ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

১.১। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে কোরানে অত্যন্ত স্পষ্ট পথনির্দেশনা পাওয়া যায়। কিন্তু বয়সের দিক থেকে আমার নিজের বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা এবং ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে ধারণার ক্রমবিবর্তন থেকে এখন অনেকটাই বিস্ময় বোধ করি যে, এতদিন লেগে গেল এবিষয়ে অল্পকিছু জানতে। নানা রকমের মুসলিমের সাথে আমার পরিচয় আছে: তাবলিগ থেকে জামাত পর্যন্ত। তথাকথিত ওহাবী ও সুন্নি মতাদর্শীদের সাথে নানা বিষয়ে আমার কথা হয়। তাদের মত ও মানসিকতা বুঝার চেষ্টা করি। তাছাড়া শিয়া ও তথাকথিত মডার্নিস্টদের বইও আমি কিছু পড়েছি।

১.২। “মুহম্মদের নবুওতে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ভিত্তিতে মানব জাতি দুভাগে বিভক্ত, মুসলিমদের কর্তব্য হলো অপর সকল মুসলিমের সাথে ঘনিষ্ঠ ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক তৈরি করা, অন্য অংশটির সাথে যথা সম্ভব শিথিল সম্পর্ক বজায় রাখা” – এটাই আমার কাছে মনে হয়েছে প্রভাবশালী ইসলাম চর্চাকারীদের ধারণা। আমি নিজেও এরকম ধারণা নিয়েই বড় হয়েছি। এবিষয়ে সকলে একমত যে, অপর অংশের প্রতি কোনরূপ অন্যায় আচরণ করা যাবে না, নিজের ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করা যাবে না; কিন্তু তারপরও সম্পর্কটা যেন শীতল, অক্রিয় বা প্যাসিভ। কিন্তু কোরান পড়ে বিষয়টি এখন আমার কাছে একটু ভিন্ন। আমি নীচে আমার ব্যাখ্যাটি দিলাম পাঠকের বিবেচনার জন্য।

২। মানুষের উৎসগত ঐক্য

সকল জগত বা আল্লাহ ব্যতীত যা কিছু আছে তা সবই এক আল্লাহর সৃষ্টি। যে আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করেছেন তিনিই অন্য সকলকেও সৃষ্টি করেছেন। তিনি সকলের প্রতিপালক এবং সকলের জন্য মমতা ও শাস্তির একই নীতি অনুসরণ করেন। সকল ব্যক্তিমানুষ একটি নির্দিষ্ট পুরুষ ও নারীর যুগল থেকে এসেছে। সকল ব্যক্তিমানুষের আত্মিক কাঠামোর মূল ছাঁচ এক এবং জগতে মর্যাদাগত অবস্থানের দিক থেকেও সমরূপ। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বা জাতিতে জাতিতে বা নারী-পুরুষে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য আছে; একই ব্যক্তির বেলাতেও জীবনের নানা কালগত অংশেও (শৈশব, যৌবন, বার্ধক্য ইত্যাদি) এরূপ পার্থক্য আছে। কিন্তু মূল মানবিক সত্ত্বাগত কাঠামো ও মর্যাদায় পার্থক্য নেই।

হে মানবসমাজ! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের উপাসনা কর যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্বপুরুষদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা অশুভ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পার। (কোরান ২:২১)

হে মানবসমাজ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর যিনি তোমাদেরকে অভিন্ন সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন, তা থেকে সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের থেকে বহু নর-নারীর উত্থান সংঘটিত করেছেন। তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে সর্বদা সচেতন থেকো, যার নামে তোমরা একে অন্যের নিকট অধিকার দাবী করে থাক; এবং সচেতন থেকো গর্ভ থেকে জাত এই সম্পর্কসূত্র বিষয়ে …। (কোরান ৪:১)

৩। প্রতিটি ব্যক্তিমানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি

প্রতিটি ব্যক্তিমানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধির মর্যাদায় আসীন এবং আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করার সম্ভাবনা যুক্ত। প্রতিনিধিত্বের জন্য প্রয়োজনীয় বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয় তার রয়েছে। তারা জগতের নিয়মাবলীকে জানতে পারে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তা জ্ঞানে রূপান্তরিত করতে পারে, তা প্রয়োগ করে জগতকে প্রভাবিত করতে পারে, এবং একই সাথে প্রয়োজনীয় নৈতিক চেতনার অধিকারী সে। মানুষ তার কর্ম ক্ষেত্রে কার্যত আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে আবার সীমালঙ্ঘন করে তার বিপরীত কাজ করতে পারে। প্রথমটি জগতের ইতিবাচক বিবর্তনে সহায়ক এবং পরেরটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করা, অত্যাচারের প্রসার ঘটানো ও মানুষকে ভোগবাদী করে তোলার মাধ্যমে শয়তানের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

কোন ব্যক্তি বা জাতি আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করলেই একথা বলা যাবে না যে, তারা আল্লাহর শতভাগ প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে, যারা আল্লাহতে বিশ্বাসী নয় বা মুহম্মদের নবুয়তে বিশ্বাসী নয় তারাও আল্লাহর প্রতিনিধিত্বে অনুরূপভাবে অংশীদার হতে পারে। এবং সকলের বেলাতেই কাজের বিচারের মানদণ্ড বা ক্রাইটেরিয়া একই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে খাওয়ানোর কাজটি আল্লাহর প্রতিনিধিত্বমূলক কাজ – তা সেটি যেই করুক না কেন।

তিনিই সেইজন যিনি পৃথিবীতে তোমাদেরকে প্রতিনিধিরূপে উন্মেষিত করেছেন। এবং তোমাদের এক’কে অপরের উপর স্থান দিয়েছেন, যেন তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন তার মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন। … (কোরান ৬:১৬৫)

তিনিই সেইজন যিনি পৃথিবীতে তোমাদেরকে প্রতিনিধিরূপে উন্মেষিত করেছেন। এবং যে এই দায়ভার প্রত্যাখ্যান করবে, এই প্রত্যাখ্যানের পরিণাম তার উপরেই বর্তাবে। … (কোরান ৩৫:৩৯)

… তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিরূপে উন্মেষিত করেছেন। আল্লাহর সাথে অন্যকোন উপাস্য থাকতে পারে কি? কিন্তু তোমরা অল্পই সেকথা স্মরণে রাখ। (কোরান ২৭:৬২)

৪। মানুষের জাতিগত আদি ঐক্য ও আল্লাহর বাণীর ধারাবাহিকতায় একত্ব

মানুষেরা আদিতে একজাতিভুক্ত ছিল। বিবাদ ও বিভাজনটা পরে আসে। পারস্পরিক বিদ্বেষ ও ঈর্ষার বশে মানুষ বিরোধে লিপ্ত হয়। এ অবস্থায় আল্লাহর শাশ্বত বাণী নিয়ে একে একে আসেন তাঁর নবীগণ। তারা সকলেই একটি ভ্রাতৃমণ্ডলের অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের বাণী একই শাশ্বত গ্রন্থের অংশ। তাদের উদ্দেশ্যও ছিল একটি; তা ছিল মানব সমাজে হৃত ঐক্য ফিরিয়ে আনা ও আল্লাহর রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা। যারা নবীদের কথার যথার্থতা নিরীক্ষান্তে তা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে তারা সেই ঐক্যের পথেই চলেছে। মানব সমাজে বিভাজন সৃষ্টি, বিবাদ সৃষ্টি ও বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির সকল প্রয়াসকেই আল্লাহ ‘ফাসাদ সৃষ্টি করা’ ও ‘সম্পর্ক ছিন্ন করা’ বলে সাব্যস্ত করেছেন এবং এর নিন্দা করেছেন। আল্লাহ সকল জাতির প্রতি তাঁর বাণীবাহক প্রেরণ করেছেন এবং তারা সকলে একই বাণীর দিকে মানুষকে আহ্বান করেছেন। কোরানের একত্ববাদ উপাস্যের চরম একত্ব, মানবজাতির একত্ব, নবীদের বাণীর একত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত – এটিই পরিপূর্ণ তৌহিদ বা একত্ববাদ।

মানবজাতি আদিতে ছিল একটি সম্প্রদায়। পরে বিভেদের সূত্রপাত হলে আল্লাহ নবীদের উত্থিত করেন সুসংবাদবাহক ও সতর্ককারী রূপে। তাদের নিকট অবতীর্ণ করেন সত্যরূপে প্রতিভাত শাশ্বত গ্রন্থ, যেন তারা মানব সমাজের মতভিন্নতার মীমাংসা করতে পারে। যাদেরকে গ্রন্থ দেয়া হয়েছিল তারা পরিষ্কার প্রমাণ আসার পরও মতভেদে লিপ্ত ছিল পারস্পরিক ঈর্ষা-বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে। যারা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছিল সেগ্রন্থকে আল্লাহ নিজ ইচ্ছায় তাদেরকে সত্য পথে পরিচালিত করেছিলেন যেবিষয়ে তারা মতভেদ করেছিল সেবিষয়ে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে সুপ্রতিষ্ঠিত পথে পরিচালিত করেন। (কোরান ২:২১৩)

মানবজাতি আদিতে একটি সম্প্রদায় ভিন্ন অন্যকিছু ছিল না, পরে তারা বিভেদের সূত্রপাত করল। তোমার প্রতিপালকের পূর্বসিদ্ধান্ত না থাকলে তারা যে মতভেদ করেছে তার মীমাংসা হয়ে যেত। (কোরান ১০:১৯)

৫। মতভেদ ও সাধারণ নীতিতে ঐক্য – এর মধ্যেই পরীক্ষা

আল্লাহ ইচ্ছা করলে জগত সৃষ্টি ও পরিচালনার এমন নীতি স্থির করতে পারতেন যার ফলশ্রুতিতে এই বিরোধের উন্মেষ ঘটত না। এই বিরোধের অস্তিত্ব তাঁর ইচ্ছার অনুবর্তী বা তাঁর পরিকল্পনার অংশ। তিনি যেমন বহু ব্যক্তি সৃষ্টি করেছেন পারস্পরিক আচরণের মধ্য দিয়ে পরীক্ষা করার জন্য, তেমনই সৃষ্টি করেছেন বহুমত ও বহু সম্প্রদায় – উদ্দেশ্য একই, মানুষ এ অবস্থায় কিরূপ আচরণ করে তা দেখার জন্য। এ পরীক্ষা মূলত মানুষের আধ্যাত্মিক, নৈতিক, বৌদ্ধিক বিকাশের মাত্রা নির্ধারণ করে। ঐক্যের নীতি অনুসরণ করা, ঐক্যের সূত্র ও পন্থা অন্বেষণ করা এবং সেমত সকলের জন্য কাজ করার মধ্যেই পরীক্ষায় সফলতা।

… আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন তবে তিনি তোমাদেরকে একটি সম্প্রদায় করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের পরীক্ষা করতে চান যাকিছু তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে তার মাধ্যমে। কাজেই তোমরা সকলে প্রতিযোগিতা কর সকল শুভ ও মঙ্গলের জন্য। আল্লাহর দিকেই তোমাদের সকলের চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন এবং তিনি নিষ্পত্তি করে দেবেন যা নিয়ে তোমরা এখন মতভেদ করছ তা। (কোরান ৫:৪৮)

আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে একটি সম্প্রদায় করতে পারতেন। তিনি যাকে ইচ্ছা করেন তাকে তাঁর করুণার অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু অত্যাচারীদের কোন রক্ষাকারী ও সহায়তাকারী নেই। (কোরান ৪২:৮)

বল, ‘হে ঐশী গ্রন্থের অধিকারীগণ! এসো সে কথায় যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই: আমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্যকারও উপাসনা করব না, অন্য কোনকিছুকেই উপাসনায় তাঁর অংশীদার করব না, এবং আমরা আল্লাহকে পরিহার করে আমাদের মধ্য থেকেই কাওকে আমাদের প্রভুরূপে গ্রহণ করব না।’ যদি তারা দূরে সরে যায় তবে বল, ‘আমরা কেবল তাঁর কাছেই আত্মসমর্পন করেছি, তোমরা স্বাক্ষী থাক।’ (কোরান ৩:৬৪)

৬। নানা জাতি, নানা গোত্র – পারস্পরিক সমঝোতা

নানা রকম ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত ব্যক্তিমানুষ আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন ব্যক্তিগত আচরণের পরিমণ্ডলে মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য; ঠিক তেমনই, বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছেন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পারস্পরিক আচরণ পরীক্ষা করার জন্য। ব্যক্তিগত মণ্ডলে সম্পর্কের উন্নতি, সকলের সমবেত উন্নতি ও উত্তম আচরণের জন্য একে অপরকে বুঝতে পারা একটি পূর্বশর্ত। তেমনই অবস্থা আন্তর্জাতিক ও আন্তঃসম্প্রদায় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও।

হে মানবসকল! নিশ্চয়ই আমরা তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমদের মধ্যে উন্মেষ ঘটিয়েছি নানা জাতি ও গোত্রের যেন তোমরা পরস্পরকে বুঝতে প্রয়াসী হও। তোমদের মধ্যে সে-ই আল্লাহর নিকট মহৎ যে নিজের চিন্তা, কাজ ও আচরণের ক্ষেত্রে সচেতন, সতর্ক ও সাবধান থাকে সর্বদা। অবশ্যই আল্লাহ সব জানেন ও সব তথ্যের অধিকারী। (কোরান ৪৯:১৩)

৭। আইনের ভিন্নতা ও স্বায়ত্তশাসন

আল্লাহ নবীকে ত্রিবিধ দায়িত্ব দিয়ে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেও দিয়েছেন। ক) মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, খ) যারা তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয় তাদেরকে গড়ে তোলা ও কোরানের দিশা অনুসরণ করে পরিচালনা করা, এবং গ) যারা আহ্বানে সাড়া দেবে না তাদেরকে তাদের মতাদর্শ অনুযায়ী নিজেদেরকে গড়ে তোলার স্বাধীন পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা।

উপরে উল্লেখিত এই তৃতীয় বিষয়টি কোরানের সুরা মায়েদা-তে বিবৃত করা হয়েছে।

নিশ্চয়ই আল্লাহ তৌরাত অবতীর্ণ করেছিলেন যার মধ্যে আছে পথের দিশা ও আলো। আল্লাহর নিকট নিজেদেরকে সমর্পণকারী নবীগণ এর ভিত্তিতেই ইহুদীদের মধ্যে বিচার নিষ্পত্তি করত; এবং ধর্মাধিকারী ও পণ্ডিতজনেরাও তা-ই করত, কারণ তারাই ছিল আল্লাহর গ্রন্থের সংরক্ষক ও সাক্ষী। কাজেই তোমরা মানুষকে ভয় করো না, বরং আল্লাহকে ভয় কর; আমার বাণীকে মূল্যবর্জিত পার্থিব স্বার্থের কারণে পরিহার করো না। যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার ভিত্তিতে বিচার নিষ্পত্তি করতে অসম্মত তারাই তো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করছে। (কোরান ৫:৪৪)

নবীদের ধারাবাহিকতায় আমরা পরে মরিয়মের পুত্র যিশুকে প্রেরণ করেছিলাম। তাকে দিয়েছিলাম ইঞ্জিল, যা তৌরাতের মধ্য থেকে যাকিছু তার নিকট বিদ্যমান ছিল তা সমর্থন করে। ইঞ্জিলেও আছে পথের দিশা ও আলো। এটি তার সামনে তৌরাতের মধ্য থেকে যাকিছু বিদ্যমান ছিল তার সমর্থক, পথের দিশা ও সর্তককারী – তাদের জন্য, যারা নিজেদের চিন্তা, কাজ ও আচরণে সদা সচেতন, সতর্ক ও সাবধান থাকে। যারা ইঞ্জিলের অধিকারী তাদের কর্তব্য তার মধ্যে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার ভিত্তিতে বিচার নিষ্পত্তি করা। যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার ভিত্তিতে বিচার নিষ্পত্তি করতে অসম্মত তারাই তো দুর্বিনীতভাবে অবাধ্যতাকারী। (কোরান ৫:৪৬-৪৭)

একইভাবে আমরা তোমার নিকট এখন শাশ্বত সত্যে ভাস্বর মহাগ্রন্থটি অবতীর্ণ করছি, যা ইতোপূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থাংশগুলির মধ্য থেকে এটির সামনে যা বিদ্যমান তার সমর্থক ও সেগুলোর সংরক্ষণকারী। কাজেই তুমি তোমার অনুসারীদের মধ্যে বিচার নিষ্পত্তি কর আল্লাহ যা তোমার নিকট অবতীর্ণ করেছেন তার ভিত্তিতে – তাদের অবান্তর বাসনার অনুসরণ করো না যখন সত্য তোমার নিকট প্রকাশিত হয়েছে। … (কোরান ৫:৪৮)

… তোমাদের প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আমরা স্বচ্ছ পথ ও স্বতন্ত্র আইন নির্ধারণ করে দিয়েছি। আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন তবে তোমাদের সবাইকে এক সম্প্রদায়ভুক্ত করতে পারতেন। কিন্তু তাঁর পরিকল্পনা তোমাদের পরীক্ষা করা, যা তোমাদেরকে তিনি দিয়েছেন তার মাধ্যমে। কাজেই তোমরা সকলে শুভ ও মঙ্গলময় কাজে পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতা কর। … (কোরান ৫:৪৮)

৮। প্রত্যেক জাতির লক্ষ্য আছে – মুসলিমদের লক্ষ্য শুভ ও মঙ্গলের লক্ষ্যে প্রতিযোগিতা

পৃথিবীতে নানা জাতি ও সম্প্রদায়ের অবস্থান মুসলিম জাতির নিকট কোন অনভিপ্রেত বিষয় নয়। প্রত্যেক জাতি/সম্প্রদায়ের কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য আছে। তেমনই আল্লাহ মুসলিমদেরও লক্ষ্য স্থির করে দিয়েছেন। আর এটি হচ্ছে অন্যদের সাথে সৎকাজে প্রতিযোগিতা করা। কোরানে ‘আমলে সালেহ’ কথাটি বহুবার বলা হয়েছে ও নানাভাবে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সকল সদিচ্ছাজাত শুভ, মঙ্গলময় ও কল্যাণকর কাজই ‘আমলে সালেহ’। অহংকার, ভোগবিলাস ও অন্যকে ঠকানোর প্রতিযোগিতা নয়, বরং পৃথিবীটাকে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়াই এর উদ্দেশ্য।

বাস্তবতা বা সত্যের উৎস তোমার প্রতিপালক, কাজেই তুমি সংশয়বাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। এবং প্রত্যেকেরই একটি লক্ষ্য আছে, সে যার অভিমুখী হয়। অতএব তোমরা শুভ ও মঙ্গলের জন্য প্রতিযোগীতা কর। … (কোরান ২:১৪৭-১৪৮; আরও দেখুন ৩:১১৪, ২১:৯০)

৯। উপসংহার

আল্লাহর প্রতিনিধিত্বকারী সম্প্রদায় হিসেবে তাই মুসলিমদের জন্য কোনভাবেই অন্য জাতি/সম্প্রদায়ের সাথে শিথিল সম্পর্কের কোন অবকাশ নেই। তাদের থেকে মানসিকভাবে দূরে সরে থাকারও কোন অবকাশ নেই বরং সক্রিয় সম্পর্ক রাখাই আল্লাহর অনুজ্ঞা। সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে কেবল কোন পক্ষের অত্যাচারী হয়ে ওঠার কারণে। মুসলিমদের জন্য অত্যাচারের পথে চলার তো কোন অবকাশ তার ধর্ম দেয় না – আর প্রতিপক্ষ অত্যাচার করার পরও যদি তা থেকে বিরত হয় তবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনরায় প্রতিষ্ঠা করার পথও মুসলিমরা বাধাগ্রস্ত করতে পারে না।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী