ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিশালতা কতখানি? মুক্তিযুদ্ধের মহিমা কতখানি? আমি কি একই প্রশ্ন দুবার করলাম? হ্যাঁ, প্রশ্নের বিষয় এক নয়। অনেকেই হয়তো বলবেন, এ তো একটি শিশুও বুঝে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে ফারাক কী? এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা বড়রাইবা কতটুকু বলতে পারব? চোখ দিয়ে দেখা সহজ, কিন্তু চিন্তা দিয়ে ধারণ করা কঠিন। যুদ্ধের মহিমা বর্ণনা করা সহজ, কিন্তু চেতনার বিশালতা পরিমাপ করা অত সহজ নয়।

আমার লেখার বিষয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা; মুক্তিযুদ্ধ নয়। উদ্দেশ্য হলো চেতনার বিশালতা বুঝার চেষ্টা করা। কোন জিনিস কত বড় তা বুঝার জন্য ভাল তুলনা দরকার, দরকার অন্য একটি বড় জিনিস। আমরা মুক্তিযুদ্ধের বড়ত্বকে বুঝি। তাই এর সাথে তুলনা করেই চেতনার মাত্র ও মাপ বুঝা সম্ভব।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুক্তিযুদ্ধের অতিবর্তী। যুদ্ধের একটি শুরু আছে, তার একটি শেষও আছে। কিন্তু চেতনাকে ওভাবে শুরু আর শেষ দিয়ে ঘিরে রাখা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চিরায়ত মূল্যগুলোর নির্যাস। যুদ্ধ পরিহার করতে পারলে ভাল হয়, কিন্তু চেতনা সর্বদাই অপরিহার্য। যেসব জাতি মুক্তিযুদ্ধ করেনি তাদেরকে বলা যায় না, যাও যুদ্ধ কর; কিন্তু তাদের সামনেও চেতনাটি উপস্থাপন করে বলা যায়, এই নাও সুন্দর আদর্শ।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুক্তিযুদ্ধ নিরপেক্ষ; ঠিক যেভাবে ধর্মের বাণী ধর্মাবতার নিরপেক্ষ বা শিল্পীর বাণী শিল্পী নিরপেক্ষ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যুদ্ধের আগেই অর্জন করা হয়, এবং তা এমন বিষয় যা পরেও ধারণ করে চলতে থাকতে হয়। এমনকি যুদ্ধটি সংঘটিত না হলেও চেতনাটি নিজ থেকে আবশ্যিক হয়েই থাকে। এখানেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিশালতা ও শ্রেষ্ঠত্ব।

ব্যাপারটি আমাদের পূর্বপুরুষেরা ঠিকই বুঝেছিলেন। তাই তারা বলেছিলেন, “যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল – জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।”(*)

এবং এই আদর্শের প্রায়োগিক লক্ষ্যও তারা সুনির্দিষ্ট করতে পেরেছিলেন এভাবে, “আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা – যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।”(*) এখানে প্রকাশিত লক্ষ্যসমূহসম্পৃক্ত প্রধান ধারণাগুলো নীচে একে একে আলাদাভাবে উল্লেখ করলাম।

গণতান্ত্রিক পদ্ধতি: কেউ নিজেকে জনগণের স্বঘোষিত অভিভাবক মনে করবেন না, বরং সরকার গঠনের লক্ষ্যে জনগণের অবাধে প্রকাশিত ইচ্ছাকে প্রত্যেকেই মেনে নেবেন। অর্থাৎ কেউ এ ধারণা পোষণ করবেন না যে, জনগণ চিন্তায় ভাবনায় দুর্বল এবং যেহেতু এটিকে আমি বাস্তব সত্য মনে করি ও যেহেতু আমি নিজেকে প্রাগ্রসর মনে করি, সেহেতু জনগণের বুদ্ধির কাছে, চিন্তার কাছে আবেদন না করে বরং ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতা নিয়ে জনগণের ‘কল্যাণ’ সাধন করার অধিকার আমার আছে।

শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ: গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গঠিত সরকার ও আইনের লক্ষ্য হবে সম্পদের প্রবাহের দিক নির্ধারণ করে এমন সকল ক্ষেত্রে অসুবিধাজনক অবস্থানে থাকা পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করা।

সকল নাগরিকের জন্য: এখানে নাগরিকদের মধ্যে কোন পার্থক্য করা, বৈষম্য করার কোন অবকাশ থাকবে না। রাষ্ট্রের সকল নাগরিক সরকারের কাছ থেকে কোন ধরণের পক্ষপাত ছাড়াই সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার লাভের অধিকারী হবে।

আইনের শাসন: সরকার নিজের শাসন নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। তার সকল বিবেচনা, চিন্তা নিয়োজিত হবে আইনের সর্বোত্তমসম্ভব প্রয়োগের উদ্দেশ্যে। আইনের আওতা বহির্ভূতভাবে কোন পদক্ষেপই সে নিবে না, তা সেটি যতই উপকারী বলে তার কাছে বিবেচনা হোক না কেন।

মৌলিক মানবাধিকার: মৌলিক মানবাধিকার আমাদের সংবিধানে যেমন লিখিত আছে, তেমনই আছে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সনদে। কোন নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের উপর সরকার আক্রমণ করতে পারবে না এবং সরকার সকল নাগরিককে অপরের এরূপ আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে।

রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার: সরকার রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করবে। নাগরিকে নাগরিকে কোন বৈষম্য করবে না। কারও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না। কাউকে সুবিচার থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না। নাগরিকরাও একই ভাবে একে অপরের সমমর্যাদাকে ও স্বাধীনতাকে কথায় ও কাজে অস্বীকার করবে না; কারও উপর অত্যাচার, নির্যাতন, উৎপীড়ন করবে না।

উপরে যা বলা হলো তার দুটি স্পষ্ট ভাগ রয়েছে: ক) আদর্শ এবং খ) প্রায়োগিক লক্ষ্য। কিন্তু আদর্শ ও লক্ষ্য অর্জনের পথ দুটোই জটিল ও কঠিন। আদর্শের অবস্থান চিন্তায় আর লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে যদি আমাদের আচরণ ও কর্ম সে উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। আদর্শ বা চেতনা কোন কিছুর নাম মাত্র নয়, একটি সুগভীর ও চিন্তালভ্য বীক্ষা। অন্যদিকে, পথটি পাড়ি দিতে প্রয়োজন অনেক সংযম, ত্যাগ ও পরিশ্রম।

আবার এদুটি ভাগের সাথে আমাদের প্রত্যেকের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ও অপরিত্যাজ্য। এটি এমন নয় যে, অল্প কিছু শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী বা রাজনীতিক আমাদেরকে তা বয়ে এনে দেবে। চিন্তায়-চেতনায় আদর্শ অর্জন ও লক্ষ্যের দিকে পথ অতিক্রমণ দুটোই সকলের জন্য অন্তহীনভাবে নিরবচ্ছিন্ন কাজ।

যে আদর্শের কথা ও তার যে প্রায়োগিক লক্ষ্যের কথা বলা হলো তার কি দশা হয়ে আছে আমাদের ইতিহাসে? প্রশ্ন করা খুবই সহজ – একথা ঠিক। তবে অনেকেই যে এর হতাশা ব্যঞ্জক উত্তর দেবেন এটিও অপ্রত্যাশিত নয়। কিন্তু আমরা তো কেবল অলঙ্কারসর্বস্ব কথামালা রচনা করেই চলেছি। তাহলে কি আমাদের এই কথাই সার? আমার এই লেখাটিও কি সে বিশাল কথার সমুদ্রে আরেক কণা জল মাত্র?

মুক্তিযোদ্ধারা তাদের কাজ সম্পন্ন করে গিয়েছেন। আমাদের কর্তব্যভার আমাদের। অন্যের কাজের নিপুণতা দেখে যত সহজে হাততালি দেয়া যায়, তত সহজে নিজের কর্তব্য কর্মে হাত দেয়া যায় না। কাজেই, সকল মার্চ মাস হয়ে উঠুক আমিসহ সকলের আত্ম-বিশ্লেষণের মাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আত্মস্থ করার মাস। আর বছরের পর বছর সাড়া বছর হয়ে থাক সে পথে চলার কাল।

(*) কথাটি ব্লগার জাহেদ-উর-রহমান এর সাম্প্রতিক লেখা থেকে নেয়া। জাহেদের লেখাটির জন্য এখানে ক্লিক করুন।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী