ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমার ছয় বৎসরের কন্যা ম্যাক্সি’র কৌতূহল-উৎসারিত ও জিগীষা-প্রবুদ্ধ প্রশ্নবাণসম্ভারের আমিই একমাত্র সহজপ্রাপ্য ও সহজভেদ্য লক্ষ্য। আমার প্রতি তাহার আগ্রহ ও আমাকে সান্নিধ্যদানে তাহার অকৃপণতা আমার নিকট গোলাপের ন্যায় প্রীতিকর হইলেও প্রশ্নের সদুত্তরদানে আমার প্রায়শই প্রকাশিত অক্ষমতা বেশ খানিকটা কণ্টকের ন্যায় বিরাজ করে। পিতাকে ঈদৃশ কঠিন প্রশ্নবাণ নিক্ষেপের সামর্থ্যাধিকারবোধজনিত আনন্দে এবং পিতার মুখে ক্রমপরিস্ফুটমান ইতস্তত-বিহ্বলভাব সন্দর্শনে বাণের নিখুঁত লক্ষ্যভেদের নিশ্চয়তালাভজনিত বিজয়ানন্দের আতিশয্যে তাহার কচিমুখখানা যেন একেবারে প্লাবিত হইয়া উঠে। তাহার প্রশ্নের বিষয়াবলী আমার অনধিগত তো বটেই, এমনকি যুগ-যুগান্তর ব্যাপিয়া প্রকাণ্ড সব উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত দার্শনিকগণও ভাবিয়া চিন্তিয়া কূল-কিনারা করিতে পারেন নাই বলিয়াই জানি। এই কন্যা আজিকে অকস্মাৎ একটি ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্ন করিয়া বসিলঃ আচ্ছা বাবা, শয়তানের কাজ কি? এই রকম প্রশ্ন আমি, বলাই বাহুল্য, বরাবরই পাশ কাটাইয়া চলিতে চাহিয়াছি।

জীবনকে সহজভাবে দেখিবার এবং বয়োজ্যেষ্ঠ, সহপাঠী ও দরিদ্রজনদের সহিত আচরণের ক্ষেত্রে কতিপয় সহজ নীতি অনুসরণ করিয়া চলিবার উপদেশ আমি কন্যাকে অক্লেশে নিরন্তর প্রদান করিয়া আসিতেছিলাম। বলিয়াছিলাম: আপনাকে রাজাপেক্ষা ন্যূন ভাবিও না, ভিখারীকে আপনাপেক্ষা ঊন ভাবিও না, প্রজাসকল যাদৃশ রাজভক্তি করে তুমিও ভিখারিকে তাদৃশ সম্মান করিবে, সকল প্রাণের প্রতি এহসানি প্রকাশিত করিয়া চলিবে। কিন্তু আমার সকল প্রয়াসকে ব্যর্থ করিয়া দিয়া আজ সে এই প্রশ্ন করিল। উত্তরে বলিলাম: মিথ্যাকে সত্য, স্বল্পমূল্যকে মহামূল্য ও অসুন্দরকে সুন্দর প্রতিপন্ন করিয়া তোলাই তাহার কাজ। ইহাতে ঘৃতে যেন আহুতি দেওয়া হইল। তাহার পর আর যেসকল প্রশ্নে আমি জর্জরিত হইয়া উঠিলাম! – আগে জানিলে তাহার প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়া বরং নিশ্চুপ থাকিতাম।

প্রসঙ্গত দিনান্তরের কথা স্মৃতিপটে ভাসিয়া উঠিল। কোন মস্ত মানুষের সহিত আমার সাক্ষাতের সম্ভাবনা অনুমান করিতে পারিয়া কন্যা আমাকে একটি অটোগ্রাফ সংগ্রহ করিয়া দিতে অনুরোধ করিয়াছিল। তৎবিপরীতে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, অটোগ্রাফ প্রদান না করিয়া গ্রহণ করিতে তুমি এই যে আগ্রহান্বিত হইয়া উঠিলে তাহার বিশেষ কোন হেতু আছে কি? অন্যের অনুকরণ করিবার ক্ষেত্রে তাহার মধ্যে একটি জড়তা পূর্বেও আমা দ্বারা লক্ষিত হইয়াছে। এইবারও সেপথ চাতুর্যের সহিত পরিহারের লক্ষণসূচক ভাব চেহারায় স্ফুট হইতে দেখিলাম। কন্যা নম্রকণ্ঠে কেবল কহিল, বাবা! আমি তো তাহাদের মত বড় হইতে সমর্থ হই নাই। আমি তাহাকে বরাবরের ন্যায় নিজেকে অন্যের সমান জ্ঞান করিবার পরামর্শ দিলাম। ইহাতে কী বুঝিল তাহা বুঝিবার কোন অবকাশ না দিয়াই সে অন্তর্হিত হইল।

কিয়ৎ দূরে দাঁড়াইয়া কন্যার মাতা অলক্ষ্যে পিতা-পুত্রীর বিবাদ পর্যবেক্ষণ করিতেছিলেন। কন্যার অন্তর্ধানের পরক্ষণেই হতাশা প্রকাশ করিয়া কহিলেন, তুচ্ছ বিষয়কে লইয়া একটা মস্ত তোলপাড় না বাধাইলে তোমার চলে না দেখিতেছি। সামান্য এক অটোগ্রাফ লইয়াও এইটুকু মেয়ের সহিত তোমার ভারী কথার কপচানি। বলিয়া তিনি কন্যাভিমুখী হইলেন। বিষন্নমনে আমি এই প্রার্থনা করিলাম, অটোগ্রাফ সামান্যই বটে, তবে কন্যা যেন একদিন ইহা উপলব্ধি করিত পারে যে, যে বোধ অটোগ্রাফের জন্য মনোমধ্যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে তাহা সামান্য নহে। উত্তরজীবনে অটোগ্রাফের বাসনা পুতুল খেলার ন্যায় পরিত্যক্ত হইলেও বোধটি নানারূপে ঘুরিয়া ঘুরিয়া কেবলই প্রত্যাবর্তন করিতে থাকে।

বাংলাদেশীদের মধ্যে যারা এসএসসি পাশ করেছেন তারা সুইফটের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন। তিনি গালেবর জাহাজির সফরনামা লিখে খ্যাত হয়েছেন। এ সফরনামা চার খণ্ডে লেখা। ফ্যারওদের রাজ-কারিগরেরা অর্থাৎ সভ্যতার দিগ্দার্শনিকেরা তাঁকে সুনজরে দেখেছেন বলে মনে হয় না। সুইফট মানসিক বিকারগ্রস্ত ছিলেন বা অন্ততপক্ষে জীবনের শেষদিকে বিকারগ্রস্ত হয়েছিলেন তা সপ্রমাণে ব্যস্ত হওয়ার মতো মানুষের অভাব হয়নি। এতে বইয়ের অন্ততঃ ঘোড়াদের রাজ্যের কাহিনী নিয়ে লেখা চতুর্থ খণ্ডটিকে উড়িয়ে দিতে সুবিধা হয়। আপনি এরূপ বিশ্বাস করতেই পারেন যে, সুইফট ফরাসি বিপ্লব চলাকালে প্যারিস শহরে বাসরত থাকলে তাঁর মাথাটি গিলোটিনে দুবার কাটা পড়তো; বিপ্লবের এপক্ষ ওপক্ষ দুপক্ষই তাঁকে আপদ হিসেবে গণ্য না করে পারত না; এবং তাঁর মানসিক অসুস্থতা তাঁকে নিস্তার দেয়ার পক্ষে যথেষ্ট কারণ বলেও গণ্য হতো না।

পরিশেষে, কন্যা কর্তৃক উত্থাপিত প্রশ্নের পরিণতি প্রসঙ্গে ফিরিয়া আসা যাক। আমি জোনাথন সুইফট প্রণীত গ্রন্থখানা শেলফে আলাদা করিয়া রাখিয়া ও তাহা কন্যাকে দেখাইয়া দিয়া এবং একদিন সে তাহার প্রশ্নের উত্তর নিজেই অন্বেষণ করিয়া লইতে পারিবে এই প্রত্যাশা অন্তরে পোষণ করিয়া অসিয়ত করিলাম, সে যেন আর দশ বৎসরকাল অতিক্রান্ত হইলে এই গ্রন্থটি আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া লয়।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী