ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

স্বাধীনতা, শান্তি, সাম্য ও ন্যায়বিচারের সার্বজনীন মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের এবং বাস্তবধর্মী ও প্রয়োগধর্মী চিন্তাপ্রসূত একটি নীতিমালার উপর প্রতিষ্ঠিত কিন্তু ধর্মসহ অন্য সকল মততন্ত্র নিরপেক্ষ একটি রাষ্ট্র ও শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে যারা অগ্রসর চিন্তা করতে সক্ষম তাদের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে ওঠা, সুন্দর একটি ভবিষ্যতের জন্য আমাদের এখন সবচে বেশী প্রয়োজন। অতীতের ভার গাধার মত বয়ে বেড়িয়ে, অতীতের চিন্তা কাঁকড়ার মতো আঁকড়ে ধরে থেকে আমরা অনেক ন্যুব্জ হয়েছি, অনেক ক্ষতি করেছি নিজেদের। এখন সৃজনধর্মী ও সমন্বয়ধর্মী চিন্তার প্রয়োজন, প্রয়োজন নতুন দিশা। হিংসা, অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা, দায়িত্বজ্ঞানহীতার যথেষ্ট পরিচয় আমরা ইতোমধ্যে দিয়ে সেরেছি।

কিন্তু কিভাবে আমরা আমাদের চিন্তায় ও ভাবনায়, বুদ্ধিতে ও মনে, কথায় ও আচরণে নিষ্ঠুরতা, বিদ্বেষ, বৈষম্য ও স্বেচ্ছাচারিতা বজায় রেখে চলেছি, তা লালন করে চলেছি, তা গণমনে সঞ্চালন করে চলেছি তার কয়েকটি উদাহরণ দেয়ার চেষ্টা করব এই লেখায়। একথাগুলো যদি সত্য হয়, যদি এদের সত্যতা আমরা অনুধাবন করতে পারি তবে আমরা এই অনুধাবনকে প্রয়োগ করে জীবনকে দেখার সঠিক ও ভাল ভঙ্গিটি অর্জন করতে পারব, সৃজনশীলভাবে প্রযুক্ত ব্যক্তিগত চিন্তার মাধ্যমেই।

আমাদের মত সাধারণ মানুষের জন্য এতো ভাবনার কি দরকার আছে? থাকলে সে দরকারটিই বা কী? এপ্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইতিহাসের আশ্রয় নেয়া যেতে পারে। গত কয়েকশত বছরে মানুষের সংখ্যা বেড়েছে বিপুলভাবে, বিজ্ঞানের হয়েছে বিশাল উন্নতি, মানুষকে গড়ে তুলেছে হয়েছে জটিল ও ঘন বুননসম্পন্ন সমাজ ও রাষ্ট্র। পুঁজির বিকাশ হয়েছে বিরাট আয়তনে, উৎপাদনের উৎস ও ব্যবস্থাপনা অল্পসংখ্যক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন হয়েছে। আগের কালে সমাজ ছিল অনেকটাই শিথিল, উৎপাদন ও জীবিকা রোজগারের উপায়াদি ছিল সরল ও প্রাকৃতিক – একজন ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে স্থূল পন্থায় ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলা থেকে বিরত থাকলেই মানুষ শান্তিতে থাকতে পারতো। কিন্তু এখন মানুষ হয়ে পড়েছে মানুষের তৈরি জটিল সিস্টেম-নির্ভর।

তাই এখন একের সামান্য চিন্তা ও আচরণ অন্যের উপর শক্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে; একের সামান্য সংবেদনশীলতা অন্যের জন্য বিপুলভাবে ইতিবাচক হতে পারে। আমাদের প্রত্যেকের সামান্য সামান্য চাপের লব্ধি একজনের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলতে পারে, আবার সকলের সামান্য সামান্য সহানুভূতির সম্ভার একজনের জীবনকে স্বস্তিতে ভরে দিতে পারে। আমরা এখন ঘনভাবে সংবদ্ধ সমাজ এবং জাতির সমাহার – আগের যে কোন কালের তুলনায় ব্যক্তিগতভাবে ও আন্তর্জাতিকভাবে একে অন্যের খুবই কাছাকাছি ভাল-মন্দ প্রভাব সৃষ্টির ব্যাপারে। কাজেই আমাদের গণমানুষের সচেতনতা ও বিচারশীলতা ছাড়া, গণমানুষের নিজেদেরকে শুধরানো ছাড়া, এবং নিজেদের উপর নির্ভর করা ছাড়া ভাল ভবিষ্যৎ আমরা পাব না – অন্য কোন অভিভাবক আমাদের জন্য উন্নতি, সুখ-শান্তি বয়ে আনতে পারবে না।

আগের কালে ভাল রাজা মানুষকে সুখ-শান্তি দিতে পারতো। কিন্তু এখন গণমানুষ সতর্ক ও সচেতন না হলে, নিজেদেরকে না বদলালে, নিজে রাজার মত চিন্তা করতে না পারলে, নিজেরা ভালভাবে চলতে না পারলে, নিজেরা সংবেদনশীলভাবে বিচারশীল না হলে, অনাচার কেবলই বাড়বে, দুঃখ-কষ্ট কেবলই বাড়বে, কেবলই ঠকতে হবে, কেবলই অন্যের জন্য কাজ করে মরতে হবে, নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে চলতে হবে। একাল তাই গণমানুষের যুগ, গণতন্ত্রের যুগ – এখানে জনগণই রাজা, জনগণের চিন্তাগত অবস্থা ও মানসিক উন্নতির মাত্রা রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করে; অর্থাৎ যেমন জনগণ, তেমন রাজা।

কোরানের ‌এক আয়াতে আল্লাহ এই মর্মে বলেছেন যে, তিনি তাদের অবস্থার পরিবর্তন করেন না যারা নিজেরা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করে না। এখানে মানুষের নিজের দ্বারা করণীয় পরিবর্তনটি বৌদ্ধিক-মানসিক এবং আল্লাহর দ্বারা প্রদেয় পরিবর্তনটি বস্তুগত ও সামাজিক যার পরিণতি প্রথমে উল্লেখিত পরিবর্তনটি অনুসারে হয় ভাল নয়তো মন্দ। আল্লাহর এই নীতি আমাদের কালের জন্য সবচেয়ে গুরুভাবে সত্য।

এখন আসা যাক শিরোনামে উল্লেখিত আসল প্রসঙ্গে। আমরা বেশ কয়েক বছর ধরে শুনে আসছি ‘সুশীল’, ‘সুশীল সমাজের প্রতিনিধি’ শব্দগুলো। তারা সেমিনার করেন, সভা করেন – ব্যানারে উৎকটভাবে লিখিত থাকে সেই পরিচয়। ‘সুশীল’ কাকে বলে? একজন সুশীলের বৈশিষ্ট্য কি? সুশীলের উদাহরণ কি? সুশীল শব্দেরই বা অর্থ কি? সেই অর্থের সাথে সুশীল সমাজ বলতে যা বোঝানো হয় তার সম্পর্ক কী? বাস্তবে আমরা যা দেখছি তাতে মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা সুশীল, কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা সুশীল। তাহলে কি কৃষক, শ্রমিকরা সুশীল নন? সুশীল সমাজ বলতে যদি সিভিল সোসাইটি বোঝায় তবে কি সামরিক বাহিনীতে যারা চাকুরী করেন তারা সুশীল নন? যারা সুশীল নন তারা কারা?

‘সুশীল’ একটি বিশেষণ, একটি নরমেটিভ কনসেপ্ট, শব্দটি দ্বারা কোন অবজেকটিভ ক্লাসকে বোঝায় না। ঠিক যেমন ‘ভাল’ শব্দটি একটি বিশেষণ। ভাল মানুষ কারও পরিচয় হতে পারে না, একজন নিজেই নিজেকে ভাল মানুষ বলে দাবী করতে পারেন না, এই পরিচয় সম্বলিত কোন ব্যানারের নীচে দাঁড়িয়ে কেউ তাদের প্রতিনিধিত্বের অবস্থান নিয়ে কথা বলতে পারেন না। এই শব্দটি এই ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন তারাই যাদের ভাষাজ্ঞান অধিক। এই ব্যবহারের পিছনে, এই ব্যবহার অনুমোদন করার পিছনে কাজ করেছে সমাজকে সাংস্কৃতিক মান, সমাজকঠামোয় সুবিধাজনক অবস্থানের ভিত্তিতে আগের কালের ‘ইতর-ভদ্র’ বিভাজনের মানসিকতা।

বিগত তত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে ‘উপহার’ কথাটির নতুন প্রয়োগ জনগণ শুনতে শুরু করে। খুব জোরেশোরে প্রচারিত হচ্ছিল নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেয়ার প্রতিশ্রুতি ইত্যাদি। এই উপহার তত্ত্বের বিস্তার আরও অনেক দূর গড়িয়েছে। রাষ্ট্রের শাসক কি করে নিজের কর্তব্য কর্মের ফলকে জনগণের জন্য উপহার হিসেবে দেখেন তা খুবই বিস্ময়কর। আগের কালে কেউ কিছু উপহার দিলে ও দেনেওয়ালা তার স্বীকৃতি পেলে বলতেন, কী যে বলেন, এতো আমার কর্তব্য। আজ আমরা কর্তব্য পালন করে বলতে শুরু করেছি, এই নাও উপহার। এটি চিন্তায়-ভাবনায় আমাদের অগভীরতার প্রকাশক, নাকি আমাদের প্রকৃত মনোভাবের প্রকাশক তা-ই এখন আবিষ্কার, গবেষণা করার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তৃতীয় বিষয়টি গোলাম আযমদের গ্রেফতারকে নিয়ে। পত্রিকায় দেখেছি, বিজয় দিবসকে সামনে রেখে তাকে গ্রেফতারের আয়োজন চলছে। একটি তো এরকম লিখেছে যে, এটি নাকি বিজয়ের চল্লিশ বছর পূর্তির ক্ষণে উপহার। এটি বোধগম্য নয় কেন বিজয় দিবসের সাথে পত্রিকাগুলো এই গ্রেফতারের এমন অনুষঙ্গ তৈরি করতে সোচ্চার হয়েছে। আইনের নিজস্ব প্রক্রিয়া রয়েছে, রয়েছে পদ্ধতি। এগুলো নিরপেক্ষ এবং সকলের জন্য সমতা ভিত্তিক। রাষ্ট্রের লক্ষ্য ও কর্তব্য হচ্ছে অভিযুক্তকে যথাদ্রুতসম্ভব আইনের আওতায় আনা। এই কাজে বিলম্ব করার যত গ্রহণযোগ্য কারণ থাকতে পারে, বা তাতে দ্রুততা আনার যত কারণ থাকতে পারে তার তালিকায় বিজয় দিবসকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। এ ধরণের অনুষঙ্গ যে আমাদের প্রতিষ্ঠান, আমাদের আইন প্রয়োগের মৌলিক নীতিমালাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তা কি তারা খতিয়ে দেখেছেন? না-কি জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য আমাদের সব মূল্যমানকে জলাঞ্জলি দিতে বসেছেন?

ন্যায়বিচারের সাথে ক্ষতির সম্পর্ক রয়েছে। আমি ন্যায়বিচার করে যদি নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হই তবে আমি আনন্দিত হতে পারি। এই আনন্দটি ন্যায় রক্ষায় আমার সমর্থ হবার কারণে, ন্যায়ের জন্য নিজের ক্ষতিটি স্বীকার করতে পারার জন্য। এটি আমার নৈতিক উৎকর্ষতার সূচক হতে পারে। কিন্তু ন্যায়বিচারে আমার প্রতিপক্ষ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হন তবে আমি তার জন্য আনন্দিত হতে পারি কি? এতে আমার দুঃখিত হওয়াটাই আমার নৈতিক উৎকর্ষতার সূচক নয় কি? গোলাম আযমের ন্যায় বিচার হোক, সেবিচারে যদি তার ফাঁসি হয় তো হোক – এবং এতে সে আনন্দিত হোক। আমাদের জন্য আনন্দের কি আছে? মানুষ মেরে যারা আনন্দিত হয় আমরা কি তাদের মত হবো?

এখানে আর একটি সূক্ষ্ম ব্যাপার আছে যা মনস্তত্ত্বের সাথে জড়িত। ভাবুনতো একবার। যদি গোলাম আযমদের অবস্থা মুসলিম লীগের মতো হতো তবে কি আমাদের এত আতিশয্য থাকতো? তাহলে কি এই দাঁড়ায় না যে, আমাদের আতিশয্যের পরিমাণ আমাদের হারের পরিমাণের সমানুপাতিক? সকল হিংসুকের বিরুদ্ধে সমভর প্রতিহিংসা, সকল হত্যাকারীর বিরুদ্ধে সমভর জিঘাংসা এই হারের বোধের সমানুপাতিক। বাঙালী! তুমি বীর হও, হেরে গেলেই কারও হার হয় না, জিতে গেলেই কারও জিত হয় না; হার-জিত মনের মধ্যে থাকে, হেরে গেছি ভাবলেই হার হয়, জিতে গেছি ভাবলেই হার হয়; আর নিরাবেগে সকল অবস্থায় দৃঢ় থাকতে পারলেই আখেরে জিত হয়।

ভাবছেন, এ-ই যদি বলবে তবে শুরুতে এতো তত্ত্বকথা কেন বলতে গেলা? এবার আবার শুরুর কথায় আসা যাক। আসল কথা হলো আমরা যদি আমাদের মানসিকতা বদলাতে না পারি তবে ভাল সমাজের লক্ষ্যে এগুতে পারব না। এই মানসিকতার বদল বলতে আমি মানবিক মূল্যবোধ সম্বন্ধে আমাদের সচেতন হওয়াকে বোঝাতে চাচ্ছি। এটিকে ছোটখাটো বিষয় বলে উড়িয়ে দেয়া চলে না। মনে করুন, একজন তার স্ত্রীর সাথে, শিশু সন্তানের সাথে মাত্রাতিরিক্ত অভিভাবকত্ব ফলান। কিন্তু তিনি যখন অফিসের অঙ্গনে আসেন তখন কি আমরা তার কাছ থেকে সেখানে খুব ভাল কিছু আশা করতে পারি? গণতন্ত্র চর্চা, সাম্য চর্চা, অন্যকে সমীহ করা, ন্যায়পরায়নতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে তিনি কি খুব সফল হবেন? আমরা কি বলতে পারি যে, ঘরের প্রসঙ্গ এখানে টেনে আনছ কেন? এটা তো মাইনর ব্যাপার। স্বামী-স্ত্রী বা পিতা-পুত্রীর ঘটনাগুলো মাইনর হতে পারে, মানসিক অবস্থাটি কিন্তু মাইনর নয়। যিনি ঘরে মূল্যমানগুলো চর্চা করতে পারেন না তিনি বাইরেও তা চর্চা করতে ব্যর্থ হবেন।

যিশু এই মর্মে বলেছিলেন যে, বন্ধুকে ভালবাসার মধ্যে গৌরবের কী আছে? যদি শত্রুকে ভালবাসতে পারা যায় তবেই না গৌরব করার মত কিছু করা হয়।

যারা শত্রুকে ভালবাসতে পারে না, তারা শত্রুবিনাশের পর আবার বন্ধুকেই শত্রু বানিয়ে বসে। শত্রুর চিন্তা যার মাথায় একবার জেঁকে বসে সে শত্রু ছাড়া বাঁচতে পারে না। যারা শত্রুর প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতে পারে না, তার বিপরীতে মূল্যমানগুলো বজায় রাখতে পারে না, তারা নিজেদের মধ্যেও কার্যকরভাবে তা চর্চা করতে পারে না। এই যে আজকের ইউরোপ বা আমেরিকা! তাদের উত্থানের শক্তি কোথা থেকে এসেছে? বিজ্ঞান? সামরিক শক্তি? না। এগুলো ফল হিসেবে তারা পেয়েছে; কারণ হিসেবে কাজ করেনি। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দার্শনিকেরা এটি করেছেন। তারা মহান মানবিক মূল্যমানগুলোকে কেবল যে চিহ্নিত করেছিলেন তা-ই নয়, গণমানুষের মধ্যে তা সঞ্চালন করতে পেরেছিলেন। আজ যদি কেবল বিজ্ঞান আর সামরিক শক্তির উপর নির্ভর করে হিংসা ও অসাম্যের পথে যাত্রা শুরু করে তবে তারা তাদের পতনের সূচনাই কেবল করবে। ভাল মানুষ শাসন করতে চায় না, শাসনভার তার উপর বর্তাতে পারে ভাল মানুষির ফল হিসেবে।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী