ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বিরোধী দল অনেকদিন পর সংসদে এলো। ছাত্ররা অসুখ-বিসুখ না বাঁধালে স্কুল কামাই করতে পারে না। চাকুরিজীবী সহজে অফিস কামাই করতে পারে না। কিন্তু সংসদ সদস্যদের সংসদ-কামাই বলে যেন কোন কথা নেই। এখানে ছুটি নিতে হয় না, তবুও চাকুরী থকে, বেতন-ভাতা গ্রহণে নেই কোন বাধা। টানা বেশ দীর্ঘ সময় বিনা দরখাস্তে ‘অফিস’ কামাই করা যায় এখানে। যারা ছাত্রদেরকে বলে, ‘স্কুল কামাই করো না’, যারা কর্মচারীদেরকে বলে, ‘অফিস ফাঁকি দিও না’, তারাই বেতন-ভাতা নিয়ে সংসদ কামাই করতে পারে টানা অনেক দিন। বিরোধী দলের সংসদ পুনর্যাত্রা স্বাগত জানানোর মত কাজ নিঃসন্দেহে। কিন্তু সংসদ টেলিভিশনের পর্দায় যা দেখছিলাম ও শুনছিলাম তাতে অবাক হয়ে ভাবছিলাম তারা এতদিন পর কিসের তরে এলো সংসদে?

কতই না আনন্দের বিষয় হতো, যদি বলা যেত সংসদ জমে উঠছে। অর্থ-বিপত্তির কারণে ‘জমে উঠার’ বিপরীতে ‘গলে পড়া’ও বলা যাচ্ছে না। সংবাদ পত্রগুলো লিখছে, সংসদ ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। উত্তাপ নেহায়েত মন্দ কিছু নয়। এবারকার সংসদ অধিবেশনের বেশ কটি অংশ-বিশেষে যা হয়েছে তার জন্য যথাযথ শব্দ চয়ন করলে একই অভিযোগ লেখকের বিরুদ্ধেও আরোপিত হতে পারে সে শঙ্কাও আছে। তবে সব দিক বিবেচনা করে বলা যায়, সংসদ মাঝে মাঝে ভাগার হয়ে ওঠে।

একটি বাচ্চাকে বলে দেখুন, ‘ও তোমার চেয়েও বেশী খারাপ।’ সে ফুঁসে উঠবে, ‘কী! আমি খারাপ?’ কিন্তু সংসদে প্রতিযোগিতা লেগেই থাকে এটা প্রমাণ করার জন্য যে, ‘তুমি আমার চেয়েও খারাপ।’ অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের কথাকে বানোয়াট বলে প্রতিবাদ করা হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেদিকে যাওয়ার উপায় থাকে না। এরকম অবস্থায় শুরু হয় যেভাবে তার সরলার্থ হচ্ছে: ‘তুমি ভেবেছ কী? তোমার কীর্তি কি আমি জানি না?’ তারপর যা বয়ান করা হয় তার উদ্দেশ্য শ্রোতার কাছে স্পষ্ট হতে বিলম্ব হয় না।

নিজের গুণ কীর্তন ও পরের কুৎসা গান সংসদীয় কর্মকাণ্ডের প্রধান কৌশল। এই কাজে কোন কোন সংসদ সদস্য মাত্রা ছাড়িয়ে যান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। আমাদের এক ব্লগার ভাইকে এরকম এক তত্ত্ব পরিবেশন করে হালে যথেষ্ট জল পেতে দেখা গিয়েছে। তার সাথে যোগ দিয়ে বলা যায়, আমরা সমর্থকরাও কম ‘খাই’ না। পরের বমির দৃশ্য বা স্বাদ বড়ই কটু – মানি একথা সত্য। কিন্তু নিজের বমির দৃশ্য ও স্বাদ বড়ই মিষ্ট – এই অবস্থা দেখলে হাসতে হবে না কাঁদতে হবে ঠিক করা বেজায় কষ্ট।

আচ্ছা ভাবুন তো একবার! কারও কাছে নিজের বমি গন্ধে ও স্বাদে মিষ্টি বলে ঠেকে কখন? যখন তার নাক ও জিহ্বা প্রকৃত ‘সেন্‌স’ হারিয়ে ফেলে। তাহলে এ নাক ও জিহ্বা দিয়ে সে পরের বমি কটু বলে আস্বাদন করে কিভাবে? প্রথম ক্ষেত্রে সে আস্বাদনের ভ্রান্ত কিন্তু সত্য বর্ণনা দেয়। কিন্তু পরেরটির বেলায় কেবল মিথ্যাই বলে – এটা কি আন্দাজ করা যায় না? ‘সেন্‌স’ নয়, কেবলমাত্র এবং কেবলমাত্র একটি ‘এপ্রায়োরি লজিক’ দিয়ে সে পরের সিদ্ধান্তটি তৈরি করে, এবং কেবল কৌশলগত কারণে। ব্যাপারটি কি এরকম না? এটিকে যখন সে ‘সেন্‌স’ এর উপর আরোপ করে তখন কি সে মিথ্যা বলে না?

সংসদে এবং বাইরে পরস্পরের প্রতি বিষোদগারের একটি নমুনা নিয়ে আলোচনা করা যায়। ‘অমুক তারিখে অমুক শহরে ভূমিকম্প হয়েছে।’ ‘অমুক জন অমুকের কাছ থেকে টাকা ঘুষ নিয়েছে।’ এ দুটি খবর কি একই রকম? আমদের প্রতিক্রিয়া দ্বিতীয়টির বিপরীতে সতর্ক প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে খবরটি সত্য না মিথ্যা তা ঘটনাটি সত্যি ঘটেছে কি ঘটেনি তার উপর নির্ভর করছে না; নির্ভর করছে আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানের উপর। আমার মনমত সব খবরই সত্য, আমার অমতের সব খবরই মিথ্যা। আমরা এভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, বিলম্ব করি না। তারপর শুরু করি প্রচার, সাথে প্রমাণ যোগার করার চেষ্টাও হয়তো চলতে থাকে।

সন্দেহ করার এখতিয়ার কি সকলেরই আছে? না-কি আছে কেবল পুলিশের মত প্রাধিকারপ্রাপ্তদের? নিজে নিজেই বিচার করে চট-জলদি একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে তা প্রচারে নেমে পড়ার এখতিয়ার কি আমাদের আছে? না-কি বিচারের ভার কেবল আদালতের? আমরা যেন সবাই পুলিশ, সবাই আদালত। আর রাজনৈতিক অবস্থানই হয়ে দাঁড়িয়েছে সত্য-মিথ্যার মানদণ্ড। প্রধান সরকারী দল ও প্রধান বিরোধী দল উভয়ের বিরুদ্ধেই পত্রিকার খবর। আর তা নিয়েই আমরা নেচে চলেছি।

সবচে আনন্দের বিষয় হতো যদি দেখতাম আমাদের সরকার ও বিরোধী দল পত্রিকাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করছে বিপক্ষের সমর্থনে। বিদেশের পত্রিকার খবরকে পুঁজি করে বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামতে পারে না। বিষয়টি সরকারের নজরে আনতে পারে মাত্র। অন্যদিকে, সরকারও পারে না কেবল পত্রিকার খবরকে পুঁজি করে প্রচারণায় নামতে। সরকারের দায়িত্ব বেশী। সে যদি খবরটিকে উপেক্ষণীয় মনে করতে না পারে, তবে বিদেশী পত্রিকাকে চ্যালেঞ্জ করা ও তদন্ত করা তার দায়িত্ব হয়ে পড়ে। তারপর বিষয়টি আদালতে নিয়ে যেতে পারে।

একটি উদাহরণ এখানে দেয়া যায়। বিদেশের পত্রিকায় লিখল আর ইউনুস অপরাধী হয়ে গেল? এত সহজেই? এ কেমন কথা? চিলে কান নিয়ে গেল, শুনেই দৌড় দিতে হবে? কানে হাত দেব না? সরকার কি নিজের নাগরিককে পরিত্যাগ করতে, ডিসওউন করতে পারে শুধু রাজনৈতিক কারণে? নাকি সরকারের কর্তব্য তার নাগরিকের পাশে এসে দাঁড়ানো? শক্ত চ্যালেঞ্জের পর, তদন্তের পর স্পষ্ট প্রমাণ বা কেইসের মেরিট পাওয়া গেলে সরকার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া কর্তব্য হয়ে পরে, তাও ব্যথিত মনে। বিদেশীদের অভিযোগের বিপরীতে সরকার কি তার নাগরিকের ডিফেণ্ডার হবে না? নাকি নিজেই তাদের সাথে সুর মিলিয়ে অভিযোগ প্রমাণের জন্য তৎপর হয়ে উঠবে?

আর আমরা যারা এদল ওদলের সমর্থক, আমাদেরও কর্তব্য আছে। আমি সরকারী দলের সমর্থক হলেও বিরোধী দলের জন্য অসম্মানজনক খবর শুনেই পুলকিত হতে পারি না। একইভাবে, আমি বিরোধী দলের সমর্থক হলেও সরকারী দলের জন্য অসম্মানজনক খবর শুনেই আহ্লাদিত হতে পারি না।

পরিশেষে, আশা করছি উত্তাপ কমে আসবে। সংসদ ধীরে ধীরে সত্যিই জমে উঠবে। অধিবেশন শেষ না হওয়া অবধি বিরোধী দল সংসদে থাকবে। হৃদ্যতা ও গঠনমূলক আলোচনায় ভরপুর হবে সংসদ।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী