ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

যদি লিও টলস্টয়ের এ্যানা কারেনিন পড়ে থাকেন তবে দেখেছেন আত্মহত্যার বর্ণাঢ্য চিত্র। এক ডাক্তার আত্মীয়ের কাছে শুনেছিলাম আত্মহত্যার শারীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যা। কিন্তু যারা ঘরে বসে চিন্তার পাহাড় গড়েন, সে দার্শনিকেরাও বিষয়টিতে ভাগ না বসিয়ে অন্যের জন্য পুরোটা ছেড়ে দিতে রাজী হননি। আপনি আলবেয়ার কাম্যু বা ফ্রাঞ্জ কাফকা’র নাম শুনে থাকবেন বা তাদের বই পড়ে থাকবেন। এ দুই দার্শনিক একমত। জগতের উৎপত্তি বা প্রকৃতির স্বরূপের সমস্যা নয়, জ্ঞানের সমস্যা নয়, নৈতিকতার সমস্যা নয়, নান্দনিকতার সমস্যা নয়, দর্শনের প্রধান সমস্যা নাকি আত্মহত্যার সমস্যা। যে পণ্ডিত বেঁচে থাকার যুক্তি দিতে পারেন না তার পাণ্ডিত্য যেন আখেরে ষোল আনাই কেবল ঝুলন্ত উদ্যান। টলস্টয়ের এ্যানা কোন গ্রন্থির অতিরিক্ত রস নিঃসরণের কারণে বা কোন জীবন-জিজ্ঞাসার উত্তর না পেয়ে নিজেকে রেলগাড়ির নীচে ওভাবে ছুঁড়ে দিয়েছিল কে জানে!

মানুষ একা একা নিজেকে হত্যা করতে পারে। শুনেছি পাখিরা নাকি একবার কবে পুরো ঝাঁকে নিজেদেরকে মেরে ফেলেছিল। তবে মানুষ দু’য়ে দু’য়েও এভাবে মরতে পারে। একই নারীর প্রেমে পড়া দু’পুরুষের হাতে দুটি পিস্তল ও একটি করে গুলি দিয়ে কলহের মিমাংসা করার চল এই সেদিনও ছিল। উভয়কেই যদি বিদ্যেটা ভালভাবে রপ্ত করিয়ে দিতে পারেন তবে দুজনকেই মাটিতে ফেলে দিতে পারবেন। এ হলো, কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা। এ কাঁটা দিয়ে ও কাঁটা তোলা। ও কাঁটা দিয়ে এ কাঁটা তোলা। দু’কাঁটা দিয়ে দু’কাঁটা তোলা। আগের কালের রাজারা, জমিদাররা একে বলতেন কূটনীতি।

আমার মত বেরসিকও যখন হলিউডের টার্মিনেটর-২ ছবিটি গোটা দশেকবার দেখে ফেলেছে তখন আপনার মত রসিকজন একবারও দেখেননি ভাবাই কষ্টকর। সেখানে দেখেছেন, হিরো কিভাবে ভিলেনকে ফুটন্ত তরলে ফেলে নিঃশেষে নিশ্চিহ্ন করে এবং তারপর নিজেকেও সেখানে নামিয়ে দেয় শেষ চিপখানা শেষ করার জন্যে। এ-ও হলো, কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা। এ কাঁটা দিয়ে ও কাঁটা তোলা। এ কাঁটা দিয়ে তাকেই তোলা। এক কাঁটা দিয়ে দু’কাঁটা তোলা। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের দুনিয়ায় এ নয়া তরিকা খুবই সহজ। বসে থেকে নিবিষ্ট মনে কেবল কোড লিখ, তারপর কম্পাইল করে ইনস্টল কর। ব্যাস, কেল্লা ফতে। খরচের দিক থেকেও এর সুবিধা আছে। পিস্তলের সংখ্যা দুই থেকে এক’য়ে নামিয়ে আনতে পারেন আপনি। এই যেমন ধরুন, এক নারীরোবটকামি দুই পুরুষ রোবটের একটির হাতে এক পিস্তল ও দুই গুলি দিয়ে আপনি কাজ হাসিল করতে পারবেন।

বলতে চাইছিলাম জাতিগত আত্মহননের কথা। স্বভাবের দোষে বলে চলেছি ব্যক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধি, উপন্যাস আর ছায়াছবির কথা। আমরা বাঙালী জাতি নিজেদেরকে কিভাবে ধ্বংসের পথে চালিত করেছি তার কয়েকটি নমুনা দেখুন। আমাদের উঠতি বয়েসের ছেলেমেয়েরাই কেবল নয়, সংসারিরাও মেতে উঠেছেন। টেলিভিশনের পর্দায় দেখি চোখের জলে ভেসে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে আত্মহন্তা। যে হিমখণ্ডের চূড়া এতোটুকু তার কতটুকু জলের ভেতর চোখের বাইরে থাকে তা-ও হয়তো আপনার জানা। আফিম-ইয়াবার কথা না-ই-বা বললাম। তারপর দেখুন, নিজ হাতে নিজের খাবারে বিষ মিশিয়ে কিভাবে আমরা নিজেরাই হারাকিরি করে চলেছি। বাকি কিছু থাকলে আপনি নিজেই খুঁজে বের করে নিন। এত কিছুর হদিস দেয়া আমার উদ্দেশ্য ছিল না।

অট্টহাসির অন্তরালে আমি কেবলই শুনে চলেছি আত্মহন্তার করুণ আর্তনাদ। হে মৃত্যুকামি! তুমি কি দর্শকের আর্তনাদ শুনতে পাও?

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী