ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

একটি সর্বাঙ্গসুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ দর্শন বা আদর্শের বৈশিষ্ট্যগুলো কী হতে পারে? এখানে একটি কথা জোর দিয়েই বলা যায় যে, আদর্শটিকে প্রাকৃতিক হতে হবে এবং জগতের ও জীবনের প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। যে আদর্শ বা দর্শন সার্বজনীন নয় তা প্রাকৃতিক আদর্শ হতে পারে না; অর্থাৎ এই দর্শন ও আদর্শ কাণ্ডজ্ঞানের নিকট বোধগম্য হতে হবে, যা কিনা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিতজনও আয়ত্ত ও অনুশীলন করতে সক্ষম।

আমজনতা প্রকৃতিকে বুঝতে এবং প্রকৃতির সাথে মিথস্ক্রিয়া করতে সক্ষম, এজন্য দার্শনিক হওয়ার প্রয়োজন হয় না। তেমনই একটি প্রাকৃতিক ধর্মের দর্শন ও নীতিমালা কৃষক-শ্রমিকও অনুধাবন করতে ও অনুশীলন করতে সক্ষম; এজন্য ডিগ্রীপ্রাপ্ত পণ্ডিত বা বিত্তবান হওয়া আবশ্যিক পূর্ব-শর্ত হবে না। একারণে প্রাকৃতিক ধর্মকে পুরোহিততন্ত্র থেকে মুক্ত হতে হয়; নয়তো তাকে প্রাকৃতিক ধর্ম বলাই চলে না।

জীবনকে যারা একটি সুগঠিত দর্শন ও আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে চান তাদেরকে চিন্তা করতেই হবে। যৌক্তিকভাবে চিন্তা করার সামর্থ্য সকলেরই রয়েছে। প্রাকৃতিক ধর্মের পুরো চিন্তাগত কাঠামোটিও সকলের নিকট পর্যাপ্তভাবে বোধগম্য। কিন্তু পুরোহিততন্ত্র ভিত্তিক ধর্মের প্রথম কথাই হচ্ছে আমজনতা এ বোঝার ক্ষমতা রাখে না এবং পুরোহিতের কথামত চলা ছাড়া তার গত্যন্তর থাকে না। এছাড়া পুরোহিততন্ত্র ভিত্তিক ধর্মের আরও একটি বৈশিষ্ট্য দৃষ্টিগোচর হয়। এখানে পুরোহিত কর্তা ও অন্যেরা দর্শক মাত্র।

আমরা পিপড়া বা হাতিদেরকে দলবদ্ধভাবে চলতে দেখি। তাদেরও সেখানে নেতা থাকে। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে নেতা কর্তা ও অন্যেরা দর্শক – ব্যাপারটি কিন্তু এরকম নয়। এখানে নেতা সকলের সাথে অর্থপূর্ণ যোগাযোগ করে এবং সকলে নেতাকে অনুসরণ করে মাত্র। নেতা পথ চলে ও কাজ করে, অনুসারীরাও একই পথ চলে ও একই কাজ করে; অর্থাৎ সকলেই কর্তা।

আমরা যদি নামাজ বা হজ্জকে পরীক্ষা করে দেখি তবে সেখানে এই প্রাকৃতিক নীতিই অনুসৃত হয়েছে দেখতে পাব। এখানে পুরোহিতের আড়ম্বরপূর্ণ বিশেষ ক্রিয়াকলাপ এবং আকর্ষণীয় প্রেক্ষা তৈরিতে সহায়ক বস্তুগত অবলম্বনগুলো নেই। নেতা এখানে যা করেন, অনুসারীরা তাকে অনুসরণ করে তা-ই করেন। তাছাড়া এখানে নেতা বক্তৃতা দেন, অনুসারীরা শুনেন। এটি একটি অর্থপূর্ণ যোগাযোগ ও শিক্ষণমূলক কাজ, যেমনটা ঘটে শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে ক্লাসরুমে। এখানে বার্তার যথাযথ সঞ্চালনের জন্য নীরব পরিবেশের প্রয়োজন হয়; আড়ম্বরের ঘটা এখানে বিঘ্ন স্বরূপ। কিন্তু পুরোহিততন্ত্রে আনুষ্ঠানিকতা ও আড়ম্বর প্রধান হয়ে উঠে। অন্যেরা যেহেতু দর্শক এবং যেহেতু আড়ম্বর দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়ক হয়, তাই এখানে আড়ম্বর ও ঘটা আবশ্যক হয়।

যখন স্বাধীন ও চিন্তাশীল ব্যক্তিদের ধর্ম বা আদর্শ ক্রমে ক্রমে পুরোহিততান্ত্রিক হয়ে উঠে তখন চিন্তা আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ধর্ম তখন বাস্তব-জীবন-ঘনিষ্ঠ না থেকে আকার ও আচার সর্বস্বতায় পর্যবসিত হয়; তা আর প্রাকৃতিক থাকে না, হয়ে পড়ে কৃত্রিম। এর নজির বিশ্বব্যাপী আমাদের চোখের সামনেই আছে।

প্রকৃতি যেমন জীবনের সমগ্র পরিসরে কার্যকর, প্রাকৃতিক ধর্মও তেমনই জীবনের সমগ্র পরিসরে প্রযোজ্য। অর্থাৎ ব্যক্তির বাস্তব ও ব্যবহারিক জীবনের সাথে তার সম্পর্ক; ব্যক্তির অবসর সময় কাটানোর মাধ্যম তা নয়। প্রাকৃতিক ধর্মের অঙ্গ হচ্ছে জগত ও জীবনকে দেখার ভঙ্গি, অন্য মানুষের প্রতি তার মনোভাব ও আচরণ, জগতের সাথে তার মিথস্ক্রিয়ার প্যাটার্ন ইত্যাদি। কিন্তু কৃত্রিম ধর্মে মুফতির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়ে দেখা দেয় এবং আকার ও আচারে ভ্রান্তির ভয়ে মন সদা তটস্থ হয়ে উঠে; পূণ্যশীলতা হয়ে দাঁড়ায় বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কহীন আচার নিষ্ঠা।

ইসলাম ধর্মের কাঠামোটি এমন যে, সাড়ম্বর অনুষ্ঠান সর্বস্ব আচার খুব প্রাধান্য পেতে পারেনি। নামাজ, রোজা, হজের প্রাণ অনেকটাই দুর্বল হয়েছে বটে, এরা অনেকটাই রিচুয়ালে পরিণত হয়েছে বটে, তবুও এগুলো কর্তা-দর্শকের সম্পর্ক তৈরি করতে পারেনি। নবীর সময় চল ছিল না, কিন্তু মুসলিমরা পরে নিজেরা তৈরি করে নিয়েছে এমন আচার অনুষ্ঠানের বেলাতেও একথা অনেকটাই খাটে। তবে মুসলিম সমাজ এক ধরণের পুরোহিততন্ত্র যে তৈরি করেছে তাও বলা যায়।

এই তন্ত্রটি তৈরি হয়েছে আকায়েদ, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, অজু, গোসল, তৈয়াম্মুম, ফারায়েজ ইত্যাদি বিষয়ে বিশাল সব শাস্ত্র তৈরি করার মাধ্যমে। মুসলিম জীবন চর্চা বলতে এখন প্রধানত ও মুখ্যত এই শাস্ত্র অনুসরণ করাকেই বুঝায়। আম মুসলিম জনতা এখন আর চিন্তা করার অধিকার রাখে না, শাস্ত্রের অভিভাবকগণের অভিমত ও নির্ণয় অনুসারে ধর্মীয় জীবন যাপন করা এখন তাদের জন্য বাধ্যতামূলক। মুসলিম সমাজে পুরোহিততন্ত্র এসেছে এই পথ ধরে।

কিন্তু কোরানে আল্লাহ যে ধর্ম উপস্থাপন ও ব্যাখ্যা করেছেন তা হারে হারে ব্যক্তিতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক: প্রতিটি ব্যক্তি এখানে চিন্তা করতে বাধ্য এবং প্রয়োজনীয় চিন্তাটুকু করতে সে সক্ষমও বটে। এপ্রসঙ্গে ‘মুসলিম ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন’ গ্রন্থে আমিনুল ইসলাম লিখেছেন, “ইসলামে পুরোহিততন্ত্রের কোন স্বীকৃতি নেই। ইসলামকে যথার্থই বর্ণনা করা হয়েছে ‘বিবাহিত সন্ন্যাসীদের গণতন্ত্র’ বলে। অর্থাৎ ইসলামী সমাজ এমন একটি সমাজ, যেখানে সব মানুষ সমান আইনের দৃষ্টিতে, এবং প্রত্যেকেই নিজের পুরোহিত ও আল্লাহর প্রতিনিধিস্বরূপ।”

কিন্তু সমস্যা বেঁধেছে এই ধর্মের প্রকৃত অবয়ব ও প্রয়োগক্ষেত্র নিয়ে। প্রকৃত কথা হচ্ছে: ইসলাম ধর্মের মুখ্য ও প্রধান ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে ঈশ্বরের সাথে সম্পর্ক, অন্য মানুষের সাথে সম্পর্ক, আচরণ ও নৈতিক মূল্যমান। এখানে ঈশ্বরের প্রতি অনুরাগ, ভক্তি ও ভালবাসা এবং সামাজিক ক্রিয়াকলাপে আন্তরিকতা, সত্যবাদিতা, অনুকম্পা, সুন্দর ও সৎ আচরণ, অঙ্গিকার-চুক্তির প্রতি যত্নশীলতা ইত্যাদি প্রধান। হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার, ভীরুতা, অত্যাচার, অবিচার, হানাহানি, স্বার্থান্ধতা এখানে পরিত্যাজ্য। এটি যদি ধর্মের প্রধান দিক হয় তবে প্রতিটি ব্যক্তি নিজে চিন্তাশীল হয়ে, নিজে সচেতন থেকেই কেবল দায়িত্ব সম্পাদন করতে পারে, নিজেকে গড়ে তুলতে পারে; অন্ধভাবে নির্বিচারে নিশ্চিন্তে মুফতির অভিমত প্রয়োগ করার অবকাশ এখানে থাকে না।

একজন সুনাগরিকের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরও সহজবোধ্য করা যায়। আমরা সকলেই জানি সুনাগরিক কিভাবে হতে হয়। আবার যে নাগরিক দেশের আইন ভঙ্গ করে চলে সে সুনাগরিক হয় না। দেশের আইনের প্রথম গ্রন্থ হচ্ছে সংবিধান। তাছাড়াও রয়েছে শতশত বিধিমালা, আইনের বই। রয়েছেন কামাল হোসেনের মত আইন বেত্তারা। এখন সুনাগরিক হওয়ার জন্য একজন যদি এইসব বইয়ের মধ্যেই মশগুল হন, আর কামাল হোসেনের অভিমতের মুখাপেক্ষী হয়ে সময় কাটান তবে তার পক্ষে আর সুনাগরিক হওয়া সম্ভব হবে না। আমি বিচার করতে, সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম, এই পারঙ্গমতা আছে কামাল হোসেনের মত বিজ্ঞজনদের, কাজেই তাদেরকে জিজ্ঞেস করে করে চলা ছাড়া আমার অন্য কোন নিরাপদ পথ নেই – আমাদের ধর্মীয় পথ ও জীবন অনেকটা এরকম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমাজের জন্য আইনের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষণীয় নয়। এবিষয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিদের সান্নিধ্য ও তাদের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণের আবশ্যকতা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু ধর্মের বেলায় যথাযথ ভঙ্গিটা ও পরিমিতি বোধটা আমরা যেন হারিয়ে বসেছি। হাজার বছরের কাড়ি কাড়ি আকায়েদের কেতাব, ফেকাহের কেতাব নিয়ে আমরা যা ধরে রাখতে পারছি না, এসব কেতাব ছাড়াই নবীর অব্যবহিত পরের যুগের মানুষেরা মাত্র পঞ্চাশ বছরে তা সাধন করেছিল। তাদের সাফল্যের রহস্য এখানেই।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী