ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ধর্ম, আদর্শ, বর্ণ, শ্রেণী, জাতি, সম্প্রদায়, রাষ্ট্র অথবা লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল মানুষের জীবন ও সম্পদ পবিত্র, যেমন পবিত্র কাবা, আরাফার দিন বা মসজিদ। কিন্তু তারপরও, যুদ্ধের বাস্তবতা ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুদ্ধের অপরিহার্যতা আল্লাহ বাতিল করে দেননি। মুসলিমরা যুদ্ধ সংক্রান্ত যাবতীয় মূল নীতি ও সংযমের বিধিবিধান কোরান এবং নবী ও রাশেদ খলিফাদের ঐতিহ্য থেকেই পেয়েছে। ধর্মের শিক্ষায় নেই কিন্তু বাস্তবতার খাতিরে নিজ মনমত প্রণীত বিধি-বিধান নিয়ে নবী বা রাশেদ খলিফারা যুদ্ধ করেননি। যুদ্ধের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত তারা মক্কায় তের বছর পুরোদমে বুদ্ধ ও যীশুর শিক্ষা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছেন। মদিনায় যাওয়ার পর নবী রাষ্ট্রের প্রধান প্রশাসক হন। সেখানে যুদ্ধের অনুমতি পাওয়া যায়।

১.২। কোরান ও ঐতিহ্য যুদ্ধের পরিষ্কার নীতিমালা প্রদান করেছে – যুদ্ধ কখন নৈতিকভাবে শুদ্ধ ও আবশ্যক হয় এবং যদি যুদ্ধ করতেই হয় তবে তা কিভাবে পরিচালনা করা হবে, যুদ্ধকালে কী করা যাবে ও কী করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ইসলাম প্রকৃতিসম্মত ধর্ম ও পূর্ণাঙ্গ ধর্ম। এরূপ ধর্ম যুদ্ধের অপকারীতা ও প্রয়োজনীয়তা উভয় সম্বন্ধেই সচেতন থাকবে ও তার অনুসারীদেরকে যথাযথ নির্দেশনা দিতে পারবে – এটাই স্বাভাবিক।

১.৩। আমরা যদি ইসলামকে সামগ্রিকভাবে দেখার চেষ্টা করি তবে দেখতে পাব যে, এখানে বুদ্ধ ও যিশুর শিক্ষার সাথে কোন বিরোধ নেই বরং সেগুলোই ইসলাম ধর্মের প্রথম শিক্ষা। তবে এর সাথে কেবল প্রতিরক্ষা ও নিপীড়নমূলক পরিবেশ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার লক্ষ্যে যুদ্ধের বিধান সংযোজন করা হয়েছে। এরূপ সংযোজন থেকে বৌদ্ধ বা খৃষ্টানরা নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারেনি, যা কোরানে যুদ্ধের নীতিমালা – পর্ব ১ এ আলোচিত হয়েছে; এবং বর্তমানকালের জাতিসংঘও যা থেকে বেড়িয়ে আসতে পারে নি, যা কোরানে যুদ্ধের নীতিমালা – পর্ব ২ এ আলোচিত হয়েছে। কিন্তু তারা যা করেছে, তা করেছে নিজেদের জ্ঞান মত। আল্লাহ আমাদের নিজ জ্ঞানের প্রয়োগে বাধা তৈরি করেননি, তবে যুদ্ধের সার্বজনীন মানবিক মূলনীতিগুলো বিধিবদ্ধ করে আমাদেরকে সর্বাবস্থায় তা অনুসরণ করে চলতে বলেছেন – চিন্তা ও বাস্তব কর্মের ক্ষেত্রে।

১.৪। ইসলাম শান্তির ধর্ম। মুসলিমরা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত এই প্রার্থনা করে, “হে আল্লাহ! তুমিই শান্তি, তুমিই শান্তির উৎস এবং তোমাতেই শান্তির প্রত্যাবর্তন। আমাদেরকে প্রাণবন্ত রাখ, হে আমাদের প্রতিপালক, শান্তির মাঝে এবং আমাদেরকে নিয়ে চল শান্তির আবাসে।” মুসলিমরা নামাজ শেষ করে বিশ্ববাসীর জন্য শান্তি প্রার্থনা করার মাধ্যমে। একদিন নবী উপস্থিতদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমি কি তোমাদেরকে এমন এক উত্তম কাজের সংবাদ দেব, পুণ্যশীলতায় যার অবস্থান রোজা রাখা, নামাজ পড়া ও দানশীলতার চেয়েও উচ্চে?” তারা সাড়া দিয়ে বলেছিল, “নিশ্চয়ই, হে আল্লাহর রাসুল।” নবী উত্তরে বলেছিলেন, “তা হলো মানবসমাজে যারা বিবাদের সম্মুখিন বা বিবাদে লিপ্ত তাদের মধ্যে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করা; শত্রুতা ও বিদ্বেষ স্বর্গীয় পুরস্কারসমূহকে সমূলে উৎপাটিত করে।” এই ইসলামে যুদ্ধ একটি সামাজিক প্রয়োজন বা আবশ্যকতা হয়ে উঠে অনিবার্যভাবে যখন বিরোধের এক পক্ষ শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রত্যাখ্যান করে ও অত্যাচারের পথে অগ্রসর হয়। কোরানে বিধৃত যুদ্ধসংক্রান্ত নীতিগুলো দুভাগে বিভক্ত করে আলোচনা করা হলো।

২। যুদ্ধে যাওয়ার নীতিমালা (JUS AD BELLUM)

২.১। ধর্মে শক্তি প্রয়োগ অবৈধ

অন্য জাতির উপর নিজের ধর্ম শক্তিবলে চাপিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে যুদ্ধের সূচনা আল্লাহ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। চিন্তার স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা, নিজের ধর্ম বা মতাদর্শ অনুসারে নিজের জীবন গড়ে তোলার স্বায়ত্তশাসন প্রতিটি জাতি ও সম্প্রদায়ের রয়েছে। সেখানে হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার মুসলিমদেরকে দেয়া হয়নি। এমনকি কোনো মুসলিম রাষ্ট্র তার অন্তর্গত অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর নিপীড়ন ও অত্যাচার করলে সেরাষ্ট্রকে প্রতিহত করার অধিকার রাখে অন্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলো।

“ধর্মাদর্শের জন্য কোন বলপ্রয়োগ থাকবে না। নিশ্চয়ই শুদ্ধ পথ প্রকাশ্যভাবে স্পষ্ট হয়েছে ভ্রান্ত পথ থেকে। …” (কোরান ২:২৫৬)

“তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে পৃথিবীতে যারা আছে তারা সকলেই বিশ্বাস করত। তবে কি তুমি বিশ্বাসী না হওয়া অবধি মানুষের উপর শক্তি প্রয়োগ করবে?” (কোরান ১০:৯৯)

“সে (নুহ) বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কি ভেবে দেখ না! আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট নিদর্শনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁর নিজ অনুগ্রহ দান করে থাকেন, অথচ এ বিষয়ে তোমারা অজ্ঞ হয়ে থাক, তবে আমি কি তা গ্রহণে তোমাদেরকে বাধ্য করতে পারি যখন তোমরা এ অপছন্দ কর?” (কোরান ১১:২৮। এখানে নবী নুহ এর যুক্তিটি এরকম: আমি যেখানে জানি যে আল্লাহ আমাকে সত্যের সাথে পরিচিত করিয়েছেন, তবুও তো আমার এ অধিকার নেই যে তোমাদের উপর সেসত্য আমি জোর করে চাপিয়ে দেই; কাজেই তোমরা কোন অধিকারে আমাকে শক্তি প্রয়োগে প্রতিহত করতে চাইছো, যেখানে বুদ্ধির অতিরিক্ত কোন জ্ঞানসূত্রই তোমাদের অধিগত নেই; যে বুদ্ধি দিয়ে কোনও কিছুরই চূড়ান্ত মীমাংসা করা যায় না।)

“বল, হে মানুষ! নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তোমাদের নিকট সত্য এসেছে। সুতরাং যারা সৎপথ অবলম্বন করবে তারা তো নিজেদের মঙ্গলের জন্যই সৎপথে পরিচালিত হবে এবং যারা সৎপথ থেকে ভ্রষ্ট হবে তারা তো কেবল নিজেদেরকেই ধ্বংসের দিকে পরিচালিত করবে। এবং আমি তো তোমাদের কর্মের বিধায়ক বা অভিভাবক নই।” (কোরান ১০:১০৮)

“ওরা যা বলে আমরা তা ভালভাবে জানি, এবং তুমি ওদের উপর শক্তি প্রয়োগের জন্য নও। সুতরাং কোরানের সাহায্যে তুমি তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দাও যারা আমার সতর্কবাণীকে সমীহ করে।” (কোরান ৫০:৪৫)

২.২। অন্য জাতির সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য যুদ্ধ অবৈধ

লোভের বশবর্তী হয়ে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, লুণ্ঠন যেমন ব্যক্তিগতভাবে নিষিদ্ধ, তেমনই দলগত বা জাতিগতভাবেও নিষিদ্ধ। অন্য জাতির সম্পদ আয়ত্ত করার উদ্দেশ্যে কৃত যুদ্ধকে আল্লাহর নির্ধারিত পন্থায় যুদ্ধ বলা যায় না কোনভাবেই। অন্যদের ধনসম্পদের প্রতি লক্ষ্য করতেই যেখানে আল্লাহ আমাদের নিষেধ করেছেন সেখানে তা লুণ্ঠনের চিন্তা করাও তো চলে না। অর্থনৈতিক বা সামরিক শক্তিতে শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণে বা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের উদ্দেশ্যে অন্য জাতিসমূহের সাথে প্রবঞ্চনার নীতি বা অঙ্গীকারকে কৌশল হিসেবে ব্যবহারের নীতি পরিহার করার আদেশ যেখানে আল্লাহ আমাদেরকে দিয়েছেন, সেখানে এতদুদ্দেশ্যে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার অনুমতি তো অচিন্তনীয়।

“আমি তাদের কতককে যা ভোগবিলাসের জন্য দিয়েছি তার প্রতি তুমি কখনও লক্ষ্যই করো না এবং তাদের জন্য তুমি চিন্তিত হয়ো না। তুমি তোমার সামর্থ্যকে প্রসারিত কর বিশ্বাসীদের জন্য। এবং বল, নিশ্চয়ই আমি কেবল একজন পরিষ্কার সতর্ককারী মাত্র।” (কোরান ১৫:৮৮-৮৯)

“অন্য জাতি অপেক্ষা শক্তিশালী হওয়ার লক্ষ্যে তোমরা তোমাদের অঙ্গীকারকে প্রতারণার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে সে নারীর মত হয়ে যেও না, যে নিজের কষ্ট করে তৈরি করা সুতা নিজেই বুনন খুলে নষ্ট করে দেয়। ….” (কোরান ১৬:৯২)

২.৩। বিদ্বেষ, প্রতিশোধ স্পৃহা ও অহংকারের বশবর্তী যুদ্ধ অবৈধ

জাতিগত বিদ্বেষ, প্রতিশোধ পরায়ণতা ও অহংকার অনৈতিক গুণাবলীর অন্যতম, এবং এসব থেকে নিজেদেরকে মুক্ত ও শুদ্ধ করতে মানুষকে আদেশ করা হয়েছে। এসবের ভিত্তিতে যুদ্ধের সূচনা করা স্পষ্ট সীমালঙ্ঘন।

“আর তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা গর্বভরে ও মানুষের সম্মুখে প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে ঘর হতে বের হয় এবং তাদেরকে আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে। … ” (কোরান ৮:৪৭)

“… যারা তোমাদেরকে নিরাপদ মসজিদে গমনে বাধা দিয়েছিল, তোমাদের প্রতি সে সম্প্রদায়ের বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে সীমালঙ্ঘনে প্ররোচিত না করে। সৎকাজ ও আত্মসংযমে তোমরা একে অপরকে সহায়তা কর এবং মন্দাচার ও সীমালঙ্ঘনে এক অপরকে সহায়তা করো না। ….” (কোরান ৫:২)

“তোমাদের প্রতি কোন সম্প্রদায়ের বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে সুবিচার থেকে বিচ্যুত হতে প্ররোচিত না করে। সুবিচার কর, এটি আত্মসংযমের নিকটতর। আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই তোমরা যা কর আল্লাহ তা সম্বন্ধে অবহিত।” (কোরান ৫:৮)

২.৪। যুদ্ধ অনভিপ্রেত

যুদ্ধকে নবীর সময়ের মুসলিমরা অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত বিবেচনা করতেন। মক্কী জীবনে মুসলিমরা সকল অত্যাচার সহ্য করেছেন নীরবে এবং কোরান থেকে ও নবীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তাঁরা নিজেদেরকে গড়ে তুলেছেন মানবজাতির জন্য আদর্শ হিসেবে। তখন ইসলাম ধর্ম ছিল যিশুর নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু হিজরতের পর মদিনায় অহিংসা ও মমতার নীতির সাথে যুক্ত হলো প্রতিরক্ষার নীতি। মুসলিমরা যুদ্ধকে গ্রহণ করল একটি দায়িত্ব হিসেবে যখন তা অপরিহার্য হয়ে উঠল, অত্যাচারীদের আগ্রাসনের বিপরীতে।

“তোমাদের জন্য যুদ্ধের বিধান দেয়া হল, যদিও তা তোমাদের নিকট অনভিপ্রেত। কিন্তু তোমরা যা অপছন্দ কর তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর ও যা পছন্দ কর তা অকল্যাণকর হতে পারে। আল্লাহ জানেন, তোমরা অনবহিত।” (কোরান ২:২১৬)

২.৫। বৈরিতার সূচনা করা নিষিদ্ধ

আল্লাহ আমাদেরকে শান্তির দিকে, সন্ধির দিকে ও পারস্পরিক সহযোগীতাপূর্ণ সহাবস্থানের দিকে আহ্বান করেছেন। সকলের স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার শিক্ষা আল্লাহ আমাদেরকে দিয়েছেন। সৎকর্মশীলতা, পারস্পরিক সহায়তা, সহানুভূতিপূর্ণ আচরণের শিক্ষা কোরানে বিস্তারিতভাবে বিধৃত করা হয়েছে। বৈরিতার সূচনা করা ও সুযোগ অনুসন্ধান করার কোন অধিকার মুসলিমের নেই।

“আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে পরকালের আবাস অন্বেষণ কর, তবে পার্থিব জীবনে তোমার অংশ উপেক্ষা করো না। এবং অন্যের সাথে মমতাপূর্ণ সুন্দর আচরণ কর, আল্লাহকে যেভাবে তুমি তোমার প্রতি মমতাপূর্ণ পেয়েছ। এবং পৃথিবীতে অশান্তি/বিপর্যয় সূচনার সুযোগ অন্বেষণ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অশান্তি সৃষ্টিকারীদের ভালবাসেন না।” (কোরান ২৮:৭৭)

“যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গিকারে আবদ্ধ হবার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক আল্লাহ অক্ষুণ্ণ রাখাকে বিধিবদ্ধ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।” (কোরান ২:২৭)

“যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গিকারে আবদ্ধ হবার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক আল্লাহ অক্ষুণ্ণ রাখাকে বিধিবদ্ধ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের উপর অভিশাপ এবং তাদের জন্য থাকল নিকৃষ্ট আবাস।” (কোরান ১৩:২৫)

২.৬। আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধের বৈধতা

আল্লাহ আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে নেয়াকে বৈধ করেছেন। আক্রান্ত হলে, নির্যাতিত হলে ও স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হলে যে কোন সম্প্রদায় নিজেদেরকে রক্ষা করার, নির্যাতনমুক্ত স্বাধীন পরিবেশ সৃষ্টির জন্য যুদ্ধ করতে পারবে না এমন কথা কোন মানবতাবাদী দার্শনিক বা ধর্মাদর্শের অধিকারী সহজে বলতে পারবেন না। আর যদি বলেনও তবে তিনি কেবল ইওটোপিয়া’য় বাস করবেন।

“যাদের উপর যুদ্ধ আপতিত করা হয়েছে তাদেরকে অনুমতি দেয়া হলো, কারণ তারা অত্যাচারিত হয়েছে। অবশ্যই আল্লাহ তাদেরকে এভাবে সহায়তা দানের ক্ষমতা রাখেন। তাদেরকে নিজ আবাস থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে কোন অধিকার ছাড়াই; কেবল একারণে যে, তারা বলে, ‘আল্লাহ আমাদের প্রতিপালক’। যদি আল্লাহ মানবজাতির এক অংশ দ্বারা অন্য অংশকে প্রতিহত না করতেন তবে বিধ্বস্ত হয়ে যেত সব সংসারবিরাগীদের মন্দিরসমূহ, গির্জাসমূহ, সিনাগগসমূহ এবং মসজিদসমূহ; যেখানে আল্লাহর নাম আধিক পরিমাণে স্মরণ করা হয়। …” (কোরান ২২:৩৯-৪০)

“আল্লাহর নির্ধারিত পন্থায় যুদ্ধ কর তাদের বিরুদ্ধে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অগ্রসর হয়েছে; কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালবাসেন না।” (কোরান ২:১৯০)

২.৭। নিপীড়কদের হাত থেকে মুক্তির জন্য যুদ্ধ

আল্লাহর নির্ধারিত পন্থায় যুদ্ধের আর একটি ন্যায়সঙ্গত কারণ হতে পারে অত্যাচারী ও নির্যাতনকারীদের হাত থেকে নিপীড়িত মানুষকে তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সহায়তা করতে এগিয়ে আসা। বর্তমান কালের প্রেক্ষাপটে এটি হতে পারে জাতিসঙ্ঘের আয়োজনে। তবে এরূপ ক্ষেত্রে কোন জাতিকে সহায়তা করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধ থেকে বিরত থাকা মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকেও ভাল বলা যায় না। এরূপ ক্ষেত্রে অক্ষমতা একটি আক্ষেপের বিষয়, কিন্তু অত্যাচারের প্রতি ভ্রূক্ষেপ পর্যন্ত না করে প্রসন্ন থাকাকে কেউ ভাল বলতে পারবেন না।

“তোমাদের হলো কী? তোমরা আল্লাহর নির্ধারিত পন্থায় এবং সেসকল অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশুদের জন্য যুদ্ধ থেকে বিরত থাকছ, যারা আবেদন করছে, হে আমাদের প্রতিপালক! অত্যাচারী অধ্যুষিত এনগর থেকে আমাদেরকে উদ্ধার কর, তোমার নিকট থেকে আমাদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্নদের পাঠাও এবং তোমার নিকট থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী পাঠাও।” (কোরান ৪:৭৫)

২.৮। শান্তির জন্য আশাবাদ ও শান্তিপ্রিয়দের সাথে শান্তির নীতি

গতকালের শত্রু বা আজকের শত্রু চিরকালের শত্রু – এমন কঠোর নীতি মুসলিমদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। জাতি, বর্ণ, সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে চিরস্থায়ী শত্রুতার ধারণা মুসলিম মনে স্থানযোগ্য নয়। শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদ বজায় রাখা মুসলিমদের কর্তব্য। যারা শান্তিপ্রিয়, অন্যের স্বাধিকারে হস্তক্ষেপ করে না, অন্যকে তার ধর্ম থেকে বিচ্যুত করার জন্য শক্তি প্রয়োগ করে না, তাদের সাথে মমতার ও ন্যায়পরায়ণতার সম্পর্ক ক্ষুণ্ণ না করা মুসলিমদের কর্তব্য।

“এটি অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তোমাদের ও তাদের মধ্যে – যারা তোমাদের প্রতি বৈরিতা পোষণ করেছে – অনুকম্পার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করবেন। আল্লাহ শক্তিমান এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মমতাবান। ধর্মের কারণে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি, তোমাদেরকে তোমাদের আবাস থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি মমতাপূর্ণ আচরণ করতে ও ন্যায়পরায়ণতায় সুপ্রতিষ্ঠিত থাকতে আল্লাহ তোমাদেরকে বিরত রাখতে চান না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়ে সুপ্রতিষ্ঠিতদের ভালবাসেন। ধর্মের কারণে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করছে, তোমাদেরকে তোমাদের আবাস থেকে বহিষ্কার করছে, বহিষ্কারে সহায়তা বা সমর্থন করছে তাদেরকে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করা থেকে আল্লাহ তোমাদেরকে বিরত রাখতে চান।” (কোরান ৬০:৭-৯)

৩। যুদ্ধকালীন নীতিমালা (JUS IN BELLO)

৩.১। যুদ্ধাবস্থায় সমরসজ্জা

“যারা প্রতিরোধ করতে চায় তারা যেন মনে না করে যে তারা পরিত্রাণ পেয়ে গেছে, নিশ্চয়ই তারা নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারবে না। তোমরা তাদের জন্য তোমাদের সাধ্যমত শক্তি ও সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখবে যেন তারা যুদ্ধে নামতে ভীত থাকে, যারা আল্লাহর সাথে শত্রুতা করে, তোমাদের সাথে শত্রুতা করে, এবং অন্য যাদের বিষয়ে তোমরা অবহিত নও কিন্তু আল্লাহ অবহিত। …” (কোরান ৮:৫৯-৬০)

৩.২। বৈরি অবস্থায় ও যুদ্ধক্ষেত্রে শান্তির পথ রুদ্ধ না করা

যুদ্ধের উদ্দেশ্য শান্তি বিনষ্টকারীর পতন এবং এর মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের ভিত প্রতিষ্ঠা। কাজেই আক্রমণকারী বা অত্যাচারী প্রতিপক্ষ তার নীতি থেকে সরে আসলে, শান্তি প্রত্যাশী হলে যুদ্ধের অবসান করতে হবে। যুদ্ধে এমন নীতি গ্রহণ করা যাবে না যাতে প্রতিপক্ষ শান্তি বিনষ্টের শক্তি হারিয়ে ফেলার পরও তাকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বাধ্য করা হবে।

“তারা যদি শান্তির দিকে যেতে ইচ্ছুক হয় তবে তুমিও সেদিকেই যাবে। এবং আল্লাহর উপর নির্ভর করবে। নিশ্চয়ই তিনি সবকিছু শোনেন ও সবকিছু জানেন। যদি তারা তোমার সাথে প্রতারণা করতে চায় তবে আল্লাহই তোমার জন্য যথেষ্ট; তিনিই তো সেইজন যিনি নিজে ও বিশ্বাসীদের দ্বারা তোমাকে সহায়তা করছেন।” (কোরান ৮:৬১-৬২)

“আল্লাহর নির্ধারিত পন্থায় তাদের সাথে যুদ্ধ কর যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে অগ্রসর হয়েছে। কিন্তু সীমালঙ্ঘন করবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালবাসেন না। তাদেরকে যেখানে পাবে সেখানেই হত্যা করবে এবং যেখান থেকে তারা তোমাদেরকে অপসারিত করেছে, সেখান থেকে তোমরাও তাদেরকেও অপসারিত করবে; কারণ নির্যাতন হত্যার চেয়েও বেশী মন্দ। নিরাপদ মসজিদের সন্নিকটে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে না যাবৎ না তারা তোমাদেরকে সেখানেও আক্রমন করে বসে। যদি তারা সেখানেও তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে এগিয়ে আসে তবে তোমরাও তাদেরকে সেখানেই হত্যা করবে। এটি শান্তি প্রতিহতকারীদের উপযুক্ত প্রতিবিধান। তবে যদি তারা যুদ্ধ থেকে বিরত হয় তবে আল্লাহকেও তারা ক্ষমাশীল ও মমতাবান হিসেবে পাবে। তোমরা যুদ্ধ কর তাদের সাথে যাবৎ নিপীড়ণমূলক অবস্থার অবসান না হচ্ছে এবং আল্লাহর আনুগত্য করার স্বাধীন পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে। তবে যদি তারা যুদ্ধ পরিহার করে তবে বৈরিতার কোন সুযোগ তোমাদের জন্য থাকবে না; অবশ্য যারা অত্যাচার কারার অপরাধে অপরাধী হবে তাদেরকে তোমরা শাস্তি দিতে পারবে।” (কোরান ২:১৯০-১৯৩)

৩.৩। সীমালঙ্ঘন না করা

অন্যের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা, শক্তি প্রয়োগ করে অন্যকে তার মত পরিহারে বাধ্য করা, অন্যের নিজ আদর্শ অনুসারে স্বীয় জীবন গড়ে তোলার অধিকারকে প্রত্যাখ্যান করা, সমাজে অশান্তির সূচনা করা, আগ্রাসী যুদ্ধের সূচনা করা – এসবই সীমালঙ্ঘনমূলক কাজ।

“আল্লাহর নির্ধারিত পন্থায় যুদ্ধ কর তাদের বিরুদ্ধে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অগ্রসর হয়েছে; কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালবাসেন না।” (কোরান ২:১৯০)

৩.৪। আঘাতের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে বিচারশীলতা

প্রথম রাশেদ খলিফা আবুবকর তার সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, “প্রতারণা বা বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, সঠিক বা ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হবে না। তোমরা নিহত সৈন্যের অঙ্গহানি করবে না। শিশু, বয়স্কজন ও নারীদের হত্যা করবে না। খেজুর গাছ বা যেকোনো ফলবান গাছ কেটে ফেলবে না বা তাতে অগ্নিসংযোগ করবে না। কোন গৃহপালিত পশুর দলকে বা উটকে হত্যা করবে না – তোমাদের খাদ্যের জন্য প্রয়োজন হলে ভিন্ন কথা। তোমরা এমন স্থান দিয়ে যাচ্ছ যেখানে তোমাদের সাথে সংসার বিরাগী সাধুজনদের সাথে দেখা হবে, তাদেরকে তাদের কাজে নিয়োজিত থাকতে দেবে।”

কোন রকম বাছ-বিচার না করে আক্রমণ করা, যারা যুদ্ধে অংশ নেয় না তাদের আঘাত করা, সম্পদহানি করা যুদ্ধে বৈধ নয়। যুদ্ধবন্দীদের প্রতি মানবিক আচরণ করাও আল্লাহর নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত। এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, জেনেভা কনভেশনে যত বিধান আছে তার পূর্ণ ও আন্তরিক অনুসরণ চুক্তিমূলে মুসলিম দেশগুলোর জন্যও বাধ্যতামূলক। এই চুক্তি লঙ্ঘন করলেও আল্লাহর কাছে অপরাধী হতে হবে।

৩.৫। সাক্ষাৎ যুদ্ধে শক্তিপ্রয়োগ ও আঘাতের সীমা

শত্রুবাহিনী যেরূপ সমরশক্তি ও সমরকৌশল নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হবে, মুসলিমরাও অনুরূপভাবে তাদের প্রতিহত করার অধিকার রাখে। আল্লাহ এর অনুমতি প্রদান করেছেন।

“… তারা তোমাদেরকে যেভাবে আক্রমণ করে, তোমরাও তাদেরকে সেভাবে আক্রমণ কর। তবে তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চলবে; জেনে রাখ আল্লাহ সাবধানজনদের সাথেই কেবল থাকবেন।” (কোরান ২:১৯৪)

৩.৬। মর্টাল কমব্যাটের অনুমতি

যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলে এবং সেই যুদ্ধ যদি হয় সর্বাত্মক যুদ্ধ তবে মুসলিমরাও সর্বাত্মক যুদ্ধের অনুমতি পেয়েছে। যখন বৈরি ভাবাপন্ন শত্রুরা মুসলিমদের জন্য যুদ্ধকে অপরিহার্য করে তুলে তখন শত্রু সৈন্যদের বিনাশ করার জন্য মরটাল কমব্যাট করা যাবে। যুদ্ধ যত দ্রুত শেষ করা যায় ততই ভাল। তলোয়ার চালাতে গেলে বা গুলি করতে গেলে বা বোমা নিক্ষেপ করলে শত্রসৈন্যরা বেশী কষ্ট পাবে কিনা, অথবা তাদের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে কিনা – এ নিয়ে চিন্তিত থাকলে যুদ্ধ প্রলম্বিত হবে এবং তাতে আগ্রাসীরাই সুবিধা পাবে ও আক্রান্ত পক্ষের ক্ষতি বাড়বে।

“যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের সাথে যুদ্ধ করতে অগ্রসর হয় ও দেশে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য উপযুক্ত প্রতিবিধান এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে, ক্রুশবিদ্ধ করা হবে, বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে, এবং তাদেরকে বহিষ্কার করা হবে। পৃথিবীতে এটাই তাদের অপমান এবং পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। তবে যারা তোমাদের আয়ত্তে আসার পূর্বেই যুদ্ধের পথ পরিহার করবে তাদের বেলায় এটি প্রজোয্য নয়। মনে রেখ, আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মমতাবান।” (কোরান ৫:৩৩-৩৪)

“যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন, আমি তোমাদের সাথে আছি। যারা বিশ্বাসী তাদেরকে দৃঢ়চিত্ত কর। আমি প্রত্যাখানকারীদের অন্তরে ভীতির সৃষ্টি করব। তোমরা তাদের গ্রীবাদেশে আঘাত কর, তাদের প্রতি আঙ্গুলে। এটি এ কারণে যে, তারাই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রোধ করতে এসেছে; যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রোধ করতে আসবে, এই তাদের কঠিন পরিণাম হবে।” (কোরান ৮:১২-১৩)

৩.৭ প্রতিশোধ গ্রহণ বা রিটালিয়েশন

যুদ্ধাবস্থায় বা বৈরি সম্পর্ক বিদ্যমান অবস্থায় শত্রুবাহিনী যদি কোন আকস্মিক রেইড করে ফিরে যায় তবে তার সমপরিমাণ ক্ষতি শত্রুবাহিনীর উপর প্রতিশোধমূলকভাবে গ্রহণ করা যাবে, যদি তা প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দেয়। তবে অনুপাতবর্জিতভাবে প্রতিশোধের কোন অনুমোদন আল্লাহ আমাদেরকে দেননি। এধরণের রিটালিয়েশন আবশ্যক হতে পারে, যদি তা না করা হলে ভবিষ্যতে আরও রেইডের সম্ভাবনা থাকে।

“যদি তোমরা প্রতিশোধ নিতে চাও তবে তোমাদের উপর যতটুকু ক্ষতি আরোপ করা হয়েছে তার সমান ক্ষতি তাদের উপরও আরোপ করতে পারবে। কিন্তু যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম হবে।” (কোরান ১৬:১২৬)

দেখুন:
1. BBC: Islam and war
2. BBC: Jihad
3. Learn Peace: World Religions: War and Peace
4. Use of Armed Force – Shariah Perspective

অন্য পর্বগুলো:
কোরানে যুদ্ধের নীতিমালা – পর্ব ১
কোরানে যুদ্ধের নীতিমালা – পর্ব ২

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী