ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা


এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন হয় নানা রকম কমিউনিকেশন, এয়ার ন্যাভিগেশন ও সার্ভিল্যান্স সিস্টেম। আমরা আগেই বলেছি যে, ট্র্যাডিশনাল সিস্টেমগুলো মূলত পুরনো প্রযুক্তির; ভয়েস রেডিও ট্রান্সমিশন, মেসেজ সুইচিং, টেলিটাইপরাইটিং, ভূমি ভিত্তিক ন্যাভিগেশন সিস্টেম ও রাডার প্রযুক্তি – এগুলোই বিগত অর্ধ শতাব্দীরও বেশী কাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই পর্বে আমরা এগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করব।

২। কমিউনিকেশন

পাইলট ও কন্ট্রোলারের মধ্যে যোগাযোগ এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের জন্য একান্ত আবশ্যক। স্টার্টআপ ক্লিয়ারেন্স, টেকঅফ ক্লিয়ারেন্স, ফ্লাইট লেভেল এপ্রুভাল, পজিশন রিপোর্টিং, ল্যান্ডিং ক্লিয়ারেন্স ইত্যাদি কন্ট্রোল ইন্সট্রাকশন এবং আবহাওয়া, নোটিফিকেশন ইত্যাদি তথ্য প্রদানের মধ্য দিয়ে ভূমি থেকে কন্ট্রোল সার্ভিস ও ইনফরমেশন সার্ভিস বিমানকে দেয়া হয়ে থাকে। এই যোগাযোগটি সম্পাদিত হয় কন্ট্রোলার-পাইলটের মধ্যে সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যমে।

২.১। ভয়েস কমিউনিকেশন

২.১.১। VHF ফ্রিকোয়েন্সি ১১৮ থেকে ১৩৭ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ক্যারিয়ারকে ভয়েস দিয়ে মডুলেশন করে রেডিও ওয়েভ ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে এই যোগাযোগ সাধন করা হয়। এই যোগাযোগে বেশ কয়েকটি সমস্যা রয়েছে। এটি কন্ট্রোলার ও পাইলটের বাচনিক ভাষা নির্ভর – যা সময়সাপেক্ষ এবং যেখানে বোধগম্যতা অনেকটাই বিষয়ীগত। এখানে একটি এরিয়ার সকল পাইলটের সাথে একটি নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে কন্ট্রোলারকে যোগাযোগ করতে হয় বলে এক পাইলটের সাথে কথোপকথনের সময় অন্য পাইলটদের অপেক্ষা করতে হয়। এয়ার ট্রাফিক ঘনত্ব যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে এই পদ্ধতি একসময় অপর্যাপ্ত ও অকার্যকর হয়ে উঠবে।

২.১.২। VHF ফ্রিকোয়েন্সি দৃষ্টিরেখা বরাবর সঞ্চারিত হয় এবং তাদ্বারা অনেক দূরের বিমানের সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয় না। তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে HF ফ্রিকোয়েন্সিতেও এয়ার-গ্রাউন্ড যোগাযোগ সম্পাদন করা হয়। সাধারণত এডভাইসারি সার্ভিসে এটি ব্যবহৃত হয়। তবে এরও কিছু সমস্যা রয়েছে। HF ট্রান্সমিশন ভূমির কার্ভেচার অনুসরণ করে অগ্রসর হতে পারে বলে অপেক্ষাকৃতভাবে বেশী দূরে যেতে পারলেও তার ভেতরকার তথ্য নানাভাবে সহজেই আক্রান্ত হয়। তাছাড়া এধরণের ট্রান্সমিশনে বড় আকারের এন্টেনা প্রয়োজন হয়।

২.২। এরোনটিক্যাল ফিক্সড টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক (AFTN)

২.২.১। বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচলে নানা সংস্থা ও কর্তৃপক্ষের সেবা ও ক্রিয়াকলাপ জড়িত হয়ে আছে। প্রতিটি ফ্লাইট শুরু হওয়ার আগেই তার গন্তব্য দেশ এবং যাত্রাপথের অন্য সকল দেশের সাথে যাত্রারম্ভের দেশের যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই যোগাযোগ সাধিত হয় ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট স্টেশনের মধ্যে। এই স্টেশনগুলোকে বলা হয়ে থাকে এরোনটিক্যাল কমিউনিকেশন স্টেশন। এই স্টেশনগুলি এয়ারপোর্ট ভিত্তিক এবং এরা সকলে একটি কমিউনিকেশন নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত – যাকে বলা হয় এরোনটিক্যাল ফিক্সড টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক বা সংক্ষেপে AFTN। যেহেতু এই স্টেশনগুলি ভূমিতে স্থিরভাবে অবস্থিত তাই ফিক্সড শব্দটি তার নামে এসেছে।

২.২.২। এখানে যোগাযোগ সাধিত হয় সরল টেক্সট ক্যারেক্টার ভিত্তিক বার্তার মাধ্যমে। এখানে রয়েছে স্টেশনগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট এড্রেসিং স্কিম এবং মেসেজ সুইচিংয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট নোড ও পথ। বিশ বছর আগেও সুইচিং ছিল ম্যানুয়াল; অপারেটররা এক পোর্টের আউটপুট টর্ন টেপ অন্য পোর্টে ইনপুট হিসেবে ব্যবহার করে মেসেজ রিলে করত। বর্তমান কালের অধিকাংশ সুইচিং সিস্টেম কম্পিউটার ভিত্তিক এবং অটোমেটিক হলেও তার অন্তরালে রয়ে গিয়েছে সেই পুরাতন টেলিটাইপরাইটিং স্পেসিফিকেশন। এখানে বার্তা ক্যারেক্টারের ভিত্তিক এবং এই সিস্টেম বাইনারি ডাটা আদান প্রদান করতে পারে না। বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিকাশ হয়েছে আধুনিক কম্পিউটার নেটওয়ার্ক প্রযুক্তির বিকাশের আগেই। AFTN-এ মেসেজ আদান প্রদানে তাই তার সামর্থ্যগত সীমাবদ্ধতা অনেক, যা কম্পিউটার ইন্টারনেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই কেবল অতিক্রম করা সম্ভব।

৩। ন্যাভিগেশন

বিশ্বযুদ্ধের কাল থেকে নানা ধরণের এয়ার ন্যাভিগেশন সিস্টেম প্রস্তুত ও ব্যবহার করা হয়ে আসছে। এসব সিস্টেম ভূমিতে স্থাপন করা হয় এবং সিস্টেমগুলি রেডিও ওয়েভ ট্রান্সমিটার। ন্যাভিগেশন সিস্টেমগুলির দুটো প্রধান কাজ: আকাশে এয়ার রুট নির্ধারিত বা নির্দিষ্ট (define) করা হয় এই সিস্টেমগুলোর মাধ্যমে এবং পাইলটের জন্য সিস্টেমগুলো প্রদান করে তার অবস্থান ও চলার দিক নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় গাইডেন্স বা তথ্য।

৩.১। নন-ডিরেকশনাল বিকন (NDB)

৩.১.১। একটি NDB গ্রাউন্ড স্টেশন অত্যন্ত সরল একটি ট্রান্সমিটার যা HF ১৯০ থেকে ১৭৫০ কিলোহার্টজ ব্যান্ডে ট্রান্সমিশন করে। অবশ্য বাংলাদেশের সব NDB ১৯০ থেকে ৫৩৫ কিলোহার্টজ ব্যান্ডে কাজ করে। এর মধ্যে দিক সম্বন্ধীয় কোন তথ্য থাকে না বলে এর নামে নন-ডিরেকশনাল শব্দটি এসেছে। তবে প্রতিটি ন্যাভিগেশন সিস্টেমের একটি বিশ্বজুড়ে ইউনিক পরিচিতি কোড থাকে। প্রতিটি NBD-এর জন্যও আছে। এই কোড দুই বা তিনটি ইংরেজি অক্ষরের সমন্বয়ে গঠিত। যেমন, ঢাকার NDB-এর কোড DCN, VOR-এর কোড DAC, ILS-এর কোড IDA ইত্যাদি। এই অক্ষরগুলো মোর্স কোড অনুসারে ক্যারিয়ারের সাথে মডুলেটেড অবস্থায় ট্রান্সমিট করা হয়, যা এয়ারক্রাফটের রিসিভারে ডিমডুলেশনের পর পাইলট কানে মোর্স কোডটি শুনতে পান। এর মাধ্যমে পাইলট নিশ্চিত হতে পারেন তার টিউন করা NDB-টি পৃথিবীর কোন NDB স্টেশন তথা কোন স্থান।

৩.১.২। যে কোন পয়েন্ট অফ রেডিয়েশনের দিক নির্ণয় করা সহজ। NDB-এর ক্ষেত্রে একটি লুপ এন্টেনা তা করতে পারে। এই প্রযুক্তিকে বলা হয় ডিরেকশন ফাইন্ডিং। কিছু ইলেক্ট্রিক্যাল, ইলেক্ট্রনিক ও মেকানিক্যাল যন্ত্রের সাহায্যে খুব সহজেই ডিরেকশন ফাইন্ডিং কাজকে অটোমেটিক করে তোলাও যায়, যাকে বলা হয় ADF প্রযুক্তি। যদিও NDB সিগনালে দিক সম্বন্ধে কোন তথ্য থাকে না, তবুও এয়ারবোর্ন রিসিভারে ADF-এর মাধ্যমে NDB-এর দিক নির্ণয় করা যায় – আর এভাবেই একটি সরল ট্রান্সমিটারকে ন্যাভিগেশনের কাজে লাগানো যাচ্ছে। তবে এর একিউরেসি অত্যন্ত খারাপ এবং HF ট্রান্সমিশনের সব অসুবিধা এতে বিদ্যমান। নিকট ভবিষ্যতে NDB একটি পরিত্যক্ত সিস্টেমে পর্যবসিত হবে।

৩.২। ভিএইচএফ অমনি-ডিরেকশনাল রেডিও রেঞ্জ (VOR)

VOR একটি উন্নত ন্যাভিগেশন এইড, যা VHF ১০৮ থেকে ১১৮ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে কাজ করে। এর সিগনাল থেকে এয়ারবোর্ন রিসিভার এয়ারক্রাফটের হেডিং বা কোর্স নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে পারে এবং এনরুট অটোপাইলটিংও এ থেকে সম্ভব। VOR সিস্টেমের মডুলেশন প্রক্রিয়া ও একটি এন্টেনা সিস্টেমের মাধ্যমে এর রেডিয়েশন প্রক্রিয়া এমন যে, আকাশের কোন পয়েন্টে গৃহীত সিগনালে বিদ্যমান একটি ৩০ হার্টজ রেফারেন্স ও একটি ৩০ হার্টজ ভেরিয়েবল এর ফেজ ডিফারেন্স থেকে ম্যাগনেটিক নর্থ এর সাপেক্ষে স্টেশনের দিক নির্ধারক কোণ (angle) এর মান পাওয়া যায়। এই কোণের মানকেই ন্যাভিগেশনের জন্য বা অটোপাইলটিংয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়। এর একিউরেসি NBD-এর চেয়ে অনেক ভাল। বর্তমান কালের বেশির ভাগ এয়াররুট VOR গ্রাউন্ড স্টেশনের সিগনাল দ্বারা তৈরি। মডুলেশনের ধরণ ও পদ্ধতি গত প্রযুক্তি অনুসারে VOR দুরকমের হয়: কনভেনশনাল (CVOR) ও ডপলার (DVOR)। নীচে একটি ডপলার ভিওআর স্টেশনের ছবি দেয়া হল।


.
৩.৩। ডিসটেন্স মেজারিং ইকুইপমেন্ট (DME)

VOR থেকে বিমানের অবস্থানের কৌণিক মান পাওয়া গেলেও স্টেশন থেকে তার দূরত্ব জানা যায় না। এই দূরত্ব জানার জন্য DME ব্যবহার করা হয়। NDB, VOR বা ILS-এর মত এক্ষেত্রে যোগাযোগটি গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে এয়ারক্রাফটের দিকে ইউনিলেটারাল নয়। বরং DME গ্রাউন্ড স্টেশন ও এয়ারবোর্ন স্টেশনের মধ্যে সক্রিয় সহযোগিতার মাধ্যমে দূরত্ব নির্ণয় কাজটি সম্পাদিত হয়। DME এয়ারবোর্ন স্টেশনকে বলা হয় ইন্টারোগেটর এবং গ্রাউন্ড স্টেশন কাজ করে ট্রান্সপন্ডার হিসেবে। ইন্টারোগেটর একটি কোড ট্রান্সমিট করে ও তার সময় সম্বন্ধে চেতন থাকে, অন্যদিকে ট্রান্সপন্ডার এই ইন্টারোগেশন পাওয়ার পর একটি রিপ্লাই কোড প্রেরণ করে। এই রিপ্লাই পাওয়ার পর এয়ারবোর্ন স্টেশন প্রথম সময় থেকে রিপ্লাই পাওয়ার সময়ের ব্যবধান হিসাব করে দূরত্ব নির্ণয় করে। DME কাজ করে UHF ৯৬২ থেকে ১২১৩ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে।

৩.৪। ইন্সট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম (ILS)

৩.৪.১। ভূমিতে বসানো ইন্সট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম থেকে প্রাপ্ত সিগনাল ব্যবহার করে এয়ারবোর্ন রিসিভার পাইলটকে রানওয়েতে নামার ভিজুয়াল গাইডেন্স দিতে পারে। রানওয়েতে নামার জন্য রানওয়ের সেন্টার প্লেন, ডিসেন্ট প্লেন এবং এয়ার ক্রাফট থেকে রানওয়ের শুরুর প্রান্তের দূরত্ব রেডিও সিগনালের মাধ্যমে কোনভাবে প্রদান করতে পারলে পাইলট রানওয়ে দেখতে না পাওয়া সত্ত্বেও রানওয়েতে নামার জন্য এপ্রোচ করতে পারবে। এই তিন ধরণের সিগনাল তৈরিতে তিন ধরণের যন্ত্র ব্যবহার করা হয়:
ক) সেন্টার প্লেনের জন্য লোকালাইজার,
খ) ডিসেন্ট প্লেনের জন্য গ্লাইড পাথ, ও
গ) দূরত্বের নির্দেশক হিসেবে মার্কার অথবা ল্যান্ডিং ডিএমই।

৩.৪.২। লোকালাইজার

লোকালাইজার রানওয়ের সেন্টার লাইন গাইডেন্স প্রদান করে। এটি VHF ১০৮ থেকে ১১২ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডে কাজ করে। এখানে দুটি অডিও ফ্রিকোয়েন্সি ৯০ এবং ১৫০ হার্টজ সাইনওয়েভকে ক্যারিয়ারের সাথে এমপ্লিচুড মডুলেশন করা হয় এবং অনেকগুলো এন্টেনার একটি বিন্যাস থেকে এমনভাবে রেডিয়েট করা হয় যে, রানওয়ের সেন্টার লাইন বরাবর ৯০ ও ১৫০ উভয় ফ্রিকোয়েন্সির ডেপথ অব মডুলেশন সমান থাকে (প্রত্যেকের জন্য ২০%)। ফলে ডিফারেন্স ইন ডেপথ অব মডুলেশন (DDM) এর মান হয় শূন্য। এই শূন্য DDM মান আকাশে যে তল তৈরি করে তা-ই লোকালাইজার তল, যা রানওয়ের সেন্টার লাইনের উপর উল্লম্বভাবে অবস্থান করে। পাইলটের আসন থেকে দেখলে, সেন্টার লাইন থেকে এয়ারক্রাফট ডানে বা বামে সরতে থাকলে এই DDM এর মান ক্রমেই বাড়তে থাকে – ডানে সরলে ১৫০ হার্টজ এর মডুলেশন ডেপথ ৯০ হার্টজ এর ডেপথ থেকে বাড়ে এবং বামে সরলে ৯০ হার্টজ এর ডেপথ অন্যটি থেকে বেশী হয়। রানওয়েতে নামার জন্য যেদিক থেকে এয়ারক্রাফট এপ্রোচ করে সেদিকে রানওয়ের সেন্টার লাইন বরাবর লোকালাইজারের কভারেজ হয়ে থাকে ২৫ নটিক্যাল মাইল। এয়ারক্রাফট ককপিটে সাধারণ অসিলোস্কোপের স্ক্রিনের মত একটি স্ক্রিন থাকে, যার উপর লোকালাইজার ইনডিকেটর লাইনটি থাকে উল্লম্বভাবে। এই লাইনটি স্কোপের মধ্যখানে থাকলে বুঝতে হবে এয়ারক্রাফট রানওয়ের সেন্টার লাইন বরাবর এগুচ্ছে; যদি লাইনটি ডানে সরে আসে তবে এয়ারক্রাফটকে ডানে (বামের বেলায় বামে) সরিয়ে আনলে সেন্টার লাইনের দিকে যাওয়া হয়। নীচে একটি লোকালাইজারের এন্টেনা এ্যারে-এর ছবি দেয়া হলো।


.
৩.৪.৩। গ্লাইড পাথ

এয়ারক্রাফটের ডিসেন্ট পাথ অনুভূমের সাথে সাধারণত ৩ ডিগ্রী হয়ে থাকে। গ্লাইডপাথ রানওয়েতে নামার এই ডিসেন্ট পাথ সম্বন্ধীয় গাইডেন্স প্রদান করে। এর কাজের প্রকৃতি লোকালাইজারের মতই, এটির ক্ষেত্রে ৯০ ও ১৫০ হার্টজের শূন্য DDM (উভয়ের ক্ষেত্রে ৪০%) যে তলটি তৈরি করে তা অবতরণ পথটি ধারণ করে। এর উপরের দিকে ৯০ হার্টজের ও নীচের দিকে ১৫০ হার্টজের মডুলেশন ডেপথের প্রাধান্য থাকে। লোকালাইজার প্রদত্ত শূন্য DDM তল ও গ্লাইড পাথ প্রদত্ত শূন্য DDM তল যে রেখায় পরস্পরকে ছেদ করে, সে রেখাটিই এয়ারক্রাফটের অবতরণ পথ। ককপিটের যে স্ক্রিনটিকে লোকালাইজার নির্দেশক ভার্টিক্যাল লাইনটি থাকে সেই একই স্ক্রিনে গ্লাইড পাথ নির্দেশক লাইনটি থাকে আনুভূমিকভাবে। গ্লাইড পাথ কাজ করে ৩২৮ থেকে ৩৩৬ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডে এবং এর কভারেজ রানওয়ের অবতরণ প্রান্ত থেকে সাধারণত ৮ নটিক্যাল মাইল।

৩.৪.৪। মার্কার

রানওয়ের নিকটতার পরিমাণ নির্দেশ করতে সাধারণত মার্কার ব্যবহার করা হয়। এধরণের তিনটি মার্কার থাকতে পারে: আউটার মার্কার, মিডল মার্কার ও ইনার মার্কার। এগুলো সবই ৭৫ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতে কাজ করে এবং ফানেল আকারে এবং উল্লম্বভাবে এদের রেডিয়েশন হয়ে থাকে। মার্কার তিনটির জন্য আলাদা পরিচিতি কোড রয়েছে, যা পাইলট কানে শুনতে পান। তবে বিশ্বের সব আউটার মার্কারের কোড একই এবং অন্য দুটির বেলাতেও একই কথা। অবতরণকালে এয়ারক্রাফট এই ফানেল অতিক্রমের সময় রেসপেকটিভ অডিও-ভিজুয়াল ইনডিকেশন পেয়ে থাকে। মার্কারগুলো যেহেতু পূর্বনির্ধারিত দূরত্বে স্থাপন করা হয় তাই এই ইনডিকেশনের সময় পাইলট রানওয়ের শুরুর প্রান্তের কতটুকু নিকটবর্তী হয়েছেন তা বুঝতে পারেন। তবে কোন রানওয়ের জন্য মার্কার স্থাপনে অসুবিধা থাকলে এগুলোর বদলে একটি ল্যান্ডিং DME ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই DME গ্লাইড পাথের সাথে সহাবস্থান করতে পারে, আবার রানওয়ের কোন এক পাশে তার মাঝামাঝি স্থানে স্থাপন করা যেতে পারে যেন একই রানওয়ের উভয় দিকের জন্য বসানো দুটি ILS একই DME ব্যবহার করতে পারে।

৪। সার্ভিল্যান্স

সবচেয়ে সরল এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল কাজ করা হয়ে থাকে এয়ারক্রাফটের পজিশন রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে – এই রিপোর্টিংটি সাধিত হয় এয়ার-গ্রাউন্ড VHF ভয়েস রেডিও যোগাযোগের মাধ্যমে। এখানে কন্ট্রোলার-পাইলটের মধ্যে কথার আদান প্রদান হয়। পাইলট তার পজিশন জানতে পারে VOR ট্র্যাক এবং DME ডিসটেন্স থেকে। কন্ট্রোলার সময়কে ব্যবহার করে সেপারেশনের জন্য। কিন্তু রাডার প্রযুক্তির মাধ্যমে কন্ট্রোলার এয়ারক্রাফটের অবস্থান সার্বক্ষণিকভাবেই দেখতে পান স্ক্রিন ডিসপ্লের উপর। বিমান চলাচল সার্ভিল্যান্সের ক্ষেত্রে দুধরণের রাডার প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়: প্রাইমারি রাডার ও সেকেন্ডারি রাডার প্রযুক্তি।

৪.১। প্রাইমারি সার্ভিল্যান্স রাডার (PSR)

PSR এয়ারক্রাফট চিহ্নিত করে উচ্চ ক্ষমতার রেডিও সিগনাল ট্রান্সমিট করা ও আকাশের কোন টার্গেট বস্তুর গা থেকে প্রতিফলিত রশ্মি রিসিভ করার মাধ্যমে। এই সিগনাল ট্রান্সমিট-রিসিভ করার কাজে ব্যবহার করা হয় খুবই ডিরেকশনাল বিম যা বিচ্ছুরিত হয় একটি ঘূর্ণায়মান এন্টেনা থেকে। এন্টেনার কৌণিক অবস্থান থেকে এঙ্গেল এবং ট্রান্সমিশন-রিসিপশনের মধ্যকার সময় থেকে টার্গেটের দূরত্ব পাওয়া যায়। আর এই দুই তথ্যকে একটি দ্বিমাত্রিক ডিসপ্লেতে তা ইলেকট্রনিক উপায়ে প্লট করা হয় – যাকে আমরা রাডার ডিসপ্লে বলে থাকি। প্রতিফলিত রশ্মি প্রয়োজন হয় বলে এই প্রযুক্তিতে বড্ড বেশী উচ্চ ক্ষমতার সিগনাল ট্রান্সমিশনের জন্য উৎপন্ন করতে হয়। এর জন্য জটিল ও ব্যয়বহুল এমপ্লিফায়ার (ক্লাইস্ট্রন জাতীয়, যা আকারেও অনেক বড়) দরকার হয়। এটিই এর সবচেয়ে বড় অসুবিধা। তবে এর সুবিধা হলো এতে এয়ারক্রাফট কর্তৃক একটিভ পারটিসিপেশন প্রয়োজন হয় না ও এয়ারক্রাফটে এর জন্য কোন সিস্টেম স্থাপন করতে হয় না। বেসামরিক বিমান চলাচলে যে প্রাইমারি রাডার ব্যবহৃত হয়ে আসছে তার আর একটি অসুবিধা হলো, এর মাধ্যমে এয়ারক্রাফটের অলটিচুড জানা সম্ভব হয় না।

৪.২। সেকেন্ডারি সার্ভিল্যান্স রাডার (SSR)

সেকেন্ডারি রাডার প্রযুক্তির মূল কার্যপ্রণালী DME-এর মতই। পার্থক্য হচ্ছে এক্ষেত্রে ইন্টারোগেটর হচ্ছে SSR গ্রাউন্ড স্টেশন এবং ট্রান্সপন্ডার থাকে এয়ারক্রাফটে। তবে এখানেও PSR-এর মতই রোটেটিং এন্টেনা প্রয়োজন হয় এবং কোণ ও দূরত্বের জন্য PSR-এর মত প্রসেসিং কৌশল ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যেহেতু ইকো-এর আর কোন প্রয়োজন থাকছে না তাই উচ্চ ক্ষমতার ট্রান্সমিশন থেকে গ্রাউন্ড স্টেশন রেহাই পাচ্ছে। তাছাড়া SSR এয়ারবোর্ন ট্রান্সপন্ডার এয়ারক্রাফটে স্থাপিত অল্টিচুড মাপার অন্য সিস্টেম থেকে পাওয়া তথ্যটি তার রিপ্লাই কোড-এ সন্নিবিষ্ট করে দেয় বিধায় গ্রাউন্ড স্টেশন ভূমি থেকে এয়ারক্রাফটের উচ্চতাটিও জানতে পারে। একইভাবে এয়ারক্রাফটের পরিচয়টিও SSR এ পাওয়া যায়। রিপ্লাইয়ের প্রয়োজন হয় বিধায় SSR-এ এয়ারক্রাফটের একটিভ পার্টিসিপেশন আবশ্যক। যেসব এয়ারক্রাফটে SSR ট্রান্সপন্ডার নেই বা অকার্যকর হয়ে পড়ে সেসব এয়ারক্রাফট সম্বন্ধে গ্রাউন্ড স্টেশনের কোন সম্বিত থাকে না।

৪.৩। একাস/টিকাস (ACAS/TCAS)

PSR ও SSR এর মাধ্যমে ভূমিতে অবস্থিত এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল স্টেশন সার্ভিল্যান্স ও কন্ট্রোল কাজ সম্পন্ন করে। এরা পাইলটকে সরাসরি ও সার্বক্ষণিক সিচুয়েশনাল এওয়ারনেস প্রদান করতে পারে না। পাইলট তার আশেপাশের এয়ারক্রাফটের অবস্থান জানার জন্য ব্যবহার করে এয়ারবোর্ন কলিশন এভয়ডেন্স সিস্টেম (ACAS)। ACAS আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO) প্রণীত সিস্টেম স্পেসিফিকেশন। প্রডাকশন ইন্ডাস্ট্রিতে এই যন্ত্রাবলী বা সিস্টেম সাধারণত TCAS (ট্রাফিক কলিশন এভয়ডেন্স সিস্টেম) নামে পরিচিত। এরা SSR প্রযুক্তিতে কাজ করে তবে তুলনামূলকভাবে অল্প রেঞ্জে। সকল পক্ষ কর্তৃক সব সুবিধা পেতে হলে সকল এয়ারক্রাফটেই TCAS ইন্টারোগেটর ও ট্রান্সপন্ডার থাকতে হয় ও সচল থাকতে হয়। এই সিস্টেম দ্বারা পার্শ্ববর্তী এয়ারক্রাফটের অবস্থান, কৌণিক দূরত্ব, দূরত্ব ও আপেক্ষিক অল্টিচুড জানা যায় যা পাইলটের জন্য রাডার ডিসপ্লে হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তাছাড়া গায়ে গায়ে সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য বিপদকালে সংশ্লিষ্ট দুই এয়ারক্রাফটের কম্পিউটারাইজড এই সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের মধ্যে নেগোশিয়েট করে নিরাপদ ডিসেন্ট/ক্লাইম্ব ম্যানুভারের সিদ্ধান্ত দিতে পারে। TCAS ধরণের এলার্ট দিয়ে থাকে: ট্রাফিক এডভাইসারি (TA), রেজোল্যুশন এডভাইসারি (RA) ও ক্লিয়ার অব কনফ্লিক্ট। এয়ারবোর্ন TCAS অপারেশনের সাথে গ্রাউন্ড স্টেশন SSR অপারেশনের কোন সম্পর্ক নেই, তাই পাইলট ও কন্ট্রোলারের রাডার ডিসপ্লে সম্পূর্ণভাবে একরূপ হয় না।


.
চলবে…
n

পরের পর্ব:
বিমান চলাচলে নেক্সটজেন টেকনোলজি – ৩/৩ (নতুন প্রযুক্তি)

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী