ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা


১.১। ভবিষ্যৎ এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সনাতন কমিউনিকেশন, ন্যাভিগেশন ও সার্ভিল্যান্স সিস্টেমসমূহের সীমাবদ্ধতার এবং বিমান চলাচলকে একুশ শতকে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এই তিন ক্ষেত্রে আবশ্যক উন্নতি সাধনের প্রয়োজনীয়তার কথা গত ৮০’র দশকের শুরুতেই আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (ICAO) ভাবতে শুরু করে। এই ভাবনার ফসল ফিউচার এয়ার ন্যাভিগেশন সিস্টেম (FANS) – যা ICAOএর একটি কনসেপ্ট। ১৯৮৩ সালে ICAO এই কনসেপ্টের উপর ভিত্তি করে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। নতুন সম্ভাবনা ও নতুন প্রযুক্তি অন্বেষণ করার দায়িত্ব ন্যস্ত হলো এই কমিটির উপর। কমিটির প্রতিবেদনে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ভিত্তিক যোগাযোগ, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, ডাটা লিংক যোগাযোগ ইত্যাদি প্রাধান্য পায়। পরবর্তীতে আরও একটি ফলো-অন কমিটি (FANS Phase II) গঠিত হয় – নতুন সিস্টেমগুলো বিশ্বজুড়ে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের পন্থা ও উপায় খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে। এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টে প্রয়োজনীয় কমিউনিকেশন, ন্যাভিগেশন ও সার্ভিল্যান্স এর সিস্টেমগত বা প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ক্ষেত্রটিকে ICAO সংক্ষেপে CNS বলে অভিহিত করে থাকে। বিগত ২০ বছরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন CNS বাস্তবায়নে অনেক কাজ হয়েছে এবং নানারূপ অসুবিধার মধ্যেও এই কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।

১.২। আমরা এই পর্বে নেক্সট জেনারেশন CNS সিস্টেম ও এপ্লিকেশন নিয়ে পরিচিতিমূলক সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে চেষ্টা করব। ভবিষ্যতে ATN, CPDLC ও ADS-B নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে লেখার ইচ্ছা আছে।

২। কমিউনিকেশন

২.১। এরোনটিক্যাল টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক (ATN)

২.১.১। আগে বলা হয়েছিল যে, এরোনটিক্যাল বার্তা আদান প্রদানের জন্য এতকাল ধরে ব্যবহার করে আসা হচ্ছে এরোনটিক্যাল ফিক্সড টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক (AFTN)। আরও বলা হয়েছিল যে, এটি মূলত টেক্সট বেইজড মেসেজ সুইচিং সিস্টেম মাত্র। গত তিন দশকে কম্পিউটার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও কম্পিউটার এপ্লিকেশনে বিস্তর অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। তাই এভিয়েশন কমিউনিটির জন্য পুরাতন প্রযুক্তির AFTN এর স্থলে বিশ্বব্যাপী অধুনা বহুলভাবে ব্যবহৃত ইন্টারনেটের মত একটি নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। পরিকল্পিত এই নেটওয়ার্কের নাম দেয়া হয়েছে এরোনটিক্যাল টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক বা ATN। আকাশের এয়ারক্রাফটকেও এই ইন্টারনেটওয়ার্কের আওতায় আনা হবে বিধায় ‘ফিক্সড’ শব্দটি এখানে পরিহার করা হয়েছে।

২.১.২। এই ইন্টারনেটওয়ার্কের জন্য প্রথমে OSI মডেল ও OSI প্রটোকলগুলো স্থির করা হয়েছিল। ৮০’র দশকে সঙ্গত কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেয় হয়েছিল: এভিয়েশন কমিউনিটির প্রয়োজন পূরণে ইন্টারনেটে ব্যবহৃত IPv4 সক্ষম ছিল না – IPv4 এর এড্রেস অপ্রতুলতা, সিকিউরিটির অপর্যাপ্ততা, সর্বোপরি মোবাইল নেটওয়ার্ককে ম্যানেজ করার ক্ষেত্রে তার অক্ষমতার কারণে। তাই একরকম বাধ্য হয়েই সেসময় OSI এর মত নিছক কেতাবি আর্কিটেকচার অবলম্বন করতে হয়েছিল।

২.১.৩। OSI মডেল কখনোই বাস্তবে ব্যাপকভাবে রূপায়িত হয়নি, হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার লেভেলে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষাও হয়নি এবং ইন্ডাস্ট্রির আনুকূল্য পায়নি; যে কারণে স্বাভাবিকভাবেই OSI সফটওয়্যার ও যন্ত্রপাতির মূল্য অনেক বেশী। যখন IPv6 এর আবির্ভাব হলো তখন OSI নিয়ে আর অগ্রসর হবার ক্ষেত্রে এভিয়েশন কমিউনিটি বিভক্ত হয়ে পড়ে। একারণে ATN এর অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে তার পূর্ণ বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটছে। ICAO অবশ্য ইতোমধ্যেই ATN/OSI এর পাশাপাশি ATN/IPS এর জন্যও স্পেসিফিকেশন প্রস্তুত করেছে। IPS দ্বারা তারা ইন্টারনেট প্রটোকল স্যুটকে বোঝাচ্ছে: যা আসলে প্রধানত TCP/IP।

২.১.৪। এই ATN হতে যাচ্ছে এভিয়েশন কমিউনিটির প্রধান যোগাযোগ অবকাঠামো যা একই সাথে ব্যবহৃত হবে সিভিল এভিয়েশন এডমিনিস্ট্রেশন, এরোড্রাম ও এয়ার ন্যাভিগেশন সার্ভিস প্রভাইডার, এয়ারপোর্ট ও এয়ারক্রাফট অপারেটর এবং প্যাসেঞ্জারদের দ্বারা।

২.১.৫। বাইনারি ডাটা আদান প্রদান করতে সক্ষম ATN কম্পিউটার ভিত্তিক নেটওয়ার্ক। তাই AFTN এর চেয়ে ATN এর সম্ভাবনা অনেক বেশী। ATN প্ল্যাটফর্মের উপর নানা ধরণের এয়ার ন্যাভিগেশন সার্ভিস এপ্লিকেশনও ডেভেলপ করা সম্ভব। ইন্টারনেটওয়ার্ক রাউটিং বিবেচনায় এই এপ্লিকেশনগুলোকে দুভাগে ভাগ করা যায়: গ্রাউন্ড-গ্রাউন্ড এপ্লিকেশন এবং এয়ার-গ্রাউন্ড এপ্লিকেশন। ইতোমধ্যে যেসব এপ্লিকেশনের স্পেসিফিকেশন ও প্রসেডিওর তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে সেগুলো মধ্যে প্রধান কয়েকটির নাম নীচে দেয়া হলো।

গ্রাউন্ড-গ্রাউন্ড এপ্লিকেশন:
(ক) এয়ার ট্রাফিক সার্ভিসেস মেসেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম (ATSMHS),
(খ) এয়ার ট্রাফিক সার্ভিসেস ইন্টার-ফ্যাসিলিটি ডাটা কমিউনিকেশন (AIDC)।

এয়ার-গ্রাউন্ড এপ্লিকেশন:
(ক) কন্ট্রোলার পাইলট ডাটা লিংক কমিউনিকেশন (CPDLC)
(খ) অটোমেটিক ডিপেন্ডেন্ট সার্ভিল্যান্স (ADS)

২.২। এয়ার ট্রাফিক সার্ভিসেস মেসেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম (AMHS)

এটিএস মেসেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম একটি ই-মেইল সিস্টেম যার মাধ্যমে এরোনটিক্যাল বার্তা আদান প্রদান করা হয়। AMHS মেসেজ AFTN মেসেজের স্থলাভিষিক্ত নতুন পদ্ধতি। AMHS প্রতিষ্ঠিত X.400 মেসেজ ট্রান্সফার এজেন্টের উপর এবং মেসেজ ট্রান্সফারে ব্যবহার করা হয় P1 প্রটোকল। যতদিন না AFTN সম্পূর্ণভাবে অপসারিত হচ্ছে ততদিন আবশ্যক ক্ষেত্রে উভয় নেটওয়ার্কের মধ্যে গেইটওয়ে হিসেবে কাজ করবে AMHS-AFTN গেইটওয়ে।

২.৩। এটিএস ইন্টার-ফ্যাসিলিটি ডাটা কমিউনিকেশন (AIDC)

একটি দেশের এয়ারস্পেস এক বা একাধিক ফ্লাইট ইনফরমেশন রিজিওন (FIR)-এ বিভক্ত। এক FIR থেকে এয়ারক্রাফট পার্শ্ববর্তী FIR-এ প্রবেশকালে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল অথরিটির পরিবর্তন হয়। এটি সম্পন্ন হয় এয়ারক্রাফট হ্যান্ডওভার/টেকওভার-এর মাধ্যমে। এজন্য সংশ্লিষ্ট দুই ATC সেন্টারের কন্ট্রোলারের মধ্যে যোগাযোগের প্রয়োজন হয়, প্রয়োজন হয় ফ্লাইট ডাটা ও রাডার ডাটা ইনফরমেশন আদান-প্রদানের। বর্তমান কালে এই আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে ফ্লাইটের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার কারণে। AIDC হচ্ছে এরূপ পাশাপাশি ATS ফ্যাসিলিটি যুগলের মধ্যে ATC ইনফরমেশন আদান-প্রদানের সিস্টেম। এর জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট মেসেজ ফরমেট।

২.৪। কন্ট্রোলার পাইলট ডাটা লিংক কমিউনিকেশন (CPDLC)

২.৪.১। CPDLC একটি এয়ার-গ্রাউন্ড ডাটা লিংক এপ্লিকেশন যা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার ও পাইলটের মধ্যে টেকস্ট ভিত্তিক মেসেজ আদান প্রদান করার কাজ করে। এটি তাই একটি কমিউনিকেশন এপ্লিকেশনও বটে। ভবিষ্যতে CPDLC সনাতন VHF ভয়েস কমিউনিকেশনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ATC এর মুখ্য সিস্টেম হিসেবে গণ্য হবে এবং VHF রেডিও টেলিফোনি একটি স্ট্যান্ড-বাই ও সহযোগী সিস্টেম হিসেবে থাকবে মাত্র । অধুনা ওশানিক রিজিওনসমূহে CPDLC ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে যোগাযোগ ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলে অনেক উন্নতি সাধিত হয়েছে।

২.৪.২। VHF রেডিও টেলিফোনির সমস্যা অনেক। VHF চ্যানেলের সংখ্যা সীমিত। কথোপকথন নিজেই একটি দীর্ঘ ও সময়-সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। তাছাড়া টেলিফোনির ক্ষেত্রে একজন পাইলট যখন কন্ট্রোলারের সাথে কথা বলেন তখন অন্য পাইলটদের অপেক্ষায় থাকতে হয়। এই পদ্ধতি এয়ারস্পেসের ক্যাপাসিটি বাড়ানোর অন্তরায়। যে হারে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ছে তাতে এই পদ্ধতি ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণে অক্ষম হয়ে পড়বে। CPDLC-তে এসব সমস্যা থাকছে না।

২.৪.৩। CPDLC অনেকটাই টেক্সট ভিত্তিক চ্যাট এপ্লিকেশনের মতো। তবে এখানে কিছু পূর্বনির্ধারিত ছোট ছোট মেসেজের সেট রয়েছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এগুলোই ATC-তে ব্যবহৃত হয় ও যথেষ্ট হয়। এর মধ্যে রয়েছে সব ধরণের ATC ক্লিয়ারেন্স, ফ্লাইট ইনফরমেশন ও রিকোয়েস্ট মেসেজ। CPDLC এর মাধ্যমে পাইলট নিজে থেকে শর্তসাপেক্ষ ক্লিয়ারেন্স নিতেও সক্ষম। রেডিও টেলিফোনিতে যেমন রিকোয়েস্ট-এপ্রুভাল-কনফারমেশন রূপে কথোপকথন হয়, তেমনই CPDLC-তে কন্ট্রোলার-পাইলটের মধ্যে রীতিমত লিখিত বার্তা ভিত্তিক ডায়ালগ চলে। লেভেল ও স্পিড এসাইনমেন্ট, রুট চেঞ্জ, আনুভূমিক ডেভিয়েশন, ইমার্জেন্সি ঘোষণা, ফ্রি টেক্সট সবই আছে CPDLC-তে।

২.২.৪। CPDLC-তে ডাটা লিংক হিসেবে যে দুটি প্রটোকল ব্যবহৃত হয় তা হলো ACARS (Aircraft Communications Addressing and Reporting System) ও VDLm2 (VHF Digital Link Mode 2)। প্রথমটি অনেক আগে থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে এয়ারলাইন অপারেশনাল কন্ট্রোল কাজের জন্য, কিন্তু এর ব্যান্ডউইডথ অনেক কম। অন্যদিকে, VDLm2 হচ্ছে ICAO সমর্থিত ডাটা লিংক যা ATN-এর ক্ষেত্রেও ব্যবহারযোগ্য। এর ডাটা ক্যাপাসিটি অনেক বেশী এবং এটি অনেক বেশী রিলায়েবল।

৩। ন্যাভিগেশন

৩.১। গ্লোবাল ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (GNSS)

৩.১.১। এয়ার ন্যাভিগেশনের জন্য ব্যবহৃত সব সনাতন সিস্টেমই ভূমি ভিত্তিক। এতে সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটি তৈরি হয়েছে তা হলো, সোজা পথের বদলে এয়াররুট অপ্রয়োজনীয়ভাবে আঁকাবাঁকা হয়েছে। এতে ফ্লাইট টাইম ও ফুয়েল কন্সাম্পশন বেড়েছে। সমুদ্রের উপর ন্যাভিগেশন সিস্টেম স্থাপনের সুযোগ নেই – এটিও একটি সমস্যা। স্যাটেলাইট সিস্টেম ভিত্তিক ন্যাভিগেশনে এসব সমস্যা অতিক্রম করা সম্ভব।

৩.১.২। GNSS শিরোনামে ICAO বিমান চলাচলে ন্যাভিগেশনের জন্য ব্যবহৃতব্য স্যাটেলাইট সিস্টেমের স্পেসিফিকেশন প্রণয়ন করেছে। প্রকৃত প্রস্তাবে GNSS একটি জেনেরিক টার্ম, এ নামে বাস্তবে রূপায়িত কোন সিস্টেম নেই। যুক্তরাষ্ট্রের GPS (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) এবং রাশিয়ার GLONASS (গ্লোবাল ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম) হচ্ছে সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত দুটি GNSS সিস্টেম। ইউরোপীয় দেশগুলো অন্যদের উপর নির্ভরশীলতা থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রাখার জন্য গ্যালিলিও নামে স্বতন্ত্র আরেকটি সিস্টেম নির্মাণ করছে। আবার চীন এবং ভারতও আলাদা আলাদাভাবে ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম তৈরি করছে। এই স্যাটেলাইটগুলো মিডিয়াম আর্থ অরবিটে অবস্থিত (অল্টিচুড: GPS–২০২০০, GLONASS–১৯১০০, Galileo–২৩২২২ কিলোমিটার)।

৩.১.৩। GPS-এর নাম আমরা অনেকেই শুনেছি ও ব্যবহারও করছি। অনেক গাড়ীতে, মোবাইল ফোন সেটে GPS রিসিভার রয়েছে। GPS সিস্টেমের স্পেস সেগমেন্ট মূলতঃ ২৪টি স্যাটেলাইটের একটি কন্সটেলেশন নিয়ে গঠিত – যাতে রয়েছে ৬টি অরবিট ও প্রতিটিতে ৪টি করে স্যাটেলাইট। স্যাটেলাইটগুলো নিজ অরবিটে থেকে ক্রমাগতভাবে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে চলেছে ১২ ঘণ্টায় একবার করে। স্যাটেলাইটগুলোর অরবিট, অবস্থান ও গতি এমন যে, পৃথিবীর যেকোনো স্থানে যেকোনো সময়ে অন্তত ৪টি স্যাটেলাইট আনুভূমিক দৃষ্টিবলয়ের উপরে অবস্থান করে। নীচের ছবিটি থেকে GPS স্যাটেলাইটগুলোর অবস্থান ও গতি সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়।

৩.১.৪। প্রতিটি স্যাটেলাইট ক্রমাগতভাবে ন্যাভিগেশন ডাটা ফ্রেম ট্রান্সমিট করে চলেছে। প্রতিটি ফ্রেমে তিন ধরনের তথ্য বিদ্যমান থাকে: (ক) ট্রান্সমিট টাইম, (খ) অরবিটাল ইনফরমেশন (ephemeris), এবং (৩) সাধারণভাবে সিস্টেমের অবস্থা এবং GPS অরবিটসমূহের ডাটা (Almanacs)। অন্তত ৪টি স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত এই ডাটা ফ্রেম থেকে GPS রিসিভার নিজ অবস্থানের অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ, উচ্চতা ও সময় নির্ধারণ করতে পারে।

৩.১.৫। GPS সিস্টেমকে তিনটি প্রধান সেগমেন্টে ভাগ করে বর্ণনা করা হয়। (১) স্পেস সেগমেন্ট, (২) কন্ট্রোল সেগমেন্ট ও (৩) ইউজার সেগমেন্ট। কন্ট্রোল সেগমেন্টের তিনটি অংশ রয়েছে: (ক) মাস্টার কন্ট্রোল স্টেশন, যা কলোরাডো স্প্রিংয়ের বিমান বাহিনী ঘাঁটিতে অবস্থিত, (খ) বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত কয়েকটি মনিটর স্টেশন ও (গ) বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত কয়েকটি গ্রাউন্ড এন্টেনা।

৪। সার্ভিল্যান্স

৪.১। অটোমেটিক ডিপেন্ডেন্ট সার্ভিল্যান্স (ADS)

৪.১.১। আমরা গত লেখায় বলেছিলাম যে, প্রাইমারি সার্ভিল্যান্স রাডার (PSR), সেকেন্ডারি সার্ভিল্যান্স রাডার (SSR) এবং ট্রাফিক কলিশন এভয়ডেন্স সিস্টেম (TCAS) বর্তমানে ব্যবহৃত হয়ে আসছে সার্ভিল্যান্সের সিস্টেম হিসেবে। এদের মধ্যে PSR ও SSR গ্রাউন্ড সিস্টেম যা কন্ট্রোলারগণ ব্যবহার করেন এবং TCAS এয়ারবোর্ন সিস্টেম যা পাইলটেরা ব্যবহার করেন। মোটামুটিভাবে বলতে গেলে, PSR-এ ১০০ নটিক্যাল মাইল কভার করতে ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে SSR-এও রোটেটিং এন্টেনার প্রয়োজন পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, TCAS অপারেশন PSR/SSR অপারেশন নিরপেক্ষ হওয়ায় কন্ট্রোলারের RADAR স্ক্রিন ও পাইলটের TCAS স্ক্রিন উপাত্তের দিক থেকে একরূপ নয়।

৪.১.২। ADS-এর ক্ষেত্রে উচ্চ ক্ষমতা, রোটেটিং এন্টেনা, ইন্টারোগেশন-রিপ্লাই ইত্যাদির কোন প্রয়োজন হয় না। এখানে এয়ারক্রাফট গ্লোবাল ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (GNSS) থেকে প্রাপ্ত নিজের অবস্থান সম্পর্কীয় ডাটা অন্যপক্ষকে ডাটা লিংকের মাধ্যমে ক্রমাগত সরবরাহ করে। গ্রহণকারী পক্ষ এই উপাত্ত থেকে রাডার ডিসপ্লের অনুরূপ ডিসপ্লে তৈরি করে। ADS অপারেশন দুরকমের: ADS-C (কন্ট্রাক্ট) ও ADS-B (ব্রডকাস্ট)। এদের মধ্যে ATS সার্ভিল্যান্সের জন্য ব্রডকাস্ট টাইপটি বেশী ব্যবহৃত হয় এবং এটি SSR-এর প্রকৃত বিকল্প হিসেবে কাজ করতে সক্ষম। আমরা ADS-B এর অপারেশন নিয়ে কিছু কথা বলে আজকের লেখা শেষ করব।

৪.১.৩। ADS-B এয়ার-গ্রাউন্ড এবং এয়ার-এয়ার ডাটা লিংক যোগাযোগ (ADS-C কেবল এয়ার-গ্রাউন্ড)। এয়ারক্রাফটের ADS-B ট্রান্সমিটার স্যাটেলাইট উপাত্ত থেকে নির্ণয় করা নিজের অবস্থান সম্পর্কীয় উপাত্ত ক্রমাগত ট্রান্সমিট করে (যে কারণে এর টাইপ নাম ব্রডকাস্ট) যা গ্রাউন্ড স্টেশন এবং পার্শ্ববর্তী এয়ারক্রাফটসমূহ রিসিভ করে। সকল ADS-B এনাবল্ড এয়ারক্রাফট যদি এভাবে তাদের স্ব স্ব অবস্থান জানাতে থাকে তবে গ্রাউন্ড স্টেশনসহ সব এয়ারক্রাফটই একই উপাত্তভিত্তিক রাডার-সদৃশ ডিসপ্লে পেতে পারে যা SSR ও TCAS এর মাধ্যমে সম্ভব ছিল না। যেসব এয়ারক্রাফটে ADS-B নেই, গ্রাউন্ড স্টেশন SSR এর মাধ্যমে তাদের অবস্থান জানতে পারে। SSR ও ADS-B এর ডাটা একত্রে সন্নিবিষ্ট করে আকাশের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরা যায় এবং ADS-B গ্রাউন্ড স্টেশন SSR ডাটা এয়ারক্রাফটকে প্রদান করলে এয়ারক্রাফটেও সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়। এভাবে কন্ট্রোলার ও পাইলট সমভাবে সমরূপ সিচুয়েশনাল এওয়ারনেস লাভ করতে পারে। ADS-B গ্রাউন্ড স্টেশন এয়ারক্রাফটকে নানা রকম ফ্লাইট ইনফরমেশন সার্ভিসও দিতে পারে।


.
৪.১.৪। ADS-B একটি ডিজিটাল রেডিও ডাটা লিংক প্রযুক্তি। এর জন্য তিনটি ডাটা লিংক প্রটোকল ব্যবহৃত হয়ে আসছে: (১) 1090 MHz Extended Squitter (1090-ES), (২) 978 MHz Universal Access Transceiver (UAT) and (৩) VHF Digital Link Mode 4 (VDLm4)। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে UAT দিয়ে শুরু করলেও এখন 1090-ES এর অনুমোদনও দিয়েছে। ইউরোপের কিছু দেশ VDLm4 ব্যবহার করে। তবে বর্তমানে ICAO এর জোর প্রস্তাব হচ্ছে 1090-ES। 1090-ES হচ্ছে SSR Mode S এবং TCAS-এ ব্যবহৃত প্রটোকল।

৪.১.৫। স্যাটেলাইট হতে পাওয়া ডাটা থেকে পজিশন নির্ণয় করা হয় বিধায় ADS-B এর পজিশন ডাটার একিউরেসি সনাতন রাডারের চেয়ে অনেক অনেক ভাল এবং এই ডাটা অনেক বেশী নির্ভরযোগ্য।

সমাপ্ত

n

আগের পর্বগুলো:
বিমান চলাচলে নেক্সটজেন টেকনোলজি – ১/৩ (প্রাথমিক কথা)
বিমান চলাচলে নেক্সটজেন টেকনোলজি – ২/৩ (সনাতন প্রযুক্তি)

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী