভঙ্গি;
গ) এই ধর্মের ভিত্তিতে আরবদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক রূপান্তর, তাদের বিশ্বাস ও নিষ্ঠা;
ঘ) সমসাময়িক পৃথিবীর জাতিসমুহের চরম পতিত দশা: বৌদ্ধিক-মানসিক অবস্থা থেকে শুরু করে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা পর্যন্ত সবক্ষেত্রে;
ঙ) মুসলিম মানসে মমতা ও ন্যায়বিচারের আদর্শ, যা জাতি-ধর্ম নিরপেক্ষ ছিল;
চ) ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, কর হ্রাসকরণ ও অনেকক্ষেত্রে অব্যহতিদান, সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা।

৭। বিজেতা হিসেবে আরবরা

৭.১। জন পিনকারটন তাঁর Voyages and Travels বইতে আরবদের সম্বন্ধে লিখেছেন, “আরবরা যেখানেই তাদের ক্ষমতা সম্প্রসারিত করেছে সেখানেই কলা, বিজ্ঞান ও মানবতার প্রসার ঘটিয়েছে।” কলা ও বিজ্ঞানের কথা বাদই দিলাম – এটি এখন সার্বজনীনভাবে গৃহীত সত্য। কিন্তু মানবতার প্রসার ঘটিয়েছে? – এটি ইসলামদ্বেষীরা মানতে নারাজ। দেখা যাক এ বিষয়ে পশ্চিমা মনীষার সাক্ষ্য কী?

৭.২। নবীর শিক্ষা ও তাঁর সাফল্য সম্বন্ধে এওয়ার্ড গিবন বলেন, “he breathed among the faithful a spirit of charity and friendship; recommended the practice of the social virtues; and checked, by his laws and precepts, the thirst of revenge, and the oppression of widows and orphans.” ইসলাম ধর্মের এই শিক্ষা প্রথম যুগের আরবরা যুদ্ধের সময়ও মেনে চলেছে।

৭.৩। গুস্তাভ লে বোঁ (জীবনকাল ১৮১৪-১৯৩১) একজন আধুনিক ফরাসী মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও লেখক। তিনি সমাজ মনোবিদ্যায় জাতীয় বৈশিষ্ট্য, বর্ণ-আভিজাত্য, দলগত আচরণ ইত্যাদি বিষয়ক নানা তত্ত্বের জন্য প্রসিদ্ধ। তিনি ১৮৮৪ সালে আরব ইতিহাসের উপর The civilization of Arabs নামে একটি বই লিখেন। এতে তিনি দেখিয়েছেন যে, আরবরাই পৃথিবীর সকল দিগ্‌বিজয়ী জাতির মধ্যে সবচেয়ে মমতাবান ও সুহানুভূতিশীল জাতি। মানুষের জাতিগত আচরণ, যুদ্ধে সেনাদলের আচরণ, রাজ্য সম্প্রসারণে বিজিত জাতির সাথে আচরণের ক্ষেত্রে তাঁর মূল্যায়ন নিশ্চয়ই গুরুত্বের সাথে বিচারের দাবী রাখে, যেহেতু তিনি নিজে এবিষয়ক মনোবিদ্যার একজন প্রাধিকারসম্পন্ন ব্যক্তি।

৭.৪। তিনি তাঁর বইয়ের প্রতিপাদ্য সম্বন্ধে বলেন, “The reader will find, in my treatment of the Arabs’ conquests and the reason of their victories, that force was never a factor in the spread of the Koranic teachings, and that the Arabs left those they had subdued free to exercise their religious beliefs. If it happened that some Christian peoples embraced Islam and adopted Arabic as their language, it was mainly due to the various kinds of justice on the part of the Arab victors, with the like of which the non-Moslems were not acquainted. It was also due to the tolerance and leniency of Islam, which was unknown to the other religions.”

৭.৫। নিজের সমর্থনে তিনি উল্লেখ করেন, “A few impartial European scholars, who are well-versed in the history of the Arabs, do confirm this tolerance. Robertson, in his book ‘Biography of Charlequin’, says that the Moslems alone were the ones who joined between Jihad and tolerance toward the followers of other faiths whom they had subdued, leaving to them the freedom to perform their religious rites.”

৭.৬। বার্নার্ড লুইস (জন্ম ১৯১৬) এর মতটি উইকিপিডিয়ার ভাষায় এরকম: the “by now widespread terrorism practice of suicide bombing is a development of the 20th century” with “no antecedents in Islamic history, and no justification in terms of Islamic theology, law, or tradition.” তিনি আরও বলেন, “the fanatical warrior offering his victims the choice of the Koran or the sword is not only untrue, it is impossible” এবং “generally speaking, Muslim tolerance of unbelievers was far better than anything available in Christendom, until the rise of secularism in the 17th century.”

৭.৭। আরব জাতির বিজয়াভিযান সম্বন্ধে গুস্তাভ লে বোঁ এর মীমাংসা তাঁর নিজের ভাষায় এরকম: “In truth, nations have never known merciful and tolerant conquerors like the Arabs.”

৮। আরব ডিমোনাইজেশন

৮.১। বর্তমানে আরবরা পৃথিবীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে আছে – মরক্কো থেকে সিরিয়া থেকে ইয়েমেন অবধি। একটি জাতিকে ডিমোনাইজ করার চেষ্টা ও সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশের লক্ষণ। আরব জাতিকে বীভৎস ও ভয়ংকর রূপে চিত্রিত করা বা ডিমোনাইজ করা কেবল অতীতেই দেখা গিয়েছিল তা নয়। ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে আধুনিক ক্রুসেডারদের প্রোপাগান্ডার মধ্যেও এটি একটি কৌশলগত উপাদান হয়ে আছে। এই প্রয়াসের মনস্তাত্ত্বিক কারণ হচ্ছে ইসলামের সাথে আরবদের অনুষঙ্গ। হলিউড এই যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠান। আপনারা নিজ দায়িত্বে ইউটিউব সার্চ করে দেখতে পারেন।

৮.২। আবুগ্রেইবের মত ঘটনাগুলো বা কিছু মার্কিন নাগরিক কর্তৃক আমেরিকায় সংঘটিত নির্বিচার হত্যাকাণ্ডগুলোকে পূঁজি করে পশ্চিমাদের বা বিশেষ করে আমেরিকানদের স্টেরিওটাইপ বা ডিমোনাইজ করার যে কোন চেষ্টা যেমন ভুল, তেমনই একইভাবে গোটা আরব জাতিকে স্টেরিওটাইপ বা ডিমোনাইজ করার চেষ্টাও ভুল ও হীন-উদ্দেশ্য তাড়িত কাজ।

৮.৩। মুসলিমদের কেউই কখনও অত্যাচার করেনি, তারা সবাই ধোয়া তুলসী পাতা – এমন দাবী মুসলিম ঐতিহাসিকরাও কখনও করেননি। তাঁরা তাদের নিজেদের লেখা বইতে এগুলোও তুলে ধরেছেন। কিন্তু সভ্যতার গতির নিয়ামক শক্তি ও মানব পরিস্থিতির উপর যাদের গভীর জ্ঞান আছে তারা একটি জাতিকে বা একটি উদ্যোগকে একচোখাভাবে দেখেন না।

***
অধিকতর পাঠের জন্য বইয়ের তালিকা:
Islam: A Short History by Karen Armstrong
Muhammad: A Biography of the Prophet by Karen Armstrong
Muhammad: A Prophet for Our Time by Karen Armstrong
The civilization of Arabs by Gustave Le Bon
Historical Role of Islam: An Essay on Islamic Culture by MN Roy
The Arabs in History by Bernard Lewis
On Heroes, Hero-Worship and the Heroic in History By Thomas Carlyle
The Decline and Fall of the Roman Empire by Edward Gibbon
The History of Western Philosophy by Bertrand Russell

ভিডিও লিংক:
Kingdome of Heaven (a movie on crusade and Saladin)
http://stagevu.com/video/fzlcjjnieulg
The Message (a movie on the Prophet’s history)
http://stagevu.com/video/yomuhvvkprkg
Muhammad the Last Prophet (an animation on the Prophet’s history)
http://stagevu.com/video/isuxbomehvzf
Islam: Empire of Faith. Part-1: The Message (documentary by PBS)
http://www.youtube.com/watch?v=yX3UHNhQ1Zk
Islam: Empire of Faith. Part-2: The Awakening (documentary by PBS)
http://stagevu.com/video/wpkiaiaazdpi
http://www.youtube.com/watch?v=X1PxJomypQE
Islam: Empire of Faith. Part-3: The Ottomans (documentary by PBS)
http://stagevu.com/video/veesaflsorur
http://www.youtube.com/watch?v=iI7Qkcyz3tM

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী