ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

একটি সিআরটি টিভি স্ক্রিনের উপর ছবি কিভাবে তৈরি হয় তার ব্যাখ্যা দেয়া যায় পর্দায় ইলেকট্রনের কাজ হিসেবে। টিভির ইলেকট্রনিক সার্কিটে যা ঘটছে তার ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রিক্যাল বিশ্লেষণ ও সূত্রাবলী পর্দায় যা তৈরি করছে তা সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু পর্দায় ফ্রেইমের পর ফ্রেইম এর ক্রমিক ধারা যে সমগ্রটি তৈরি করছে তা একটি নাটক হতে পারে বা অন্য কোন অনুষ্ঠান। এই নাটকটি বা অনুষ্ঠানটির একটি আলাদা বাস্তব সত্তা আছে যা টিভি সিস্টেমের হার্ডওয়্যার-এর ‘ঊর্ধ্বে’ অবস্থান করে। আমরা বলতে পারি না যে, নাটক বলে কিছু নেই, যা আছে তা সবই ইলেকট্রনের খেলা বা উৎপাদন।

অর্থাৎ এখানে দুটি স্তরের সাথে আমরা পরিচিত হই – একটি ইলেকট্রনিক হার্ডওয়্যার ও অন্যটি নাটক। নাটককে আমরা হার্ডওয়্যারের কর্মকাণ্ডে নামিয়ে আনতে পারি না। হার্ডওয়্যার স্তরের বিশ্লেষণ থেকে নাটকের স্তরে উপনীত হওয়া যায় না। তবে যে দর্শক একাধারে হার্ডওয়্যার ও নাটক উভয় স্তরকে ভাল জানেন তিনি দুই স্তরের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে পারবেন।

আমরা বলতে পারি হার্ডওয়্যার ছাড়া নাটকটির উপস্থাপনা সম্ভব হয় না। এটিও বলা যায়, সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির দুই সেট হার্ডওয়্যারেও একই নাটকের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়। একটি সিস্টেমে নাটকের প্রথম অংশ ও অন্য সিস্টেমটিতে নাটকের পরের অংশটির উপস্থাপনা সম্ভব। এখানে সিস্টেমের ভিন্নতা স্বত্বেও নাটকের একত্ব বজায় থাকে। হার্ডওয়্যার লেভেলেই সব কিছুর ব্যাখ্যা সম্ভব, নাটকের ব্যাখ্যা হার্ডওয়্যার লেভেলে নামিয়ে আনা সম্ভব – এমন দাবীকে ‘লেভেল কনফিউশন’ থেকে জাত বলা যেতে পারে। নাটক নিজেই যদি দাবী করে বসে যে, নাটক আমি আসলে ইলেকট্রনের খেলা ছাড়া কিছু নই, তাহলে সে তার স্বতন্ত্র সত্তাকে ও সম্ভাবনাকে অস্বীকার করে।

স্তর-বিন্যস্ত সত্তাসমূহের আর দুটি ভাল উদাহরণ কম্পিউটার ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। আমরা সাধারণভাবে বলতে পারি যে, নীচের এক স্তরের ঘটনাবলীর উপরে নতুন স্তরের উন্মেষ ঘটলে নীচের স্তর উপরের স্তরের কর্মকাণ্ডের সন্ধান পায় না; উপরের স্তরের সমগ্রটি ও তার কর্মকাণ্ড কেবল নীচের স্তরের ঘটনাবলী দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; এবং একত্বের নীতিযুক্ত একটি সমগ্র হিসেবে উপরের স্তরের নিজস্ব স্বত্বা থাকে।

এখন, আমরা যদি মানুষের অবস্থা বিচার করি তবে তার মধ্যে তিনটি স্পষ্ট স্তর দেখতে পাই: বস্তুর স্তর, প্রাণের স্তর ও অহংয়ের স্তর। পিছনের দিকে গিয়ে আমরা অহংয়ের উন্মেষের একটি বিবর্তনবাদী নীতি পেতে পারি। কিন্তু উন্মেষমূলক বিবর্তনবাদীদের কথা অনুসরণ করে বলা যায় যে, জড় পদার্থের জটিল বিন্যাস থেকে প্রাণের উন্মেষ ঘটার সময় জড়ের সমগ্রের অতিরিক্ত হিসেবেই প্রাণের উদ্ভব হয়। একইভাবে, মানুষে এসে অহংয়ের উন্মেষকালেও প্রাণবান দেহের সমগ্রের অতিরিক্ত একটি কিছুর উদ্ভব হয়। বস্তুর বিজ্ঞানকে আমরা বলি ফিজিক্স, প্রাণের বিজ্ঞানকে বলি বায়োলজি এবং অহংয়ের বিজ্ঞানকে সাইকোলজি। সাইকোলজিকে ফিজিক্সে নামিয়ে আনা তো অনেক দূরের কথা, বায়োলজিকে ফিজিক্সে নামিয়ে আনা এখনও সম্ভব হয়নি।

মহাকর্ষের টানে একটি আপেলের নীচে পড়া এবং খাবারের সন্ধানে পাহাড়ের উপর থেকে একটি প্রাণীর নীচের দিকে ছুটে যাওয়া – এই উভয় প্রপঞ্চকে মহাকর্ষ, কণা ও তরঙ্গের নিয়মাবলী দিয়ে একই ভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। বস্তুর ধর্ম যেমন প্রাণীদেহের উপরে কাজ করে, তেমনই প্রাণের ধর্মও বিপরীতক্রমে বস্তুর উপর কাজ করে। এখানে সক্রিয় প্রাণের উদ্দেশ্যবাদীতা। অহংয়ের স্তরে এসে এই উদ্দেশ্যবাদীতা অত্যন্ত স্পষ্ট রূপ লাভ করেছে। মানুষের কোন স্বাধীনতা নেই, তার ইচ্ছা ও চিন্তা তার মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ, তার মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ আদতে ইলেকট্রন-প্রোটনের ক্রিয়াকলাপ মাত্র – এমন সিদ্ধান্ত মানব জীবনকে ব্যাখ্যা করা দূরে থাক, উল্টো অনেক গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করে।

মানুষের মধ্যে যে অহংয়ের নীতি বিদ্যমান তাকে বলা যায় আত্মা। আত্মা হোক বা প্রাণ হোক – এগুলোকে এক ধরণের ভুতুড়ে সত্ত্বা হিসেবে কল্পনা করার যেমন কোন প্রয়োজন নেই, তেমনই উপরিস্তরগত উন্মেষিত বাস্তব সত্ত্বা হিসেবে গ্রহণ করাতেও কোন বাধা নেই। আত্মা ‘ঘোস্ট ইন দি মেশিন’ এর মতই হোক অথবা ‘সফটওয়্যার ওভার দি হার্ডওয়্যার’ এর মতই হোক, আত্মা আছে – এটাই বাস্তবতা। আত্মা বলে কিছু নেই, আমরা নিছক জটিল এক একটি প্রাণী একথা বলে থেমে যাওয়া তো চলে না। আমাদেরকে তবে আরও এক ধাপ নামতে হবে যে! আমাদেরকে বলতে হবে, প্রাণ বলে কিছু নেই, আমরা নিছক জড় পদার্থের জটিল এক একটি মেশিন।

কিন্তু এভাবে পিছনের দিকে নিজেদেরকে অবনমিত করলে আমরা আমাদের নিজেদেরকেই অস্বীকার করবো, নিজেদের সম্ভাবনাকে পরিত্যাগ করবো, বিবর্তনের সম্মুখগতিকে পরিহার করবো। সূর্যমুখী ফুলের রূপের অভিব্যক্তি ঘটে সূর্যের দিকে তার উত্থানের সাহস থেকে, কাদা থেকে নয়। সূর্যমুখী ফুলকে যদি বলা হয় – তুমি আসলে কাদা; নীচের দিকে তাকাও, ওতেই তোমার আসল পরিচয়; নীচের দিকে নামো, এটাই তোমার আসল পেশা – তবে কেমন হয়?

ভবন অর্থ হওয়া, গড়ে ওঠা, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘বিকামিং’। অহং এমন একটি সক্রিয় নীতি যা নিজেকে ক্রমাগত গড়ে তুলতে পারে, বলিষ্ঠ থেকে বলিষ্ঠতর করতে পারে। এজন্য প্রয়োজন উচ্চতর আদর্শ এবং আদর্শের উচ্চ উৎস। বস্তু ও প্রাণের টানের বিপরীতে নিজেকে উঠানোর মাধ্যমে, জড়তা পরিহার করা ও জৈব বাসনাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে, স্বার্থপরতার বদলে পরার্থপরতা অবলম্বন করার মাধ্যমেই অহং পারে নিজেকে ক্রমাগত বিকশিত ও গঠন করতে। অর্থাৎ ধৈর্য বা সবর এবং অনুকম্পা বা রাহমা এর নীতি এজন্য প্রয়োজন। এটিকে বলা যায় পাহাড়ী পথ বেয়ে উপরের দিকে অভিযাত্রা।

কোরানে বলা হয়েছে, “আমরা কি তাকে দুটি পথই দেখাইনি? সে তো পাহাড়ী পথের অভিযাত্রী হতে উদ্যেগী হলো না। তুমি কি জানো এই পাহাড়ী পথের পরিচয় কী? তা হলো দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্ত করা, কঠোর অনাহারের সময়েও নিজেকে বঞ্চিত করে নিকট-সম্পর্ক অসহায়দের বা দুর্দশাগ্রস্ত দরিদ্রজনদের প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসা। সেই সাথে ঈশ্বরের উপর আস্থাশীল থেকে মানুষকে ধৈর্য্য ও অনুকম্পা অবলম্বনের জন্য উৎসাহিত করা।” (কোরান ৯০ : ১০ – ১৭)।

কিন্তু বস্তুবাদী, ইহলোকবাদী ও সুখবাদী দর্শনগুলোর সীমাবদ্ধতা এখানে যে, তারা অহংয়ের কাছে কোন উচ্চ আদর্শ উপস্থাপন করতে পারে না। এর কারণ এই যে, তারা চেতনাকে দেখে জড় ও প্রাণের উৎপাদন হিসেবে এবং তাই সেগুলো জনতাকে নিম্নতন প্রবৃত্তিকে পরিতৃপ্ত করার দিকেই কেবল ঠেলে দেয়। মানুষ তখন জড়ের মতো অথবা প্রাণীদের মতো অন্যের টানে ছুটাছুটি করে এবং নিজের টানে অন্যদেরকে কেবল অস্থির করে তোলে।

চৈতন্য একটি বিস্ময়কর ও সুন্দর সৃষ্টি। কিন্তু এই চেতনা বা আত্মা বা অহংকে যথার্থভাবে ব্যাখ্যা করতে হলে, নৈতিক আদর্শকে মজবুত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে হলে একটি পরম চেতনাকে, পরম আত্মাকে বা পরম অহংকে বাস্তব এবং সমগ্র জগতকে তার সৃজন হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। এই পরম চেতনাকেই আমরা ঈশ্বর নামে আখ্যায়িত করে থাকি। কোরানে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দর ছাঁচে। কিন্তু তাকে অবনমিত করেছি স্তরসমুহের বিন্যাসের সর্বনিম্ন স্তরে। তবে যারা ঈশ্বরের উপর আস্থাশীল এবং ন্যায়ানুগ ও সৎ কর্মশীল তারা ব্যতিক্রম, তাদের জন্য রয়েছে অন্তহীন পুরষ্কার।” (কোরান ৯৫ : ৪ – ৬)। এই পুরস্কার হচ্ছে অহংয়ের অন্তহীন সম্মুখগতি বিকাশ বা ভবন।

অহংয়ের সম্মুখগতি-ভবনের নীতি ও আদর্শই অহংয়ের ধর্ম বা আদর্শ। পিছনের দিকে নামার জন্য অহংয়ের নিকট আছে প্রাণ ও জড়; সেদিকে যাত্রা হচ্ছে উচ্চ আদর্শ ও নীতি থেকে বিচ্ছেদ। কিন্তু সম্মুখ দিকে যাওয়ার জন্য কী আছে? এর একটি উত্তর হতে পারে: নিজে থেকে কিছু নেই, মানুষ নিজের জন্য যা নির্ধারণ করে নেয় তা-ই। কোরানে ঈশ্বরের ‘রং’কেই মানুষের আদর্শ বা ধর্ম বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, “(বল, আমাদের জন্য) ঈশ্বরের রং, রঙিন হওয়ার ক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে ঈশ্বর অপেক্ষা সুন্দর কে? আমরা কেবল তাঁর দিকেই নিজেদেরকে নিবেদিত করেছি।” (কোরান ২ : ১৩৮)।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী