ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

একজন ব্যক্তি জীবন, সমাজ বা রাজনীতির সব দিক নিয়ে চিন্তা করবেন এমনটা আশা করা যায় না। তবে আমাদের কিছু নীতি নিয়ে চলা ভাল হবে বলেই মনে হয়। এই নীতিমালা ভালভাবে অনুসরণ করাই আমাদের কর্তব্য হবে। আমরা রাজনীতির কর্মকাণ্ড বিচার করতে গিয়ে পক্ষপাতদুষ্ট হই। যিনি আওয়ামী লীগকে দুচক্ষে দেখতে পারেন না তিনি বিএনপির বেলায় একই কাজের বিপরীতে চোখ বুজে থাকেন। আবার এর বিপরীতটিও আমরা অনেকে করে থাকি। ফল যা হয় তা হলো, আমাদের এই অন্ধ প্রীতি আমাদেরকে ক্রুদ্ধ করে তোলে ও রাগ সামলাতে না পেরে অশালীন কথা বলতে শুরু করি। এতে যে সত্যটি বেরিয়ে আসে তা হলো, আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকে আমি ভালবাসলেও আমি কিন্তু নিজেকে ভালবাসি না।

এই প্রবণতার প্রকাশ অগণতান্ত্রিক মনোভাবের প্রকাশ। অন্যের স্বাধীনতাও এতে অস্বীকৃত হয়। এরকম আচরণ করে একজন এদাবীই করতে চান যে, ভাল-মন্দ, সত্য-মিথ্যা সম্বন্ধে তার যে ধারণা তা একেবারে ঠিক এবং অন্যদের জন্য তা গ্রহণ করা ছাড়া অন্য গতি নেই। এটি হচ্ছে নিজেকে অন্যদের অভিভাবক হিসেবে নিজেই গণ্য করা। এরূপ আচরণের আর একটি কারণ হচ্ছে ভয়। সমাজ যেন দ্রুতই রসাতলে চলে যাবে এবং আমার ক্রুদ্ধ অভিব্যক্তি সমাজকে উদ্ধারে সহায়ক হবে। কিন্তু এতে বৈরিতা বাড়ে, বাড়ে দূরত্ব। কাজের কাজ কিছুই হয় না।

আমরা প্রত্যেকেই মানুষ। সীমিত আমাদের বোধশক্তি, জ্ঞান, বিচার ক্ষমতা। আমি ভুলের ঊর্ধ্বে – এমন কথা কেও কিন্তু প্রকাশ্যে দাবী করেন না, করতে পারে না তাই করেন না। অথচ এই দাবীটি মন থেকে মুছতে পরি না আমরা অনেকেই, সংগোপনে মনের মধ্যে নিয়ে বয়ে বেড়াই। আর এই বহনের খেসারত দিতে হয় অশালীন বাচনের মাধ্যমে। আমরা যখন মন্তব্য লিখি তখন যদি বিচারশীল হই, মন্তব্য লিখার পরও যদি বিচারশীলতা বজায় রাখি তবে দেখব যে, ভুল কমে আসছে ও ভুলের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে না। ভুল করে বসা স্বাভাবিক কিন্তু নিজেকে নিজের বিচারের আওতামুক্ত করে তোলা একটি বোকামি। এই বোকামি নিজেকে শুধরানোর ও ক্রমে ক্রমে ভালর দিকে নিজেকে নিয়ে যাওয়ার পথে অন্তরায়।

মুসলিমদের চতুর্থ খলিফা আলীর একটি প্রসিদ্ধ উক্তি রয়েছে। তিনি বলেছেন, আমরা কথার বিচার করি, কথকের বিচারের আগে। অর্থাৎ কি বলা হলো সেটিই প্রথম বিচার্য বিষয়; এই বিচার, কে কথাটি বলল সেই বিচারের আগেই করার বিষয়। আলী আরও বলেছেন, এটি অসম্ভব নয় যে, খুবই আশাতীত উৎস থেকে খুবই সঠিক কথা উচ্চারিত হতে পারে। আর একারণে আমরা একটি শিশুর কথা শুনেও বলতে পারি না, তোমার মতো পুঁচকে ছেলের কথা শুনলে আমার তো আর চলে না। চলুন কথার খোঁজে বের হই – বন্ধুর কথায় নেচে আর শত্রুর কথায় মাথার চুল ছিঁড়ে লাভ নেই। নিজেকে স্বাধীন করার ইচ্ছা এখান থেকে কাজ শুরু করতে পারে। আর স্বাধীন মানুষেরাই পারে ভাল কিছু করতে।

শুরুতে বলেছিলাম যে, সব বিষয়ে একজন নাক নাও গলাতে পারেন। তবে যা নিয়ে তিনি এক ক্ষেত্রে গলাবেন, সেরূপ কাজ তাঁর বন্ধু করলে নাকটি আকাশে উঠিয়ে রাখবেন না। নীতিটি বজায় রাখবেন। একটি বিষয় আমাদের ভাল করে বুঝা দরকার। আমার সামর্থ্য, আমার শক্তি আমার উপরেই নিশ্চিতভাবে কার্যকর, অন্যদের উপর কতটুকু তা কাজ করতে সক্ষম তা যথেষ্ট পরিমাণে সন্দেহযুক্ত। তাই, সবাইকে বদলে দেব – এই আশা দুরাশা মাত্র। কিন্তু আমি যদি স্থির-প্রতিজ্ঞ হই যে, আমি আমাকে বদলে দেব, তবে ম্যাজিকের মতো কাজ হতে পারে। আর তা যদি না হয় তবে অন্যদের বদলে দেবার প্রত্যাশা কতটুকু আর যুক্তিযুক্ত থাকে!

কাজেই জীবনের স্ক্রিপ্ট যদি লিখতেই হয়, তবে নিজের জীবনের স্ক্রিপ্ট লিখতে উদ্যোগী হওয়াই একটি কাজের কাজ। অন্যের জীবনের স্ক্রিপ্ট লিখতে গেলে নিজের জীবনই অবহেলিত হয়। অন্যদিকে, যাদের নিয়ে আপনি এতো হায়-হুতাশ করছেন, দেখবেন তারা দিব্যি বাইম মাছের মতো আপনার হাত গলে বারবার বেরিয়ে যাচ্ছে। বলা যেতে পারে যে, তোমার এই নীতিকথা শুনতে গেলে যে বৈরাগী হতে হয়। আমি বলি কি, প্রথমে বৈরাগীটাই হয়ে উঠুন আর অন্যদেরকেও বৈরাগী হতে উৎসাহিত করুন। সংসারের প্রতি আসক্তিটা প্রবল করে রাখলে, আপনি যে ভালটা সবার মধ্যে আনতে চাইছেন তা আনতে আসলে ব্যর্থই হতে থাকবেন।

এই বৈরাগ্যের কদর বুঝেছিলেন দার্শনিক রাসেল। দর্শন পড়াটাকে অনেক সংসারী লোক নিতান্তই একটি অকাজ বলে মনে করেন বা বিশ্বাস করেন। রাসেলের সংসারবুদ্ধি কতটুকু ছিল তা সম্বন্ধে আমি কিছু বলতে পারব না, তবে তিনি যে দর্শনের একজন অতি উন্নত শিক্ষক ছিলেন তা সহজেই ঠাহর করা যায়। এই রাসেলের বিশ্বাস, দর্শন পড়ার বড় ফজিলত হলো এই বৈরাগ্য অর্জন। জড় ও চৈতন্যের সম্পর্কের মধ্যে যে একটি বিরাট শুভঙ্করের ফাঁকি আছে তা গভীরভাবে অনুভব করতে পারলে মনে এই বৈরাগ্যভাব জন্মাতে পারে। বাস্তব জগতের বিপুলতা দেখে হ্যামলেটের মনে বিস্ময়ভাব থাকা স্বত্বেও এর মূল্যকে যেমন তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন, তেমনই দর্শন পাঠ করলে সংসারের এতো হৈ-হাঙ্গামার উপযোগিতা আপনার কাছে একটি বিরাট প্রশ্ন হয়ে দেখা দিতে পারে।

যাই হোক, এখন কিছু কাজের কথায় আসি। বিডিনিউজ২৪.কম ব্লগ আগের চেয়ে অনেক ভাল হয়েছে। মাডরেটরদের কাঁচি এর পেছনে কাজ করেছে – বুঝাই যায়। এই ব্লগের একটি নীতিমালা রয়েছে। এই ব্লগের রিসোর্স আমাদের ব্লগারদের মালিকানাভুক্ত নয়। আমারা এসেছি সেই নীতিমালা অনুসরণ করে চলার অঙ্গীকার করে, যদিও অঙ্গীকারটি পরোক্ষ ও সোচ্চারে অনুচ্চারিত। এই ব্লগে লেখার অধিকার এবং ব্লগ-রিসোর্সের মালিকানায় নিজেকে অংশীদার মনে করার অধিকার আমাদের তখনই জন্মায় যখন আমরা এই নীতিমালাকে গ্রহণ করি ও মেনে চলতে মনস্থির করি। যদি এটিকে নিজের মনের ঝাল মেটানোর একটি নিখরচা সুযোগ বা সুবিধা বলে মনে করি তবে তার তুলনা চলে কেবল তস্করবৃত্তির সাথে। কথাটি সত্য কি-না তার বিবেচনা করণ সুপ্রিয় পাঠকের জন্যই থাকল।

এই কাঁচি চালনার পক্ষে আমি নই; ব্লগ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে স্বমত-স্বজন প্রীতির অভিযোগ উত্থাপন করে বসতে পারেন কাঁচির খোঁচা পাচ্ছেন যারা তারা ও তাদের সমর্থকবৃন্দ। তবে আমার বিবেচনায় শেষ কথা হলো: কর্তৃপক্ষের বিচারকে সমীহ করাই কর্তব্য। এই কাঁচি চালনায় ক্ষতির কথিত সম্ভাবনা থেকে ব্লগের সৌন্দর্যের মূল্য অনেক বেশী; তাছাড়া নীতিমালা ভঙ্গ করলে কাঁচি এমনিতেই যুক্তিযুক্ত হয়ে ওঠে।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী