ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

বৃত্ত সমস্ত প্রকৃতি ব্যাপী কেবলই পুনরাবৃত্ত হয়ে চলেছে অন্তহীনভাবে। এমারসন বলেছেন, চোখ হলো প্রথম বৃত্ত আর দ্বিতীয়টি দিগন্ত। তার সাথে আরও দুটি যোগ করে বলা যায়, আকাশ হলো তৃতীয় বৃত্ত ও চতুর্থটি শূন্য। এক, দুই, তিন অনেক দিন থেকেই ছিল, ছিল না কেবল শূন্য। মাঝের বাসীরা পূবের বাসীদের কাছে শূন্য সংখ্যাটি শিখে পশ্চিমের বাসীদের শিখিয়েছিল। শিক্ষকের নামে ইউরোপীরা এই শূন্য-সম্পন্ন সংখ্যা-পদ্ধতিটির নাম দিয়েছিল আরবী সংখ্যা; যদিও এর নাম হওয়া উচিত ছিল ভারতীয়। আমাদের এই শূন্য একটি বৃত্ত, আমাদের চার বৃত্তের শেষ বৃত্ত। চোখকে যদি বলা যায় দর্শক, বিষয়ী বা আমি, তবে দিগন্ত তার দেশ, আকাশ তার স্বপ্ন, আর শূন্য যেন সকলের মান বা মূল্য।

অস্তিত্বের ঘেরগুলো সব এক একটি বৃত্ত, এখানকার জ্যামিতিতে যেন সরলরেখা বলে কিছু নেই। বৃত্তের ভেতর বৃত্ত, বৃত্তের বাইরে বৃত্ত। পরিধির কোথায় শুরু তুমি খুঁজে পাবে না; ইচ্ছেমত কোন বিন্দুতে তুমি তা ছিঁড়তেও পারবে না। দেহ-আত্মা, জড়-চৈতন্য, প্রকৃতি-অহং, অবভাস-বাস্তবতা, ভবন-সত্ত্বা, নিত্য-অনিত্য, পরনির্ভর-স্বনির্ভর, চঞ্চল-অচঞ্চল – সবখানেই এই বৃত্তের হেঁয়ালী। মুক্তির জন্য তুমি সরলরেখা খুঁজছো? তবে বিশ্বাস কর। বিশ্বাস করতে চাও না? তাহলে সংশয়ী হয়ে বৃত্তের মাঝে বন্দী হয়ে থাক।

হিরাক্লিটাস বনাম পারমেনাইডিস

আড়াই হাজার বছর আগে হিরাক্লিটাস বলেছিলেন, সবকিছুই বদলায়, স্থায়ীত্ব বলে কিছু নেই। এক নদীতে একজন দুবার স্নান করতে পারে না। নদীও বদলায়, জনটিও বদলায়। নদীর মাঝ বরাবর সাঁতার দিতে গ্রীকরা যেন জানে না; হয় এপার, নয় ওপার দিয়ে দৌড়। কদিন বাদে তাই পারমেনাইডিস বললেন, সত্ত্বা একটিই এবং তা অব্যয়, কিছুই বদলায় না। যেন নদীতে নদীই স্নান করে বা মানুষ স্নান করে মানুষে। নদী আর মানুষ যেন দুই নয়। তাহলে কি অচঞ্চল আর চঞ্চল একই বৃত্তের পরিধির দুই দিক মাত্র?

দেকার্তে বনাম সার্ত্রে

সন্দেহের আগুনে সবকিছু পুড়িয়ে ছাইয়ের ভেতর থেকে দেকার্তে ‘আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি’ বলে উল্লাসে উত্থিত হয়েছিলেন। তার কাছে এটিই ছিল বাস্তবতার প্রশ্নে আদি বচন, যাকে আমরা সকলেই জেনে থাকি বলে মনে করি। আমাদের নিজেদের অস্তিত্বই আমাদের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু ছাই থেকে যেন কেবল ছাইই মেলে, মুক্তো মেলে না। সার্ত্রে বললেন, কোথায় তুমি? আছে কেবল চিন্তাটি, একটি প্রসেস হয়ে। নিজেকে না দেখে কর কেবল লম্ফঝম্প। তাহলে কি প্রসেসগুলো সব এক একটি মুক্তোমালার মত বৃত্ত? যার একদিক ধরে দৌড়লে আমিতে লাফ, আর উল্টোদিক ধরলে কেবলই আমি বিহীন ছাইভস্ম?

অভিজ্ঞতা বনাম বুদ্ধি

দর্শনে জ্ঞানতত্ত্ব বলে একটি শাখা আছে। এখানে অভিজ্ঞতাবাদী ও বুদ্ধিবাদী এই দুই শিবিরে বিভক্ত দার্শনিকেরা বিতণ্ডা করে আসছেন সেই পুরনো কাল থেকে। আজকের বিজ্ঞান শুরু করেছিল অভিজ্ঞতাবাদীদের বলয় থেকে। যেতে যেতে গিয়ে হাজির হয়েছে সূত্র আর গণিতের জগতে। তাদের কারও কারও মতে, জগত নিজেই নিজেকে তৈরি করতে পারে যদি সূত্র দেয়া থাকে। এই সূত্র এলো কোত্থেকে? আহা! যদি বলা যেত, সূত্রগুলো ‘একমাত্র যৌক্তিক আবশ্যিকতা’! তবে কি অবভাস বস্তুর আকস্মিক উপরিতল নয়? জগত কি তবে চিন্তার অনিবার্য অভিব্যক্তি। এবার কি তবে যুক্তি দিয়ে উল্টোভাবে অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা দিয়ে বৃত্ত তৈরির পালা?

ডেভিসের বৃত্ত

পদার্থের নিয়মগুলো এমন যে তা যান্ত্রিক প্রসেস তৈরি করে। অথবা, ঘুরিয়ে বললে, এইসব প্রসেস পদার্থের সেই নিয়মগুলো দ্বারা অনুমোদিত। এই প্রসেসগুলোকে ব্যাখা করার জন্য গণনাযোগ্য গাণিতিক ফাংশন তৈরি করতে পেরেছি আমরা। এই ফাংশনগুলোর উপর ভিত্তি করে আবার সরল সমাধানযোগ্য গাণিতিক সিস্টেম তৈরি হচ্ছে। এই গাণিতিক সিস্টেমগুলোই আবার পদার্থের নিয়মগুলোকে উপস্থাপন করে। এখানে নিজের মধ্যে সংগতিপূর্ণ একটি বৃত্ত তৈরি হলো, যার প্রতিটি অংশ অন্য সকল অংশের মাধ্যমেই কেবল ব্যাখ্যাত হতে পারে। এই বৃত্তটিই পল ডেভিস-এর বৃত্ত।


.
হুইলারের বৃত্ত

পদার্থের নিয়মগুলো অংশগ্রহণকারী দর্শকের উত্থান ঘটিয়েছে। অংশগ্রহণকারী দর্শক থেকে আবির্ভূত হয়েছে তথ্য। তথ্য থেকে আবার এসেছে পদার্থের নিয়মগুলো। এ বচনগুলোর মূলে আছে কোয়ান্টাম মেকানিক্স, যেখানে দর্শক ও দৃষ্ট জগত একটির সাথে আরেকটি পারস্পরিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে আছে। এই নির্ভরশীলতা থেকেই এসেছে ‘অংশগ্রহণকারী দর্শক’ ধারণাটি। হুইলারের ব্যাখ্যা অনুসারে, বাস্তব জগতের একচুয়ালিটি দর্শকের ক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল, অথচ এই একচুয়ালাইজিং দর্শকই আবার পদার্থের জগতের ক্রিয়াকলাপের ফল। নীচে হুইলারের বৃত্তটি, তিনি যেভাবে এঁকেছেন, দেয়া হল। এখানে ইংরেজী অক্ষর ইউ দিয়ে ইউনিভার্স এবং চোখ দিয়ে দর্শক নির্দেশিত হয়েছে।


.
কোরানে বৃত্ত

আমরা কোরানের ৬৭তম সুরার ৩য় ও ৪র্থ আয়াতে দেখি আল্লাহ মানুষকে তার সুবিশাল সৃষ্টিটাকে দেখার আহ্বান করছেন। দর্শক, তুমি দেখ, আবার দেখ, আবার দেখ।

“No fault will thou see in the creation of the Most Gracious. And turn thy vision upon it once more: canst thou see any flaw? Yea, turn thy vision upon it again: and thy vision will fall back upon thee, dazzled and truly defeated.” (“মমতাবানের সৃজন ক্রিয়ায় তুমি লেশমাত্র ত্রুটি খুঁজে পাবে না। আবার তাকিয়ে দেখ! কোন ত্রুটির সন্ধান পাচ্ছ কি? আবার তাকিয়ে দেখ! তোমার দৃষ্টি তোমার উপরই নিপতিত হবে – হতবিহ্বল হয়ে, পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত হয়ে।”)

যদি প্রথম দেখাকে বলা যায় কাণ্ডজ্ঞানের দৃষ্টি, তবে দ্বিতীয়টিকে বলা যায় বিজ্ঞানীর দৃষ্টি এবং তৃতীয়টিকে বলতে হয় দার্শনিকের দৃষ্টি। এখানেও যে বৃত্ত। দেখতে গেলাম বাইরেটাকে, ঘুরে ফিরে শেষে আবার সেই ভেতরেই পুনপ্রবেশ।

অগাস্টিনের বৃত্ত

অগাস্টিন বলেছেন, ঈশ্বর এমন একটি বৃত্ত যার কেন্দ্র সর্বত্র, কিন্তু পরিধি কোথাও নেই। এমন পরিধিবিহীন কেন্দ্রসর্বস্ব বৃত্ত কেমন বৃত্ত? পরিধিসম্পন্ন সব বৃত্তই দেখতে ‘শূন্য’ সংখ্যাটির মত। পরিধিবিহীন বৃত্ত অ-শূন্য। অ-শূন্যের পাশে বসে শূন্যও সামগ্রিক মানের অংশীদার হতে চায়। তবে কি অগাস্টিনের বৃত্তের পাশে বসাই আর সব বৃত্তের মান রক্ষার শেষ উপায়?

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী