ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

এর আগেরে একটি লেখায় (আল্লাহ কাদেরকে ভালবাসেন) আমরা দেখতে চেষ্টা করেছিলাম আল্লাহ যাদেরকে ভালবাসেন তাদের কতিপয় বৈশিষ্ট্য। বর্তমান লেখায় আমরা দেখতে চাইবো বিপরীত অবস্থাটি: অর্থাৎ আল্লাহ যাদেরকে ভালবাসেন না তাদের কতিপয় বৈশিষ্ট্য। ইন্নাল্লাহা লা ইউহিব্বু … অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ ভালবাসে না … এই পদগুলো সহ যে আয়াতসমূহ কোরানে পাওয়া যায় সেগুলো থেকে এই মন্দ বৈশিষ্ট্যগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।

১। যারা আত্মম্ভরী দম্ভপ্রকাশকারী

“পৃথিবীর উপর বা তোমাদের উপর যে বিপর্যয় আসে তা পূর্বলিখিত পাণ্ডুলিপি অনুসারেই হয়ে থাকে, যা আমরা ধারাবাহিকভাবে অস্তিত্বে আনতে থাকি। আল্লাহর পক্ষে এ অতি সহজ কাজ। এটি এজন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা বিমর্ষ না হও, এবং যা তিনি তোমাদের দিয়েছেন তার জন্য হর্ষোৎফুল্ল না হও। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন আত্মম্ভরী দম্ভপ্রকাশকারীকে ভালবাসেন না।” (কোরান ৫৭:২২-২৩)

“অহংকার বশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করবে না, এবং উদ্ধতভাবে পৃথিবীতে বিচরণ করবে না; নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন আত্মম্ভরী দম্ভপ্রকাশকারীকে ভালবাসেন না।” (কোরান ৩১:১৮)

“তোমরা আল্লাহর উপাসনা করবে, তাঁর সাথে কদাচ অন্যকে অংশীদার করবে না, এবং পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন-অসহায়, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূরবর্তী প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, পথচারী এবং তোমাদের অধীনস্থদের সাথে সুন্দর-কল্যাণকর (এহসান) আচরণ করবে। নিশ্চই আল্লাহ আত্মম্ভরী দম্ভপ্রকাশকারীদের ভালবাসেন না।” (কোরান ৪:৩৬)

আমাদের মনে অহংকার, দম্ভ জন্ম নেয় কখন? অথবা তা প্রকাশ করি কেন? যে নিজের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে সচেতন নয়, যে নিজেকে কারও কাছে দায়ী মনে করেন না সে অহংকার করতে ও তা প্রকাশ করতে পারে। এতে তার পথে কোন যুক্তিগত বাধা নেই। জাতিগত, বর্ণগত বা শ্রেণীগত অবস্থান থেকে মানুষ অহংকারী হয় এবং এটাই সব ধরণের ফ্যাসিবাদের উৎস। যে মুসলিম মনে করে মুসলিম হওয়া সারা জীবন ব্যাপী একটি প্রসেস নয় বরং একটি ধর্মীয় জাতি বা গোষ্ঠিগত অবস্থান বা পরিচয়, সে মুসলিমও অহংকারী হতে পারে।

অহংকারের বিষয়গুলোর দিক থেকে দেখলে, অহংকারের কারণ হিসেবে আমরা পাই দুটো মানসিক অবস্থাকে: ১. বাসনার ধন না পেলে বা হারালে বিমর্ষ হওয়া এবং ২. পেলে হর্ষোৎফুল্ল হওয়া। নৈতিকতার ক্ষেত্রে আমরা যে মনোভাবকে স্পিনোজীয় প্রজ্ঞা বলে থাকি তা কোরানের ৫৭:২২-২৩ আয়াতের ব্যাখ্যা মাত্র।

স্পিনোজার মতে যা ঘটার তা ঘটবেই, যা না ঘটার তা ঘটবে না। কাজেই যা কিছু ইতিবাচক অর্জন তার জন্য অহংকার এবং যা কিছু নেতিবাচক সংঘটন তার জন্য আক্ষেপ স্পিনোজীয় নীতিবিদ্যায় ভিত্তিহীন। স্পিনোজীয় প্রজ্ঞার অধিকারীর নিকট উভয় ক্ষেত্রেই প্রশান্ত ও অচঞ্চল মনোভাবই নীতিবানের ধর্ম।

স্পিনোজার কথার সাথে একথাও যোগ করা যায় যে, আমার প্রতিবেশী যদি কোন কিছু হারিয়ে বিমর্ষ না হন তাহলে আমি কিছু পেয়েও অহংকার করার সুযোগ পাই না, বা তা প্রকাশ করে কোন ফল পাই না। অপর দিকে আমি যা পাই তার জন্য হর্ষোৎফুল্ল হওয়ার পরিবর্তে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ হওয়া ছাড়া অন্য কোন প্রতিক্রিয়া যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। এর উভয়েরই কারণ হলো এই যে, উভয় ক্ষেত্রেই যা ঘটে তা আমাদের সামর্থ্য প্রয়োগের অতিরিক্ত কিছুর সাথেও সংশ্লিষ্ট – যাকে আমরা বলে থাকি প্রকৃতির নিয়ম; আর প্রকৃতির ও তার নিয়মের অধিকর্তা আল্লাহ।

আল্লাহ ছাড়া আর কারও উপাসনা না করা এবং আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে অংশীদার না করার মধ্যে নিহিত আছে অহংকার পরিহারের চরম যুক্তি। একই সাথে পিতামাতাসহ সকল মানুষের সাথে মমতাপূর্ণ, সুন্দর ও পরার্থপর আচরণের ও দানশীলতার মধ্যে প্রকাশিত হয় একজনের অহংকার-বর্জিত অবস্থান।

২। যারা বিশ্বাসঘাতক, মন্দাচারী ও অকৃতজ্ঞ

“তুমি তাদের পক্ষ নিয়ে কথা বলবে না, যারা নিজেরাই নিজেদের সাথে মিথ্যাচার করে বেড়াচ্ছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন বিশ্বাসঘাতক মন্দাচারীকে ভালবাসেন না।” (কোরান ৪:১০৭)

“আল্লাহ বিশ্বাসীদের রক্ষা করেন। তিনি কোন বিশ্বাসঘাতক ও কৃতজ্ঞতাবোধহীনকে ভালবাসেন না।” (কোরান ২২:৩৮)

বিশ্বাসঘাতকতার অর্থ হচ্ছে স্বীকৃত, স্বেচ্ছায় গৃহীত এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে গ্রহণ করা দায়িত্ব, কর্তব্য বা গচ্ছিত সম্পদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা বা তৎসংশ্লিষ্টে মিথ্যাচার করা। এটি চরম অকৃতজ্ঞতা, কারণ এর বিনিময়টি অপর পক্ষের কাছ থেকে ষোল আনা নেয়া হয় কিন্তু দায়িত্বটি পালন না করে অপর পক্ষের সাথে প্রতারণা করা হয়। এটি মানুষের সাথে করা একটি বড় মাপের মন্দ আচরণ। এটি নিজের সাথে স্পষ্ট মিথ্যাচার একারণে যে, এখানে একজন জেনে বুঝে দায়িত্ব নিয়ে সেই দায়িত্ব স্বার্থতাড়িত হয়ে জলাঞ্জলি দেয়। রাষ্ট্র বা অন্য যেকোন প্রতিষ্ঠানের পদ গ্রহণ করে তার সাথে সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব-কর্তব্য বিশ্বস্ততার সাথে প্রতিপালন না করে রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করা, সেবা গ্রহণকারীদের সেবা করার পরিবর্তে তাদেরকে হয়রানি করা, তাদের কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করা এবং রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ আত্মসাৎ করা এই বিশ্বাসঘাতকতা, মন্দাচার ও অকৃতজ্ঞতার নজির।

৩। যারা অপচয়কারী

“… যখন তা ফলবান হয় তোমরা তার ফসল ও ফলাদি আহার কর এবং ফসল/ফলাদি উত্তোলনকালে অন্যদের প্রাপ্য অংশ দাও। এবং অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালবাসেন না।” (কোরান ৬:১৪১)

অপচয়কারীদের আল্লাহ শয়তানের ভাই বলে সাব্যস্ত করেছেন কোরানে। একটি দেশে বা সমগ্র পৃথিবীতে যত মানুষ আছে তাদের সকলের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব হয় না যদি একটি অংশ সম্পদের অপচয় করে। অহংকারের বশে, সামাজিক আভিজাত্য প্রতিষ্ঠা ও প্রকাশের জন্য আমরা নানাভাবে অপচয় করে থাকি। মক্কী যুগের একেবারে প্রথমেই অবতীর্ণ হওয়া কয়েকটি সুরায় মানুষকে এই মনোভাব পরিহারের কথা বলা হয়েছে। এই আভিজাত্য বজায় রাখা ও আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করা – পরস্পর বিরোধী দুটো ভাব যাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন সম্ভব নয়।

ট্যাপ খুলে রেখে পানির অপচয়, রুমে কেউ নেই তবু ফ্যান চালিয়ে রাখা, গ্যাসের চুলা অযথা জ্বালিয়ে রাখা এগুলোও অপচয়। সচেতন মুসলিম নদীর ধারে বসে অজু করার সময়ও নদী থেকে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করেন না, যদিও সেপানি আবার নদীতেই ফিরে যায়।

৪। যারা সীমালঙ্ঘনকারী

“হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য উত্তম যাকিছু বৈধ করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত করোনা। তবে সীমালংঘন করবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের ভালবাসেন না।” (কোরান ৫:৮৭)

যা কিছু আল্লাহ আমাদের জন্য বৈধ করেছেন সেসব বিষয়ে অনুপাত, পরিমিতি পরিহার করাই সীমা লঙ্ঘন।

৫। যারা অত্যাচারী

“… যারা আল্লাহর উপর পূর্ণভাবে আস্থাশীল থেকে শুভকাজে নিরন্তর, আল্লাহ তাদেরকে পূর্ণভাবে তাদের প্রাপ্য প্রতিদান দেবেন। এবং আল্লাহ অত্যাচারীদের ভালবাসেন না।” (কোরান ৩:৫৭)

বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান নেতিবাচক ভাব যেমন হিংসা, তেমনই কোরানের প্রধান নেতিবাচক ধারণা হচ্ছে অত্যাচার। আল্লাহর অংশীবিহীন উপাসনা, সৎকর্মশীলতা এবং অত্যাচারকে কেন্দ্র করেই কোরানের তাবৎ শিক্ষা আবর্তিত হয়েছে। আল্লাহ উদ্ধত-অহংকারী অত্যাচারীদের জন্য অনন্তকালের ধ্বংস নির্ধারণ করেছেন। মুসলিম চিন্তকেরা প্রকৃতিতে যার যেখানে স্থান তাকে সেখান থেকে নমিত করা অত্যাচার বলে সাব্যস্ত করেছেন। তাছাড়া হিংসা, সীমালঙ্ঘন, উৎপীড়ন, অন্যের স্বাধীনতা অস্বীকার করা – এ সবই অত্যাচারের মধ্যে পরে।

৬। যারা শান্তি বিনষ্টকারী

“আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে পরকালের আবাস অন্বেষণ কর, তবে পার্থিব জীবনে তোমার অংশ উপেক্ষা করো না। এবং অন্যের সাথে মমতাপূর্ণ সুন্দর আচরণ কর, আল্লাহকে যেভাবে তুমি তোমার প্রতি মমতাপূর্ণ পেয়েছ। এবং পৃথিবীতে অশান্তি/বিপর্যয় সূচনার সুযোগ অন্বেষণ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অশান্তি সৃষ্টিকারীদের ভালবাসেন না।” (কোরান ২৮:৭৭)

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী